হারিয়ে যাওয়া হেমন্ত

রোশনি কুহু চক্রবর্তী


শীতের আমেজ অনেকটা মার আদরের মত , আস্তে আস্তে কপালে লেগে থাকা চুল সরিয়ে চুমু যেমন । ছোটবেলায় দুর্গাপুজোর পর পর মা মাথায় রুমাল জড়িয়ে বলত হিম পরবে , মাথা ঢেকে রাখতে হয় । শীতকাল নয় বলে রুমাল জড়াতে চাইতামনা মোটেও , মা বলত হেমন্তকাল এটা , শীত নয় কিন্তু হিমের পরশ থাকে । বছর তিন বয়সে আমার সব থেকে প্রিয় গান ছিল ‘হিমেরও রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে হেমন্তিকা করল গোপন ‘ মা গাইত আর কেউ গাইতে বললেই শীত গ্রীষ্ম বর্ষার বোরোলিনের মতই এই গানটাই শোনাতাম । পুজোর পরে উত্তর কলকাতায় মামাবাড়ির পাশে গঙ্গার ঘাটে বিসর্জন দেখার সময় থেকেই মাথায় হিমের পরশ ছোঁয়া মানা অতএব রুমালে মাথা কান ঢাকা । এই ছিল হেমন্তকাল ।
হেমন্ত কাল মানে মেজোদাদুর কাছে বহু পুরনো আনন্দমেলার ছবি দেখা , হেমন্তকাল মানে দাদুভাই –এর ঘড়িতে দম দেয়া শেখা , হেমন্তকালের অস্তিত্ব যেমন নেই , প্রায় মুছে যাচ্ছে বা মুছে গেছে ছোটবেলার মামাবাড়ির মত । আয় খুকু আয় ডাকটার মানে ছিল রাঙাদাদুর সেতার , সেজদাদুর হাওয়াইয়ান গিটার বাজানো মার সঙ্গে দাদুভাই –এর গান গাওয়া ।
‘ আয় খুকু আয় ‘ কার গাওয়া তখন জানতাম না । কিংবা হিমেরও রাতে ওই গগনে গানটা যে কেন আমার খুব প্রিয় ছিল সেসব বুঝতামনা , তবে জেঠুর কোলে বসে ওই গানটাই গাইতাম , বার বার জেঠু শোনাতে বলত । দক্ষিণ কলকাতায় তখন বেশ গাছপালা ছিল , জেঠুকে গান শোনালেই পিছনের ছোট্ট জঙ্গল থেকে আমার জন্যে স্থলপদ্ম ফুল আসত , বা আসত সন্ধেমালতী , গোলাপি , বেগুনি , সাদা , হলুদ এক-একটা গানে এক-একটা ফুল আমাকে উপহার দিত জেঠু , আর মামাবাড়িতে গান শোনালে উপহার পেতাম হজমিগুলি , রূপোর বাটি , এক টাকা , কাঠি লজেন্স আর আমার এই যাবতীয় উপহার পাওয়ার সময়টা ছিল হেমন্তে ঘেরা । ঠিক পুজোর পরে কালীপুজো ভাইফোঁটা এই সময়টা অব্দি কেটে যেত জেঠু দাদুভাইদের আহ্লাদে আহ্লাদেই ।
আস্তে আস্তে আমিও বড় হচ্ছিলাম কিন্তু পুজোর সময়গুলো ঠিক এমন করেই কাটত , হেমন্তকাল মানে দিদুনের হাতের নাড়ু , বেশ শক্ত কড়া পাক যাতে অনেক দিন টাটকা থাকে , আর নাড়ুর কৌটো রাখা থাকত জালের আলমারিতে । একটা বেশ শক্তপোক্ত কাঠের আলমারি , দরজাগুলোয় জাল দেয়া , বাইরে থেকে বুঝতে পারতাম ভেতরে কী আছে ঠিক তখনকার মানুষগুলোর মতই , বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যেত । কোনোদিন চুরি করতে হইনি , এমনি বড় নাতনি এবং মাসিরা প্রবাসী হওয়ায় বেশ কিছু বছর অব্দি একমাত্র নাতনি থাকার কারণে এতগুলো দাদু দিদা মামা মাসির আদরের ভাগটা আমার ছিল ।
এক মামা ছিল , যার কোলে চড়ে গঙ্গার ঘাটে বেড়াতে যেতাম , আর ভোঁ গাড়ি দেখতাম জেটিতে দাঁড়িয়ে।
মামা ওই বাড়ি থেকে এলেই মেজদাদু সব সময় তর্ক জুড়ে দিত আর কবিতা পড়ত শোনাত , মামা একদম চুপচাপ শুনত, সবসময় কেমন একা, সবাই যদিও খুব লম্বা আমি ভাবতাম আকাশের মত লম্বা বলেই হয়ত অনেক কিছু দেখতে পেত মামা যেটা আমরা পেতামনা । আমি একটা পুরনো উঁচু চৌকিতে দাঁড়িয়ে তখন লম্বা সাজার চেষ্টায় । আমি ছাই কোনোদিন বুঝেছি কী সেই কবিতা । ফুলমাসি দরজা বন্ধ করে সারাদিন ‘তোমাকে চাই’ বা ‘বাজল ছুটির ঘণ্টা’ কেন শোনে , কী গান এটা , এসব তো বুঝিনি তখন । প্যান্ডেলের বাঁশে দোল খেতে খেতে দেখতাম ‘ এলাদিং বেলাদিং শৈল ‘ বলে একটা খেলা খেলছে পাশের ধোপামামার মেয়ে পিঙ্কি , যাকে দেখলে আর চিনতে পারবোনা এখন হয়ত । সেও হারিয়ে গেছে , হারিয়ে গেছে ডাবুদাদার দেওয়া পুকুরমাঠের পাশে সেই ফুটবলটা , ওর ফুটবল আমাকে দিয়ে দিয়েছিল , ও এখন একটা রাজনৈতিক দলের হোল টাইমার । ফুটবলটা অনেকদিন আগেই বিক্রি হয়ে গেছে ফুটো হয়ে যাওয়ায়।
হারিয়ে গেছে দিদুনের মুখে শোনা কত গান, সুর, ঘুমপাড়ানোর গল্প ও ছড়া আর সেসব রোদজ্বলা দুপুর। ছুটি শেষে বাড়ি ফিরে ইশকুলে যেতাম আর এসব গল্প করতাম অর্পিতার সঙ্গে। মামাবাড়ির বনভোজনের গল্প করেছিলাম , ও বলেছিল আমরাও ফিস্ট করি চল, ওর চোখ দুটো কী ভাসা ভাসা , ঠোঁট দুটোয় ছিল যেন অভিমানের সুর.ফিস্টের মাস কয়েক পর থেকে ও আর ইশকুলে আসেনা , শুনি ওর শরীর খারাপ,কারও বাড়িতে ফোন নেই তাই কথা বলতে পারিনা , আনুয়াল পরীক্ষার শেষদিনে শুনলাম অভিমানে চলে গেছে ও ছেলেটা অনেকটা দূরে যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায়না। সেই আমার প্রথম হারানো বুঝতে শেখা , অস্থিমজ্জা ক্যান্সার নামটা শুনলেও তখন বুঝিনি , চলে গেল ও আর দূরদর্শনে খবরের কাগজে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণাগুলো দেখলে মনকেমনটার সঙ্গে অর্পিতাও জুড়ে গেল ।
মনকেমনটা নিয়ে আমিও বড় হয়ে গেলাম , দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারি থেকে নাকতলা,সেখান থেকে অনেক বছর বালিগঞ্জ হয়ে আবার বৈষ্ণবঘাটার অন্য এক বাড়িতে বাসা বদল হল আমাদের । তারপর গাঙ্গুলিবাগান । মনটা বদলেছে কিছুটা কিন্তু অনেকটা ছোটবেলা রয়ে গেছে দিদার বুনে দেওয়া পশমের জ্যাকেটের মত । এখন আমাদের বাড়ির উপরতলাতেই একটা বাচ্চা ক্লাস থ্রিতে পড়ে নামী ইংরেজি মাধ্যমে , ওর কোনও মামাবাড়ি নেই , এক মাসি শুনেছি আছে যিনি শিলিগুড়ি থাকেন , ও কোনও সম্বোধন জানেনা । কম্পাউন্ডে খেলে যখন ওরা সবাই সবাইকে নাম ধরে ডাকে বয়সের অনেক তফাত হলেও ,এমনকী কাজের দিদিকেও। ফুলমাসি , রাঙাকাকু এসব শব্দ নাইবা জানুক ও কিন্তু জানে বিয়ে ভাঙা মানে ডিভোর্স,পুরুষ মানে বড় কোন লোক , জিলাতো বা বাস্কিন রবিন্স জানে ও কিন্তু জানেনা টং-লিং, ও ইয়ে জাওয়ানী হায় দিওয়ানী দেখে মার সঙ্গে সাউথ সিটিতে স্কুল থেকে ফেরার পথে দুপুরে।
দুর্গাপুজো মানে ওর কাছে মল থেকে কেনা জামা আর নায়িকার আদলে বেঁকে হাঁটা ওই জামাগুলো পড়ে , গল্প শুনতে ও ভালবাসেনা চেষ্টা করে দেখেছি কিন্তু খুব গুছিয়ে সিরিয়ালের সব চরিত্র অভিনয় করে দেখাতে পারে, মুন্নি বদনাম হুয়ি ডাউনলোড করে বাবার রিংটোন বানিয়ে দিতে জানে। ও নিজের জামাকাপড় নিজে ভাঁজ করতে জানে ,ও বা ওর মত এই পুঁচকিগুলো বড্ড স্বাবলম্বী, ওরা সবাই খুব বড় হয়ে গেছে আট নয় বছর বয়সেই বলা যায় ছোটবেলা বলতে আর কিছুই নেই,ওরা সবাই বয়ঃসন্ধির কিশোরী বা কিশোর । ওর ভাল লাগা থেকে নয় , মহাগুরুর সঙ্গে নাচতে চায় বলে শেখে । সেই লাল ফুটবল বল,ইশকুলের সাদা ফিতে ,পেন, পেন্সিল, রাবার,ঘোর বর্ষায় প্রয়োজনীয় ছাতা যেমনভাবে হারিয়ে যায় , ওদের জীবন থেকে গোটা হেমন্তকালের মত শৈশবের এই হারিয়ে যাওয়া তার থেকে অনেক বেশি অদ্ভুত । ঠিক পদ্মশ্রী বাটার দোকানটার সামনে আশা দিদার বাড়ির নিচে [ হ্যাঁ এই নামেই চিনতাম আশাপূর্না দেবীকে] আমার ইশকুল বাসটা যেমন দাঁড়িয়ে থাকত , অনেক ছোট ছিলাম যখন বাসের কাকু বা দাদা বাটাকাকুকে নামিয়ে দিত বাসের পা দানী থেকে ধরেই,হ্যাঁ বাটাকাকু নামেই আমাকে ডাকত ওরা দুজন। আবার শিশু দিবসে বাসজুড়ে সব পুঁচকেকে ওরা লজেন্স খাওয়াত, মায়ের মনে কোনও ভয় ছিলনা । উপরের পুঁচকে জেনিলার [ নামটা বেশ ইংরেজি ঘেঁষা না হলে স্কুলে ভর্তি হওয়া যায়না এখন শুনি ] মা ওকে স্কুল বাসটা ছাড়িয়ে দিয়েছে , কিছুদিন আগেই স্কুলের একটা একরত্তি মেয়ে বাসের কাকুর হাতেই শৈশব হারিয়ে ফেলায় , বড় হয়ে যাওয়ায় । জেনিলাও তাই অনেক বড় , ঠিক যেন ম্যানিকুইন,আসলে সময়টাই বদলে কুৎসিত হয়ে গেছে , অর্পিতা যখন চলে যায় , সেই কর্কট রোগটাই সারা সমাজটাকে গ্রাস করেছে , কারও শরীরে ক্যান্সার ,কারও মনে , শরীরের ক্যান্সারের নিরাময়ের উপায় জানার চেস্টা জারি রয়েছে কিন্তু মনের ক্যান্সার আরও প্রবল ভাবে গ্রাস করছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং –এর মত । আর আশা দিদার নামে এখন ভাসমান সুইমিং পুল হয়েছে ।
এভাবে যখন বুঝতে শিখেছি ,বড় হচ্ছি, পড়তে শিখেছি , আস্তে আস্তে হেমন্তকাল যেমন শীতকালে মিলিয়ে যায় তেমনি আমার নাকতলার জেঠু , আমার দাদুভাইরা , আমার দুই প্রিয় মামা, সেখানে চলে গেছে যাদের জন্যে কার্তিক মাসে নাকি আকাশপ্রদীপ জ্বালতে হয় । মামাবাড়ির পাশে অবাঙালি বন্ধু , দাদা , কে কোথায় হারিয়ে গেছে হেমন্তকালের মতই আর আমার ছোটবেলাটা একসঙ্গে হারিয়ে গেছে ।
ফুলমাসি এখন মানসিক রোগী , ঘুম পেয়েছে বাড়ি যা শুনে যে মেয়েটা দরজা বন্ধ করে নাচত , পরপর ৩ বার সন্তান গর্ভেই মারা যাওয়াতে মাসির ঘুম চিরকালের জন্যে বিদায় নিয়েছে ঠিক হেমন্তকালের মতই ।
শুধু মাঝে মাঝেই অর্পিতার মুখটা মনে পড়ে আর ৫-ই মার্চ আসলে বসন্ত এসে যাওয়ার বদলে মনে হয় ওর চলে যাওয়ার দিনটা , আমার প্রথম হারিয়ে যাওয়া শেখার দিনটা ছিল বসন্তকাল ।
পুরিয়া ধানেশ্রী রাগটা যেদিন শিখেছিলাম গুরুজীর কাছে , আমার বয়স তখন তেরো আর তার কিছুদিন আগে বা পরে ওই সময়টা থেকেই জীবনানন্দের কবিতা বোঝা শুরু , জীবনানন্দের কাছে হেমন্ত ঋতু ক্ষয়িষ্ণুতা ও মৃত্যুর প্রতীক , আবার একই সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উৎসবের কাল। আমার কাছে হেমন্তকাল ঠিক যেন হারিয়ে ছোটবেলার পুরিয়া ধ্যানেশ্রী রাগ যে সুর গুনগুন করতে করতে হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলা মনে পড়বে আর চোখ ঝাপসা সেলফি উঠবে । জেনিলা স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্যে ধুম মাচালে চালিয়ে নাচ প্র্যাকটিস করছে , আর আমি ভাবছি সা পা মা পা ধা পা রে মা গা ভৈরবী না ? ও ওর বাবার ট্যাবে একটা সেলফি তুলে আমাকে দেখাবে কাল আমি জানি আর তখন ওকে বলব ধুম মাচা লে কিন্তু ভৈরবী রাগ জানিস । আবছা হেমন্তকালের মতই আবছা হয়ে যাওয়া ছোটবেলাটা ওকে ফিরিয়ে দিতে পারি কিনা দেখি।