গুলবাহার

প্রকল্প ভট্টাচার্য


আমি তখন কোন ক্লাশে পড়ি ? ওয়ানে বোধহয় কি তাও নয় | একদিন সকালে জ্যেঠিমাকে দেখলাম ছাদে বসে কয়লার গুড়োতে জল মিশিয়ে হাতে চেপে চেপে কালো লাড্ডু বানাতে, আর একের পর এক সাজিয়ে রোদ্দুরে শুকোতে দিতে |

স্বাভাবিক কৌতুহলে জানতে চাইলাম যে ওগুলো কী, কোন কাজে লাগবে | জ্যেঠিমা বললো, ওগুলোকে বলে গুল, উনুন ধরাতে কাজে লাগে, নতুন নাম শেখার আনন্দে দৌড়ে গিয়ে মা কে বললাম, " মা জানো, জ্যেঠিমা ছাদে বসে গুল দিচ্ছে !"

মা খুব বকেছিল, " এসব কি ভাষা শিখেছ, রাস্তার ছেলেদের মতো ?"

তখনো বুঝিনি যে আমি কোন কথাটা খারাপ বললাম | মিথ্যা কথা বলাকে যে গুল দেওয়া বলা হয়, আর সেটা যে ভদ্র ভাষায়, বা গুরুজনদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে নেই, কিছুই জানতাম না | এরপর গুল কয়লার ব্যবহার কমে গেল, উনুনের বদলে এল জনতা স্টোভ তারপর এলপিজি | একদিন জ্যেঠিমাও চলে গেলেন, কিন্তু গুল কথাটার সাথে পরিচিতি আমার বাড়তেই লাগলো |

জলপাইগুড়িতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তো আমার এক পিসতুতো দাদা | সে আমাকে বলে ছিল দার্জিলিং এ ইভয়ানক বাঘের উপদ্রব, তাই রাস্তার ধারে ধারে বন্দুক রাখা থাকে | কখনো যদি পথচারীরা বাঘের কবলে পড়ে, সেইসব বন্দুকের সাহায্যে প্রাণরক্ষা করতে পারবে | শিশুমনে বিশ্বাস করেছিলাম, এবং এই অভিনব তথ্য অন্যদের জানাতে গিয়ে বুঝেছিলাম যে বোকা বনেছি | বড়রা বলেছিল, দাদা ওসব বানিয়ে বলেছে, মিছিমিছি কথা | 'গুল দিয়েছে' বলেনি কেউ | খারাপ কথা যে !

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিশতে হলো বিভিন্ন বয়সী ছেলেদের সাথে | পাড়ার ক্লাবে খেলতে আসতো পার্থ আর সিদ্ধার্থ নামের দুই ভাই | ওদের বাবা ছিলেন পুলিশ ইন্টেলিজেন্স ব্র্যাঞ্চের বড় অফিসার | সেই সুবাদে ওরা ছিল আমাদের হিরো | পার্থ আমাদের শোনাতো কী ভাবে ওদের বাবা একবার বাইক নিয়ে গুন্ডাদের গাড়ীর পিছনে ধাওয়া করে, তাদের গ্রেপ্তার করেছিলেন, কী ভাবে গুলির বৃষ্টির মধ্যেও অকুতোভয়ে জাপটে ধরেছিলেন এক দাগী আসামীকে, সেই সব রোমহর্ষক গল্প | আমরা চোখ বড় বড় করে শুনতাম সেগুলো, আর অনেকেই ওদের গুলবাজ বলতো |

তারপর আমাদের বাড়ীতে টি ভি এল | টেলিভিস্টা | সে এক মায়াবী জগৎ | চিচিং ফাঁক থেকে দর্শকের দরবারে কোন কোন অনুষ্ঠানের সময় টি ভি চালানো হবে, আর তার কোনগুলো আমরা ছোটরা দেখতে পাবো, তা বড়রাই ঠিক করে দিতেন | এই সময় জেনেছিলাম একটা অনুষ্ঠানের নাম ' ফুল খিলে হ্যায় গুলশন গুলশন ' | প্রথমে ভেবেছিলাম এ কোনও গুল দেওয়ার প্রতিযোগিতা বোধহয় | সাহস করে বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিলাম যে গুলশন মানে বাগান ; উর্দু ভাষায় গুল মানে ফুল |

ভিন্ন এক অর্থ জানবার পর গুল শব্দটা যেন মনের আরও কাছে চলে এসেছিল | গুলকয়লা বা মিথ্যাভাষণের মধ্যে যে অস্বস্তিকর নোংরামি থাকে, ফুলের নিষ্পাপ সারল্যে তা কেটে গেল | সত্যিই তো, গুল দেওয়া মানে তো মিথ্যা কথা বলা নয় | বরং অসম্ভব রকম অতিরঞ্জন | দুটোকে কী এক শ্রেণীতে বসানো যায় কখনো !!

আর একটু বড় হয়ে চারমূর্তি সিনেমায়, এবং তারপর শ্রী নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায় পেলাম টেনিদাকে | প্রবাদপ্রতিম গুলবাজ | শুধু ক্যাবলা, হাবুল সেন ও প্যালারাম কেন, পাঠকদেরও কি সাধ্য ছিল যে তার কথায় ভুল ধরে, বা চ্যালেঞ্জ করে ! বাঙালী গুলবাজরা টেনিদার মধ্যে তাদের আইকনকে খুঁজে পেয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিল, ' ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক !' এর পরের ধাপ ওনার গুরুদেব পর্যায়ের গুলবাজ, ঘনাদা | প্রেমেন মিত্তিরের সৃষ্ট প্রাত:স্মরণীয় চরিত্র | মৌলিক কাহিনী আর বিপণন সংস্থা বা মৌকাসাবিসের কর্ণধার, ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ীতে গৌর, শিশির এবং লেখককে উনি যে গল্প শোনাতেন, তা কখনো বা কল্পবিজ্ঞান, কখনো বা রূপকথা | কিন্তু মিথ্যা ভাষণ ? নৈব নৈব চ !

কার্টুনিস্ট অহিভূষণ মালিক সৃষ্টি করেছিলেন নোলেদার, যে কি না পেলের সাথে ফুটবল নিয়ে ছেলেখেলা করতো, তাবড় ম্যাজিসিয়ানদের দেখাতো ভেল্কি | অসম্ভব তা, সেটা জেনেও অবিশ্বাস্য মনে হয়নি কখনো | শ্রী নারায়ণ দেবনাথের বাঁটুল দি গ্রেট, বা প্রানের চাচা চৌধুরী ও সাবু | হ্যা, এরা আর দশজনের মতো নয়, কিন্তু তাইবলে মিথ্যা হবে কেন ! সুনীল গাঙ্গুলীর কাকাবাবু- র গল্পে এক ডাহা গুলবাজ চরিত্র হলো জোজো | লীলা মজুমদারের প্রবাদপ্রতিম চরিত্র পদিপিসীর রান্নার বর্ণনা দিয়েছিল পাঁচুমামা- " একবার ঘাস দিয়ে এইসা চচ্চরি রেঁধেছিলেন যে, বড়লাট সাহেব একেবারে থ !" শ্রী ত্রৈলোক্যনাথের ডমরুধর, পরশুরামের বিরিঞ্চিবাবা, এমন কতো প্রতিষ্ঠিত গুলবাজ বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন | থাকবেনও চিরকাল, তার কারণ, মিথ্যাবাদীদের আমরা ঘৃণা করি, কিন্তু গুলবাজদের আপন করে নিই, মজা পাই তাদের নির্দোষ অসত্য বচনে |

স্কুলে আমাদের ইংরাজী পড়াতেন শ্রী রামকুমার দা | পড়ানো শেষ হলে উনি নানারকম গল্প শোনাতেন | একবার বলেছিলেন, কী ভাবে ব্রুস লি তাঁর কাছে কুংফু তে পরাজিত হয়ে শ্রদ্ধার চিহ্ন হিসেবে একজোড়া জুতো উপহার দেয়| প্রমাণ হিসেবে তিনি দেখিয়েওছিলেন তাঁর পায়ের 'লি' কোম্পানির জুতোজোড়া | ভীষণ মজা পেয়েছিলাম আমরা | বিশ্বাস করেনি কেউই, প্রয়োজনও ছিল না !

বয়স বাড়ার সাথে সাথে চারপাশের পৃথিবীটা যেন ক্রমে ব্যস্ত হয়ে যেতে লাগলো | টি ভি তে নানান নিউজ চ্যানেল সেইসঙ্গে ইন্টারনেট - সব মিলিয়ে মানুষজন এক একটা সার্চ ইঞ্জিন হয়ে উঠলাম | পাড়ার রমেনবাবু আর বাজারে যেতে যেতে সগর্বে বলতে পারেন না যে তিনি আগের সপ্তায় একটা দেড় কেজি ইলিশ কিনেছিলেন দু'শো টাকায় | প্রতিবেশী জয়দীপ যখন বলে যে হায়দ্রাবাদের ডেলয়েট কোম্পানি তাকে চাকরি দিয়েছিল কিন্তু সম্বর রসম খাওয়ার ভয়ে সে যায়নি, তখন সেই বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস কম থাকে, ফাঁপা শোনায় | এই সব গুলবাজরা ক্রমেই হারিয়ে যেতে লাগল অন্যদের জ্ঞানের পরিধি এবং যাচাই ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে | বিশ্বাস - অবিশ্বাসের মাঝখানে যে দোলাচল, সত্যি - মিথ্যার সীমানায় যে জগৎ, সেই নিষ্পাপ সারল্য আমরা হারাতে লাগলাম ধীরে ধীরে - পুরনো 'গুলবাহার' সেন্টের গন্ধের মতো |

এই কেজো, কেঠো, ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট জীবনযাত্রায় "এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়, সব সত্যি" গান গেয়ে ভাবের ঘরে ডাকাতি ছাড়া আমরা আজ আর কিছুই করছি না | গুলের জগতে মশগুল হয়ে থাকার সেই নেশা, সেই আড়ালে গুলতানি করবার ছেলেমানুষি - সবই কেমন যেন হারিয়ে গেল | তা গুগল - এর ধাক্কায়, নাকি ব্যস্ততার গুগলি বল সামলাতে না পেরে, - কে জানে !!