মোচার চপ

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

- "কাকে কি বলবেন বলুন তো? টিভিতে নিউজ্‌ চ্যানেল খুলতেই ভয় করে... সবাই সব জানে, কিন্তু সব চুপ!"
- " সেই..."
- "কেঁচো খুঁড়তে গেলেই কেউটে বেরিয়ে পড়বে... কে রিস্ক নেবে, মাথা খারাপ! সবার নিজের ফ্যামিলি আছে... আপনার আমার... কি বলেন?"
- "হুম... ঠিকই তো। নিজের পরিবারের কথা কে না ভাবে..."
- "তাহ'লে? শেষে হিরো সাজতে গিয়ে একটা কিছু ভালমন্দ ঘটে গেলে... কে দেখবে?"
- " কেউ না... "
- "আমার তো দাদা সাফ কথা... ন্যায়-অন্যায় সব বুঝি, কিন্তু নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলে কেউ কিচ্ছু করে না... ঝামেলা সামলানোর সময় কেউ থাকে না।"
- "হুম, দেখেছি... টিয়ার গ্যাসে রাস্তার পাব্লিকেরই চোখ জ্বলে, কোনও সাজানো অফিসের ভেতরে ঢোকে না।"
- "তাহলে?... দিনকাল যা পড়েছে, চুপচাপ থাকাই সেফ।"
- "হুম।"

তারপর সেই অটোর সহযাত্রী সামাজিক অবক্ষয়, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, আপোশনীতি... পর্দার আড়ালে মিটমাট এসব অনেক কিছুই বলল... অমলবাবুর সবটা মনেও নেই, অর্ধেক কথা কানেই ঢোকেনি, মাঝে মাঝে হ্যাঁ-হুম করে গেলেন। ওনার থেকে বেশি কথা বোধহয় অটোচালকটি শুনেছে। তার অটোতে লাগানো রাজনৈতিক দলের স্টিকারটি অমলবাবুর চোখ এড়ায়নি। ঘড়ির দিকে বার বার তাকিয়ে দেখছেন, রাত আটটা বেজে গেছে। বেশি দেরি হ'লে কাগজের ঠোঙায় মোচার চপ আর ফুলুরি ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ভাজা তেলে ঠোঙার গায় ছোপ ছোপ দাগ, কোনও এক ধর্ষিতার আত্মহত্যার খবরকে ভিজিয়ে দিয়েছে।


- "কি গো এত দেরি হ'ল?"
- "উফ!"
- "এতে উফ-এর কি আছে... ওমা মোবাইলটার ওই অবস্থা হ'ল কি করে! আবার হাত থেকে ফেলেছ?"
- "কি করব, অন্য হাতে তেলে ভাজার ঠোঙাটা সামলাতে গিয়ে... মলিইইইইই... "
- "উনি এখনও কোচিং ক্লাস থেকে ফেরেননি... সাতটায় ক্লাস শেষ হয়, দেড় ঘণ্টা হয়ে গেলো, ঘরের ফেরার নাম নেই!... খুব ডানা হয়েছে!"

অমলবাবু তখনও তেলে-ভাজার ঠোঙাটা হাতে শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সাড়ে আটটা বেজে গেছে। বাংলা খবরের চ্যানেলটা নিজের মনে কি সব বলছে, কানে আসছে না। ওনার মেয়ে মলি মোচার চপ খেতে বড় ভালবাসে। ঠোঙায় মোচার চপ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, হাতের তাপে সে কি আর গরম হয়? তেলের দাগ, হাতের ঘামে ভিজে ঠোঙা একেবারে বিবর্ণ, সেই 'ধর্ষিতা' শব্দটাই আর চেনার উপায় নেই।