রোদ্দুর-উঠোনে দুরন্তবেলা

ঈশিতা ভাদুড়ী


যে স্বপ্নময় হাতগুলি লেগে আছে স্পর্শচিহ্নের মত
পালকে পালকে আটকে আছে যে সূর্যোদয়
যে পুরোনো নদী , যে পুরোনো মাঠ, যে পুরোনো গতকাল
যে পুরোনো চিলেকোঠা, শিকড়ে যে উত্তাপ
যে গচ্ছিত ঠিকানা বাজে জলতরঙ্গের মত...

সে আমার ২৫/১ চৌধুরী পাড়া লেন । সামনে পুকুর, পেছনে পুকুর । চৌধুরী পাড়া থেকে জগাছা, ব্যাতর, দূর্গাতলা, রামতলা সবটাতেই ছিল আমাদের একচ্ছত্র অধিকার । আমাদের বাড়িটা ছিল মস্ত বড় । বারো ঘর এক উঠোন বলতে যা বোঝায় , আক্ষরিক অর্থেই তাই ছিল আমাদের , রান্নাঘর পুজোর ঘর ভাঁড়ার ঘর ইত্যাদি নিয়ে আমাদের বারোটা ঘরই ছিল । আর একটা মস্ত বড় উঠোন । বাড়ির বাইরে চৌহদ্দির মধ্যে একটি প্রেসও আবার। লেটারপ্রেস ।

ঠাকুমা ঠাকুর্দা বাবা কাকা জ্যেঠা , সবাই মিলে বসবাস ছিল আমাদের । বাবারা ছয় ভাই ছিলেন , আর তিন পিসি , পিসিরাও আসতেন মাঝে মাঝে লক্ষনৌ থেকে গুসকরা থেকে নবদ্বীপ থেকে , সঙ্গে পিসতুতো ভাই-দাদারা । সোনায় সোহাগা আর কী ! আগাগোড়া একান্নবর্তী সংসার । সকাল থেকে রাত্রি বেশ আনন্দ আর হৈ হৈ । আমরা ভাই-বোনেরা সন্ধেবেলায় একসঙ্গে পড়তে বসতাম রাঙাকাকার ঘরে , দোতলায় । একতলার বারান্দায় তখন মা-কাকীমাদের গল্প । শরৎচন্দ্রের মেজদা-কাহিনীর মত আমাদের ভাই-বোনেদেরও একই অবস্থা । মাঝে মাঝেই জল খেতে যাওয়া ইত্যাদির বাহানা করে একতলাটা একটু ঘুরে আসা , রান্নাঘরে উঁকি মারা, দিদিয়ার ঘরে একটু ঘুরে যাওয়া , আমরা ঠাকুমাকে দিদিয়া বলতাম , দিদিয়াকে ম্যানেজ করে ওপরে যাওয়া থেকে রেহাই পাওয়াই যেত কখনও কখনও । সন্ধে সাড়ে আটটা বাজতে না বাজতেই রান্নাঘরে থালা-গেলাস সাজানো হত । ধীরে ধীরে আসা আরম্ভ হয়ে যেত আমাদের সকলের । যেহেতু দুপুরবেলা স্কুল-অফিস থাকার জন্যে খাওয়াটা একসঙ্গে হত না , রাত্রিবেলায় কিন্তু আমরা সকলে একসঙ্গে মাটিতে পিঁড়িতে বসে কাঁসার থালা গেলাসে নৈশভোজ সারতাম । খেয়ে-দেয়ে আমার ছোট যমজ দুই বোন এঘর-ওঘর আড্ডা মেরে আদর খেয়ে বেড়াত ।

আমি তাদের থেকে বছর তিনেক বড় , আমার পরিসর বিস্তৃত ছিল । আমি স্বভাবেও ডানপিটে ছিলাম । মেয়েলিপনা থেকে সরে দাদাদের সঙ্গে ছুটোছুটিতেই উৎসাহ আমার বেশি ছিল । ছুটির সময় দুপুরবেলায় সারা বাড়িই আমাদের হয়ে যেত । তখন মা-কাকীমাদের বিশ্রামের সময় । তখন আমাদের যাবতীয় কান্ডকারখানা করে বেড়ানোর অখন্ড পরিসর । প্রতিদিনই আমাদের নতুন নতুন আবিষ্কার । তখন কিন্তু ভাঁড়ার থেকে চুরি করাটাও একটি অত্যন্ত জরুরী কাজ ছিল । একজনের কাঁধে আরেকজন চেপে ঠাকুমার হেঁসেলের উঁচু সেল্‌ফ্‌ থেকে মোয়া চুরির যে কী স্বাদ আজকের শিশুরা তো জানতেই পারলো না । শীতের দুপুরে ছাদে দাঁড়িয়ে কত কী খেলা তুতো ভাই-বোনদের হতে পারে সেসবও জানতে পারলো না তারা । আমাদের কিন্তু এইভাবেই বড় হওয়া । রামঠাকুরের মেলায় উবু হয়ে বসে শাখের আংটি কেনা আজকে কতজন শিশুকে আকর্ষিত করবে ? যৌথ পরিবার , শিশু-কিশোরদের শৈশব কৈশোর, সবই তো বেমালুম হারিয়ে গেছে এখন। পুকুরপাড়ে বসে ব্রজদি দূর্গাদির বাসন-মাজা দেখার মধ্যে কী বিস্ময় ছিল যা আজ ফ্ল্যাটের সিঙ্কে বাসন-মাজার মধ্যে নেই ?

চোখ মেলে দেখি আজ
উড়ে গেছে তারা
নিশ্চুপ ছায়া-ছায়া অন্ধকারে ...

বিকেল হল কী হল না , আমাদের পাড়া বেড়ানো শুরু হয়ে যেত । তখন নকশাল পিরিয়ড ছিল । স্থানীয় সব নকশাল দাদাদের সঙ্গে আমাদের বেশ ভালই ঘনিষ্ঠতা ছিল । তাদের মধ্যে একজন খুব ‘ইমিডিয়েট’ শব্দটি ব্যবহার করতো , তাই আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ইমিডিয়েটদা , মিষ্টির দোকানে নিয়ে গিয়ে আমাদের মিষ্টি খাওয়াতো । উবু হয়ে বসে আমরা তাদের সঙ্গে বোমা দেখতাম । এরকমই একদিন মনিকাকা আমাদের দেখে ফেললেন, সেইখান থেকে ধরে নিয়ে এসে বাড়িতে শাস্তিপর্ব আরম্ভ হলো । দাদাদের সেইদিন উঠোনে নাকে খৎ দিতে হয়েছিল , আর আমাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল । আজকের দিনে কোনো কাকা তার ভাইপো-ভাইঝিদের এমন অবলীলায় শাস্তি দিতে সাহস পাবেন কী ? মা-বাবা দু-কথা শোনাবেন না কী ? আমাদের কিন্তু সেরকম অবস্থা ছিল না । কে কার পুত্র কে কার কন্যা এই বিষয়টি অনর্থক যে কোনো যৌথ পরিবারেই । আজ যৌথ পরিবারের কন্সেপ্টটাই বেমালুম উধাও । আজ দুই বা তিন কামরার ফ্ল্যাটের বন্ধ দেওয়ালে মা-বাবা ও একটি সন্তান, বড় জোর দুটি , আর টিভি , ইন্টারনেট এবং একটি পরিচারিকা। এইরকম পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুকে যতই বুদ্ধিমান বানাক যতই প্রতিযোগী করে তুলুক , সত্যিকারের মানসিক বিকাশে কিন্তু বাধার সৃষ্টিই করছে । মানুষ স্বার্থপর তৈরী হচ্ছে । অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শিখছে না বলেই আমার মনে হয় । আমাদের কিন্তু পরিচারিকার কাছে থাকতে হত না যদি বাবা-মাকে কোনো জরুরী কাজে বাইরে যেতে হত । বাড়ি ভর্তি লোক আমাদের । এইসব পরিপ্রেক্ষিতে আজকের শিশুদের কথা ভাবলে বড়ই অভাব-বোধ হয় ।

আমাদের পাড়ায় দূর্গাতলা ছিল । প্রতিবছর দূর্গাপুজোর সময় বিপুল উৎসব হত । সারাদিন ধরে পুজো খাওয়া-দাওয়া নাটক । তখন আমাদের পায় কে ! একদমই ধরাছোঁয়ার বাইরে । সন্ধে হল কি না হল গিয়ে বসে পরতাম চেয়ার দখল করে । এইসব টুকরো টুকরো আনন্দের মধ্যে দিয়েই তো আমাদের শিশুবেলা, যেগুলি হারিয়ে গেছে আজকের শিশুদের শৈশব থেকে ।

আরেকটা দিন ছিল আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা । সরস্বতী পুজোর দিন । বাড়িতেই পুজো হত । আগের দিন সন্ধেবেলায় বই দিয়ে দিতাম ঠাকুরের কাছে , ব্যস তখন থেকেই পড়াশুনো বন্ধ । পুজোর দিন সক্কালবেলা সরষের তেলে হলুদ-বাটা দিয়ে গায়ে মেখে চান করে অঞ্জলি দিয়ে ফলমূল মিষ্টি কদমা খেয়ে-দেয়ে আমরা পাঁচ ভাই-বোনে বেরিয়ে পড়তাম ঠাকুর দেখতে । সেদিন আমার দুই বোনও আমাদের সঙ্গে থাকতো । সেদিন বাসন্তী রঙের শাড়ি পরতাম । ঠাকুর দেখতে যাওয়ার আগে অবশ্য তারাদি তিলকদাদের বাড়ি একবার ঢুঁ মারতাম । পিসতুতো ভাইদের পিসিও তো আমাদের পিসিই ছিলেন । আশপাশের ঠাকুর দেখে চৌধুরীপাড়া মোড় থেকে ৫২ নম্বর বাসে উঠে কিছুদূর গিয়ে নেমে পড়তাম , আবার উঠতাম আবার নামতাম । টিকিট কাটার ব্যাপার ছিল না , কন্ডাক্টররা চাইতো না বাচ্চাদের থেকে । তারপর স্কুলে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে দিগ্‌বিজয় করে বাড়ি ফিরতাম । সেইদিন সন্ধেবেলায়ও পড়াশুনো নেই আমাদের , সরস্বতী পুজোর দিন বই ছুঁলে মহাপাপ ! আমাদের তো দিগ্‌গজ্‌ হতে হবে ! পরেরদিন সকালবেলায় দিদিয়া ও কাকীমনির তত্ত্বাবধানে আমরা খাগের কলমে ‘নমঃ সরস্বত্যৈ নমঃ’ লিখে আমাদের ছুটি শেষ ।

মেজজ্যেঠুর একটা পার্কার পেন ছিল , বাবার একটা শেফার্স , দুটো কলমই আমি পেয়েছিলাম, নিবগুলো সোনার । এখন তো ফাউন্টেন পেন বিলুপ্তই প্রায় । আমরা ছোটবেলায় কত বিভিন্ন রঙের কালি কিনতাম , ঝর্ণা কলমে ভরে কত হিজিবিজিই কেটেছি কাগজে । আজ ‘জেল’ পেনের দয়ায় ঝর্ণা কলম তো হারিয়েই গেল । ঝর্ণা কলমের পাশেপাশে আমাদের অল্প বয়সের অধিকাংশ বস্তুই তো হয় বিলুপ্ত , নয়তো বিলুপ্তির পথে । শুধু কী বর্ণমালা থেকে ৯ হারিয়েছে ? সঙ্গে সঙ্গে বহু কিছুই তো হারিয়ে গেছে অজানা অন্ধকারে । মেজজ্যেঠু বিনাকা পেস্ট কিনতেন , সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট পুতুল ফ্রি-তে পাওয়া যেত । সেগুলি আমরা পেতাম , কে কত নিতে পারতাম সেই খেলাটা ছিল আমাদের ।

কালীপুজোর দিন আমাদের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হত , সন্ধেবেলা হত , বেশ ঘটা করে হত । সারা বাড়ি সাজানো হত । এখনকার মত টুনি বাল্বে নয় । মোমবাতি জ্বালানো হত । কালীপুজোর আগের দিন থেকেই । অত বড় বাড়ি মোম দিয়ে সাজানো চারটিখানি কথা ছিল না । সেজজ্যেঠু পুজো চলাকালীন ঝাঁটা দিয়ে অলক্ষ্মী দূর করতেন পুকুরপাড়ে । তারপরও পুজো চলত বেশ অনেকক্ষণ । আমাদের অবশ্য পুজোর চেয়ে প্রসাদের ওপরেই টানটা বেশি ছিল , লুচি পায়েস নাড়ু যাবতীয় সুখাদ্য সব । দুদিন পরেই ভাইফোঁটা । সেদিন দাদাদের দেখে কে ! বেশ রাজা-রাজা ভাব ! এমন ভাবে আশীর্বাদ করবে যেন জ্যাঠামশাই ! বাবা ফোঁটার আগের দিন ধর্মতলার ইন্দ্রমহল থেকে বিভিন্ন রকমের মিষ্টি কিনে আনতেন ।

পরবর্তীকালে ট্রেনলাইনের কাছাকাছি বসবাস করলেও ট্রেনের হৃৎস্পন্দন কিন্তু প্রথম বুঝেছিলাম রামরাজাতলা স্টেশনের লেভেল ক্রশিং-এ দাঁড়িয়ে , প্লাটফর্মে বসে থেকেই । মেজজ্যেঠু প্রতিদিন বিকেলবেলা যেতেন ওখানে, সমবয়সী মানুষদের সঙ্গে বসে গল্প করতেন , একটা দল ছিল । আমরাও যেতাম, তাঁর সঙ্গে নয় অবশ্য , আলাদা , রাস্তার লোকজন , আশপাশের দোকান, দোকানের সামগ্রী , কোনো দোকানে গুড়ের চাকতি কোনো দোকানে গুজিয়া এইসব আবিষ্কার করতে করতে । স্টেশনের পাশেই শঙ্কর মঠ , সেখানেও প্রায় প্রতিদিনই আমাদের যাওয়া ছিল , ধর্মের টানে নয় অবশ্য, সামনের মাঠে আমরা খেলতাম । ফেরার পথে সত্যমামার বাড়িতেও কখনও কখনও ঢুঁ মারা হত , সত্যমামা আসলে মামা ছিলেন না আমাদের , উনি ছিলেন আমার দিদিমার মামাতো ভাই , সেই হিসেবে দাদুই হন , কিন্তু উনি ছিলেন ইউনিভার্সাল ‘সত্যমামা’ । তা যাই হোক কোথায় সত্যমামা কোথায় শান্তিপিসি সবাই কিন্তু খুব আপন মানুষই ছিলেন , বিজয়ার পর প্রণামটা অবশ্যই পেতেন আমাদের থেকে এবং আমরা নাড়ুটা ফলটা । যৌথ পরিবারের সীমানাটি এতটাই বিস্তৃত ছিল ।

বড়জ্যেঠুরা বাইরে থাকতেন । দিদির বিয়েটা অবশ্য বাড়ি থেকেই হল । বাড়িতে একটা উৎসব হলে যা হয়, হৈচৈ , নতুন জামা তৈরী , খাওয়া-দাওয়া । সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল আমরা যা-খুশী তাই করতে পারি , এই কটা দিন আমাদের সব কিছুই মাফ । আমরা স্বাধীন । বরঞ্চ বাড়ির অন্য সবাই খুব আড়ষ্ট , ভীত , নকশালরা এসে উৎপাত করবে , খাওয়া-দাওয়া নষ্ট করবে , সব ভণ্ডুল করবে । আমরা ছোটরা অবশ্য বুঝিনি এই ভয়ের কারণ কী । ওরা তো ভাল লোক , আমাদের সঙ্গে গল্প করে , মিষ্টি খাওয়ায় , ওরা কেন উৎপাত করতে যাবে ! সত্যি সত্যি ওরা কিন্তু কোনো কিছুই ভণ্ডুল করেনি । দিদির বিয়েটা নির্বিঘ্নেই হয়েছিল । একসঙ্গে অনেক ভাইবোন একত্রে মানুষ হওয়ায় যে কী আনন্দ ! দাদার পৈতে যখন হয়েছিল তখন অবশ্য আমি আরেকটু বড় হয়েছি । দাদা তো একটি ঘরে বন্দি , সেই ঘরে শুধু আমাদের জন্যেই ‘অবারিত দ্বার’ , দাদার পাওয়া উপহারের দেখভালের দায়িত্বে তখন আমি রানী ভিক্টোরিয়া ! আজকে ফ্ল্যাটবাড়ির কন্সেপ্ট যৌথ পরিবারের সমস্ত রোমাঞ্চই শেষ করে দিয়েছে । আমরা তো এই বাড়ি থেকে এই পরিবার থেকেই যা-কিছু শিখেছি , যত আচার-আচরণ ।

তখন আট বছর বয়স আমার, একদিন দুপুরবেলা আমি আর ছোড়দা পিকনিক করতে বেরোলাম । দাদা কেন জানি না সেই অভিযানে ছিল না । একটা লাল কোট ছিল আমার , দু-পকেট ভর্তি করে খুড়তুতো বোন মিঠুর মিল্ক পাঊডার ভর্তি করলাম , তার মধ্যে কিছু কিশমিশ আর কাজু নিলাম । ছোড়দার কাছে এক টাকার একটা নোট ছিল । এই সব নিয়ে আমরা হেঁটে হেঁটে সাঁত্রাগাছি রেলস্টেশনে গেলাম । ওভারব্রীজে দাঁড়িয়ে ট্রেন দেখতে দেখতে আমাদের সংগ্রহের খাদ্যগুলি উদরস্থ করলাম । তারপর ওভারব্রীজ থেকে নেমে দুই ভাই বোন মিলে চা খেলাম , যে দুজন বড় হয়ে আর চা স্পর্শই করলাম না । এই ছিল আমাদের পিকনিক । এইসব করতে করতে সন্ধে নেমে এল , তখন ভয় হল , তাড়াতাড়ি বাড়ি না ফিরলে সমস্তটাই ফাঁস হয়ে যাবে। হেঁটে ফিরতে হবে এতটা পথ । তাড়াহুড়ো করলাম । ফেরার সময় চোখে পড়ল একটি শর্টকাট পথ , আবছা অন্ধকারে দেখলাম একটা মাঠ , সেই মাঠটা পেরোলেই আমাদের বাড়ি যাওয়ার পথ সহজ হবে বুঝতে পারলাম । ছোড়দাকে টেনে নিয়ে এগোতে লাগলাম । আমি সামনে , সে পেছনে ত্রস্ত । মাঠের থেকে কিছুটা দূরত্বে কিছু বাচ্চা খেলছিল , তারা বারণ করতে থাকলো ওই মাঠের দিকে এগোতে । আমাদের কী তখন বারণ শুনলে চলে ! সন্ধে হওয়ার আগে বাড়ি না পৌঁছাতে পারলে পিঠে যে কিল-চড় পড়বে , তার কী হবে? যেই না পা তুলে মাঠে রেখেছি পা , ব্যস পা গেল আটকে । এ কী রে বাবা! আমার এক পা ওপরে, এক পা আটকে নিচে । ছোড়দা পেছনে । অনেক কষ্টে আটকে থাকা পা বার করে বুঝলাম এটি আসলে মাঠ নয়, মল জমা করার জায়গা । বোঝো কান্ড ! পা বার করতে পারলে কী হবে চটি তো বার হল না এবং বাঁ পায়ে হাঁটুর নিচ থেকে ওই সব গোলমেলে বস্তু । ইস্‌ কী দুর্গন্ধ ! অনেক কষ্টে ধুয়ে-টুয়ে নির্দিষ্ট পথেই বাড়ির দিকে রওনা হলাম । সেবছরই প্রথম শখ করে অজন্তার চটি কিনেছিলাম , বাবা পুজোর সময় কিনে দিয়েছিলেন , নইলে তো জুতোই পরতে হত । অত সাধের চটি তো গেলই , এখন বাড়িতে কী জুটবে তা-ই বা কে জানে ! এক পায়ে চটি এক পা খালি এইরকম অবস্থায় গুটি গুটি পায়ে বাড়ি ঢুকেই বাড়িশুদ্ধু লোকের মুখোমুখি হয়ে সেদিন কী হল সেসব আর বিশদ বলে লাভ নেই । শুধু তো মা-বাবার বকুনি নয় , কাকা-জ্যাঠা সকলের বকুনিই শিরোধার্য ছিল তখন আমাদের । আর শুধু কী বাড়ির লোক ! পাড়ার মানুষও তো আমাদের অভিভাবক ছিলেন , কখনও এদিক-সেদিক দেখলেই তো সে রিপোর্ট পৌঁছে যাবে বাড়িতে ।

এইসবে কিন্তু আমাদের মা-বাবাদের বা আমাদের কারুরই কোনো অভিযোগ ছিল না । যে কোনো যৌথ পরিবারে যেমনটা হয় ঠিক সেইরকমই ছিল আমাদেরও , দিদিয়া দাদু কাকা কাকীমা জ্যাঠামশাইদের স্নেহে ও শাসনে বেড়ে উঠেছি আমরা । দিদিয়ার খুব শাসন ছিল , পুরো বাড়িই দিদিয়ার তত্ত্বাবধানে চলত । কিন্তু আমাদের জন্য সাত খুন মাপ ছিল । যত দুষ্টুমিই করি না কেন দিদিয়া আর কাকীমনির আহ্লাদ আর প্রশ্রয়ের হাত আমাদের মাথার ওপর ছিল । দাদু মারা যাওয়ার পর দিদিয়া স্বপাক খেতেন, যতদিন চলাফেরা করতে পারতেন । দিদিয়া যখন রান্না করতেন কেউ তখন দিদিয়াকে ছুঁতে পারতো না , আমি পাশে চুপটি করে বসে থাকতাম, দিদিয়ার খাবারের প্রসাদ যে জুটবে ! ভাত-মাছ খাওয়ার চেয়ে যে সেগুলো অনেক বেশি লোভনীয় ছিল সেকথা আজকের ফ্ল্যাটে থাকা শিশুরা জানতে পারল না ভেবে আপশোষই হয় আমার ।

এখন তো জন্মানোর পরে পরেই ব্যাঙ্ক-অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয় বাচ্চাদের নামে । আমাদের সময় সেই চল্‌ ছিল না , আমাদের প্রত্যেকের একটা করে পয়সা জমানোর ভাঁড় ছিল , মাটির , রামতলা থেকে কেনা হয়েছিল , ভেঙে গেলে আবার কেনা হত । দিদিয়ার ঘরে কাচের আলমারিতে রাখা থাকতো । তখন কুড়ি পয়সার নতুন কয়েন চালু হয়েছিল । ওই ভাঁড়ে সব কুড়ি পয়সা ফেলতাম , বেশির ভাগই পেতাম দিদিয়ার কাছ থেকে । তখন কিন্তু কুড়ি পয়সার মূল্য অনেক ছিল ।

আমাদের বাড়িতে যে প্রেসটি ছিল সেটি সেজজ্যেঠু দেখাশুনা করতেন । লেটারপ্রেস ছিল । এখন তো ডিজিটালের হাওয়ায় লেটারপ্রেস মৃত । আমাদের বাড়ির প্রেসটা অনেকদিনই নেই । আমরা প্রেসে গিয়ে এটা দেখতাম ওটা দেখতাম , খুবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাজগুলো পর্যবেক্ষণ করতাম । শ্যামলবাবুকে খুবই জ্বালাতাম , আরও যাঁরা ছিলেন তাঁদেরও । ওই প্রেসে আমার স্কুলের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ছাপা হত । তখন কিন্তু ওই প্রেসের দরজা আমাদের জন্যে বন্ধ হয়ে যেত , আমরা ভাই-বোনেরা কেউই তখন ওই প্রেসের ভেতরে ঢোকা তো দূরস্থান , প্রেসের চৌহদ্দির মধ্যে যেতে পেতাম না । সেজজ্যেঠুর এমনই কড়া হুকুম !

আমাদের বাড়িতে একটি কুকুর খেতে আসতো , রাস্তার কুকুর , টমি বলে ডাকতাম , সেজজ্যেঠুর সঙ্গে চা খেতো আর লেড়ে বিস্কুট । আমরাও তাকে খেতে দিতাম । বেশ ভাব ছিল আমাদের সঙ্গে । একথা বলা ঠিক হবে যে টমিও আমাদের যৌথ পরিবারের সদস্য হয়ে গিয়েছিল । সেই টমি যখন মারা গেল খুব কেঁদেছিলাম । সেই প্রথম অত কাছ থেকে আমি মৃত্যু দেখেছিলাম ।

আমাদের মস্ত বড় উঠোন ছিল একটা , সেখানে আমাদের খেলাধুলো হত , গুলি খেলতাম আমরা তিন ভাই-বোন সেখানে , কালীপুজোর সময়ে তুবড়ি জ্বালাতাম , চড়কি , দোদমা , লম্বা তারে কালিপটকা একসঙ্গে । সেই উঠোনে রোদ্দুর খেতাম আমরা সবাই মিলে । আজকের শিশুদের সেই উঠোন কোথায় ? রোদ্দুরই বা কোথায় ? আসলে আজ শিশু-কিশোরদের শৈশব কৈশোর থেকে এসব কিছুই হারিয়ে গেছে অজানা অন্ধকারে । যৌথ পরিবারের মধ্যে যে মায়ার স্পর্শ লেগে ছিল , জানি না কোন্‌ নিশিডাকে কেন তারা মিলিয়ে গেল ! আজকের শিশু-কিশোররা যে কী ভয়ঙ্কর অভাবের মধ্যে বেড়ে উঠছে , তারা তো জানতেও পারলো না । কিন্তু আমরা ? যারা এই স্বাদ পেয়েছি ? যাদের স্মৃতির টেবিলে পড়ে আছে সেই সব মায়াময় দিনগুলি ? তারা তো আকাশের রামধনু দেখতে দেখতে শিশির-ভেজা দুব্বো-ঘাস দেখতে দেখতে ভেবেই চলেছি... যদি একবার ফিরে আসে সেইসব দিনগুলি কুহকিনী রোমাঞ্চে... যদি একবার উঠে আসে ফের তারা শীতে ও হেমন্তে ... যদি আরও একবার সেই সব দিনগুলি ... সেই যে ...

সকাল দুপুর বিকেল সেদিনের সেই দুরন্তবেলা
আকাশে পায়রা চুপি-ছাদ আমাদের ফিসফাস
সেই কৈশোর-দুপুর কৎবেল চুপিচুপি আর
চুকিৎকিৎ উঠোনে কাটাকুটি কিশলয়বেলা
সেদিনের সেই স্বপ্ন-হলুদ
কিশোরী দুচোখ অবাক বিস্ময়ে
আজ সন্ধে-তারা তাকিয়ে দেখে সরল সকাল
তখন রোদ্দুর-দুপুর হেঁটে যেত বুড়ির চুলে ...