সেই সব মাতালেরা

শুভ্র চট্টোপাধ্যায়


অনেক ভেবে মনে হলো, সেই সব মাতালেরা আর আসবে না। মানব জীবনের বিচিত্র বর্ণমালা থেকে সময় তাঁদের তুলে দিয়েছে। তাঁদের লালন করার মত প্রকৃতিই নেই এখন ডুয়ার্স লাগোয়া জলপাইগুড়ি শহরে। বছরে সাড়ে চার মাস শীত আর ছয় মাস বর্ষার দিন ফুরিয়েছে। লোক বেড়ে গিয়ে ফাঁকা জায়গা ফুরিয়ে গেছে।
সেই সব মাতালদের সন্ধানে স্মৃতির সরণীতে পা রাখি।
মাঘ মাসের গোড়ায় শহরের গলির মাঠে সকাল এগারটাতেও কুয়াশা গড়াচ্ছে দেখে ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ম্যাচ বাতিল। আম্পায়ারদের একজন স্ট্যাম্প থেকে বেল তুলে নিয়েই বললেন, ‘আজ শালা খাবোই।’
চার–পাঁচ দিন ধরে এমন আবহাওয়া চলছে। এই দিনগুলিতে কি তবে তিনি খান নি? আসলে তা নয়। অতটা সংযমের উদাহরণ নয় এটা। বিকেল গড়ালে তো রোজই খাচ্ছিলেন। আজ দিনের বেলাতেও।
আবার ধরা যাক কয়েক দিন ধরে আকাশ থেকে জল পড়েই যাচ্ছে। ঝুপ ঝুপ। ঝম ঝম। ঝির ঝির। মাঝে মাঝে দু-চার মিনিটের বিরতি। চারদিকে হাওয়া – বাড়ি – মানুষ – ব্যাকটেরিয়া --- সব ভিজে। ভিজে চা ভিজে সিগারেট খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে শিলিগুড়ি গমন বাতিল করে ড্রাইভার হাঁক দিয়ে বললেন, ‘নিয়ে আয় রে! আজ বাল দারুর দিন!’ আদালতে যেতে যেতে শেষ মুহূর্তে লিকার শপের দিকে বেঁকে গেলেন তরুণ আইনজীবী। ব্যাকুল বাংলা বিক্রেতা গর্জমান রাজদূত বাইকে চেপে ছুটলেন ভাটি থেকে স্টক আনতে। ভেজা কোহল বাতাসে ভেসে আসে হাহাকার ধ্বনি: ‘চানাচুর! চানাচুর!’ কোথাও কোনও দোকানের বয়াম থেকে বেরুচ্ছে না নেতিয়ে না পড়া চানাচুর।
উক্ত আবহাওয়াতেই সেই সব মাতালেরা লালিত হতেন। শহরে সন্ধা নামলে তাঁরা নেমে আসতেন পথে। ওই তো ব্যানার্জিদা শাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে রিক্সায় একটু ঝুঁকে বসেছেন। ডান হাতে ডান হাঁটুতে ভর দিয়ে মোলায়েম হাসি মেখে কাউকে দাঁড় করালেন ডেকে। রিক্সা থেকে নেমে এসে জড়িয়ে ধরে কুশল সংবাদ নিলেন। তারপর বললেন, ‘চলিরে! তাড়া আছে।’ তারও পর এক পা রিক্সার মেঝেতে তুলে আধ ঘন্টা ধরে বোঝালেন কেন তাঁর তাড়া।
আহা! ওই তো দাসদা। ডিসেম্বরের শেষে হালকা বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ায় মোড়া বিকেলে ঈষৎ বক্র অবস্থায় কাবুলিওয়ালাকে কিশোরের গান শোনাচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন বাহবা দিচ্ছেন বকি ঘোষ। তাঁর ঢিলে ফুল প্যান্টের পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে ভুটান রামের বোতলাংশ। গোটা দুয়েক গান শুনিয়ে দাসদা কাবুলিকে শুধালেন, ‘তেরা কাবুলমে কিশোর কুমার হ্যাঁয়?’
কাবুলি বলে, ‘নহী’
‘তবে ইন্টারেস্ট কিউ কামাতে হ্যাঁয়?’
বলে চলে যাচ্ছেন দাসদা। আলো নিভে আসছে। রাস্তার আলো জ্বলে ওঠেনি। সামনে সিনেমা হল থেকে হাফ টাইমে লোক বেরুল। দাসদা তাঁদের উদ্দেশে শরীর ঝাঁকিয়ে গেয়ে উঠলেন: মেহেবুবা মেহেবুবা!’ লোকেরা আবার চলে গেল সিনেমায়। পৃথিবী ঘুরল। রাস্তার পাশের খাবারের দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন পরিপাটি সাজের সাধুদা। ঘাড়ে পাউডারের আভাস। ফুরফুরে সুগন্ধের সঙ্গে বাংলার গন্ধ মিশিয়ে তিনি ধীর পায়ে হেঁটে এলেন পানের দোকানে। এবার তিনি একশো বিশ জর্দা দিয়ে পান খেয়ে বসবেন একটা বেঞ্চিতে। তারপর যার সঙ্গে চোখাচোখি হবে, তাঁকেই অসামান্য আন্তরিকতা নিয়ে জিগ্যেস করবেন, ‘কী? কেমন আছ? আমি একটু খেয়েছি বুঝলে? তা তুমি এখন খাও না?’
কেউ একজন বিদ্রূপে স্বরে বললেন, ‘কী রে সাধু! সবে তো বিকেল। এর মধ্যেই!’
শুনে লজ্জায় গলে গিয়ে সাধু কোনও মতে বলে, ‘আপনি এখনও খাননি জানলে কি খেতাম দাদা!’
নেই। তাঁরা নেই। ৯-কার হয়ে গেছে।
তিনি শক্তির কবিতা পড়েন নি। পড়লে জানতেন মধ্যরাতে বাড়ি ফেরার সময় তিনি ক্রমাগত ফুটপাত বদলের জালে জড়িয়ে পড়েন। নইলে কতটুকুই বা দূরত্ব দিনবাজার ভাটিখানা থেকে তাঁর বাড়ি! দিনের বেলায় চায়ের দোকানে বসে অবলীলায় বলেন, ‘হাই ম্যথমেটিক্স বুঝলি? ক্যালকুলেশনে একটু ভুল হলেই কিন্তু তুই ড্রেনে। আর যদি বুঝিস ভুল হচ্ছে, দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে যাবি।’ তাঁর মুখে প্রসন্নতা। চিবুকে হাসির গুঁড়ো। ব্যাগে বাজার। এক অপরূপ মাতাল গেরস্ত। নতুন শতক থেকে তাঁদের শেষ পেগের শুরু। এখন ওদের সকলেরই বোতল শেষ।
আহা! কী সব দিন! কত লোক তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেত আর খেয়ে রাস্তাতেই থাকত। শহর জুড়ে আনাচে-কানাচে ফুটে থাকত সব। পথে ছোট একটা মোড় ঘুরতেই মন্দিরের পাশের দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো মিঠুন পানু। তাঁর নাম পানু। তাঁর চুল মিঠুন ছাঁট। টলন্ত, দোদুল্যমান, তরঙ্গায়িত শরীর নিয়ে অসীম আনন্দে বলে উঠল, ‘আরে তুই! কোথায় যাচ্ছিস? আমি একটু খেয়েছি বুঝিলি?’
তারপর হটাত তাঁর শরীরের যাবতীয় ছন্দ-কল্লোল নিভে গেল। ঝুপ করে বসে পড়ে জড়ানো সানুনাসিক গলায় বলল, ‘ঘকাল হেঁকে ঘাচ্চি তোঁ। ঠুই ঘাবি?’
আকাশে শুক্লা সপ্তমীর চাঁদ। টিমটিমে পথবাতি। লম্বা গলিপথ। পর পর গাছপালা মাখানো একতলা বাড়ি। হেমন্তের সকল বিষণ্ণতা যেন হিমের মত ঝরে পড়ছে। কেউ একজন সাইকেল নিয়ে থামল। ডাকল একে-ওকে। তিন-চারজন মানুষ নিমেষে মেতে উঠল মাতাল মিঠুন পানুকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে টক খাওয়ানোর জন্য। তাঁদের প্রত্যেকের মুখেই কোহল সুবাস। হায়! তখন কত নির্জন বৃক্ষ ছায়া, কত ছায়াশীতল ভূখণ্ড! সেই সব মাতালদের জন্য কত কত স্পেস!
আজ সে সব ৯ হয়ে গেছে।
সেই সব মাতালেরা আজ কাহিনী।
ঝক ঝকে আলোয় ভরা আধুনিক পানশালার ভাঁড়ারে রক্ষিত বহু পুরাতন মদ্যের আধারের কর্কের নিচে তাঁদের আত্মারা জমায়েত হয়ে খোঁজ নেয় যে সেই বৃষ্টি, সেই শীত, সেই কুয়াশা ফিরে এলো কি না।