হারানো ঠিকানায়

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়


প্রিয় মিঠু,মিঠাই

কতদিন দেখা হয়না তোর সাথে। কেমন আছিস রে? তোর কথা মনে পড়লে বুকের ব্যলকনিতে অনেকদিন আগের একটা হারিয়ে যাওয়া সকাল। একটা টিপটিপ বৃষ্টিতে কাগজ নৌকোর লাট খেতে খেতে ভেসে যাওয়া। সময় রিওয়াইন্ড করে করে মায়ের লাল টুকটুকে শাড়ি, জবাকুসুম তেলের গন্ধ মাখা একমাথা কালো চুলের লম্বা বিনুনী দুলতে থাকা চোখের সামনে। এবার পূজোর ছুটির অনেকগুলো দিন কাটালাম আমাদের ছোটবেলার শহরে, পাড়ায়...অনেকবছর পরে। গত পনেরো বছরে এই পাড়াটার অলিতে গলিতে তে দূর অস্ত, সদর রাস্তাতেই হাঁটা হয়নি সেভাবে। এবার পূজার ছুটিতে সেটাই হলো। পাড়ার প্রতিটি বন্ধ দরজায় টোকা মারতে গিয়ে দেখলাম এ এক অন্য পাড়া, অন্য রাস্তা, অন্য মানুষজন। তোরা যে বাড়িটায় থাকতিস্‌, সেই বাড়িটাই বেমালুম লোপাট। সেই কাঠের সবুজ গেটওয়ালা, লাল বারান্দা আর ছোট্ট বাগান ঘেরা বাড়িটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বদলে একটা বিরাট কমপ্লেক্স্‌...যার বাসিন্দাদের কাউকে আমি চিনিনা। আমি যেমন অন্য শহরে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে একচিলতে ফ্ল্যাট বাড়ির বাসিন্দা, আমার শহরও তেমনি কোল পেতে দিয়েছে নবাগত নারীপুরুষকে...যারাও হয়ত আবার অন্য কোথাও হারিয়ে ফেলেছে তাদের পুরনো দিনরাত। পাড়া জুড়ে শুধুই বহুতল আর ঝাঁ-চক্‌চকে শো’রুম, বাহারি স্টেশনারি শপ, সাইবার কাফে, এটিএম্‌ কাউন্টার, টিউটোরিয়াল হোম এসবই চোখে পড়ে। দুলাল কাকুর সেই ছোট্ট মুদি দোকানটা নেই রে, যেখান থেকে আমরা স্কুল ফেরৎ দশ পয়সার হজমি কিনে খেয়ে জিভ কালো করে বাড়ি ফিরতাম। বা কাঠের চামচের মাথায় লাগানো পাতলা সেলোফেন পেপারে মোড়া তেঁতুলের আচার...সেও সেই দশ পয়সার। কাচের বয়ামের ভেতর রাখা কুকিস্‌, আটার নোন্‌তা বিস্কুট আর চিকলেট...যার এখন নাম হয়েছে চুইংগাম, ছোট্ট ছোট্ট কৌটোর মধ্যে মৌরি লজেন্স্‌। এর কোনোটাই দুলালকাকুর ছেলের ঝক্‌ঝকে স্টেশনারিতে পেলাম না। পিন্টুকাকুদের বাড়িটা এখন মেডিকেল কলেজের মেস্‌বাড়ি...মনে আছে টুকটুকি দি আমাদের ওখানে নাচ শেখাতো? প্রতি বছর রবীন্দ্রজয়ন্তির অনুষ্ঠানের রিহার্সাল...আর একবার লাটাই দা লুকিয়ে দিদিয়ার হাতে একটা চিঠি গুঁজে দেওয়ায় কি হৈ চৈ...! লাটাই দা বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে শুনলাম। টুকটুকি’দি দিল্লী তে থাকে। বুড়ির মাঠের পাশ দিয়ে আসছিলাম...নাহ্‌ মাঠ টা নেই। ওই মাঠ আমাদের বিকেলগুলো জানে, তাই না রে! আমরা লাফ দেওয়ান্তি খেলতাম। এখন কি কেউ খেলে এটা? সেই দুদিকে দুজন পায়ের পাতা ছুঁইয়ে বসবে। পায়ের ওপর পা, তার ওপর দুই হাতের পাতা দিয়ে চুড়ো করে একটা উচ্চতা তৈরি হবে। তারপর দৌড়ে এসে লাফ দাও। আমি লম্বা ছিলাম বেশ, টুক করে পেরিয়ে যেতাম, আর তুই হেরে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে মাঝ পথে বলতিস ---খেলবো না যা! হিঃ হিঃ হিঃ। তারপর এলাটিং বেলাটিং সইলো, রাজামশাই একটি বালিকা চাইলো...তখনো আমরা এইসব খেলার সামাজিক ইন্টারপ্রিটেসন্‌, উৎপত্তি, এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর পাকামিতে যাইনি। কিৎ কিৎ বা এক্কা দোক্কার পাশাপাশি চুটিয়ে পিট্টু, ডাঙ্গুলি, ফুটবল , ক্রিকেট...গোল্লাছুট, কুমীরডাঙ্গা...ইসস, সেই বুড়ির মাঠ! হাঁটু তে সবসময় নুনছাল ওঠা থাকবেই, সারাবছর। আর সন্ধ্যে হলেই দৌড় বাড়ীর দিকে...আমরাও দৌড়োই, মাথার ওপর ভন্‌ভন্‌ করে মশার ঝাঁকও দৌড়োয়। যেদিন কারো বাড়িতে হরির লুঠ থাকতো, সব্বাই বাতাসা কুড়োতে সেখানে ভিড়। ভালো করে হাত পা ধুয়ে তবে ঘরে ঢুকতে পাবে।
মিঠু জানিস, সারা পাড়া ঘুরলাম---একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম কোনো বাড়ি থেকে চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করার কোনো আওয়াজ নেই। মনে কর সেই সন্ধ্যেগুলো...এ বাড়ি থেকে রাজু অশোকের ধর্মপ্রচার নিয়ে চেঁচাচ্ছে তো ওবাড়ি থেকে পাট চাষের অনুকূল পরিবেশ নিয়ে গলা ফাটাচ্ছে রিন্টু। আর মামন তো চেঁচিয়ে লেটার-রাইটিং মুখস্থ করতে করতে “ইয়োর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট বিদিশা”...এটাও বারবার পড়ে যেত। সন্ধ্যেবেলা যেকোনো একটা গলি ধরে হাঁটলেই হলো...যার বাড়ি থেকে যত জোর পড়ার আওয়াজ সে বাড়ির তত কদর। মা খুব খেপে যেত আমার ওপর...সবাই জোরে জোরে পড়ছে, আর তুমি মুখে বই নিয়ে বসে কি এত উদ্ধার করছ শুনি? জোরে পড়তে পারোনা? না রে, সন্ধ্যে বেলা বরং বাড়ি বাড়ি শুনলাম---ব—ধু উউ বর--ণ বা ইষ্টিক্টুমের টাইটল্‌ সং, টেলিভিশন সিরিয়ালের ভীষণ সব প্লট আর কাহিনীর হাই পিচ্‌ উল্লাস। আর একটা কথাও মনে পড়লো...আমাদের বিকেল বিকেল বা সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরে হারমোনিয়ামে গলা সাধা। তুই আর আমি একই স্কুলে গান শেখার জন্য একই গান দুই বাড়িতে গলা ফাটিয়ে রেওয়াজ...একবার ছোটকাকু আমাদের “জয় আগুনের জয়” টানা ছয় দিন সমস্বরে শোনার পর দমকলে খবর দেবে বলেছিল, মনে আছে? সন্ধ্যেয় লোডশেডিং রোজকার ব্যাপার ছিলো...আর ওম্‌নি পাশের ক্লাবঘর থেকে কয়েকজন গলা বিকৃত করে চেঁচিয়ে উঠতো—“জ্যোতি বাবু চলে গেলেন!!” আমাদের পোয়া বারো। বিকেলবেলা উনুনের সাদা ছাই দিয়ে কাচ মেজে, সলতে কমিয়ে রাখা লণ্ঠন উস্‌কিয়ে মা কাকিমা হাজির হত...আমরা যৌথ ফ্যামিলির সাতজন ভাইবোন দুটো লন্ঠন ঘিরে গোল টেবিল বৈঠকে বসে পড়তাম। দেওয়ালে কত রকমের ছায়া...এই বড়দি, তোর নাকের ছায়াটা দ্যাখ্‌, একদম শঙ্কুর মত লাগছে...হিঃ হিঃ হিঃ...ও মা দেখত, বুনু আমার গায়ে লণ্ঠনের কালি দিচ্ছে---শুরু হয়ে গেল নালিশ! ওই মিমি, তুই আলোটা তোর দিকে ঘোরালি কেন রে? বেশ করেছি, জানিস না আমার চোখ খারাপ...! ভাই, একটু আস্তে পড়না...উফফ্‌ তোর চিৎকারে আমার মাথায় কিছু ঢুকছেনা! এদিকে আমি মন দিয়ে আলোর পোকা ধরে লণ্ঠনের ভেতর ফেলছি...! আর জ্যোৎস্নারাতের সেই আকাঙ্ক্ষিত কারেন্ট অফ্‌! সাড়া পাড়ার মা মেয়েরা ছাদে উঠে পড়লো। তারপর শুরু হলো ছাদে ছাদে এক অভূতপুর্ব গানের আসর...! “আকাশ ভরা সূর্য তারা” বা “আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে” দিয়ে শুরু হলেও শেষমেশ এবাড়ি ওবাড়ি থেকে “আধো আলো ছায়াতে, কিছু ভালোবাসাতে” হয়ে “পাপা কহতে হ্যায় বরা নাম করেগা...” অবধি পৌঁছে যেত। মা’র মুখে একটা গান আমরা শুনতামই আর কাঁদতাম “মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে/ মা কে মনে পড়ে আমার মা কে মনে পড়ে”। মাদুরের ওপর শুয়ে আকাশটা দেখতাম...কখনো সেখান থেকে জ্যোৎস্না ভেজা স্বচ্ছ ডানায় রূপোলী পরির দল ভেসে যেত।কখনো মায়াবী আলোপথ মাড়িয়ে... স্পষ্ট দেখতাম একটা সাদা ঘোড়া উড়ে আসছে। দিদু কে বললে “ষাট ষাট”...বলে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো...অমন বলতে নেই পাগলি! লেবু ফুলের তীব্র গন্ধ আসত বাগান থেকে। একআধটা পেঁচার ডাক...তক্ষকের খক্‌ খক্‌...। নারকেল পাতার চিরুণির ওপর হঠাৎ কাক ডেকে উঠলে মা বলত---কাকজ্যোৎস্না! উঠোনে ঝাঁকড়া আমগাছের ছায়া , লম্বা টানা বারান্দার উঁচু উঁচু থামের হেলে পড়া ছায়ার সাথে লম্ফ বা কুপির আলো অদ্ভুত এক আলো-আঁধারি মেলে রাখতো। সেখানেও শুরু হয়ে যেত “আলো-ছায়া “ খেলা। একটা ছায়া থেকে আরেকটায় টপকে যেতে হবে...আর একজন হবে চোর। আলোর মধ্যে দিয়ে আসার সময় চোর তাকে ছুঁয়ে ফেললেই সে আউট...মানে চোর। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলে পাড়া জুড়ে “হো---ও ও ও” চিৎকার! সেই লোডশেডিঙও হারিয়ে গেছে মিঠু, এই পাড়া থেকে; ইনভার্টারের জোরালো নিয়নে। কেউ আর লোডশেডিঙ’এর দোহাই দিয়ে তারাভরা আকাশ দেখেনা। জোছ্‌নাকুমারী হয়ে ওঠার অবকাশও পায়না কোনও সদ্য কিশোরী। প্রায় কোনও বাড়িরই সামনে বা পেছনে কোনো জায়গা নেই পাড়ায়। সেই খোলা বারান্দা...যেখানে শিপ্রা কাকিমা, মুক্তি পিসি আর মিতা বউদিরা বিকেলে বসে উল বুনতো, এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে কি যেন সব নিষিদ্ধ গল্প করতো...সেই বারান্দাটা নেই। বারান্দার নামে যা আছে কোনো কোনো বাড়িতে, তা আসলে লোহার খাঁচা। সেই মানুষগুলোও নেই , জানিস্‌। প্রায় সব বাড়িরই নিচের তলায় ভাড়া। ওপরের অংশে যে পুরনো মানুষেরা আছেন কেউ কেউ, তাঁরা প্রায় সকলেই বৃদ্ধ অসুস্থ বা একাকী। ছেলেমেয়েরা কৃতী বা বিবাহসূত্রে, চাকরিসূত্রে অন্যত্র চলে গেছে। যাঁরা তাঁদের বাড়ি আঁকড়ে পড়ে আছেন তাঁদের সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। কলিং বেল বারবার বাজালে ওপর থেকে সাড়া পাওয়া যায়। তারপর অনেক কষ্টে নিজের নাম, বাড়ির পরিচয় এসব দিয়ে তাঁদের চেনা দিলে ওপর থেকে ছোট্ট ব্যাগে করে এসে পড়ে চাবির গোছা। সেই চাবি দিয়ে দরজা খুলে তবে ওপরে যাও। কাকু, জেঠু পিসি, মাসি ডাকের মানুষগুলো এরকম ফুরিয়ে গেলেন কবে? আমি তাঁদের চিনতে পারিনা, তাঁরাও অবাক হয়ে খোঁজেন সেই কবেকার রোগা পাতলা দুষ্টু মেয়েটাকে। আমাদের প্রজন্মের যারা দু একজন রয়ে গেছে এ পাড়ায়, তারা পরস্পরের দিকে অবাক হয়ে দেখতে থাকি ঈষৎ ভারি চেহারা, গাম্ভীর্য আর গৃহস্থালির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, কৈশোরের দিনগুলো। হঠাৎ মনে পড়লো মিঠু রে, তোর সেই লম্বা চুলগুলো কি এখনো আছে? তাহলেও আর যাই হোক্‌ দুই বিনুনী নিশ্চয় তুই বাঁধিস না?
ছোটবেলার অভ্যেসমত একদিন খুব ভোরে উঠে খুঁজছিলাম পুরোনো সকাল, হারানো পাড়াটায়। এপাড়ায় এখন কেউ ফুল কুড়োতে যায়না আমাদের মত। শুধু পড়তে যায়। রেডিওয় প্রাত্যহিকী বা খবর পড়ছি নীলিমা সান্যাল...শোনা যায়না। আমাদের বাড়ির রেডিওটাও খারাপ হয়ে পড়ে আছে। কোনো বাড়ি থেকে কয়লার উনুনের ধোঁয়া ওঠা নেই। ও হ্যাঁ, এই পাড়ার সেই দাপুটে ঘুঁটেওয়ালিরা বেমালুম ভ্যানিশ...সারা দুপুর যাদের হাঁকডাকে আমরা দু চোখের পাতা এক করতে পারতাম না। সামনে আঁচল দিয়ে শাড়ি পরা, নাকের দুই দিকে বড়ো বড় পেতলের নাকছাবি, কানে অজস্র মাকড়ি, কনুই অবধি উল্‌কি আর কাঁচের চুড়ি শোভিত সেই মাথায় ঘুঁটের ঝুড়ি নিয়ে হাঁক...ঘষি লিবা গো মাসিইইইই? আমার দিদু তাদের সাথে এক অদ্ভুত ভাষায় দরাদরি শুরু করত...কোন এককালে নাকি দিদুর বাবা ছিলেন পাটনা হাইকোর্টের উকিল...আর আমাদের বাড়ীর তিনপুরুষের ওকালতির জোরে দিদু কোমরে হাত দিয়ে বলতো...হাম্‌কো ঠকাতা হ্যায়? হাম উকিলের বেটি, উকিলের বহু, উকিলের মা হ্যায়। কম কিউ দেতা হ্যায়? আমরা হেসে কুটিপাটি হতাম, মনে আছে তোর? পিছনের বাগানে পেয়ারা গাছের সেই দোলনা আর পুরোনো গোয়াল ঘরের ইঁটের স্তূপে বাস্তুসাপের আড্ডা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে...সারা দুপুর বোগেনভেলিয়া গাছে ঘুঘু পাখির বাসায় উঁকি মেরে, তিনতলার চিলেকোঠায় লুকিয়ে আমমাখা খেয়ে আমাদের ছুটির দুপুর কেটেছে। ঐ ছাদের ঘর থেকে উঁকি মেরেই আমরা দেখেছি বুড়ির মাঠের পাশের বাগানে কত দুপুরের প্রেম দৃশ্য, স্কুল কলেজ পড়ুয়া প্রেমিক-প্রেমিকার ঘনিষ্ঠতা! তোর মা, মানে কাকিমা সবসময় পান খেতেন আর টুকটুকে লাল ঠোঁটে মাঝে মাঝে ছাদে উঠে হাঁক দিতেন...”মিঠাআআআআইইইই... বাড়ি আয়। বেলা গড়িয়ে গেল”।গরমের ছুটিতে খুব তাপের দিন হলে দিদু বলত...এই ঝাঁওয়ালের মধ্যে খবরদার বেড়োস না ঘরের বাইরে! আমরা শুনতাম না! গরম একটা ভাপ উঠত মাটি থেকে...আমের মুকুল থেকে টুপটুপ করে আঠা পড়ত আর তার মিষ্টি গন্ধ টেনে বের করত আমাদের। যদিও বড় গেটের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিলোনা...তাই তুইই আসতিস দুপুরে আমাদের সাত ভাই বোনের খেলার আসরে। শোন্‌পাপড়িওয়ালা রাস্তা দিয়ে হেঁকে গেলে আমরা পাপড়িদিকে খেপাতাম...ওই দ্যাখো, তোমাকে ডাকছে...শোওওওওওন পাপড়ি! একবার আড়ি হয়েছিল তোর সাথে, পুরো এক সপ্তাহ। সেবার স্কুল লাইব্রেরীতে দেওয়া তোর বরাদ্দ বইটা আমার পড়া হোলনা...আমি ভাব করে নিয়েছিলাম। তুই তো বই সেরকম পড়তিস না, আমি তোরটাও নিয়ে পড়তাম। আর তোকে গল্প বলতাম। মনে আছে রবীন্দ্রনাথের সমাপ্তি গল্পের শেষ অংশটা ছাদে লুকিয়ে কতবার পড়েছি আমরা আর মা স্কুল থেকে ফেরার আগেই আবার বইটা আলমারিতে লুকিয়ে দিয়েছি! স্কুলের সেই নিচু ক্লাশের দিনগুলো জানতো যে ছাদের প্রাচীর, সিঁড়িঘর, বাগানের পেয়ারা গাছ, রাস্তার ধূলোরা...সেগুলো আর নেই রে মিঠাই। একেকটা শীতকাল মানে পাড়ার সবার বাড়ি থেকে চাল আলু আর ডিম এনে আমাদের বাগানে পিক্‌নিক হবে। দু’টাকা চাঁদা। ছবি দি, পাপড়িদি, মিলিদি রান্না করবে...আমরা হ্যাজাকের আলোয় উঠোনে বসে ডিমের ঝোল ভাত খাবো। সব্বার গোটা ডিম। ভাবা যায়!! বাগানের আম গাছগুলোয় কোথা থেকে যেন শীতের শেষে ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বক এসে বাসা বানাতো। প্রায় সব বাড়িতেই তখন আমগাছ, আর তাতে বকের বাসা। সাদা সাদা পতাকার মত বকের ডানা গাছগুলোর মাথায় যেন টাঙানো মনে হত। বকের বাচ্চাগুলো অবিকল শিশুর কান্নার মত ডাকতো...রাত্রে গা ছম্‌ছম করতো, আমরা দিদুর গা ঘেঁষে শুতাম। কোথা থেকে যেন বক-মারার দল আসতো মাঝে মাঝে। দিদু খেপে যেত...পাখিগুলো আমার আশ্রয়মে বাসা বানায়া হ্যায়...খবরদার হাত নেহি লাগানা! সেই উত্তেজনার অপূর্ব হিন্দী! শুনেছি ব্রিটিশ আমলে দাদু তখন স্বদেশী দলে জড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন...একবার এসেছেন গ্রামের বাড়িতে লুকিয়ে...দিদু তখন সদ্য কিশোরী বধূটি। ঘরে আলো না জ্বালিয়ে তাঁকে ভাত বেড়ে দিয়েছেন। বাইরে লাল পাগড়ি পুলিশ...দিদু দরজা খুললো...অসামান্য রূপসী আর তেজিয়ান কন্যা গলা উঁচিয়ে বললো...ভদ্দরলোককে ঘর মে এত রাতে আতা হ্যায়? ভাগো হিঁয়াসে ইত্যাদি ইত্যাদি...ততক্ষনে তার দূর্দান্ত পলাতক স্বামীটিও থালা শুদ্ধু নদী পেরিয়ে পগার পার...পুলিশ সব দেখেশুনে পুরো ভ্যাবাচাকা যাকে বলে!
নাহ্‌ আমাদের বাড়ি ত নয়ই, পাড়ায় কোন বাড়িতেই আর কোনো আমগাছ নেই এখন। বক তো দূরস্থান, কাক চড়ুইগুলোও কোথায় গেল কে জানে! বেড়ে গেছে শুধু মশা আর কুকুরের সংখ্যা। পাড়ায় একটা লাল ডাকবাক্স ছিলো...সেটা নেই। কত মানুষ যে নেই হয়ে গেছেন সেটা এবার জানলাম মিঠু, আর আমার বাবাও এবার সেই নেই’য়ের তালিকায় ঢুকে পড়লেন রে। কোজাগরীর রাতের অসহ্য জ্যোৎস্নামাখা চাঁদটা লুফে নিলো তাঁকে, নামের আগে বেমালুম চন্দ্রবিন্দু বসে গেল তাঁর। চন্দ্রাহত আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল “বাবি” ডাকটা। হারিয়ে গেল আমার জীবনযাপনের একটা কোমল, আর্দ্র, ছায়ার আড়াল।অনেকটা পথ হেঁটে এসে যেখানে দাঁড়ালে দুদন্ড অমরতা ছিলো! তাঁরই পারলৌকিক কাজের নিমন্ত্রণপত্র বয়ে আমার হারানো পাড়ায় দরজায় দরজায় ঘোরা। দেখলাম আরো কত কিছুই হারিয়ে গেছে। তোর কথা বড্ড মনে পড়লো আড়াই দশক পর আবারো। আজ এই মধ্যরাতে,হেমন্তের নক্ষত্রের আলোয় তোর সাথে কথা বলা আমার বড়ো প্রয়োজন মিঠু। যদিও এ চিঠি পড়ার কোন দায় তোর নেই রে বাবু...কেননা তুইও তো সেই কবেই হারিয়ে গেছিস...অনেক খুঁজেও তোর হারানো ঠিকানা আমি পাইনি কখনো। ভালো থাকিস তুই, যেখানেই থাক। বুকের মধ্যে থেকে সব কিছু তো হারায় না, বল্‌!