হারিয়ে যাওয়া সময়

রানা মুখোপাধ্যায়


গেছে সেই ঢাউস কালো রঙের টেলিফোন রিসিভার, সেই রাস উৎসব, সেই গান । হারিয়ে গেছে লংপ্লে রেকর্ড। হারিয়ে গেছে বহু মানুষ। হারাতে হারাতে আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের সময়ের ইতিহাস যা একান্ত প্রিয়। কেমন ছিল সেহারিয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক আর হারিয়ে ফেলাটা মানুষের স্বভাবজাত। তাই হারিয়ে গেছে সময়, হারিয়ে গেছে ঝর্ণা কলম, হারিয়ে ই সময়টা ? কেমন ব্যবহার করত সেদিনের মানুষজনেরা ? একটা কথা মনে রাখা খুবই জরুরী যে, যে জিনিসটা আমারা একেবারে হারিয়ে ফেলেছি আমাদের জীবন থেকে তা হচ্ছে গল্প। বেঁচে থাকার উপাদান সংগ্রহে যার অবদান অপরিসীম। মানুষের প্রতি পদক্ষেপ এই গল্পের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা এখানে তারই সন্ধানে ধাবমান। যুগযুগান্তরে তা আমাদেরই চলার পাথেয়।

এর পরে আমাদের গল্পে আসবে এক জোতদার পুত্রের কথা। সেই ভদ্রলোক একটু রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বাবার ছিল হাজার বিঘে জমি। বাবা ছেলের মতিগতি লক্ষ্য করছিলেন। তিনি সাবধান করেদিয়েছিলেন ছেলেকে, সে যাই করুক সে যেন বাবার জমির দিকে দৃষ্টি না দেয়। ছেলে পরের দিন হাজার বিঘে জমি বাস্তুহারা কৃষকদের দিয়ে দখল করিয়ে দিয়েছিলেন। বাবা ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন। গৃহহারা সেই সেই শ্রমিকনেতা জনারণ্যে মিশে গিয়েছিলেন সব হারানো মানুষের পক্ষে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এই যে, তিনি যখন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তখন ইতিহাসের অতীত হয়ে যাওয়ার সাক্ষি ছিলেন খনি অঞ্চলের কিছু শ্রমিক। তত্ত্বের সুক্ষবিচারে ক্লান্ত নেতারা লন্ডনে ছুটি কাটানোর সময়েও এই ত্যাগী ভদ্রলোককে মনে রাখতে পারেন নি। সত্যি কথা বলতে কি মনে রাখা যায়ও না। এর বিপরীতে রয়েছে স্বজনপোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি। পৃথিবীর সবচেয়ে নিন্দিত তাত্ত্বিক ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্ব আজ বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে প্রবল প্রাসঙ্গিক। তিনি বেঁচে থাকলে তাঁর সমালোচকদের বলতেন নিশ্চয়, দ্যাখ কেমন লাগে ? ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্বের অন্তর্নিহিত ভাব আত্মস্যাৎ করেছে ইদানীং কালের রাজনীতি। ম্যাকিয়াভেলি তার বইয়ের ১৭তম অধ্যয়ে বলেছেন, ......... there are two ways of contending, one in accordance with the laws, the other by force; the first of which is proper to men, the second to beasts. But since the first method is often ineffectual, it becomes necessary to resort to the second. এটাকে ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক কৌশল বলে চালাতে চাইলেও, এ আসলে ক্ষমতার ভাষা, যা ম্যাকিয়াভেলি এইভাবে বর্ণণা করেছেন যার মূল উদ্দেশ্য হল টিঁকে থাকার জন্য ভয় তৈরি করা। And here comes in the question whether it is better to be loved rather than feared, or feared rather than loved. It might perhaps be answered that we should wish to be both; but since love and fear can hardly exist together, if we must choose between them, it is far safer to be feared than loved. সেটা বোধ করি মানুষ বুঝতে পেরেছেন। তবে যেভাবে রাজনৈতিক অসভ্যতা চলছে তা মনে হয় ম্যাকিয়াভেলিও অনুমোদন করতেন না।
এবারে আর একটা গল্পে যাওয়া যাক। সেটা অবশ্য এক ঐতিহাসিকের স্মৃতিচারণ। সে ঐতিহাসিকের নাম অনুক্তই থাক। পুলিশ এসেছে রাজনৈতিক নেতার কাছে। লোকের প্রবল কৌতুহল, কি করেছে লোকটা ? কিন্তু যখন দেখা গেল, যে ভদ্রলোক চটের উপর বসে মুড়ি খাচ্ছেন এবং পুলিশকে আহ্বান জানাচ্ছেন মুড়ি খাবার জন্য তখন সেই জনসমাগমে একটা হিল্লোল বয়ে গেল। পুলিশও চটের উপর বসে পড়ল। মানুষের ধারণাটা আমূল বদলে গিয়ে একটা শ্রদ্ধার উদ্রেক হল। এ দৃশ্য আজকের আবহাওয়ার চিন্তা করে দূরে থাকুক, খুব কষ্ট করেও কল্পনাও করা যায় না। এহেন মানসিকতার বিরুদ্ধে ম্যাকিয়াভেলির শিক্ষা হল, যা মুখে বলবে তা কাজে মানবে না। ক্ষমতায় আসার আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দিতে হয় কিন্তু একবার ক্ষমতা হাতে পেয়ে গেলে আর পুরনো প্রতিশ্রুতি মনে রাখবার প্রয়োজন হয় না। এ প্রসঙ্গে ম্যাকিয়াভেলির নিদান এই যে, The promise given was a necessity of the past : the word broken is a necessity of the present. তা বলে ম্যাকিয়াভেলি তো একমাত্র চিন্তানায়ক নন। ফরাসী বিপ্লবের সময়কার চিন্তাবিদ রুসো বলেছিলেন, ‘যে পদ্ধতির মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাজের সৃষ্টি হয়েছে তা হচ্ছে একটি "সামাজিক চুক্তি" (Social Contract)। এ চুক্তি কেনো নিরঙ্কুশ শাসক তৈরি করে না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার সমস্ত অধিকারকে সামাজিক চুক্তির দ্বারা সমষ্টির নিকট সমুদয়ভাবে সমর্পণ করে। (দ্রঃ- জাঁ জাঁক রুসো – বাংলা উইকিপিডিয়া)। ভলতেয়ার, দিদেরো এবং আরো অনেকে এই চিন্তাধারায় আরও নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। আমাদের স্মরণে আছে, যে রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের ক্ষেত্রে একরকম কর্মপদ্ধতি আর জনগনের জন্য অন্য নিদান। এর বিরুদ্ধেও আর একটা গল্প আমাদের হাতে মজুত। একটা ব্যক্তিগত স্মৃতি। সমীরদার। আমাদের স্কুলে পড়ার সময় আমরা সমীরদার সঙ্গ পাই। সমীরদাও রাজনীতি করত, যদিও নিজের মুখে কখনও বলে নি। আমাদের সে বয়সেও সমীরদার কথাগুলো একটু অন্যরকম লাগত। তার মধ্যে পৃথিবী পরিবর্তনের কথাও থাকত। আমরা খুব একটা বুঝতাম না তার গভীর কথাগুলো। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গকে যে সব সময় শিক্ষণীয় চরিত্রের হয়ে উঠতে হবে সাধারণ মানুষের কাছে, তা সমীরদা বুঝিয়ে দিত। এবং তারও আচরণ ছিল সেই রকম। ভাল হবার সমস্ত চেষ্টা সে করে যেত। সমীরদা বলেছিল, ললিতকলার উপরে রাজনীতির প্রভাব প্রবল। সাহিত্য, সিনেমা, গান, নাটক, ছবি প্রভৃতি ললিতকলার সমস্ত বিভাগেই রাজনীতির ছাপ পড়বেই। উদাহরণস্বরুপ আমাদের দেশের উত্তাল রাজনৈতিক দশকগুলোর কথা তিনি বলতেন, যখন ললিতকলার সমস্ত বিভাগেই দিকপালেরা দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন এবং তা আজও আলোচিত হচ্ছে। আজ সমীরদা নেই কিন্তু সমীরদার কথাগুলো আজও কানে বাজে। আজকে প্রযুক্তিগত উন্নতি লাগাম ছেঁড়া। হাতের কাছে মজুত সমস্ত উপকরণ। কিন্তু কাজ কি হচ্ছে ? সেদিন একটা সিনেমা দেখলাম। অশ্লীল শব্দের অবিরাম প্রয়োগ খুব সহজেই সেন্সরবোর্ডের ছাড়পত্র পেয়ে যায়। আর ট্রেনে বাসে মানুষের মুখের ভাষায়ও একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন। তার পিছনে সামাজিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক অবস্থাও কিছুতা দায়ী যার পিছনে রাজনীতির ভূমিকা নেই বলা যাবে না।

ফরাসী বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তির যুগ শেষ। এটাও তাত্ত্বিকদের কথা। কিন্তু তার পরেও চিন্তায় নৈরাজ্য আসে নি। বরঞ্চ তা একটা আলাদা গতিপথ পেয়েছে। কিন্তু সাম্যের ক্রমিক পর্যায়ে একটা জোর খাটানোর প্রবনতা চলে এসেছে। এর সঙ্গে চলেছে সাম্রাজ্য বিস্তার এবং বাজার দখলের লড়াই। সেক্ষেত্রে সভ্য সামাজিকেরা জঙ্গলকেই একমাত্র তূল্যমূল্য করে তুলেছে। রাজনীতি তো হারিয়েছে তার শিষ্টতা, তার সহনশীলতা তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। শিক্ষাক্ষেত্রেও নৈরাজ্য চরম। শিল্প তো কবেই বিদায় নিয়েছে এই প্রদেশ ছেড়ে। একটা অসংস্কৃত বাতাবরণের মধ্যে আমাদের বসবাস। স্যোসাল মিডিয়াতে অশালীন শব্দ প্রয়োগ একটা স্টাইল। তারা বুঝতে পারে না বাক্যের বিরামহীন অশিষ্ট প্রয়োগ আসলে অশ্লীলতাই সামাজিক স্বীকৃতি পেয়ে যায়। আর তখনই শুরু হয়ে যায় এই প্রবনতা। আমাদের তখনই মনে পড়ে যায়, একদিন যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে পৃথিবী পাল্টাতে এসেছিল, তারা সবাই অদ্ভুত জাদুবলে অদৃশ্য হয়ে গেল। তাদের জায়গা নিল একেবারে অন্য চেহারার মানুষেরা যারা সংস্কারের নামে সন্ত্রাস চালিয়ে সেই আবেগপ্রবণ মানবতাবাদী যুবকদের স্মৃতিটাই মলিন করে দিল। মানুষ আবার হতাশ হল। হতাশার মধ্যেই তো আশার সঞ্চার হয়। আমরা পরিবর্তনের স্বপক্ষে মিছিল করে গেলাম, কলেজ স্ট্রিট থেকে এসপ্ল্যানেড। মুক্তির মিছিল মনে হয়েছিল আমাদের। পরিবর্তন এল। কিন্তু এ কোন পরিবর্তন ? এ যে আগের নাটকের পুনরাভিনয় আরও বৈশিষ্ট্য নিয়ে। আমরা দেখলাম, পড়লাম এবং শুনলাম অনেক কিছু। আবার পথ ডাক দিল। তাই আমরা আবার পথে। সেই একই পথ। আমরা হাঁটছি। এখানে আপনার মনে হতেই পারে, পথের শেষ কোথায় ?