জলচুরি

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়


পড়াশোনা বলতে এখন ইন্টারনেট সার্চ করা এবং মাত্র কেবল কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার ক্ষেত্রে । বর্তমান লেখার ক্ষেত্রেও পদ্ধতি তাই ছিল । অবলুপ্ত নদী বিষয়ক এই লেখার সূত্রপাত । কিন্তু ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেশ একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাওয়া গেল । নদী এমনিতেই বেশ প্রিয় একটা বিষয় । ছোটবেলায় বেশ বাড়াবাড়ি রকমের ঝোঁক ছিল নদীর প্রতি – নতুন নতুন নদীর নামের প্রতি । ট্রেনের জানলা দিয়ে সেইসব নদীর রঙিন নামগুলি জানার আগ্রহ পেয়ে বসত । বাবা কারখানায় চাকরি করতেন । তাঁর এক সহকর্মী সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে ভূগোল পড়াতেন । সেই ভটচাজ্ জেঠু পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত নদীর ম্যাপ এঁকে দিয়েছিলেন । গোটানো সাদা কাগজে নীল কালিতে আঁকা সেইসব জীবন্ত নদী আমাদের ছোট্ট কোয়ার্টারের বাইরের ঘরে বয়ে যেত । আর তাদের নতুন নাম জানার পর স্কুলে গিয়ে বুকের সাইজ চল্লিশ ইঞ্চি ।
ইন্টারনেটে অবলুপ্ত প্রায় সমস্ত বিষয়ের দেখা মেলে । কিন্তু ভারতবর্ষের অবলুপ্ত নদী – এ বিষয়ে চর্চা সীমিত । প্রথমেই সরস্বতী নদীর নাম ভেসে ওঠে । তারপর ধীরে ধীরে বয়ে আসে বেধিটি (bedhiti ) , কালী অগ্নসিনি ( agnashini ) – এরা দক্ষিণাবর্তের নদীসমুহ । উত্তর ও উত্তর পূর্ব ভারতের ফার্সি তথা বাগমতির নাম । এর মধ্যে কোনগুলি নদ এবং কোনটি নদী সেই তথ্য পাই না ।
সরস্বতী নদীর ইতিহাস অবলুপ্তি তথা নতুন আবিষ্কারের কাহিনী পেঁজা মন ও মননকেই তরতাজা করে তুলতে পারে । গুগল বলছে , ঋক্বেদেও নাকি সরস্বতী নদীর উল্লেখ আছে । কুরুক্ষেত্র নাকি সরস্বতী নদীর উত্তরপূর্বে অবস্থিত ছিল সেই কালে । সরস্বতী নদী সম্বন্ধে বাকি যে উত্তেজক তথ্যগুলি পাই তা ক্রমান্বয়ে উত্তেজক পারদ নির্ণয় করে পরিবেশন করি । ১) হরপ্পা মহেঞ্জদারো সভ্যতা যতটা ইন্দাস নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল ততটাই ছিল সরস্বতী নদীর কল্যানপুষ্ট । প্রায় ৫০০০ বছরের পুরাতন এই সভ্যতার নামাঙ্কণ হওয়া উচিৎ ইন্দাস সরস্বতী সভ্যতা । ২) যমুনা এককালে সরস্বতী নদীর উপনদী ছিলেন । পরবর্তী কালে তিনি গঙ্গার ভগনী রূপ ধারন করেন ।কারন পৃথিবীর নিম্ন উদরকেন্দ্রিক প্রবল মোচড় ; এবং যমুনা সটান গঙ্গাবক্ষে । ৩) রাজস্থানের ভূমি উদ্বেলিত করে যে নীর উঠে আসে পাথর স্তর থেকে তা প্রায় ৫০০০ বছরের পুরনো । হিমালয় পর্বতমালার হিমবাহ নির্গত জলের সাথে রাজস্থানে নির্গত নীরের সাদৃশ্য যমজ বোনের ন্যায় । অর্থাৎ সরস্বতী যমুনা থেকে যে জল সরবরাহ পেত তাই বয়ে নিয়ে যেত হরপ্পা শহরের গ্রামে গঞ্জে । রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে সরস্বতী নদীর অববাহিকা ধরেই তাঁর খননকার্য চালাচ্ছিলেন । 8) হরিয়ানা রাজস্থানে ঘাগর (ghaghar ) নদীর যে নদীপথ যা এখন প্রায় শুকনো , সেই আদপে বিলুপ্ত সরস্বতী । ৫) যে কারণে আজ পৃথিবী থেকে ডায়নোসর বিলুপ্ত , প্রায় সেই রকমই ভূ-আন্দোলনের ফলে সরস্বতী আজ আর নেই । হিমবাহ থেকে জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং বর্ষারও দেখা মেলা ভার । কি আর বইবে বল সরস্বতী !
কিন্তু সরস্বতীকে আমি তো বহতা দেখেছি ; কেন ত্রিবেণীতে । একটা পাকাপোক্ত ব্রীজও আছে । উল্টোদিকে মহুয়া না কামিনী সিনেমাহল । ১০ টাকা ১৫ টাকা লেখা গোলাপী হাল্কা সবুজ টিকিটগুলো ভেসে যাচ্ছে । ঠিক এমনভাবেই যমুনা বয়ে চলেছে হরিণঘাটা দিয়ে । একশো মিটার দূরে বন্ধুর বাড়ি । সে ছেলেবেলায় হাফসাঁতার শিখেছে যমুনায় । আর বাঁকা নদী , সে তো বর্ধমানে । গ্রামের বাড়ি যেতে কতবার পেরিয়েছি । আসলে খাল যে কীভাবে জনশ্রুতিতে নদী হয়ে যায় সে বলা ভার । বুড়ি গঙ্গা – যখন লন্ঠন জ্বলতো , নৌকোও চলত কলকাতার একেবারে অন্দরে । কিন্তু নদী শুনলেই সেই সাদা বালির টানটান শুয়ে থাকা চাই । যে নদীতে বালি নেই , অভ্র নেই সে আবার নদী কেমন নদী ! সমুদ্র তটে বালি চিরকালই – নাম ধুয়ে যাবার ক্যানভাস । কিন্তু নদীতে বালি ? যে গোড়ালি রেখেছে তার ওই একটা সারাদিন রয়ে যাবে সারাজীবন । আর হাওয়াই চটি খুঁজতে খুঁজতে ফিরে আসা ওইখানে যেখান থেকে আপনি কিশোর-কিশোরী হয়েছিলেন ।
আজ নভেম্বরের প্রথম রোববার । শুয়ে বসে কি করছি আমি লেখার ভেক ধরে ! টুকলি না অনুবাদ ? কতটুকু মৌলিক উপাদান আছে এই লেখাতে ? যাঁরা সত্যিকারের নদী বিশেষক , তাঁদেরই তো লেখার কথা । আমার সামনে বিপুল তথ্য ও তত্ত্বে ভরা ইন্টারনেটে দু একটা প্রবন্ধ পড়ে অম্লানবদনে লিখতে বসে গেলাম । আর কেউ জানুক না জানুক , আমি তো জানি কতটা শঠতা করছি নিজের সঙ্গে , এই বিষয়ের সঙ্গে ।
নদী প্রাণী গাছপালা সভ্যতা – এদের অবলুপ্তির সাথে সাথে আমাদের বোধের অবলুপ্তি ঘটেছে , ঘটে চলেছে । আজ প্রায় ৪০ কিমি পথ ধরে যমুনায় প্রাণ অবলুপ্ত । micro organism ও বেঁচে নেই । এত দূষণ ! এই দূষণ আসলে কিসের জন্য – কোন ফ্যাক্টরি , শত শত শৌচ নির্গত জল নাকি আমাদের সামগ্রিক অবলুপ্ত বোধ ! ঋত্বিক তাঁর ছবিতে collective unconsciousness এর কথা বলতেন । আমরা তো আরো আরো কয়েকশো ধাও পিছিয়ে গিয়ে collective blindness এ পৌঁছে গেছি ! মনে হয় এ যেন এক conscious hegemony of crime । দক্ষিণাবর্তে বা গোয়ার এক নদী আছে , নাম কালী । এই কালী নদী কর্ণাটক গোয়ার বর্ডার থেকে নির্গত হয়ে বেশ ঘুর পথে প্রায় ১৮৯ কিমি যাত্রা করে আরব সাগরে শরীর মিশিয়ে দেয় । প্রায় ছখানা বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্মকান্ড এই নদীর শরীর ব্যবচ্ছেদ করে গড়ে উঠেছে । ৩২০০০ একর বনাঞ্চল জলের তলায় । একটি পেপার মিল থেকে নির্গত শুদ্ধ গঙ্গাজল কালীকে এতটাই পবিত্র করেছে যে তার জল মুখে দেওয়া যায় না । সত্যিই কালীপুজো হয় অমাবস্যায় । মজার বিষয় এই তথ্যগুলোও ইন্টারনেট থেকে পাওয়া । স্বচ্ছ ভারত বানাতে গিয়ে ঝাঁটা তো হাতে নিলাম । কিন্তু ধুলো বালি ময়লা ফেলবো কোথায় – সেই কোন গঙ্গা যমুনা দামোদরে তাই তো ! আমরা এমন জাত কন্ডোমটাও নদীতে ফেলি – বাপ মায়ের অস্থিও । ভাগ্যিস সরস্বতী আজ আর নেই ।
আর কয়েকটা কথা , ব্যাস , তারপরে থেমে যাব । সরস্বতী নদী revive করার plan বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে । রাজস্থানে চাষাবাদ পুরো হয়েছে । পুরোটা না হলেও ধীরে ধীরে হয়ত এই অবলুপ্ত নদী মানুষের কথোপকথনের সঙ্গী হয়ে উঠবে । ছোটবেলায় পশ্চিমবঙ্গের নদনদীর ম্যাপে খড়ি নদীর নাম দেখেছিলাম । যদি কেউ জানে এই নদী এখনও অবশিষ্ট আছে কিনা জানাবেন । আদৌ কি এই নামে কোন নদী ছিল কিংবা
আছে ?
বছর পাঁচেক ধরে একটা ডকুমেন্টরি করার পরিকল্পনা মাথায় ঘুরছে ! ছোট ছোত স্বল্প চেনা জানা নদীর অববাহিকা ধরে যদি একটা ছবি করা যায় কেমন হবে ! যেমন ধরা যাক অজয় নদী । অজয়ের তীর ধরে ক্যামেরা এবং ক্রিউ গ্রাম বাংলার জনপদ তাদের বেঁচে থাকার শৈলী গান সাহিত্য লোকাচার এইসব দেখতে দেখতে আসবে । রাত্তিরে নদীর পাড়ে ক্যাম্প করে থেকে যাবে । ছবিতে ধরা থাকবে আড্ডার শব্দ গানের শব্দ রান্নার শব্দ – অজয় চিরচির তীরতীর বইতে থাকবে – ঘাটের সাথে গল্প করবে নদীর জল ......