সাতগাঁয়ের কাছেই

সঞ্চারী গোস্বামী



চট করে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয় আরণ্যক। কেউ দেখে ফেললে! আজ সারাদিন চুপচাপ থাকতে হবে, স্কুলেও যাওয়া যাবে না। নিজেকেও তো হৃদয়ঙ্গম করতে হবে ব্যাপারটা, না কি!
ভাঙ্গা পাঁচিলের ধারে আস্তে আস্তে বসে পড়ে আরণ্যক। জঙ্গলে জঙ্গলে পুরনো ভিটে-মাটির মধ্যে ঘুরে বেড়ানো ওর স্বভাব। বাবা অনেকবার বারণ করেছেন, ঘরে আটকে রেখেছেন, লাভ হয়নি। মা মাঝে মাঝে আক্ষেপ করেন, কেন যে এই নামটা রাখতে গেলো তোর বাবা। আরণ্যক কিচ্ছু বলে না। ওর একটা ডাকনাম আছে অবিশ্যি, সেটা টোটো। এমনিতে ও টোটো করে ঘুরে বেড়ায় না মোটেই, ক্লাস সিক্সে ওঠার সময় সেকেন্ড হয়েছে ক্লাসে। তবু ওই সব জঙ্গুলে জায়গা, ভাঙ্গা বাড়ি, পুরনো মন্দির, মজে যাওয়া পুকুরঘাট দেখলেই ওর মনটা কেমন করে ওঠে। মন খারাপেরও যে একটা ভালোলাগা আছে, সেটা ওই জায়গাগুলোয় ঘুরতে ঘুরতে বুঝতে পারে টোটো।

কিছুদিন আগে এই অঞ্চলে ইতিহাস সমীক্ষায় এসেছিল একটি দল। এখানকার একটা ইঁটভাঁটা খোঁড়ার সময় অনেক প্রত্ন উপাদান পাওয়া গেছে সে ব্যাপারে কথা বলতে। প্রত্ন উপাদান মানে পুরনো দিনের জিনিস, ইতিহাস বইতে পড়েছে ও। যেমন হরপ্পা-
মহেঞ্জোদারো তে পাওয়া গেছিল ঠিক তেমনি। সত্যিই ও আর ওর স্কুলের বন্ধুরা অনেক কিছু পেয়েছিল - অনেক শাঁখ, কড়ি, পোড়ামাটির জিনিস। যারা এসেছিলেন তাদের ওরা নাম দিয়েছে ইতিহাসকাকু। ইতিহাসকাকুরা ওদের বুঝিয়েছেন এসব জিনিস নিজের কাছে না রেখে যদি দিয়ে দেওয়া হয় যাদুঘরে রাখার জন্য তবেই না সবাই দেখতে পাবে! তবেই না সবাই জানতে পারবে ওদের জায়গাটার ইতিহাস! ওরা টোটোর মত ছেলেমেয়েদের জন্য অনেক বই , চকোলেট দিয়ে গেছেন। টোটো বুঝেছে এসব আসলে ঘুষ, ওরা যাতে ওই পুরনো জিনিসগুলো ফেরত দেয় তার জন্য। অবশ্য টোটো নিজেও বোঝে এটা দিয়ে দেওয়াই উচিত। এমনিতে ও দিয়ে দিয়েছে সবই - একটা জিনিস ছাড়া। সেটা একটা মাটির ঝুমঝুমি। আজকাল বাচ্চারা যেমন প্লাস্টিকের ঝুমঝুমি নিয়ে খেলে তেমনি, কেবল পোড়ামাটির। ও লুকিয়ে রেখেছে জিনিসটা। মাঝে মাঝে একা থাকলে ওটা হাতে নিয়ে বসে। কিট্‌ কিট্‌, কিট্‌ কিট্‌ আওয়াজ বেজে চলে আর ওর মনটা হারিয়ে যেতে থাকে কোন্‌ এক পুরনো সময়ে তা ও নিজেও জানে না। কেউ তো আর কোনোদিন এখানকার ইতিহাসের গল্প শোনায়নি ওকে।



"তাড়াতাড়ি কর, তাড়াতাড়ি কর" - সোমচন্দ্র অস্ফুটে বলে ওঠে ।
"আসছি ভাই" – বিষ্ণু দত্ত জবাব দেয়। তার গলা তত অস্ফুট শোনায় না। তার মনে এখন ভয় নেই, হিংসা নেই, ক্রোধ নেই- এমনকি বিজয়ের গৌরব বা পরাজয়ের হতাশাও নেই।

বিষ্ণুদত্ত জাতে শঙ্খবণিক, পেশায় নয় অবশ্য। শঙ্খনগরে ওর বাস। ওর বয়স যখন দশ-বারো হবে, ওর পিতা হরিদত্ত মারা যান। লোকের কাছে শোনে বাবার ব্যবসা বেজায় বড় ছিল। বিদেশি বণিকরা যখন সাতগাঁয়ে ঢুকত, তাদের কাছ থেকে শঙ্খ ও কড়ি কিনে নিয়ে তা দিয়ে নানারকম শৌখিন জিনিষ তৈরি করিয়ে বিক্রি করাই ওদের পারিবারিক পেশা। সে কাজে বাবা সম্পত্তি করেছিলেন বিস্তর। বাবা সমুদ্রে যাননি কোনোদিন, স্রেফ ঘরে বসেই তার বাণিজ্য। মায়ের কাছে বিষ্ণুদত্ত শুনত সমুদ্রের কথা। ওর প্রপিতামহের আমল পর্যন্ত সমুদ্রে যেত ওদের বড় বাণিজ্যতরী। তাতে বোঝাই হত শঙ্খ দিয়ে তৈরি নানান হস্তশিল্পের সম্ভার। নানা দেশ ঘুরে সে জাহাজ ফিরত সোনা নিয়ে - সেই সোনাই তখন বাংলাদেশের সর্বত্র। অবশ্য কেবল সোনা নয়, তাতে শঙ্খও থাকতো বিস্তর -সিংহলের, যবদ্বীপের, সুমাত্রার। আর আসত মশলা - রন্ধনের জন্য, পান সাজবার জন্য। সেইসব সুগন্ধি মশলায় পান সেজে তার খিলি করে এদেশের বধূরা তুলে দিতেন তার স্বামীর বা প্রিয় পুরুষটির হাতে। বস্তুত পানের খিলির প্রচলনটা বঙ্গদেশ থেকেই শুরু হয়েছিল। বাঙালি যে বরাবরই সৌখিন এ কথা কি আর বলার অপেক্ষা থাকে!

বিষ্ণুদত্ত যখন জন্মায় তখনও ওদের সম্পত্তি কিছু কম ছিল না। পূর্বপুরুষরা রেখেও গেছিলেন বিস্তর, বাবাও বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন সে ঐতিহ্য। অবশ্য বাবা মারা যাওয়ার পর জ্ঞাতিদের অত্যাচারে সে সম্পত্তির সবটাই চলে গেছে। এখন নিজের বলতে আছে কেবল ভিটেটুকুই। এটুকু আঁকড়েই পড়ে আছে সে। লোকে তাকে কূপমণ্ডূক বলে আড়ালে। তা সে নিজেও জানে। তা বলে বলুক। সে কথায় তার কিছু এসে যায় না। সে জাত শিল্পী।

হ্যাঁ, বেনের ঘরের ছেলে, কিন্তু শিল্পী। বাপ-ঠাকুর্দার ব্যবসা তাকে টানতে পারেনি, তাকে টেনেছে শিল্প। তাদের বংশের ধারা সে অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেনি। অবশ্য পুরোপুরি অন্য পথে গেছে সে, সে কথাও বলা যায়না। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে শঙ্খের কারুকাজ - তার টান সেই দিকে। তার বাবার কাছে কাজ করতেন রামখুড়ো, শঙ্খ কেটে ছবি আঁকতেন, তৈরি করতেন শঙ্খের পাখি, কুমির, দেবদেবীর মুর্তি, মায় জাহাজও। সেই কাজই ভালো লেগে গেছে ওর। ওতেই তার দিন চলে যাচ্ছে, সে সন্তুষ্ট। দুঃখ কেবল একটাই। বাড়ির উঠোনে যে তুলসীমঞ্চ আছে সেখানে রোজ সন্ধেবেলায় মা সন্ধে দিতেন। মাও নেই আজ বছর কয়েক। ওর দুঃখ এখন কেবল ওই তুলসীমঞ্চটার জন্যে। তুলসীমঞ্চটা বড় একা এখন। কেউ আর সন্ধে দেয় না সেখানে।



সোমচন্দ্র বিষ্ণুদত্তের একমাত্র বন্ধু। ছোটবেলায় এক পাঠশালে এক গুরুমশায়ের কাছে চপেটাঘাত খেয়েছে দুজনেই। দুজনের বিরুদ্ধেই একই অভিযোগ ছিল গুরুমশায়ের, কেউই পড়া করে না। দুজনেই বেনের ছেলে। পার্থক্য কেবল, সোমচন্দ্রের বাবা সুবর্ণবণিক আর বিষ্ণুদত্তের বাবা শঙ্খবণিক। সপ্তগ্রামের বণিকদের মধ্যে ধনমানে সুবর্ণবণিকরা শঙ্খবণিকদের চেয়ে একটু উঁচুতে । পার্থক্য আরও একটা ছিল। বিষ্ণুদত্ত শিল্পী, আর সে শিল্পের কদর করার লোক সোমচন্দ্র।

যে সময়ের কথা বলছি সেটা ষোড়শ শতকের একদম শেষ ভাগ। সদ্য বাংলাদেশ প্লাবিত হয়েছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমে। সে প্লাবনের রেশ রয়ে গেছে বাংলাদেশের সর্বত্র। এই প্লাবন বাংলাকে দিয়ে গেছে এক অদ্ভুত দ্বৈত অনুভব। প্রেম যেমন একাধারে মানুষকে মানসিকভাবে গতিময় করে তোলে আর অন্যদিকে কর্মতত্পরতার দিক থেকে অলস করে, এই প্রেমেও ঘটেছে তারি প্রতিফলন। একদিকে বাংলার মানুষের চেতনায় এসেছে নতুনের সজীবতা, মধ্যযুগীয় অন্ধ জাতপাতের বিচার ভেসে গেছে ভাগীরথীর উজানে। অন্যদিকে যে বাংলা ছিল বাণিজ্যে অগ্রসর, সে বাংলা যেন হঠাৎই হয়ে পড়েছে স্থবির। বহির্বাণিজ্যের হাত ধরে বাংলায় অনুপ্রবেশ ঘটেছে পর্তুগীজদের। প্রথমে কালিকট, তারপর পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রাম। কালিকট ও চট্টগ্রামের মত সপ্তগ্রামেও একই উপায়ে প্রথমে সাধারণ ব্যবসায়ীর বেশে ব্যবসা শুরু করেছিল তারা। সমুদ্রপথে ভাগীরথী হয়ে বড় জাহাজ নিয়ে ঢুকে বেতড়ে জাহাজ নোঙর করে ছোট ছোট নৌকোয় করে পসরা নিয়ে তারা যেত সপ্তগ্রামে। সপ্তগ্রাম ছিল পোর্টো পিকানো বা ছোট বন্দর। এখানকার বণিকদের থেকে অল্প দামে জিনিস কিনে পরে কালিকটের বন্দরে সেগুলি বিক্রি করত অনেক বেশি দামে। এভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে বাঙলার বহির্বাণিজ্য। আগে সপ্তগ্রাম থেকে দূরদূরান্তরে বাণিজ্যে যেত যে বিশাল সংখ্যক বণিকের দল, তারা যেন কর্পূরের মত মিলিয়ে গেছিল কোথাও।

শিবপুর, বাসুদেবপুর, নিত্যানন্দপুর, কৃষ্ণপুর, খামারপাড়া, সাম্বাচোরা আর বলদঘাটি এই সাত গ্রাম নিয়েই সপ্তগ্রাম। যার প্রাণ প্রবাহ ধরে রেখেছিল সরস্বতী নদী। প্রাচীন বাংলার এক অন্যতম বন্দর ছিল সপ্তগ্রাম। ষোড়শ শতকে অবশ্য সরস্বতী মৃতবৎ, সে নদী দিয়ে বড় জাহাজ ঢুকত না সাতগাঁয়ে। সাতগাঁ - লোকমুখে সপ্তগ্রামের নাম। বাংলার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যস্থল। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই সেখানকার বণিক সমুদ্রে যেত কোলণ্ডিয়া জাহাজে চড়ে বিখ্যাত মসলিন, ক্ষৌম পট্টবস্ত্র, মলমল নিয়ে। এই বন্দরের সুবর্ণযুগের সূচনা অষ্টম শতক থেকে, তাম্রলিপ্ত বন্দরের অবলুপ্তির পরে। ষোড়শ শতকের শেষদিকে যদিও সে গৌরব ফিকে হয়ে এসেছিল অনেকটাই, তবু ছিল।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসে সোমচন্দ্র। প্রতিহারী একজন আছে অবশ্য, তবু যা সময় চলছে, নিজে সতর্ক থাকাই ভালো। বাইরের ঘরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। আসলে আজ মধ্যাহ্নভোজন টা বেশ বেশি হয়ে গেছে ওর। ভালো ঘি দিয়ে সাদা ভাত, নালিতা শাক, মৌরলা মাছ, বন্য কুক্কুটমাংস। শেষে সোনামুগ ডাল। ডাল তাদের বাড়িতে বড় একটা আসে না, কিছুদিন আগে বাণিজ্যে গেছিলেন বাবার বন্ধু রক্তাম্বর দত্ত, তিনি এনেছেন। বাড়িতে কেউ রাঁধার সাহসও দেখায়নি, ওর আপন বোন ছাড়া। ওর বোন সুনয়না।

প্রতিহারীকে ইশারায় দরজা খুলতে বলে সোমচন্দ্র। প্রতিহারীও ঢুলছিল। তারও বোধকরি কড়া নাড়ার শব্দ হওয়ার আগে দিবানিদ্রাই চলছিল। এসব জানে সোমচন্দ্র, কিন্তু কিছু বলে না। অরাজক দেশে এছাড়া আর হবেই বা কি! সে নিজেই বা কতটুকু পালন করছে নিজের দায়িত্ব!

"তুমি কিছু শুনেছ?” - ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলেন মুকুন্দরাম। ইনি গ্রামের একজন বিখ্যাত শেঠ।
"কিসের কথা বলছেন খুড়োমশায়?"
"তার মানে জানোনা। জানলে এ প্রশ্নটাই করতে না আমাকে। যাই হোক জানোই না যখন বাবাকেও ডাকো। একসঙ্গেই বলা যাবেখন।" কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বসে পড়েন মুকুন্দরাম।
"আজ্ঞে খুড়োমশায় , আপনি তো জানেন বাবাকে পাওয়া যাবে না এইসময়। বাবা এখন ঠাকুরঘরে বসে আছেন। মা মারা যাওয়ার পর যে কি হল বাবার! বাড়িতে যে সময়টুকু থাকেন, তার বেশিরভাগটা ঠাকুরঘরে কাটান। আপনি আমাকেই বলতে পারেন।" একটু ইতস্তত করতে করতে বলে ফেলে সোমচন্দ্র।
"আরে বুঝছ না হে। ঠাকুরঘরে বসে থাকার সময় আর নেই।"
"বুঝছি খুড়োমশায়, আপনার খুবই দরকার বাবার সঙ্গে। তাই যদি হয় আপনি কি দয়া করে এই সময় কাল আসতে পারবেন একবার? আমি আজ সান্ধ্যভোজনের সময় বাবাকে বলে রাখব নাহয়! ওই ভোজনের সময়টুকুতেই যা কথা হয় তো ওনার সঙ্গে।"
"না হে, সে সময় নেই। তা যাক গে, তোমাকেই বলি। তোমরাই তো বাঁচাতে পারো এই কৃষ্ণপুরকে, মানে, ইয়ে সপ্তগ্রামকে ।" আবার কপালের ঘাম মুছে নেন মুকুন্দরাম।
"আজ্ঞে, আপনি কি বলছেন আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।" সোমচন্দ্রের কপালে বিস্ময়ের রেখা।
"আরে রোসো, রোসো। আমি তো বলিই নি কিছু এখনো। তুমি একটা কাজ করো দিকিনি। সদরের দ্বার আর জানলার কপাটগুলো বন্ধ করে দাও তো একটু।"

প্রতিহারীকে দ্বার রুদ্ধ করতে বলে নিজে জানলা বন্ধ করে মুকুন্দরামের পাশে এসে বসে সোমচন্দ্র। মুকুন্দরামকে আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না সে, কিন্তু তার নিশ্বাসের শব্দই বলে দিচ্ছে তিনি কতটা উদ্বিগ্ন।
"আজ সকালে বেতড়ে আবার এসেছে তারা" হাঁফিয়ে হাঁফিয়ে বলেন মুকুন্দরাম।
"কি বলছেন!” সোমচন্দ্রের নিশ্বাস দ্রুত হয়।
"হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। খবর কালই এসেছিল তারা আসছে। ভেবেছিলাম ভাগীরথী থেকে হুগলীর দিকেই চলে যাবে ওরা। গেলে বেশ হত। ভুগত ওখানকার অহংকারী গণ্ডমূর্খ বণিকগুলো। আমরাও তো করেছি এককালে বাণিজ্য, তা তোদের এত দেমাক কিসের রে?”
"আজ্ঞে খুড়োমশায় আপনার সমস্যাটা কোন বিষয়ে ঠিক বুঝলাম না । তারা করছে তাদের মত বাণিজ্য। আমাদের অবস্থা খারাপ যে হচ্ছে তার জন্যে দায়ী তো আমরা। এটা কি আপনারা বোঝেন নি এখনও?” সোমচন্দ্র বলে ওঠে।
একটু আমতা আমতা করেন মুকুন্দরাম - "সে বাপু জানি না। এখন এই টুপি-কামিজধারী ফিরিঙ্গীদের বিষয়টা নিয়ে তুমি কি ভাবছ বলো।"
"আজ্ঞে আমাদের মনোভাব এরকম থাকলে কিচ্ছু করার নেই। বুদ্ধিমান পোর্তুগীজরা আমাদের ঠকিয়ে নিজেরা ব্যবসা করে চলে যাবে।"
"আরে শুধু তা হলে তো হয়েই যেত। তারা গেল বার থেকে যে আরো কীর্তিকলাপ দেখাচ্ছে সেটা মনে আছে?”
"আপনি কি নারীহরণের কথা বলছেন?”
"ঠিক ধরেছ।"



একমনে বসে বসে শঙ্খটা দেখতে থাকে বিষ্ণুদত্ত। আর বেশি কাজ বাকি নেই। হয়ে গেলেই এটা সোনায় বাঁধিয়ে নেবে সে। অবশ্য কাজটা খুব সাবধানে করতে হবে। কেউ জানতে না পারে।

জানতে যে কেউ পারবে না তা সে জানে। অন্তত প্রাণ থাকতে কাউকে এটা জানতে দেবে না সোমচন্দ্র। সে বলেছে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার এক বিশ্বাসী কারিগর কে দিয়ে শঙ্খটা বাঁধিয়ে দেবে। সেটা হাতে পেলে তোরঙ্গে রাখা মায়ের সোনার হারে পরিয়ে নেবে বিষ্ণুদত্ত। সেই হারেই হবে তাদের মালাবদল। তার আর সুনয়নার।

সুনয়না- সুনয়না - সারাক্ষণ ওর মাথার মধ্যে মন্ত্রের মত জপ করে যায় কেউ। সোমচন্দ্র ওকে আশ্বাস দিয়েছে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেওয়াবে ওদের। পিতা যাতে জানতে না পারেন তার ব্যবস্থাও ওরই। একবার বিয়ে হয়ে গেলে পিতা আর কি করবেন! আর তখনো যদি গররাজি থাকেন, তাকে ঠিকই বোঝাতে পারবে সোমচন্দ্র। এ বিশ্বাস তার আছে।

সুনয়না - সুনয়না - আনমনে একটা ক্ষীণ লৌহশলাকা তুলে নেয় বিষ্ণুদত্ত । এইটি দিয়েই শেষের কাজগুলো করবে সে। চোখের কাজ যে সম্পূর্ণ হয়নি এখনও! সেটুকু শেষ না হলে সুনয়নার যে কিছুই ফুটিয়ে তোলা হল না! সুনয়নায় প্রতিকৃতি আঁকা এই শঙ্খটিই হবে সুনয়নাকে দেওয়া তার বিবাহোপোহার। তার যে আর দেবার মত কিছুই নেই। ওই হারে সেজে বাড়ির উঠোনের তুলসীমঞ্চে জল দেবে সুনয়না। সন্ধেবেলায় সন্ধেবাতি জ্বলবে যখন, তুলসীর গন্ধ, ধূপের গন্ধ আর সুনয়নার সুবাস মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে...

"ভাই, ভাইরে" একটা বুকফাটা আওয়াজে চমকে ওঠে বিষ্ণুদত্ত। কেঁপে যায় হাতের শলাকা। কেঁপে যায় সুনয়নার ডান চোখের পাতা। কি হবে এখন! তার এত পরিশ্রমের কাজ নষ্ট হয়ে গেল যে! কালই যে তাদের বহু প্রতীক্ষিত মিলনের দিন। অবশ্য সে এখনো ঠিক করে ফেলতে পারে ওই ত্রুটি, কিন্তু সে যে ভেবেছিল সুনয়নাকে দেবে নিখুঁত এক প্রতিকৃতি। সে আশা তার পূরণ হল কই! তার নিজের জীবন যেমন শুধুই ভুলে ভরা, সুনয়নাকেও সে তার থেকে বেশি কিছু দিতেই পারল না। বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে দ্বার খোলে বিষ্ণুদত্ত।
আরেকবার চমকে ওঠে সে।

"কি হয়েছে সোম? তুমি এই সময়?”
"সুনয়না...”
"কি হয়েছে তার? তোমার বাবা বলেছেন কিছু?”
"কথা রাখতে পারলাম না ভাই। তাকেও রক্ষা করতে পারলাম না।" কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মাটিতে বসে পড়ে সোমচন্দ্র। আস্তে আস্তে বলতে থাকে কি হয়েছিল। দিন দুই আগে বিবাহ উপলক্ষে দেবতার আশির্বাদ নিতে দেবমন্দিরে পূজা দিতে বেরিয়েছিল সুনয়না। তার একমাত্র অনুগামিনী দাসীটিকে সঙ্গে নিয়ে। পথে তাকে হরণ করে এক পর্তুগীজ দস্যু। দাসী বাড়ি ফিরে এসে খবর দেয়। কাল সকালে তার নগ্ন মৃতদেহ পাওয়া গেছে সরস্বতীর পশ্চিমের জঙ্গল থেকে। শুনে থেকে পিতা উন্মাদের মত আচরণ করছেন। সোমচন্দ্র আরও বলে এই পর্তুগীজ বণিককে কদিন ধরে বেতড়ে পসরা নিয়ে বসতে দেখা যাচ্ছিল। নাম দিয়েগো রেবোল্লা। ওদের ব্যবসা গোটানোর সময় হয়ে এসেছে। সোমচন্দ্র তাদের গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে কথাও বলেছে, কিন্তু এদের বিরুদ্ধে যেতে রাজি নয় কেউ। কারণ এদের অস্ত্র আর অর্থের জোর , সর্বোপরি সংঘবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা সপ্তগ্রামের বণিককুলের থেকে অনেক বেশি।



খুব সাবধানে হারটা রেখে দেয় টোটো। হাতির দাঁতের কৌটোয়। তারপরেও তাকিয়ে থাকে লকেটটার দিকে। এই কৌটোটা ছাড়া এ কাজ মানাবে না। এ কার মুখ? তার মাও সুন্দর, অন্তত সবাই সে কথাই বলে, কিন্তু এত সুন্দর মুখ সে কোনোদিন দেখেনি। মা তো তার কপালে সিঁদুরের টিপ, শাড়ি, মুখের ওপর পড়া কালো চুল সবকিছু নিয়ে সুন্দর, কিন্তু শুধু সাদা শঙ্খের ওপরে রেখা দিয়ে কে আঁকল এমন সুন্দর একটা মুখ! টোটো জানে না। কেবল সে জানে এরপর যদি ইতিহাসকাকুরা এসে জিনিস চায় ওকে মাটির ঝুমঝুমিটাই দিয়ে দিতে হবে। এটা ও দিতে পারবে না কোনোমতেই।

অবশ্য আরও একটা জিনিস আছে যেটা ও জানে ইতিহাসকাকুদের কাজে লাগবে। অন্তত ওর তাই ধারণা। সেদিন ও যে হারটা পেয়েও খুব আনন্দ করতে পারেনি, স্কুল যেতে পারেনি, তার যে আরও একটা কারণ আছে। ও যে দেখেছিল আর একটা জিনিসও।

হ্যাঁ, আর একটা জিনিস। এখনও মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় ভয়ে। ও যখন খুরপি দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে জঙ্গলের মধ্যে মাটির ঢিবি থেকে বার করেছিল এই জিনিসটা, তখন তার পাশে আরও একটা জিনিস ছিল। সেটা কারুর একটা পায়ের হাড়।



রেবোল্লার গলায় হাতের দাগ হয়ত দেখা যাবে না। আফসোস হল বিষ্ণুদত্তের। কিন্তু ও চায় ওর বাড়ির তুলসীমঞ্চটার পাশে মাটির নিচে থেকে যাক ওর প্রতিহিংসা। অন্তত সুনয়না জানুক। এই তুলসীমঞ্চটায় সন্ধে দিতে সুনয়নাকে দেখতে পেলনা ও। শান্তি ও পেলনা, অন্তত সুনয়না পাক। আর কোনও হিংস্র জন্তুর শিকার হতে হবেনা ওকে।

"ভাই একটু তাড়াতাড়ি" সোমচন্দ্রের গলা শোনা যায়।
অস্পষ্ট অন্ধকারে সোমচন্দ্রের পাশে এসে দাঁড়ায় বিষ্ণুদত্ত।
"একটু আসবে আমার সঙ্গে?"
সোমচন্দ্র জবাব দেয় না। ধীরপদে বিষ্ণুদত্তের পিছন পিছন তুলসীমঞ্চটার পাশে এসে দাঁড়ায়।
তুলসীমঞ্চের মাটি থেকে একমুঠো তুলে নিয়ে সোমচন্দ্রের হাতে দেয় বিষ্ণুদত্ত। তারপর ধীরে ধীরে দ্বার মুক্ত করে বেরিয়ে যায়।

সোমচন্দ্রের চোখে তখন চিকচিক করছে শীর্ণা সরস্বতীর জল। কোনও এক না হওয়া মিলনের মালা বুকে নিয়ে আবার একা হয়ে গেল তুলসীমঞ্চটা।