একটি কৃষ্ণগহ্বর থেকে পাওয়া সাতটি শ্বেতপত্র

রমিত দে


সেকেন্ডে মাত্র ৭ মাইল ! মাত্র ৭ মাইল ! ব্যস । এতটুকু গতি কুড়িয়ে বাড়িয়ে জড়ো করে নিতে পারলেই তুমি পৃথিবীর মায়ার বন্ধন ছিঁড়ে ফেলেছ।তারমানে কি তুমি নেই? তুমি লুপ্ত ! না তা তো নয়। ওই তো আছ, স্ফীত নীহারিকার মাঝে শ্বেতবামন হয়ে মহাজাগতিক পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চলেছ স্পেসটাইমের সমীকরণটি নিয়ে। হ্যাঁ সময় এবং শূন্য -এর মাঝেই তুমি অপেক্ষা করছ একটি মাত্র কৃষ্ণগহ্বরের জন্য।যা তোমাকে গিলে নিয়ে প্রমাণ করবে আসলে এই নকল বিশ্বে তুমি উদ্বাস্তু, শূণ্য নামের ‘স্বল্প ঘনত্বের ডার্ক ম্যাটার একদিন তোমার হাত ধরে বলবে আসলে আগাপাস্তলা তুমি নেই , কেবল ভাঙা ভাঙা , কেবল লুপ্ততার দিকে ডাক আসছে ফিরে যাবার, আর শেষবারের মত কালো গর্ত থেকে ডাক আসার আগে কাঁকুড়লতার মত স্মৃতি তোমার মাটি ধরে ধরে নিয়ে চলেছে ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত অবধি । কোথায় থাকে স্মৃতি নামের নাছোড় ছোড়াটি ! দুটো ফেনি বাতাসা আর গুপো সন্দেশ দিলেই হল, একেবারে চাটাপোঁছা পাত অবধি নিয়ে যাবে কিন্তু শূণ্যের এঁটো খেলেও তো জাত যায় তাই আমাদের খোলা মালসার দিকে মাকড়সা ঝাল বোনে আর মানুষ ফিরে আসে, ফিরে আসে সময় , অথচ দেখ বন্ধক দিয়েও শূন্যকে তো সময় থেকে ছাড়াতে পারলেনা! “সেঁজতোলানি” জান তো! সেই যে বরের বাপের কাছ থেকে পাড়ার মেয়েরা টাকা না পেলে বর ছাড়ে না , শূন্যও ঠিক তেমনি স্মৃতির কাছ থেকে সময়ের সেঁজতোলানি না নিয়ে কিছুতেই যাবে না ,পিছু পিছু ধাওয়া করবে ওই ঘটনা দিগন্ত অবধি। এখন আক্ষরিক অর্থে এই ঘটনা দিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন হচ্ছে ব্ল্যাকহোলের ভেতরের আর বাহিরের বিভাজন রেখা ঠিক যে অবধি এসে মহাবিশ্বের তাবত ঘটনা পেছন ফিরে দেখছে “হ্যাঁ’ সে আছে আর ঠিক যা পেরিয়ে গেলেই কেউ তাকে জানাতে পারছেনা “না” সে নেই। সে লুপ্ত ! এ যেন সেই ‘ নিজের রাজ্য ছেড়ে সাত রাজার রাজ্য পেরিয়ে, যে দেশে কোনো রাজার রাজ্য নেই সেই দেশে রাজপুত্তুর চলেছে’ লুপ্ততার সাথে রঁদেভ্যু করে...
তা এই কৃষ্ণগহ্বরে একটু ঝুঁকে দেখলে কেমন হয় ! তুমি নিশ্চিত এখুনি গুঁফো বিজ্ঞানীর মত চেঁচিয়ে উঠবে ভবিষ্যত! ভবিষ্যত ! ওই যে Neil Degrasse Tyson ও বলেছিল না -Do You realize that if you fall into a black hole, you wil see the entire future of the universe unfold in front of you in a matter of moments and you will emerge into another space-time created by the singularity of the black hold you just fell into- আমার কিন্তু মনে হয় ভবিষ্যত আসলে এক সদর বাড়ি খালি সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে চাওয়া আর ওর ভেতরের কাঠের জাফরিটা এট্টূ ঠেলো দেখ কীভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অতীত নামের সেই অন্দরবাড়ি, সময় নামের ওই কৃষ্ণগহ্বরই তো খেয়ে বসে রয়েছে অতীতের জায়ফল জয়িত্রী কর্পূর। তো , ২০০৮ সালে এম-৮৭ নামের যে কৃষ্ণগহ্বরটি আবিষ্কৃত হল মহাকাশবিদ দ্রগভস্কির মতে তা নাকি এযাবতকালীন সবথেকে বড় কৃষ্ণগহ্বর। সে এক বিশাল ব্যাপার, ৫০০ কোটি আলোকবর্ষ নাকি তার বিস্তৃতি আর ৬৮০ কোটি সূর্য তার খিদে; কিন্তু আমাদের তো গুটি গুটি পা আর গোড়ালিতে গতকালের গেড়ো তাই অতদূর না হয় নাই বা গেলাম। বরং স্যাগিটারিয়াস ‘এ’ র কাছে আসা যাক, এটা হল পৃথিবী থেকে মাত্র ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এরও খিদে আছে তবে রয়ে সয়ে খায় নাকি। তা হল কি আমাদের নাসাবাবু স্যাগিটারিয়াস ‘এ’ এর খিদে দেখবে বলে ওর দিকে তাক করে দিলেন রেডিও টেলিস্কোপগুলোকে, দেখা গেল ওর ইভেন্ট হরাইজনের দিকে দৌড়ে চলেছে জি-২ মেঘমালা। আর মেঘের সাথে মানুষকে তো ভীষন মানায়। কিভাবে যে দুজনে ভাসে কিভাবেই বা হারায় পথ সে ওরা দুজনেই জানে ; সে যাই হোক লোভ সামলাতে পারলাম না আমিও, খিদে দেখব,সেই রাক্ষুসে খিদে যা গিলে ফেলছে একের পর এক জন্মদিন একের পর এক আধেয়ের জ্যামিতি আর শব্দস্পর্শরূপরসগন্ধহ ীন শূণ্যের মাঝে স্মৃতির সাথে কেবল ধ্বসাধ্বস্তি করছে লুপ্ততার কিছু স্থুল আহার্য। তা আমিতো জীব, প্রাণ আদিত্যে খন্ডিত,থাকতে ভালোবাসি, কিছুতেই যেতে চাইনা, থাকার অনুশীলনে তর্পন দিতে দিতেই আর ‘পরাচঃ কামান অনুযন্তি বালা/স্তে মৃত্যোর্যন্তি বিততস্য পাশম’ শান্তিপাঠ করতে করতেই জি-২ মেঘেদের হাত ধরে ইভেন্ট হরাইজান পেরিয়ে নেমে পড়লাম উজ্জ্বল বৈবস্বত অখন্ড লুপ্ততাকে ছুঁতে-
ভেতরে ধোঁওয়া ধোঁওয়া ,আলোর গতিতে পাক খেয়ে চলেছে উত্তপ্ত গ্যাস, আর ওই ধোঁওয়ার সামিটেই পা ছড়িয়ে বসা এক লুপ্ত প্রেক্ষাপট, আমি ওর কাছে যাওয়ার পথ খুঁজছিলাম, কোথায় পথ ! পথের চারদিকে তো ছবি ছড়ানো। কোথাও নীলের স্নায়ুতন্ত্র তো কোথাও হলুদের শি সার্প মাইনর। তুলি ইজেল ক্যানভাস বর্ণরঙীন প্রহেলিকা জাল! যেন জানতামই না আমাদের চাল ফুটো হওয়া গোল বাড়ির দশ পা দূরের এই অন্তন্ত মিউজিয়াম। চারিদিকে এত আঁধার তবু আমি ওদের দেখছি কিভাবে! তবে কি স্মৃতির সবটুকু শাদা রং শুষে প্রতীত হয়ে উঠছে ওরা! ওই তো ছবির সামনে বসে আলেকজান্ডারের বন্ধু অপেলিজ।


পৌরানিক গ্রীসের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী। হাতে তাঁর ইজেল তুলি মোটিভ মনতাজ এক নারীর আবহগন্ধ, হ্যাঁ সেই নগ্নিকা ক্যাম্পাস্পির নিঃশব্দ গোপন প্রতিটি কামনা এঁকে চলেছেন অপেলিজ। একজন নারীর জটিল ও সুক্ষ অঙ্গের সাথে সমসত্ত্ব হয়ে যাচ্ছে একজন শিল্পীর চেতনার বর্ণচ্ছটা। নিজের প্রেমিকা ক্যাম্পাস্পির ছবি কিন্তু আলেকজান্ডারই আঁকতে দিয়েছিলেন অপেলিজকে আর আঁকতে আঁকতে ছবির মানুষটারই প্রেমে পড়েন অপেলিজ। না,আলেকজান্ডার তাকে মৃত্যুদন্ড দেননি বরং ছবির বাস্তবতার কাছে চিত্ররসের কাছে হেরে গিয়ে নিজের প্রেমিকাকে তুলে দেন অপেলিজের হাতে কারন বিশ্বাস করেছিলেন কোনো আলফা ম্যান নয় বরং অপেলিজের মত শিল্পী ছাড়া ক্যাম্পাস্পির মত নারীর সৌন্দর্যকে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ গল্প। এ গল্প নয়। কারণ আর প্রায় সব গ্রীক ছবির মতই অপেলিজের এ ছবিও সংরক্ষিত হয়নি। কালের গর্ভে বোকাবানিয়ে চলে গেছে এমনই নান্দনিক সৃষ্টি আর যেতে যেতে স্মৃতির পারমানবিক লংশটে রেখে গেছে কেবল কিছু মানবীয় মিথস্ক্রিয়া। স্যাগিটারিয়াস ‘এ’ তে বসে বসে আমি এসবেরই টুকরো কুড়োচ্ছি শুধু; হারিয়ে যাওয়া শাদা একটা মন্ড । মাঝে মাঝে ভাবছি রাস্তা সব ঠিক আছে তো ! আলো জ্বেলে তো দেখারও উপায় নেই, নিঁখুতভাবে সব অন্ধকার !অথচ অন্ধকারের মধ্যেই বিঘৎ মত ফাঁকা জায়গা , কারা যেন আগুন জ্বালিয়েছে, আলো নেই, কেবল পুড়ে যাওয়ার গন্ধ...
অগত্যা ছবির গন্ধের কাঁধে হাত দিয়ে দিয়ে হাতড়াই আগুনের ওপিঠে কাদের অত জোর লড়াই,কাদের ভুল করে ঠুকরে খেল সময় ! দেখি ফিতে বার করে ধ্বংসের মাপ নিতে বসেছে ফ্যাসিবাদ।

চারদিকে কাটা ফসল আর হলুদ গমের ক্ষেত ধরে হেঁটে চলেছেন ভ্যান গঘ। তাঁর পায়ের সাথে লেগে রয়েছে নিজেরই ছায়ার পা, আড়াআড়িভাবে উলটে পড়ে আছে যেন। ভিস্যুয়াল ইমেজের মাঝে সেই যেন সেই ল্যাটেন্ট ইমেজ , যা পৌঁছবার রাস্তাটাকে বার আর পিছিয়ে দিচ্ছে । বারবার বোঝাচ্ছে অতিক্রমণ শব্দটা কত ভারী! স্মৃতিভারে কত আক্রান্ত ! আচ্ছন্ন বধির ! সত্তাকে ছিঁড়ে বিশুদ্ধ এই পরিভ্রমণেই হয়ত শিল্পীর সাধনা; জানা নেই ওই রঙের স্রোতে নিজেরই ছায়াকে ছিঁড়ে শিল্পীও কি আসলে লুপ্ত হতে চান ! লুপ্ত হতে চেয়েছিলেন ? জানা নেই, শুধু এতটুকু জানা ডালফ, ক্লি্‌ ,লিরো কিংবা পিকাসোর হাজার ছবির সাথে সাথে ১৯৪২ এর ২৭ এ জুলাই রাতে হিটলারের নাৎজীবাহিনীর হাতে চিরকালের মত লুপ্ত হয়ে যায় গখের এ ছবি “ দ্য পেন্টার অন দ্য রোড ট্যু টারাস্কান” । ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ , দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বারো বছরে হিটলারের শাসনে চুরি হয়ে যাওয়া পুড়ে যাওয়া প্রায় ৭৫০০০০ লাখ ছবির জন্য স্নানের জল ঠিক করে দিয়ে গখ যেন তখনও চলেছেন একজন শিল্পীর শেষ সওয়াল নিয়ে-“Real Painter do not paint things as they are … They paint them as they themselves feel them to be”,...”কৃষ্টিহীন ইমেজ” নাম দিয়ে যে ছবিদের পুড়িয়ে দেওয়া হল মোহগ্রস্ত মানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠার দায়ে, লুপ্ত করে দেওয়া হল যে উল্লোল অতীতকে সত্যিই কি তাকে পোড়ানো গেল? যেখানে ছবির পাঁজরের হাড় পুড়িয়ে দেওয়ার কথা চলছে সেখানে অনেক আগেই তো শিল্পী জড়ো করে ফেলেছেন সৃষ্টির খসে পড়া পালকগুলোকে। জড়ো করে ফেলেছেন তার অ্যালিয়েনেটেড সেলফকে। আমরাও কি চলছিনা আমাদেরই ভেতরে আমাদেরই অ্যালিয়েনেটেড আউটসাইডার অবধি। ঘড়ি গলে গলে পড়ছে আর গতিহীন সরণহীন স্যাগিটারিয়াস ‘এ’ তে দাঁড়িয়ে গ্যালাক্সির গভীর প্রদেশে সারি সারি লুপ্ততার কথাবার্তায় আমিও তো খুঁজে চলেছি টারাস্কান অবধি একটি রাস্তা, যা স্মৃতির মোটিভ ইনডেকস চেনাবে,চেনাবে লুপ্ততার ইসথেটিক্স...
মাঝে মাঝ মনে হয় ধোঁওয়া যত বাড়তে থাকে ততই কি আমরা গভীরতা মাপতে থাকি ফেলে যাওয়া ধাঁধার ! লুপ্ততার ভেতরেই কি পড়ে থাকে একধরনের স্মৃতির গন্ধ একধরনের নিউরিনাল নেক্সাস ! ১৯৩৮ এর জুনে আত্মহত্যা করে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী আর্নেস্ট লুডঊগ কির্চনার(Ernst Ludwig Kirchner)

যখন নিজেকে সরিয়ে নিলেন নিজের ধ্বংসস্তুপের থেকে তার আগে তাঁর আঁকা প্রায় ৬০০ ছবি পুড়ে গেছে হিটলারের নির্দেশে। রাষ্ট্রের কাছে স্বেচ্ছাচারী রংহুংকারের কাছে হেরে গেলেন একজন শিল্পী। হারিয়ে গেল কোনো দেহের উর্ধ্বাংশ অথবা কোন অবিন্যস্ত কেশরাশি , হারিয়ে গেল স্থির ইমেজের গায়ে লেগে থাকা এক শিল্পীর মনস্তত্ত্বের কথা যিনি বারবার পিকচার পেরিয়ে ডেজায়র ফ্যান্টাসির কথা বলেছেন, নিজের ছবি্র ভেতর যিনি বারবার খুঁজে বেরিয়েছেন আবিষ্কারের জ্বলন্ত চোখদুটো...My panintings are allegories not portrait... বুঝিনা স্মৃতি কোথায় থাকে ! পুড়ে খাক হয়ে ছাই ভেঙ্গে কিভাবে ছবির গল্প খুলে বসে ! যত এগোই পায়ে পায়ে আটকে যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষের হারিয়ে যাওয়া মনের এসব চতুস্কোন এসব ডাঙা ডহর... সত্যিই কি এগোই ! আমি তো কৃষ্ণগহ্বরে আটকে গেছি সেই কবে থেকে ! লড়ে যাচ্ছি অনবরত লুপ্ততাকে ছোঁবো বলে। পায়ের তলায় এখনো লেগে আছে কির্চনারের হারিয়ে যাওয়া ছবি “ গার্ল ইন হ্যামক”( Girl in Hammock)আর “পোর্ট্রেট অফ কার্ল স্টার্ণহেম”( Portrait of Carl Sternheim)এর দলিল দস্তাবেজ। না, স্বৈরতন্ত্রী হিটলার পোড়াতে পারেননি এ ছবি কিন্তু হারিয়ে যায় হাতে হাতে স্মৃতির রেশম পশম সুতো মশলা ছেড়ে রেখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জামার্নীতে নাৎসীবাহিনীর হাতে যত ছবি ধ্বংস হয় পুড়ে যায় তার পুরোভাগেই রয়েছে কির্চনারের ছবি, যদিও ধ্বংসের আঁচ পেয়ে টেকলা আর আলফ্রেড হেস দম্পতি তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ছবির সংগ্রহ থেকে এ ছবি ১৯৩৫ এ Cologne Art Union এর হাতে তুলে দেন । ঠিক একই ভাবে যুদ্ধোদীর্ণ জার্মানী থেকে পালিয়ে আসার আগে ম্যাক্স ফিশার তার বার্লিনের ফ্ল্যাটেই ছেড়ে আসেন তার শখের সংগ্রহ, যাতে পড়ে থাকে “পোর্ট্রেট অফ কার্ল স্টার্ণহেম”(Portrait of Carl Sternheim) এর মত অমূল্য শিল্প, পড়ে থাকে লস্ট ল্যাংগুয়েজ অফ সিম্বলিজম। কত কিছুই যে পড়ে থাকে ! আমরা কেবল স্মৃতির সরাটুকু উলটে দিয়ে এগিয়ে যাই। সময়ের কার্ডিওগ্রাফে ঝুলে থাকে নৈঃশব্দের রেফগুলো। কেবল চিৎকার ! যেটুকু চিৎকার , প্রাত্যহিক ফ্ল্যাশব্যাকে সেই যেন আমাদের যাপনের থিম, সেখানেই দখল শব্দটি এসে পড়ছে, অতীতের ওপর বর্তমানের দখল, চিদের ওপর চিৎকারের দখল। কিন্তু চিৎকার ! সেও তো লুপ্ততার সাথে আত্মরতিক্রয়ার মগ্ন। তাকেও যে ‘শরীরের আয়তন আর খাবার পরিমান দিয়ে’ বিয়োগ করে দিয়ে আসছি আমরা।
ওই তো চিৎকার ! অস্তিত্বর সহস্রশাখ শব্দে সে যেন ধরে আছে অনস্তিত্বের নাড়িজলকে। শিল্পী যেন অনেক আগেই শুনতে পান সে আর্তনাদ , যেন জানেন লুপ্ত তোমায় হতেই হবে, লুপ্ততার ট্রেসিংয়েই আঁকা অস্তিত্বের আলপনা , না হলে “Edvard Munch” কেন এঁকে যাবেন “The Scream” মত ছবি, যা হারিয়ে যাবে যাকে হারিয়ে যেতে হয়।

কারন আবার যে চলার শুরু আবার যে খানিকটা ভাঙা রাস্তায় ফেরা। ‘The Scream” লিথোগ্রাফিক মিডিয়ামে এঁকেছিলেন “Munch”। ১৯৩৩ এর শুরুতে জার্মানীতে প্রফেসার গ্লেজারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল এ ছবি। ছবির নিচে গ্লেজারের স্ত্রী এলসার নাম লেখা। সময়টা নাৎসী আগ্রাসনের কিছু আগে। গ্লেজার ছিলেন ইহুদী, মিউজিয়মের সংরক্ষক; যে বাড়িতে গ্লেজার যত্ন করে ভরে রেখেছিলেন মানুষের এমনও হাজারো চিৎকার , সত্তার এমন হাজারো অভাব , যাকে আমরা চিনেও চিনিনা যাকে Edvard Munch, Ernst Ludwig Kirchner, Lovis Corinth এর মত শিল্পীরা তাদের রং তুলিতে তাদের পোয়েটিক ভ্যালুতে ভরিয়েছিলেন জীবনের অভেদ হিসেবে তাকেই গ্লেজার সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু নাৎসী বাহিনীর গেসট্যাপো(GESTAPO) বা গোপন পুলিশ বাহিনীর সদর অফিস বানাতে গ্লেজারের বাড়ি ধ্বংস করা হল, রাতারাতি জামার্নী থেকে পালিয়ে যেতে হল ইহুদী গ্লেজারকে, টিকিটের টাকা জোগাড় করতে নিলামে তুলতে হল দুষ্প্রাপ্য সব ছবিকে। এবং যথারীটি ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেল আরও একটি মিথের টুকরো। আমরা কি এই টুকরো টুকরো না থাকা গুলো নিয়েই থাকার , থামার একটা জায়গা খুঁজে চলেছি আজীবন! মাঝে মাঝে মনে হয় এই যে যা যায় তা কোথায় যায়? সব যাওয়াই কি থাকার ওপর ভাসে ! ঘরের যেমন ঘাসবন চরের যেমন চরাচর ঠিক তেমনি আলোর ফোঁটাগুলোর নিচেই কি বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অন্ধকারের অনুমান আর আয়তনগুলো !
স্যাগিটারিয়াস ‘এ’ তে বসে এখন আর শূন্যতত্ত্ব টত্ত্ব কিছু ভালোলাগছে না, মনে হচ্ছে সবই আছে, আসলে হারিয়ে যাওয়া বলে কোথাও কিছু নেই বরং এই যে ধোঁওয়াজংগলের মাঝে কুড়িয়ে পাচ্ছি কিমা কিমা মেঘগুলো যার ভেতর একজোড়া উষ্ণতা একজোড়া আকুতি একজোড়া শীতের ব্যবহার কিংবা জীবিতের স্মৃতি জুড়ে ওড়া মৃতের স্তব্ধ ও নিশ্চুপ মাস্তুল-এই বা কম কি! মাঝে মাঝে ভাবি এই কৃষ্ণগহ্বরের এত ভর আর ঘনত্ব কেন! অস্তি চিরতরে লুপ্ত হলে স্মৃতির ভর বুঝি বেড়ে যায় ! ওরা এসে জমা হয় শূন্যতার কালো গর্তে ! আরও একটু এগোই, দেখি কোথায় কোন সৃষ্টির জ্বালানি ফুরিয়ে গিয়ে সরণের ওপরে ভেসে উঠল ! ওই তো দেখা যাচ্ছে “Le Peintre” -পিকাসোর সেই হারিয়ে যাওয়া ছবি, “দ্য পেন্টার”। একজন চিত্রকর যখন একজন চিত্রকরকে আঁকেন তখন তিনি কি কেবল একজন ছবির মানুষ আঁকেন নাকি তাকে আবিষ্কার করতে হয় তার নিজেরই বিশ্বাস। এই আবিষ্কারের কথা তো পিকাসো আজীবন বলে গেছেন , কি তাঁর চিত্রকলায় কি তাঁর চিন্তনে। দন পাবলোর সাথে তাঁর সেই কথোপকথন মনে আছে? পাবলো তখন কাঠকয়লা দিয়ে অবিস্মরনীয় এক মোরগ আঁকছিলেন, পিকাসোকে দেখে বলেছিলেন- মোরগ তো চিরকালই আমাদের চারপাশে আছে কিন্তু জীবনের অন্যান্য সব জিনিসের মত তাকেও আমাদের আবিষ্কার করতে হয়। ঠিক যেমন কোরো আবিষ্কার করেছিলেন সকালবেলাকে, রেনোঁয়া আবিষ্কার করেছিলেন ছোট ছোট মেয়েদের সব কিছুকেই আবিষ্কার করতে হয় , এমনকি কাগজের টুকরোটাকেও যাতে তুমি আঁকছ। আসল কথা দরজা সব সময় খোলা রাখতে হয়, আবিষ্কারের দরজা। আর ওই দরজাটা পেরিয়ে গেলেই ফিরে তাকিও না আর। হ্যাঁ এই আবিষ্কারের দরজাটাই তো খুলে দিয়েছিলেন পিকাসোও। তিনিও তো বলতেন “ভেঙ্গে ফেলো, আবার করো, বহু বার করো। একটা সুন্দর আবিষ্কারকে ভেঙে ফেলে শিল্পী তাকে ঠিক দমন করে না,বরং তার রূপান্তর ঘটায় আর শেষ পর্যন্ত যেটা বেরিয়ে আসে তা তার বর্জিত আবিষ্কারের ফলাফল”। “দ্য পেন্টার” এ তিনি যে চিত্রকরকে আঁকছিলেন সেখানে হয়ত তিনি নিজেকেই ভাঙতে চেয়েছিলেন।

তার হাতে তুলি আর ইজেল তুলে নিজেকেই আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন , অথচ দেখার উপায় নেই সে কি আঁকছে ! হয়ত সেও একজন চিত্রকরকে আঁকছিল , আবিষ্কার করতে চাইছিল দ্যোতনাভরা কোনো এক শিল্পীর অমীমাংসিত যাপনা, আগাগোড়া যিনি বহির্ভূত রয়ে গেছেন নিজেরই অন্তরমহলে। তা এই “দ্য পেন্টার’ ১৯৬৩ তে পিকাসোর আঁকা ছবি নিউইয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্ট থেকে উড়ানে আসছিল যা যান্ত্রিক গোলযোগে কানাডার নোভাস্কটিয়ায় জরুরী অবতরণ কালে আটলান্টিকে ভেঙে পড়ে। বিমানে ছিল ২২৯ জন যাত্রী, হাফ বিলিয়ন ডলার মূল্যের হিরে এবং পিকাসোর ছবিটি। আশ্চর্য্য কেবল জীবিতেরই আবিষ্কার হয়না, মৃতেরও হয়। আর বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে আবিষ্কার বলতে কেবল পিকাসোর ধুয়ে যাওয়া ছবির ২০ সেন্টিমিটার। আমাদের জানা নেই মুছে যাওয়ার আগে কারা বেশি জল খেয়েছিল, ২২৯ জন যাত্রী, বিলিয়ন ডলারের হীরে নাকি পিকাসোর ‘দ্য পেন্টার’ ! ঠিক যেমন জানা নেই যারা হারিয়ে গেল তাদের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান কি ছিল ! কেবল এটুকুই সত্য আত্মজীবনের কিছু সাক্ষ্য লুপ্ত হয়ে গেল, স্মৃতিধার্য হয়ে গেল , আর এই কৃষ্ণগহ্বরে সত্ত্বা ও শূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম কারা যেন আজও বলে চলেছে লুপ্ততা যে ছায়া ফেলে তা আসলে আলো নয় বরং পরিপূরক এক বর্ণ, সেখানে সব আছে, থাকা ,না থাকা, জীবনের প্রতিটি স্তরের ইঙ্গিত; ছবির ভিজে ক্যানভাস থেকে কারা যেন এই কৃষ্ণগহ্বরকেই রঙদানি ভেবে লিখে ফেলে -
“ মানুষ অত্যন্ত উর্ধ্বে উঠে গেলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের
বাইরে যায় সে , তাকে কেউ আর আকর্ষণ করে না , সে থাকে
সব গ্রহতারকার আকর্ষণহীন স্থানে একা”...

একাই তো ! ওই যে জমা হয়েছে যে ক্ষণকাল সেও তো একা হওয়ার জন্যই। একার আক্ষরিক অনুবাদ শিল্পী ছাড়া শিল্প ছাড়া আর কিছুতেই যে সম্ভব না। স্যাগিটারিয়াস ‘এ তে আমি ওই একাগুলোই খুঁজি,মূক স্থবির নীরব অতীতকে নিয়ে শব্দহীনতায় নিটোল সে। ওই যে ছাইয়ের ভেতর জমা হয়েছে হলুদ হয়ে যাওয়া ছবিটি যেখানে সময় আর কাঁচি চালাবে না শিল্পী আর রং দেবে না অথচ মরচের ভেতর কি তাজা আর সুস্পষ্ট হারানো দিনের মোহ! লুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরেও স্মৃতির প্রতিটা শটে জীবনের তিন লাইন গাঁথতে গাঁথতে এগিয়ে আসি ফ্রিডা কাহলোর দিকে। না তিনি এখন আর নিরাশাগ্রস্ত নন,নিজের থেকে নির্বাসিত নন , খাওয়ার টেবিলে বসা মানুষটি যেন জেনে গেছেন দ্বিমেরু বিশ্বের সহজপাঠগুলি। অগ্রন্থিত এক কৃষ্ণগহ্বরে দাঁড়িয়ে দেখি সবকিছুই ফিরে গেছে হারিয়ে গেছে পড়ে আছে কেবল একটি “উন্ডেড টেবিল”। ১৯৪০ এ “ দ্য্ উন্ডেড টেবিল” ছবির কাজ শেষ করেন ফ্রিডা কাহলো। মূলত সেই একই বছরে নিজের শহর মেক্সিকোতেই আন্তর্জাতিক স্যুররিয়াল একজিবিশনে সে ছবির প্রদর্শনের কথা ছিল, কথা ছিল অঁদ্রে ব্র্যঁত এবং অন্যান্য সুররিয়ালিস্টদের তাক লাগিয়ে দেবেন তাঁর জীবনের প্রতিবন্ধকতাকে পরাবাস্তবের সাথে মিলিয়ে দিয়ে। ফ্রিডার প্রায় সব ছবিই আত্মপ্রতিকৃতি, সব ছবিতেই তিনি স্ব এর মাঝেই খুঁজে ফিরেছেন জীবনে সীমাবদ্ধতাগুলোকে। “দ্য উণ্ডেড টেবিল” ছিল ফ্রিডার আঁকা সবচেয়ে বড় ফ্রেমের ছবি। এবং সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয় এই ছবিতে ফ্রিডা কিন্তু ডেপিক্ট করেননি তাঁর অন্য ছবির পরিচিত শেডস অফ মেলানকলি বা লস ফেটিশকে। কিছুদিন আগেই প্রেমিক স্বামী বিখ্যাত মিউরালিস্ট দিয়াগো রিভেরার সাথে দীর্ঘকালীন সম্পর্কের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে ফ্রিডার। হয়ত দীর্ঘ তিক্ততার সমাপ্তি ফ্রিডাকে তখন চিনিয়ে গেছে অস্তিত্বের সাথে যুক্ত টুকরো টুকরো মিথ্যেগুলোকেও। “দ্য উন্ডেড টেবিল” এ ফ্রিডার আত্মপ্রতিকৃতিতে
ধরা একধরনের আয়না যেখান থেকে উঠে আসছে জীবন সম্পর্কিত নতুন ধরনের পিকচরাল রেসোনেন্স। চওড়া ক্যানভাসের দু পাশের থিয়েটারের পর্দা প্রতীক হয়ে উঠছে , মেটাফর হয়ে উঠছে লাইফ এজ এ পারফর্মার অন স্টেজের। আর পিছনের প্রেক্ষাপটে আঁকা কিছু অ্যালেগরিকাল প্লে যা সম্পর্কের মিথ্যে , অস্তির অসহয়তা যন্ত্রনা সংশয় এবং পুনরাবৃত্ত চক্রের মত যাপনের কিছু দুর্মর টানাপোড়েনের সাইকোঅ্যানালাইটিক পূর্ণনির্মাণ বলা যেতে পারে। কিন্তু এখানেই ছবির সম্পূর্ণতা নয় বরং অন্য এক ডাইমেনশান পেয়েছে ছবিটি যা লাস্ট সাপারে জুডাসের বিশ্বাসঘাতকতার খ্রীষ্টিয় অনুকথনটিকে নতুন এক অ্যাবসার্ডিটির বয়ান দিয়েছে। কাকতালীয় ভাবে যীশু মারা যান তেত্রিশ বছর বয়সে আর ফ্রিডাও তখন তেত্রিশের যুবতী, টেবিলের মাঝে ফ্রিডা নিজেকে প্রতিস্থাপিত করেছেন আর সাদা পোশাকের ওই অদ্ভুত মূর্তি যার দীর্ঘ হাত ফ্রীডার কাঁধে সে কি জুডাস! এই জুডাসের অশুভ মূর্তির প্রেক্ষিতে এসে পড়ে মেক্সিকোর লৌকিক কিছু সংস্কারের প্রসঙ্গ। মেক্সিকোতে স্থানীয় রীতি অনুযায়ী ইস্টারের আগের শনিবার বাঁশ আর কাগজের মন্ড দিয়ে জুডাসের মূর্তি বানানো হয় , যার মুখে বসানো হয় কোনো না কোনো অপরাধীর মুখের আদল এবং সবশেষে স্থানীয় মানুষের সমাবেশে মূর্তির গায়ে আগুন জ্বালিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়। তবে কি ছবিতে যে সাদা মূর্তি সে ফ্রিডার নিজের ঘরেই থেকে যাওয়া কোনো জুডাস ! স্বামী দিয়াগো রিভেরা ! নিজের বোনের সাথে স্বামীর গোপণ সম্পর্কের শেষে রিভেরাই হয়ত ফ্রিডার চোখে সেই বিশ্বাসঘাতক জুডাস। কে জানে দিয়াগোরই মুখের আদলে ফ্রিডা আঁকতে চেয়েছিলেন কিনা ওই সাদা পোশাক পরিহিত মুর্তিটির মুখ ! কিন্তু স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর যন্ত্রনায় ভেঙে পড়া ফ্রিডা প্রথম যে ছবি এঁকেছিলেন –“ সেলফ পোর্ট্রেট উইথ ক্রপড হেয়ার”(Self Portrait with Cropped Hair) তার সাথে ““দ্য উণ্ডেড টেবিল” এর পার্থক্য খুব সহজেই ধরা পড়ে। জীবনের বিচ্ছিন্ন পংক্তি আর বিষন্নতার নির্যাসের বাইরে কোথাও শিল্পীর মনোজিনে উঠে এসেছে ঘৃণার হলুদ স্লাইড, অবসাদ আর দ্বিধাগ্রস্থ ফ্রিডার বাইরে এ যেন এক নতুন আলকেমি যেখানে জীবন সম্পর্কে অস্তি সম্পর্কে শিল্পী নিশ্চিত,মিথ্যে আশ্রয়ের জন্য তাঁর আর লড়াই নেই আপোস নেই বরং তাঁর উত্তর-অস্তিত্ব ভালোবাসার উপর থেকে পর্দাগুলো সরাতে শিখে গেছে। কিন্তু ফ্রিডার এ ছবি থেকে পর্দা সরানো হয়নি ‘আন্তর্জাতিক স্যুররিয়াল এগজিবশনে’-১৯৪৬ অবধি মেক্সিকোতে ফ্রিডার নিজের বাড়িতেই ছবিটি ছিল ,পরে বেসরকারী মত অনুযায়ী মেক্সিকোতেই কোনো রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের হাতে ছবিটি তুলে দেন ফ্রিডা অথচ সরকারী মতে ১৯৫৫ থেকে ছবিটি নিঁখোজ,; কেবল ফ্রিডা কাহলোর “ দ্য উন্ডেড টেবিল”ই না মানেটের ওয়াটার লিলি”,মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর “লিডা এন্ড দ্য সোয়ান”, জোয়ান ভার্মারের “দ্য কনসার্ট' থেকে শুরু করে হাজার হাজার দূর্মূল্য ক্যানভাস হারিয়ে গেছে হাতফেরতা লুপ্ততার সারগর্ভে। এসে জমা হয়েছে সময়ের কালো গর্তে। আর ওদেরই পেছন পেছন জমা হয়েছি আমিও। রাস্তা সব ঠিক আছে কিনা দেখতে ।জনারের খেতে স্মৃতিদৃশ্য সব শুকিয়েছে কিনা দেখতে।
কিন্তু কোথায় যায় শিল্পী! দপ করে জ্বলে ওঠা এত সব ছবির আলো ব্যাখাতীত শূন্যতা রেখে কোথায় হারায়? রামকিংকরের গোলকের প্রসঙ্গ টেনে এর যে কি সহজ উত্তর দিয়েছেন মনীন্দ্র গুপ্ত-গোলোক ছিল রামকিংকরের ফুটফরমাস খাটার আঠারো উনিশ বছরের একটি ছেলে, আর তাকে নিয়েই ৫ ফুট বাই ৪ ফুট দুখানা ছবি এঁকেছিলেন রামকিংকর যা কলকাতার প্রদর্শনীতে প্রদর্শিতও হয়েছিল। তারপর একদিন গোলক মারা গেল। ছবিও গেল হারিয়ে। আর এই লুপ্ততার মত আবহে দাঁড়িয়েই আর এক শিল্পী মনীন্দ্র গুপ্ত বললেন- “ কী হল গোলোকের ছবির? কী আবার হবে ! মৃত শিল্পীদের এইরকম কত ছবি ফর্দফাঁই হয়ে পৃথিবীর কালাধারে জল-মাটি-পোড়া ছাই হয়ে পড়ে আছে শিল্পীর পুনর্জন্মের সংগে রিসাইক্লিং-এর আশায়।“- হ্যাঁ ওই রিসাইক্লিং-এর আশাতেই হয়ত আমারও এ কৃষ্ণগহ্বরে নামা, যেখানে একগাদা জলরঙের স্কেচ, ছিঁড়ে মুড়ে যাওয়া তুলির মেখলা কিংবা পুড়ে যাওয়া তেল রঙের খিদে, ওদের আমি জড়ো করব ভাবনাটা ঘুরছে মাথায়, এদের মাঝেই জীবনের সাক্ষ্য বিধৃত আছে, দানা বেঁধে উঠছে হয়ত কোনো এক কাহিনীচিত্রের। বাবাকে পুড়িয়ে আসার সময় শিখেছিলাম কোনো কিছুকে ছেড়ে আসতে হলে তাকে পুরোপুরি জল দিয়ে ধুয়ে আসতে হয়। ঠিকভাবে সরা ভাঙতেও তো জানতাম না তখন।কেবল শেখান হয়েছিল যে ফিরছে যে হারিয়ে যাচ্ছে তার দিকে নাকি ফিরতে নেই। অথচ দেখ স্মরণপ্রবাহ! তার ছায়াটি মুছে ফেলারও কেউ নেই। বাবা যখন ছাই হয়ে গেল আর হাতের ছাই ধুতে গিয়ে কাদা ধুতে গিয়ে মানুষ ধুয়ে এলাম , জলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম স্বচ্ছ জলে কিউমুলোনিম্বাস মেঘের মুখদেখাদেখি চলছে। মানুষও কেমন যেন মেঘের মত, আসছে জড়ো হচ্ছে আর হারিয়ে যাচ্ছে! অথচ ধুয়ে আসার পরই বুঝলাম লুপ্ততার কোনো ফন্ট হয়না, হয়না কোনো অ্যালাইনমেন্ট কিংবা পেজ লেয়ার , কেবল প্যারাগ্রাফ দিয়ে দিয়ে ক্যারেকটার স্পেসিং দিয়ে দিয়ে কোথাও মন রাখা তো কোথাও মনখারাপ কোথাও ভর রাখা তো কোথাও ভাসমানতা! এই যে এখন উবু হয়ে বসে আছি স্যাগিটারিয়াস ‘এ’ তে আর মর্ত্যে বসে আছে আমার বাড়ি, বাড়ির গায়ে বাড়ি, ছায়ার গায়ে ছায়া, হাসনুহানা সেজেছে, কৃষ্ণচূড়া ফুটেছে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে বক পাখি কিংবা একটা নওরং লাল গোঁফওলা বুলবুলের সাথে গল্প করছে শিল্পীর নাভি হারানো নিয়ে। কেবল সৃষ্টি চলেছে সাদা থেকে নীলে নীল থেকে লালে লাল থেকে কমলা হলুদে। আর ওই কালো, আলো যাকে নিলনা যা হারালো জীবনের সংযোজন ও গুননে ওই তো চূড়ান্ত কম্পোজিশন ...
কাছে এসে দেখুন না, গতজীবন আর গতিজীবনের সব রংটাই ওই কালো ফুলে এসে বসেছে...

******************