কুয়াশা নগর

অর্ঘ্য বন্দোপাধ্যায়


যদি চলে যেতে চাই তো এভাবে হারাবো যে আমাকে খুঁজলেই নতুন করে পাবে তুমি। পুরনোকে আর পাবে না। চোখের জল সোয়েটারের গায়ে বিন্দু বিন্দু করে ফেলে রেখে বলব ‘দেখনা এত কুয়াশা, হারিয়ে গেছিলাম।‘ তুমি অবাক হয়ে ফিরে চাইবে। পুরনো আমাকে খুঁজতে এসে হতভম্ব। নতুন আমাকে নিয়ে ফিরে যাবে। আর আমি আবার আবার...আবার হারাবো।

কত অভিমান থাকলে কেউ এমন কুয়াশা আর মেঘের দেশে এসে পৌঁছয়? খাদ আর ধুপিবন দেখতে দেখতে তাই ভাবছিলাম। এটাও যেন ঠিক হয়ে আছে ঝর্না পড়লে তার উচ্ছ্বাস যেন ক্যামেরার ফোকাস অব্দিই সীমাবদ্ধ থাকবে...তারপর আবার অভিমানী কুয়াশা এসে ঢেকে দেবে তার শব্দ আর আমাকে। খাদ থেকে চোখ সরিয়ে তোমাকে দেখছি। লাল স্কার্ফে মাথা ঢেকে আর টুকটুকে ঠোঁট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ।
- কিছু বলবে?
- না ভাবছিলাম...
- কি?
- না এত কুয়াশা এখানে। মেঘ। রোদ কই? আসবে না?...আসে না? খুব ঠাণ্ডা লাগছে। জ্বর না এসে যায়!
মনখারাপ। চোখ কেমন ভাসিয়ে দিলে। এলাচ ক্ষেতের মতো লাগছে তোমাকে। ভাবছি কি উত্তর করি। হারিয়ে যাবার জন্যে তো। নিজেকে নতুন ফিরে পাওয়ার জন্যই তো আসা। রোদ থেকে মাইল মাইল পথ পেরিয়ে। অবাক হলাম। কিন্তু মন এত অকারন যে তাকে যুক্তি দেওয়া চলে না। একটা পাখি গেল। একটা কুকুর পাশ কাটিয়ে। আর একটা লোক বোঝাই বাস এসে পড়ল চওকে। মুহূর্তে আর পালাতে পারলাম না। জনকোলাহল। বলি।
- চলো ফেরা যাক।


সকালে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ে নেপালি ফুটবল। আর হাস্যময় বাকি মুখ। বাকি চোখ। বাকি সুন্দর। ওয়েট করছি। ঘুরছি কিন্তু ওয়েট করছি কখন আসবে মেঘ আর কুয়াশা। তার ভেতর ঢুকে দেখব আমাকে খুঁজে পাই কিনা। দেখব আমি দ্রব কিনা। অথবা দেখব কাঁদলে আমাকে কেমন দেখায়।
- এই শ্যামল! ডাকছি শুনছ না যে?
কানের কাছে এসে পড়ে বিরক্তিকর আদিখ্যেতাটা।
- বল।
- ম্যানেজার বলছিল শনিবার এখানে একটা হাট হয়। অনেক ট্রাইবাল জিনিসপত্র পাওয়া যায়। আমরা যাচ্ছি। আমি গাড়ি বলে দিয়েছি।
- কিন্তু আমরা তো এখানে হাটে যাব বলে আসিনি! নিজেরা কথা বলতে এসেছি। এক থাকব বলে। চেঁচামিচির ভেতর গিয়ে কি লাভ?
- ওকে। তুমি যেও না! আমিই যাচ্ছি। গাড়ি বলা হয়ে গেছে। এতগুলো টাকা নষ্ট। তোমার তো গায়ে লাগে না! টাকাটা আমাকেই দিতে হবে। চালাও যদ্দিন পারো!
- আমরা এখানে কথা বলতে এসেছি ঋতু! আর আমার হাত এখন ফাঁকা এখন এসব হুজ্জুত না করলেই নয়?
- আমি তো চাকরি করি! চলো টাকা তো আমি দিচ্ছি!
- এটা শুধু টাকার কথা নয় ঋতু!
- যদি জানতাম এই পাণ্ডব বর্জিত জায়গায় আসতে হবে! তবু যদি কারেন্টটাও ঠিকঠাক থাকত!...
আহহ্ আহহ্...আহহ্!


আহত হতে হতে আমি দেখছি কুয়াশাকে! কামনা করছি যেন সে আমাকে ডুবিয়ে দেয়। আর তার ভেতরে আমি আশ্রয় নিতে পারি। রেখে আসতে পারি আমার যন্ত্রণা। যেতে পারি স্থানীয় হাটে ঋতুর হাতে হাত রেখে। আনন্দ বয়ে। ওপরের দিকে যদি যাই? পাব? চায়ের দোকান থেকে দাম দিয়ে উঠে পড়ি। লম্বা লম্বা পা ফেলে চড়াই ভাঙ্গতে থাকি! ঋতু যে বোঝে না তাতো এমনি না, সে বুঝতে পারে না। কি করবে...ওর বড় হওয়া, ওর প্রতিবেশ...ওর কোলাহল...ওর আলো...ওর না অন্ধকারকে ভালোবাসতে না পারা...ওর বহির্জগত...ওর মানুষজন...ওর আকাশ...ওর পাতাল...ওর কল্পনাহীনতা...ওর ধ্যাসটামো...ওর নোংরামো...ওর নীচতা...ওর সারাদিন বাড়ি মাথায় করে রাখা...টাকা টাকা টাকা...ওর মরে যাওয়া চোখ...ওর মরে যাওয়া বোধ...ওর মরে যাওয়া বিশ্বাস...ওর মরে যাওয়া ভরসা...ওর মরে যাওয়া শরীর...এটাই তো ও। আমার জন্যে কেন বদলাবে? কেনই বা? বদলাবে না...বদলাবে কি করে? চাইলেও পারবে না! বদলাতে না জানলে বদলানো যায় নাকি? আর ও কোনোদিন জানবে না। কারণ জানতে চায় না। আর তাই কথা বলে...মানে কথা বলে সম্পর্ক বাঁচাতে...যা করতে এসেছি আমরা এখানে...সেসব অর্থহীন... কিছু হয় না...কিচ্ছু হয় না কথা বলে। এসব নিয়ে তো ভাবার মানে হয় না। আমিই বা কেন...আমার অল্প একটু কুয়াশা হলে মেঘ হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। একটুখানি। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই ওপরে এলাম। দেখা নেই। আরও খানিক। আসবে। দাঁড়িয়ে খাদের পাশে। অনেক নীচে দূ - উ - উ - রে জনপদ। সবুজ লেখায় জোকায় ভরে আছে উপত্যকা। ঘন সবুজ জঙ্গলে প্রতি গাছে, প্রতি পাতায় কুয়াশার নিশ্বাস। মেঘের আলুলায়িত খোঁপার গন্ধ...দেখছি আর অপেক্ষা। কখন আমাকেও... আমার গায়েও। আমিও হারাতে চাই! নিজেকে আবার পেতে চাই গো কুয়াশা নগর! তুমি কি জানো না? আমাদের ছোট্ট বাণ্টিটা বাবা অথবা মা, কাউকে ছেড়েই থাকতে পারে না?