কবর-চাপা অক্ষরমালা

সত্রাজিৎ গোস্বামী



কত কিছুই তো হারিয়ে যায়! কানের মাকড়ি, তিলফুল নাকছাবি, অনামিকার আংটি...;ঠিকানা লেখা চিরকুট, ট্রেনের ঠিকিটের উল্টোপিঠে টুকে রাখা ফোন নম্বর, বুক পকেটের বলপেন...; ছেলেবেলার রঙিন দিন, ইস্কুলের বন্ধু, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে পঁচিশ টাকায় কেনা দুষ্প্রাপ্য বইখানা...

বইয়ের কথায় মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার ছবিওয়ালা চ্যাঙাব্যাঙার রঙিন বইটাও আর একবার পড়াই ইচ্ছে হলেও খুঁজে পাই না আর। তবু এসব নিয়ে আক্ষেপ করে লাভ নেই। এ তো অবধারিত অনিবার্য জাগতিক নিয়ম! কিন্তু আক্ষেপ জাগে তখন, যখন বুঝি কিছু কিছু হারিয়ে যাবার পুছনে আছে সুপরিকল্পিত হিসেবনিকেশ, স্বার্থ, চক্রান্ত। আর সেই চক্রান্ত যদি বইয়ের সঙ্গে হয়, তাহলে মনে হয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ইমারতের ভিতের ফাঁকে ফোকরেও বহুদিন থেকেই জমে উঠেছে বাস্তুসাপের আড্ডা; অসাবধানে চলতে গিয়ে লেজে পা পড়লেই ধমনীতে নাচতে থাকে নীল তরঙ্গ। সেই ছোবলের কবলে পড়েই কত বই লেখাই হলো না আর, কত রচনার ছেঁড়া-খোঁড়া টুকরো কয়েকটা মাত্র পাতা এসে পৌঁছলো আমাদের হাতে, কত লেখা বই হয়ে বেরলোই না কোনোদিন!

বহুদিন আগে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা চিঠিপত্রের সংকলন প্রকাশ করেছিলেন প্রিয়নাথ শাস্ত্রী মশাই। নাম ছিল ‘পত্রাবলী’। সেখানে শাস্ত্রী মশাই মোট ১৪৬খানা চিঠি সংকলিত করেছিলেন। তার মধ্যে ছিল রাজনারায়ণ বসুকে লেখা, বেচারাম চট্টোপাধ্যায়কে লেখা, কেশবচন্দ্র সেন, নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন, রবীন্দ্রনাথ, সৌদামিনী দেবী ও আরও কয়েকজনকে লেখা দেবেন্দ্রনাথের চিঠি। দেবেন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিও ছিল কয়েকটা। বইয়ের ভূমিকা তথা ‘বিজ্ঞাপন’-এ শাস্ত্রীমশাই জানিয়েছিলেন-
“ইহাকে তাঁহার স্বরচিত জীবনচরিতেরই আর এক পৃষ্ঠা বলা যাইতে পারে।” এমন একটা বই আর ছাপা হল না। বিশ্বভারতী প্রকাশনাও কেন যে গা করলেন না, জানিনা!

বইটা নিয়ে একটা অন্য কথাও তোলা যেতে পারে। মহর্ষির পরমার্থ সাধনার ঐকান্তিকতাকে ব্রাহ্মসমাজের সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতেই প্রিয়নাথ শাস্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ সংকলনটি প্রকাশ করেছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর মাথায় ব্রাহ্মধর্মসাধক মহর্ষি যতখানি ছিলেন, মানুষ দেবেন্দ্রনাথ তো ততখানি ছিলেন না। তাই তিনি ছাপা আকারে মহর্ষির যতগুলো চিঠি রক্ষা করেছেন, তার চেয়ে চিঠি নষ্ট করেছেন ঢের বেশি।

কথাটা খোলসা করে বলি। দেবেন্দ্রনাথের একখানি প্রামাণ্য জীবনী লিখতে গিয়ে অজিতকুমার চক্রবর্তী দেবেন্দ্রনাথের চিঠিগুলোর খোঁজ করছিলেন। কিন্তু তিনি জানতে পারেন, প্রিয়নাথ শাস্ত্রী বিভিন্নজনের কাছ থেকে সংকলনে প্রকাশের জন্যে প্রায় ৬০০চিঠি সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সংকলনের ১৪৬টি চিঠির মধ্যে দেবেন্দ্রনাথের লেখা চিঠির সংখ্যা মাত্র ১৩২। বাকিগুলো গেল কোথায়? কাজে না লাগলে চিঠিগুলো যাঁদের হেফাজতে ছিল, তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। শাস্ত্রী মশাই কিন্তু তা-ও করেন নি। মোদ্দা কথা দাঁড়িয়েছে এই যে, মহর্ষির জীবনপাঠের অমূল্য উপাদান প্রায় ৪৫০খানি চিঠি চিরকালের জন্যে হারিয়ে গেল!

মহর্ষির এক পুত্রের লেখার পাতার কাটাকুটিটাও আজ অমূল্য। ১৯৩৭ সালে মুদ্রিত (১৩৪৪, শ্রাবণ) সঞ্চয়িতার একটা রবীন্দ্র-স্বাক্ষরিত ছেঁড়াখোঁড়া কপি ফুটপাথ থেকে ৪৫ টাকায় কিনেছিলেন লেক গার্ডেন্সের অরিন্দম ঘোষাল। সেই বইয়ের নাকি দর উঠেছে ৩ লক্ষ! ভাবা যায়! (দ্রঃ সংবাদ প্রতিদিন, ২৬ অক্টোবর, ২০১৪) তো সেই রবি ঠাকুরের ছিন্নপত্রাবলী বইটাকে তো পারলে রবীন্দ্রভক্তের দল শয়নেস্বপনে মাথায় করে রাখে। কিন্তু এই চিঠিগুলোর কপালেও কি দুর্ভাগ্য কম? এ যাবৎ চিঠিগুলো তো ‘ছিন্ন’ হয়েই রইল, গোটাগুটি চিঠিগুলো আর পাঠকের হাতে এল কই!

১৯১১ নাগাদ বই প্রকাশ করে অর্থসংগ্রহের একটা তাগিদ দেখা গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। সেই সময়েই শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা ৮টি এবং ইন্দিরা দেবীকে লেখা ১৪৫টি চিঠির অংশ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘ছিন্নপত্র’ বইটি (জুলাই ১৯১২)। এর বহু আগেই ১৯৮৫-এ রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীর কাছে চিঠিগুলো একবার চেয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিল চিঠিগুলো কপি করে রাখার। কিন্তু ইন্দির দেবী তাঁর এই প্রিয় কাকাটিকে ভরসা করে চিঠিগুলো হস্তান্তর করতে পারেন নি। দুটো খাতায় নিজের হাতে চিঠিগুলোর স্বনির্বাচিত অংশ টুকে দিয়েছিলেন রবিকাকার হাতে।

ছিন্নপত্র ছিল একেবারেই খণ্ডিত। ১৩৬৭-তে বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ মনস্থ করে ইন্দিরা দেবীকে লেখা সমস্ত চিঠিগুলোই প্রকাশ করবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫২টি চিঠি নিয়ে ‘ছিন্নপত্রাবলী’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০-এ। এবারেও চিঠিগুলো কিন্তু ‘ছিন্ন’-ই রইল। কেননা এই পূর্ণাঙ্গ সংস্করণটির ভিত্তি ছিল ইন্দিরা দেবীর নকল করা সেই দুটি খাতা। আশ্চর্য হয়ে ভাবি, বিশ্বভারতী যখন ‘ছিন্নপত্রাবলী’ প্রকাশ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন, তখনও তো ইন্দিরা দেবী বেঁচে (মৃত্যুর তারিখ ১২ অগস্ট, ১৯৬০)। তাহলে তখনও কেন মূল চিঠিগুলো তিনি বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিলেন না! সেই অমূল্য চিঠিগুলো থেকে কেন বঞ্চিত হল বিশ্বভারতী এবং অগণিত রবীন্দ্রপাঠক? রবীন্দ্রনাথের আদরের ‘বব্‌’ বা ‘বিবি’ কেন পুরোপুরি অদৃশ্য করে দিলেন মূল চিঠিগুলো চিরকালের জন্যে!

তবু তো ‘ছিন্ন’ হলেও সেগুলোর খানিকটা আমরা পেয়েছি ‘ছিন্নপত্রাবলী’র দুই মলাটের মধ্যে। কিন্তু শিলাইদহ-সাজাদপুর অঞ্চলের ঠাকুর জমিদারির বহু বিবরণ লেখা কাঙাল হরিনাথের সেই সুদীর্ঘ ডায়েরিটা তো এ পর্যন্ত ছিন্ন আকারেও প্রকাশ করল না কেউ গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় ঠাকুর জমিদারি নিয়ে অনেক অপ্রিয় তথ্য তুলে ধরতেন সাংবাদিক-সম্পাদক হরিনাথ মজুমদার। একটি আত্মজীবনীমূলক সুদীর্ঘ ডায়েরিও লিখেছিলেন তিনি। মহর্ষির আমল থেকে হেমেন্দ্রনাথ-জ্যোতির ন্দ্রনাথ পর্যন্ত জমিদারি শোষণ-পীড়নের নানা বিবরণ সেই ডায়েরিতেও অকপটে লিখে রেখেছিলেন হরিনাথ। কিন্তু সেই ডায়েরি পাণ্ডুলিপি আকারেই ঘুম পাড়িয়ে রাখা হল চিরকাল। শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথই নাকি তাঁর জীবৎকালে সেই ডায়েরি প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেছিলেন হরিনাথকে।

হরিনাথ-গবেষকেরা অনেকেই নাকি কুষ্টিয়ায় গিয়ে হরিনাথের উত্তরপুরুষদের কাছে সেই কয়েক খণ্ড ডায়েরি দেখেছেন। ‘চতুষ্কোণ’ পত্রিকায় সেই ডায়েরির দুটি মাত্র অংশ একবার প্রকাশিতও হয়েছিল। সে ডায়েরি থেকে সরাসরি নোট নিয়ে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সাহিত্য-সাধক-চরিতমাল ’-র হরিনাথ মজুমদার জীবনীতে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সেই যৎসামান্য খণ্ডাংশ ছাড়া এপার-ওপার দুই বাংলার কৌতূহলী পাঠকই এ পর্যন্ত সেই ডায়েরিকে মুদ্রিত আকারে পেল না। ঠাকুরবাড়ির ধ্যানকল্প শরীরে যাতে কোনো কালো ছিটে না লাগে, তাই কি মুখে নুন ঠুসে জীয়ন্ত মারা হয়েছে সেই ডায়েরিকে?