পদ্মায় ভেসে গেছে বারোভূঁইয়াদের রায়পুর

সুজন দেবনাথ


রাস্তার পাশে বড়ই তলা।
বড়ই তলায় দুটি সারিতে সাতটা অতি ছোট গর্ত। গর্তের দুপাশে দুটি বালক-বালিকা। তাঁদের হাতভর্তি তেঁতুল বীচি। ওগুলো গর্তে ফেলে ফেলে এক জটিল হিসাবের খেলা খেলছে দুজনে। হঠাৎ এক অচেনা লোক ডেকে ওঠল,
‘এই খোকা, তোমার এই গ্রামের নাম কি?’
খেলায় বাঁধা পেয়ে বিরক্ত হল ছেলেটি। বলল – রায়পুর।
- আমি আসলে পুটিজুরি গ্রামটা খুঁজছি।
পেছন থেকে অন্য এক লোক বলে উঠল, ‘এইডাই পুটিজুরি, বুড়ারা এহনো রায়পুরই কয়।’

ছেলেটি ভীষণ অবাক। তাঁর গ্রামের নাম রায়পুর নয়? হাতে এখনো তেঁতুল বীচি, কিন্তু তাঁর মন চলে গেছে দাদুর কাছে। দাদুর মুখে শুনে এসেছে, গ্রামের নাম রায়পুর। বারোভূঁইয়াদের রায়পুর। বারোভূঁইয়া চাঁদ রায় আর তাঁর ছেলে কেদার রায়ের রায়পুর।

সেদিন তেঁতুল বীচি হাতে অবাক হওয়া ওই বালকটিই ছিলাম আমি। রায়পুর গ্রামের যুগী বাড়ির বড়ই তলায় বেড়ে ওঠা আমি।

আজ আর রায়পুর নেই। সেই গ্রামের নাম এখন পুটিজুরি। আমি স্থায়ী ঠিকানা লিখতে আর রায়পুর লিখি না। কিন্তু রায়পুর ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে ছিল। বারো ভূঁইয়াদের চাঁদ রায়, কেদার রায় যখন এই অঞ্চল শাসন করতেন, তখন থেকেই ছিল। আমার রাবার-ঢিলা হাফ-প্যান্ট ছুঁয়ে ছিল। আমার দাদুর মুখে ছিল। তাঁর অন্তরজুড়ে ছিল।

চাঁদ রায় আর তাঁর ছেলে কেদার রায় শাসন করতেন পদ্মার দুইপারের বিস্তীর্ণ জনপদ। শ্রীপুর ছিল তাঁদের রাজধানী। বিক্রমপুর, ইদ্রাকপুর জুড়ে ছিল তাঁদের রাজত্ব। এই ইদ্রাকপুরই এখন বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলা। কিছুকাল আগেও এটি বৃহত্তর ফরিদপুরের অধীনে ছিল। এই শরীয়তপুরেরই একটি গ্রাম রায়পুর। বাংলার বারোভূঁইয়াদের একজন কেদার রায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রামটি। তাঁদের রায়বংশ অনুসারেই নাম হয়েছিল রায়পুর।

ষোল শতকের শেষ দিকে সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বাংলায় মুঘল শাসন বিস্তারে এসেছিলেন। তাঁর প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পাশাপাশি দুটি রাজ্যের রাজা। একজন মুসলিম, অন্যজন হিন্দু। একজনের নাম ঈশা খাঁ, অন্য জন কেদার রায়। এই ঈশা খাঁর সাথে মানসিংহের এক যুদ্ধে মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে গিয়েছিল। সেই কাহিনী নিয়ে অনেক কিংবদন্তী আছে। যাই হোক, মানসিংহের দ্বিতীয়বার বাংলা অভিযানে প্রথমে মারা যান ঈশা খাঁ। তাঁর কিছুদিন পরেই মাথায় গোলার আঘাতে মুঘলদের হাতে নিহত হন স্বাধীনতাকামী বীর কেদার রায়। তাঁর রাজ্য লুণ্ঠন করল মুঘল সৈন্যরা। মাটিতে মিশে গেল তাঁর রাজধানী শ্রীপুর। আর মানসিংহ নিজে নিয়ে গেলেন চাঁদ রায়, কেদার রায়ের অধিষ্ঠিত দেবী শিলাময়ীর মূর্তি। রায়দেরকে, বারোভূঁইয়াদেরকে ভুলিয়ে দেবার ব্যবস্থা মুঘলরাই করেছিলেন। আর পরবর্তী নবাবদের, ব্রিটিশদের কি কোন দায় ছিল তাঁদেরকে ইতিহাসে রাখার? তাঁরা রাখেননি। আর সেই ধারা বজায় রেখে স্বাধীন বাংলাদেশেও বারোভূঁইয়ারা উপেক্ষিত। বিশেষত চাঁদ রায়, কেদার রায়দের আমরা একেবারেই ভুলে গেছি।

এই ভুলে যাওয়া, এই উপেক্ষার প্রবাহকে পদ্মানদী টেনে এনেছে তাঁর অপর পাড়েও। কেদার রায়ের রাজধানী শ্রীপুর পদ্মার যে তীরে ছিল, তার উল্টো পাড়ে একটা গ্রামে আমার জন্ম। গ্রামটির নাম ছিল রায়পুর। ইতিহাসের উপেক্ষায় সেই নামও পাল্টে ফেলা হেয়েছে। আজ আর চাঁদ রায়, কেদার রায়দের কোন চিহ্নমাত্র নেই সেখানে। শুধু পাশের গ্রামে তাঁদের খনন করা দুটি বিশাল দীঘি রয়ে গেছে। এখনো দিগম্বরী দেবীর পূজা হয় সেখানে। তাই এই দিঘীগুলোর বর্তমান নাম দিগম্বরীর দীঘি। শুধু এই দীঘি দুটিই পদ্মার এপারে বারোভূঁইয়া কেদার রায়কে মনে রেখেছে। স্থানীয় মানুষ আজ জানেও না কে খনন করেছিলেন এই দীঘি। সবাই ভুলে গেছে। ভুলে গেছে বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতাকামী এক রাজাকে। ভুলে গেছে তাঁর রায়পুরকে।

সুনীল গাঙ্গুলী আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘বাংলার বারোভুঁইয়ারা ইতিহাসে বঞ্চিত। বড় বড় ইতিহাস গ্রন্থগুলিতে শুধু মুঘল-পাঠানদের দ্বন্দ্বই স্থান পেয়েছে, বাংলার এইসব বীর যোদ্ধাদের কাহিনী উপেক্ষিত।’ আসলে সুনীল গাঙ্গুলীও জন্মেছিলেন এই অঞ্চলে। যে গ্রামে তিনি জন্মেছিলেন, সেটি রায়পুর থেকে মাত্র পনের-বিশ মাইল দূরে। তাই তাঁর অন্তরেও বেজেছে এই ভুলে যাওয়ার অন্যায়বোধ।

আমার শৈশবে দাদু আমাকে শিখিয়েছিলেন – গ্রামের নাম রায়পুর। আমার ছেলেকে কে শেখাবে রায়পুরের কথা? আমার ছেলেরও এখন পাসপোর্ট আছে। তাতে কোথাও রায়পুরের কথা নেই। আমার শৈশবে গ্রামের নাম বলতাম রায়পুর। অথচ আমার ছেলের জীবনে রায়পুরের কোন চিহ্ন নেই। রায়পুর শব্দটাই সে শোনে নি। সময় যখন আর এক প্রজন্ম হাঁটা শেষ করবে, কেউ আর বলবে না রায়পুরের কথা।

কিন্তু কেন রায়পুরের নাম বদলে যায়? কেন বাংলাদেশের থেকে কেদার রায়রা হারিয়ে যায়? এই জাতীয় বীরদেরকে অতীতের ইতিহাসবিদরা গুরুত্ব দেয় নি। আর আমরা তাঁদের সকল চিহ্ন মুছে ফেলছি। রায়পুর হয়ে যাচ্ছে পুটিজুরি। ঐতিহ্য ছুঁয়ে থাকা বিক্রমপুর হয়ে গেছে মুন্সিগঞ্জ। এই বদলের সাথে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, মিশে আছে সাম্প্রদায়িকতা। দলাদলির বাতাসে ভর করে সুযোগমত কেউ কেউ মুছে দিচ্ছে এসব। দিয়ে ফেলছে অন্য নাম। আর অন্যরা রুখে না দাঁড়ানোয় সেই মুছে দেওয়াই স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। সাত চল্লিশের পর থেকেই এই ধারা বহমান। তখন বাংলাকে মুছে পাকিস্তানি আদলে নতুন ইতিহাস লেখা শুরু হয়। তাতে বদলে যেতে থাকে রাস্তার নাম, জনপদের নাম। অভিষিক্ত হতে থাকে নতুন নতুন সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতি ছিল ভুলিয়ে দেবার সংস্কৃতি। আরো বেশি করে পাকিস্তানি বানানোর সংস্কৃতি। সেই উদ্দেশ্যেই কাজ করেছেন ইতিহাসবিদরা। মুখের কথায় বদলে গেছে ইতিহাস, নামজারি হয়েছে নতুন নতুন জনপদের। বুদ্ধিজীবীরা কেউ আনন্দ পেয়েছেন, কেউ ভয়ে চুপ থেকেছেন। যারা প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন, তাঁরা হয়েছেন নির্যাতিত।

কথা ছিল - স্বাধীন বাংলাদেশে এই বদলের প্রবাহ হবে সুন্দরের দিকে। এই মাটির শিকড়ের দিকে। বাংলার ইতিহাসকে মুছে ফেলার প্রচেষ্টার বিপরীত দিকে হাঁটবে স্বাধীন বাংলাদেশ। এই মাটির সকল বীর উঠে আসবে ইতিহাসের পাতায়। তাতে সাম্প্রদায়িক চোখ থাকবে না। রাজনীতি থাকবে না। সত্য ফুটে উঠবে ইতিহাস চর্চায়। কিন্তু তা হয়নি। বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে কেবল ঈশা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কেদার রায়দের দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি। পদ্মায় ভেসে গেছে রায়পুরের ইতিহাস। যশোরের ভূঁইয়া প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ঈশ্বরীপুর আজ আক্ষরিক অর্থেই জঙ্গল। ক’টা ভাঙ্গা পোড়োবাড়ী দাঁড়িয়ে আছে ঘন জঙ্গলের ভেতর। কেউ তাঁকে ইতিহাসে তুলে আনেননি। তাঁদের কথা জানাননি নতুন প্রজন্মকে।

অথচ ইতিহাস বলে যে, ধর্মীয় বিভেদ বাংলাকে কখনোই ভালো কিছু দেয়নি। কেদার রায় আর ঈশা খাঁ দুজনে ছিলেন ভাল বন্ধু। একসাথে যুদ্ধ করেছেন আরাকান রাজের বিরুদ্ধে। জয়ীও হয়েছেন। অল্পকাল ছিল বন্ধুত্ব। সেই অল্পকালেই এই মিলিত শক্তিকে ভয় পেত আরাকানের মগ বাহিনী। মানসিংহও অনেক ছক কষেছিলেন এই মিলিত বাহিনীর জন্য। কিন্তু সেখানেও ধর্মীয় বিভেদ বিচ্ছেদ ঘটায় এই দুই বীরের। কেদার রায়ের বিধবা বোন ছিলেন স্বর্ণময়ী। ঘটনাক্রমে স্বর্ণময়ী দেখে মোহিত হয়ে পড়েন ঈশা খাঁ। প্রেমের টান এখানেও কাজ করল ভয়াবহভাবে। বীর ঈশা খাঁও কূটনীতি ভুলে গেলেন। বিয়ে করতে চাইলেন বিধবা স্বর্ণময়ীকে। পিতা চাঁদ রায় আর ভাই কেদার রায় দুজনেই ভয়াবহ ক্ষেপে উঠলেন অমন কথা শুনে। কেদার রায় আর ঈশা খাঁর বন্ধুত্ব সেখানেই শেষ। ঈশা খাঁ কিন্তু প্রস্তাব দিয়েই বসে থাকলেন না। একদিন যাত্রা পথে আক্রমন করে স্বর্ণময়ীকে তুলে নিলেন। বিয়ে করলেন তাঁকে। শোনা যায় স্বর্ণময়ীরও সম্মতি ছিল এই বিবাহে। তাঁর নাম হল সোনাইবিবি। সেই স্বর্ণময়ী বা সোনাইবিবির নামেই ঈশা খাঁর রাজধানীর নাম সোনারগাঁ। যাই হোক, স্বর্ণময়ীকে নিয়ে দ্বন্দ্বে দুই বীর কেদার রায় আর ঈশা খাঁ একে অন্যের শত্রু হলেন। দুজন দুজনের রাজ্য আক্রমন করলেন। আরাকান রাজের সাথে যুদ্ধে কেউ কাউকে সাহায্য করলেন না। আর মানসিংহের সাথে যুদ্ধে যেদিন ঈশা খাঁ মারা গেলেন, কেদার রায় দূর থেকে শুনে হাসলেন। আবার কিছুদিন পরেই সেই মানসিংহের সাথে যুদ্ধেই কেদার রায়ও নিহত হলেন। দুই বীরের পরিণতি হল একই। বাংলায় মুঘলদের শাসন পথ সুগম হল। তাই এই ধর্মীয় বিভেদ বাংলাকে কখনোই ভালো কিছু দেয়নি। আজও নাম বদলে দিয়ে সেই বিভেদকেই বহন করে চলেছে কিছু মানুষ। একই ভুল চক্রাকারে চলছে। একদিন তাঁদের নতুন প্রজন্ম পেছনে তাকিয়ে দেখবে – গৌরব করার মত তাঁদের নিজেদের কিছু নেই। পদ্মায় ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে তাঁদের নিজস্ব গৌরব।

কেদার রায়ের খনন করা দিগম্বরীর দিঘির একটু দূরেই এখনও কিছু পোড়া ইট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাড়ি। সেখানে এখন অন্য লোকের বসতি। স্থানীয় লোকেরা বাড়িটাকে বলে ‘ভিয়া বাড়ি’। আসলে ‘ভুঁইয়া বাড়ি’ মানুষের মুখে মুখে অপভ্রংশ হতে হতে ‘ভিয়া বাড়ি’ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই বাড়ির লোকেরাও আজ জানে না কে বা কারা ছিল এই ভিয়া বা ভূঁইয়া। নিজের বাড়িতেই আজ বিস্মৃত কেদার রায়।

আজ রায়পুর শুধু বেঁচে আছে আমার শৈশব ছুঁয়ে। বেঁচে আছে দাদুর স্মৃতিতে। দাদুর হাত ধরে রায়দের বানানো দিঘীর পাড়ে খেলেছি আমি। খেলেছি রায়পুরের যুগি বাড়ির বড়ই তলায়। এরকম খেলার মাঝেই একদিন দাদু আকাশে তারা হয়ে চলে গেলেন। আর সাথে গেল ‘রায়পুর’ নামটিও। তবু মাঝে মাঝে এখনো আমার কান্নার ঘ্রাণ ছুঁয়ে, আমার একলা বিকেল জড়িয়ে দেখা দেয় রায়পুর। আমার আমির মাঝে হঠাৎ হঠাৎ জ্বলে ওঠে রায়পুর গ্রামের যুগী বাড়ির আকাশ প্রদীপ। হয়তো রাজা কেদার রায়ও তখন আকাশে হাত নাড়েন আক্ষেপ ছূঁড়ে ছুঁড়ে।

‘চোখ বুজে মেঘের মনিটরে দেখি -
পাঁচ বছরের ছোট্ট আমি কাগজের প্লেনে
পায়রার সাথে পাল্লা দিচ্ছি রায়পুর গ্রামের চাতালে
পাশে দুহাতে আমার শৈশব নিয়ে খেলছে দাদু -
খেলতে খেলতে সমস্ত শৈশব চলে গেল তাঁর চোখে
কিছু বোঝার আগেই সেই চোখ বুজে গেল জন্মের মত’