ভুলে যাওয়া গানের বাণী, সুর ও

.শ্রুতি গোস্বামী


দিদাকে কোনোদিন দেখিনি আমি। দাদুকেও না। ঠাকুর্দাকেও না। শুধু ঠাকুমাই আমার ছ’ বছর বয়েস পর্যন্ত ছিলেন। বাড়িতে চারজনের ছবিই রাখা, জোড়ায় জোড়ায়। শুভ কাজের আগে প্রণাম করি। মায়ের কাছে শুনেছি, দাদু রেলের চাকরি করতেন। রেল কোয়ার্টারে থাকতো মা’রা চার ভাইবোন আর দাদু দিদা। লোকসংখ্যাটা প্রায় রোজই বেড়ে যেতো বাঙাল আতিথ্যের চোটে। দোরগোড়া থেকে লোক ডেকে এনে খাইয়ে দাইয়ে না পাঠালে আর বেঁচে সুখ কীসের! ব্যঞ্জন হয়তো পঞ্চ নয়, কিন্তু আতিথ্য বিশ আনা! সারাদিন উনুনের ধারে বসে রান্না, গুলের গন্‌গনে তাত, দিনের শেষে হয়তো নিজের জন্যে মিনিট দশেক সময়। ওই সময় গুন্‌গুন্‌ করতেন দিদা। দুটো গান, তার মধ্যে একটা ছিলো তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে। দিদার গলা কেমন ছিলো জানি না। কিন্তু গানটা শুনলেই আমার খালি মনে হয়, বেলা পড়ে আসছে, চৌকাঠের কাছে বসে কাঠের কবাটে হেলান দিয়ে চাপা গলায় ছোট্টখাট্ট মানুষটা কোন্‌ এক বিশ্ববিপদহন্তাকে বিশ্বাস করে গাইছেন। কী-ই বা বাসনা ছিলো, কতোটুকুই বা ছিলো মোহ! কিন্তু এ গানের ভৈরবী কিছুতেই আমার কাছে আর ভোরবেলার সুর হলো না। দিদা বলতে আমার কাছে ওই সুরটুকু বেঁচে আছে। হারিয়ে গেছে বাকি সব।

যেমন করে হারিয়ে গেছে রজনীকান্ত সেনের প্রায় বাকি সব গানই। চলতি বছরে তাঁর ঠিক ১৫০-এ পা। খুব চেষ্টা করে মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে মনে রাখার মতো ‘স্মরণ’ করেছেন পাঁচ আঙুলেই গুনে ফেলা যাবে এমন কয়েকজন। রজনীকান্তকে কী বলবো? ভুলে যাওয়া ব্যক্তিত্ব? যিনি তৈরি করেছিলেন কিছু ভুলে যাওয়া গীতি? হারিয়ে ফেলা সুর? ভাবলে কেমন শিউরে উঠি। একটা মানুষ, গলায় অসহ্য ব্যথা, কথা বলা বারণ, গাইতে গেলে রক্তবমি হয়, লিখে যাচ্ছে একটার পর একটা কবিতা, গান, ভাবছে দয়াল ভারি দয়া করে ব্যাধি আর বেদনা দিলেন, কিন্তু কিছুতেই স্বরলিপি করে উঠতে পারছে না, স্বরলিপি করতে গেলে তো গাইতে হবে। আর সেই গানগুলো ভবের হাটে জলের দরে বেচে দিচ্ছে কারা। লাল গানে নীল সুর একে একে জুড়ে যাচ্ছে।

রজনীকান্ত সেন বললে ক’টা গান বলতে পারবেন? তুমি নির্মল কর, পূর্ণ-জ্যোতিঃ তুমি, আমি অকৃতী অধম, কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব, খানিকটা মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়, আর পান্নালালের দৌলতে আমি সকল কাজের পাই হে সময় । মেরেকেটে পাঁচ-ছ’টা গান হবে। স্মৃতি নিংড়ে বেরোয়। বাকি এতো গান কোথায় গেলো? বাক্স-রেডিওতে একসময় দিনের পর দিন বেজেছে যেসব গান, সেসব থেকে এখন বিন্দাস বাঙালি এন্টারটেনমেন্ট ভ্যাল্যু পায়না। আগেও কি খুব পেতো? বেশ কষ্ট করেই রজনীকান্তের বড় মেয়ের প্রথম পুত্র, দিলীপকুমার রায় দীর্ঘ দীর্ঘ দিন ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন, নিজে গেয়ে, অন্যদের শিখিয়ে, কিছু গানে নিজে সুরকাঠামো দিয়েও। কিন্তু প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্ম যুক্ত হয়ে সংস্কৃতির যে স্রোত চলে, তার মধ্যে সত্যিই তো মাইলস্টোনের মতো থেকে যেতে পারেন নি রজনীকান্ত। পারেন নি কিছুটা হয়তো উপযুক্ত কন্ঠের অভাবে। না, বাংলাদেশে বিশ শতকে গাইবার লোক ছিলো না একথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। অনেকে ছিলেন। নিশীথ সাধু, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অতনু সান্যাল। কিন্তু রজনীকান্তের গান কেবল কন্ঠের না। যে ভক্তিবিনীত পূর্ণাঙ্গ সমর্পণ, যন্ত্রণার্ত নিবেদন তাঁর গীতবাণী আর সুরে রয়েছে, তাকে প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। গানগুলো এতোটাই সহজ সুরে বাঁধা যে গাওয়ার সময়ে একটিমাত্র ওস্তাদি গিটকিরি এলেই ভাবের পঞ্চত্ব। আর ওস্তাদি প্রদর্শন যে কন্ঠশিল্পীদের বেসিক ইন্সটিংক্ট, কে না জানে!
ওই চক্করেই হারিয়ে গেছে ‘আমি স্বপনে তাহারে কুড়ায়ে পেয়েছি’-র মতো অসামান্য গানের আসল গায়কী। গান তো শেষ অব্দি হারায় কথা-সুরের ভোলবদলে নয়, গায়কীতে। রজনীকান্ত সেনের দৌহিত্র, দিলীপকুমার রায়ের কাছে বসে গান শোনা, শেখা, গানের গল্পের আশ্চর্য সৌভাগ্য বর্তমান কলমচির হয়েছে। নবতিপর এই গায়ক এবং এইচ এম ভি-র এক সময়ের ট্রেনার এখনো স্মরণ করেন, স্টুডিও রুমে তাঁর ক্ষণিক অনুপস্থিতিতে এক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী কেমন রজনীকান্তের সরল সুরে শাস্ত্রীয় মোচড় দিয়ে দিয়েছিলেন। গানটার সেই রেকর্ডই আবার সবথেকে বেশি শ্রুত। ভাবুন তো, কী কেলেঙ্কারি! হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই, নামজাদা গানের দল ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’এর অরিজিনাল মূলতান সুর বদলে অবলীলায় তাকে বেহাগে বেঁধে ফেলেন, অসীম জনবলের সুবাদে তার প্রচার-ও হয় বিপুল। উলটো পারে থেকে যান অর্চনা ভৌমিক, আমার শিক্ষিকা, দিলীপকুমার রায়ের ছাত্রী, যিনি সর্বথা ব্যবহার করেন ‘শিষ্যা’ শব্দটি। আসলে গান তাঁদের কাছে আক্ষরিক অর্থে একটা যাপনপদ্ধতি। তিনি শুধু গানের সুর-তাল-লয় শেখেন নি; ওই জীবনটাকে পাঠ করেছেন, এক সাধক জীবনের মধ্যে দিয়ে আরেক সাধক জীবনকে গ্রহণ করেছেন। প্রতিবার অনুষ্ঠানের শুরুতেই বলেন, রজনীকান্তের গানের পরে যেন করতালি না বাজে। রজনীকান্তের গান অভিনন্দিত, বা যাকে বলে ‘সেলিব্রেটেড’, হতে পারে না; তাকে ধারণ করতে হয়, ধারণ করাটাও শিখতে হয়। ক্রমশ হারিয়ে গেছে আসলে এই শিক্ষাটা।

আর সেজন্যেই আস্তে আস্তে বাঙালি চেতনা থেকে হারিয়ে গেছে ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়, সেথা আমি কি গাহিব গান, মাগো আমার সকলি ভ্রান্তি, তারা মোরে রেখেছিল ভুলাইয়ে, তুমি আমার অন্তস্তলের খবর জান, কেউ নয়ন মুদে দেখে আলো, বেলা যে ফুরায়ে যায়-এর বেহাগ, ভৈরবী, বারোঁয়া। কাব্যগুচ্ছের আবডালে ঘুমিয়ে পড়েছে গৌরী, বসন্ত বাহার, সিন্ধু-খাম্বাজ, গড়-খেমটা, আড়-খেমটারা। আমরা ব্রাহ্মণ বলে নোয়ায় না মাথা, তারা নাম কোর্‌তে কোর্‌তে জিব্বাডা আমার, যদি কুমড়োর মত চালে ধ’রে র’ত, চাঁদে চাঁদে বদলে যাবে-র মতো গানের হিউমার-ও স্মৃতি থেকে ফস্কে গেছে। রজনীকান্ত মনোরঞ্জন-উপকরণ নন কোনো কালেই, কিন্তু এই গানগুলো যদি অন্তত কিছুটা প্রচারিতও হতো, অর্ঘ্য সেনের গলার ওজনে জীবনের ‘তৃষিত মরু’ ছেড়েছুড়ে ‘রসাল নন্দনে’ যাবার জন্যে কান্না কতোটা, সেটাই রজনীকান্তকে বোঝার একমাত্র দাঁড়িপাল্লা হতো না। হাসিটাও খুঁজে পাওয়া যেতো। রজনীকান্তের যখন বাক্‌ পুরোপুরি রুদ্ধ, তখনকার ডায়েরি পড়লেও এই হাসিটাকে বোঝা যায়।

দিদা কি চিনতো রজনীকান্তকে? কিংবা রজনীকান্ত কি চিনতেন দিদাকে? জানিনা। আমি শুধু বুঝেছি, ওই সারল্যকে স্পর্শ করতে পারলে বেঁচে যেতাম, বেঁচে যেতো আমাদের সময়টা। রোজ যে সরলরেখা হারিয়ে ফেলি, সেগুলো হয়তো শেষমেশ পাওয়া যায় আকাশের বাঁকে। আমার দুনিয়া থেকে হারিয়ে গিয়ে আরেকটা হারানো দুনিয়া নিশ্চয়ই খুঁজে পেয়েছে দিদা। রজনীকান্ত-ও চিনতে পেরেছেন ওই ভুলে যাওয়া গোধূলি-চৌকাঠ। আমার বর্ণমালায় ৯ ছিলো। আমার মেয়ের বর্ণমালায় হয়তো থাকবে না। আমি এটুকু জানি, মেয়ের শহুরে শব্দভাঁড়ারে আমি চৌকাঠ রেখে দেবো।