একজন কবির হারানো যা কিছু

প্রবীর রায়


একটা সময় থাকে যখন একজন তার চারপাশের ছবিগুলোকে নিজের ভিতরে আঁকতে শুরু করে, সে তার শৈশব। তারপর কেউ কেউ সেইসব থেকে কিছু কিছু লিখে রাখতে চায়। তার কল্পনায় ভর করে কবিতা লেখা শুরু হয় কোনও এক সময়। নতুন নতুন দেখায় ভরে উঠতে থাকে ছবিঘর। এই ভাবে বেশ কিছু বছর কেটে গেলে, সে লক্ষ্য করে পুরনো অনেক কিছুই তার দৃষ্টিসীমার মধ্যে নেই। নিরুদ্দিষ্ট সেই সবকিছু তার লেখায় ঘুরে ফিরে আসে। পাঠকেরা ভাবে নস্টালজিয়া। শুধু এইটুকু হয়ত নয়। নিরুদ্দিষ্ট সেইসব মুহূর্তগুলির প্রতি নিবেদনও বটে।
একটি শিশু, পঞ্চাশ দশকের শেষে এক পল্লীর জীবন তাকে যা দেখিয়েছিল তা কেন ষাট বছর পরে তার কাছে ফিরে এলো। তা কি শুধুই হারিয়ে যাওয়া কোন অনুভবের নম্র স্মৃতি চারণা নাকি কিছু ফিরে পেতে চাওয়া।
ফেরা
আবার আবিষ্ট হলে দেখতে পাবো ফিরে যাওয়ায় যা চাইছি কথা বসান হয়নি এমন গান
শুনতে শুনতে গোবর লেপা মাটিতে পা ফেললে ভুল বাজতো
টালি পালটে নিলে ছাদে আর জল পড়ত না
বিমল জেঠুর মিছিল রাস্তাবেলার সন্ধ্যায় ঘরে ভাত নাই গদি ছাড়ুক তাহলে
গদি এক আরাম বিষয় তাতে নাকি আরাম পাওয়া যায় এর বেশি বুঝিনি তখন
“চাউল নাই চাউল দাও নইলে গদী ছেড়ে দাও” এই স্লোগান ছিল খাদ্য আন্দোলনের প্রস্তুতি মিছিলের। ছন্দ ও আবেগ কবিতা লেখার পটভূমি তৈরি করেছিল শুধু।
বয়েসের ভার
আমাদের শৈশব সবচেয়ে সুন্দর ছিল প্রায়ই বলা হয় এই কথা কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার পর বেগুনী
ঘাসফুল যা বোঝাতে চাইছে পথচলাকে এগিয়ে দিচ্ছে সামনের দিকে
ঝুঁকে পড়তে চাইলেও সোজা করে দিচ্ছে যে টান তাকে কি বলবে তোমরা
কিছু কিছু তো একই রকম থেকে যায়। প্রতিবাদী এবং মেনে নেওয়া মানুষের দুই শ্রেণী সত্তর দশকের ছাত্র জীবনেও ছিল, আজও আছে।
বশ্যতা
আমরা যারা বশ্যতা মেনেছি তাদের প্রতিটি বিকেল কাটে
নদীর নরম জলে রূপোলী মাছের ছায়া খুঁজে
সুখে লিপ্ত হয়ে আছি স্বপ্নে আজ আর মানুষ প্রসঙ্গ
নেই বরং সাদা আরবি ঘোড়া বারবার নিয়ে যেতে আসে
তারা যারা বশ্যতা মানেনি ডাক দিয়ে বলেছিল বুকের
ভিতরে কতকাল হাওয়া নেই তাদের বুকের দেয়াল ভেঙ্গে প্রতিদিন রক্তক্ষরণ
প্রতিদিন হাওয়ার প্রবেশ
অনেক কিছুই আগেও ছিল এখনও আছে। তবুও তো দশকের পর দশক এক হাহাকার থেকে যায়, নিরুদ্দিষ্টের দিকে অনুভব ছুটে যায়, সেও এক সত্য।
ইতিহাস
১৯৭২ ক্যারম স্ট্রাইকার নয় আমাদের
জন্য রাইফেল ট্রিগার বলতে বলতে কয়েকজন বেরিয়ে গেল ইন্ডোর স্টেডিয়াম
থেকে বাইরে
১৯৮২ তারা এখনও ফেরেনি
অনেক কিছুই জানি আর ফিরবে না। জেনেও হরিকাকু বা নিখিল স্যার-এর কথা ভোলা যায়না। এমন সব মানুষকে যদি কাছে পাই আজ, কেন এই তেষ্টা জেগে থাকে!
পিওন
নাকতলা ডাকঘরের হরিকাকু কাঁধে খয়েরি ব্যাগ হাতে কাগজের
তাড়া থামিয়ে বলতাম – আমাদের চিঠি আছে?
নীল হলুদ রং মার হাতে দিতেই আলোর ফুলঝুরি ছেলেবেলা কেটে গেলে দেখিনি অমন
দীপাবলি আর
এখনও কি চিঠি লেখে কেউ? আঁধার পীড়িত ঘরে এখনও
কি চিঠি আসে?
পা
টেবিলে নিখিল স্যারের বেত নীল সম্মোহনী ধোঁয়া তার থেকে
বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ত ক্লাসরুমে
দাঁড়াবি যখন শিকড় চালিয়ে দিবি মাটির গভীরে নিখিল স্যার বলতেন
সেদিন দেখি আধখানা নিখিল স্যার থলে হাতে ফিরছেন প্রনাম করতে পা খুঁজে
পাইনা বললেন, আমি খুব তাড়াতাড়ি উবে যাচ্ছি
জানিনা আর কতদিন
কী কী হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, কত কিছু নিরুদ্দেশে চলে গেছে, সে সব ভাবতে বসলে আরও কত চাওয়া তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে ভাবতে গিয়ে কয়েকটি প্রকাশিত / অপ্রকাশিত কবিতার কথা মনে এল। এরাই আমার কথা বলবে।