না মুড়োনো নটে গাছ... সরস্বতী নাম

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


একটা জেট প্লেন... আকাশে ভেসে যাচ্ছে অনেএএএএক ওপর দিয়ে... পেছনে যে সাদা ধোঁয়ার দীর্ঘ দাগ... নীল আকাশে গতিপথ রেখা। সেই দাগ ম্লান হ'তে থাকে, একসময় হারিয়ে যায় নীলে। জেট প্লেন তবু এগিয়ে যায়, নীল আকাশে তার যাত্রা চিহ্ন এঁকে দিয়ে। তারপর... একসময় সেই জেট প্লেনটা আর নেই... শুধু সাদা রেখা... তাও ম্লান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে একটু একটু করে... হারিয়ে যাচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়া ব্যাপারটার মধ্যেই কেমন একটা রহস্যের ইঙ্গিত থেকে যায়। আমি বললাম 'হারিয়ে গেল'... তো সকলের বয়ে গেল। তার বদলে যদি বলি 'অন্তর্হিত হ'ল' তাহ'লেই সকলের মধ্যে একটা টনক নড়া ব্যাপার। পেছনে ফেলে আসা পথের দাগ... মুছে যায় একটু একটু করে। হারিয়ে যায়। ছিল... আর নেই। পেছন ফিরে দেখা... যাকে ইতিহাস বলি, সে তো শুধুই হারিয়ে যাওয়ার কথোকথা। হারিয়ে যাওয়াই যেন একটা গোমুখ উৎস; যার থেকে এক একটি ধারা নিসৃত হয়েছে। কখনও বলছি - হারিয়ে যাওয়া... খুঁজে পাওয়া, হারিয়ে যাওয়া... ফিরে আসা... আবার কখনও শুধুই হারিয়ে যাওয়া... তারপর আর কিচ্ছু নেই। এই কিচ্ছু নেই ব্যাপারটাই আমাদের মত নঃস্বরদের কাছে এক বড় সংকটের কারণ, ভীতির কারণ। এই যা মানুষ জন্মের পর থেকে একটু একটু করে এত কিছু সইছে, এত কিছু করছে, এত কিছুর মধ্যে দিয়ে টিকে আছে... তা যে অন্তে 'নেই' তে মেশার জন্য... স্রেফ হারিয়ে যাওয়ার জন্য, এটা ভাবলেই কেমন একটা 'যাঃ শালা' মনে হয়ে আশেপাশের সব কিছু দেখে। অস্তিত্বই তো সব থেকে বড় পরিচিতি আমাদের। এই অস্তিত্বর জন্য, অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতেই তো শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে নিরন্তর ঘটিয়ে চলেছে এত কিছু এই দু'পেয়ে প্রাণীর প্রজাতি। একজন সিদ্ধার্থ যদি এই 'হারিয়ে যাওয়া'-কে খুঁজতে পথে নামে, তাতে বাকিদের কার কি? প্রতি মুহূর্তে ওই 'নেই' হয়ে যাওয়ার চিন্তা মাথায় নিয়ে কি প্রাণীকুল থাকতে পারে? নাকি শরীরের উৎসেচক বা হরমোনগুলো তা থাকতে দেয়? এই যাত্রা অনাবিল, দীর্ঘ শৃংখলে এক দিক থেকে আর এক দিকে হেঁটে চলা... আর পেছনে ফেলে আসা এক রাশ হারিয়ে যাওয়া। উঁহু, নেহাৎ সেই হারিয়ে যাওয়া ঘিরে দীর্ঘশ্বাস, হাহুতাশ কিংবা নস্টালজিয়া নয়... সেই হারিয়ে যাওয়ার দর্পনেই ফুটে ওঠা প্রতিবিম্ব, আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতেই আমাদের ভবিষ্যতের কারিগর হয়ে ওঠে। ওই এক একটা সত্ত্বা, যেন ঠিক জাতকের গল্পের মত, এক রূপে বিস্মৃত হয়ে, আর এক রূপে এসে মিশে যায় আমাদেরই মাঝে। যেন ঠিক তাসের পাতাগুলোর মত শাফ্‌ল করতে করতে এক এক সত্ত্বার বার বার ঘুরে ফিরে আসা... এই মহামায়া প্রকৃতিরই কোলে, ভিন্ন অবয়বে আত্মপ্রকাশ... সে তুমি চিনলে চিনো, না হ'লে তারই অন্বেষণের উত্তর হয়ে তাকে বল 'সে তো আর নেই... কবেই হারিয়ে গেছে'!



(১)
আজ যেথায় ধূ ধূ রেগিস্তান...

হিমাচলের শিবালিক পর্বতমালা থেকে ঘাগ্‌গর বলে যে নদীর ধারা নেমে এসেছে... একের পর এক হরিয়ানা, পাঞ্জাব পার করে হঠাৎই রাজস্থানের বুকে এসে হারিয়ে গেছে... চিকচিকে বালির সমুদ্রে... থর মরুভূমি। তারপরে আর জল কথা? শুধু রেগিস্তানে রেখার মত শুখা নদীর চড়... এক নদীর পথে আর এক নদী চলতে চলতে এসে মিশেছিল কোনওদিন। সেই সংগমের দাগ আঁকা রয়ে গেছে বালিতে। এখনও বর্ষা এলে... রেগিস্তানে ঘনঘোর সাওয়ানের কালে হয়ত কুলুকুলু শব্দ শোনা যায়। একে একে সুখা শাখাপ্রশাখা, সময়ের দাগ গুলো বয়ে চলে... ঘাগ্‌গর, হাক্‌রা, দৃশদ্বতী, সরস্বতী। হারিয়ে যাওয়া সেই বৈদিক নদী সরস্বতী... অভিমান নিয়ে নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যাওয়া সভ্যতার বুক থেকে... সেই নদী, যার তটে ছিল এক কালের আর্য্য সভ্যতার সমৃদ্ধি... ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৈদিক যজ্ঞভূমি।
পাবকা নঃ সরস্বতী বাজেভির্বাজিনীবতী। যজ্ঞং বষ্টু ধিয়াবসুঃ।।
মহো অর্ণঃ সরস্বতী প্রচেতয়তি কেতুনা। ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি।।
যার অর্থ করলে কিছুটা এইরকম দাঁড়ায় -
পবিত্রা, অন্নযুক্তযজ্ঞবিশিষ্ট া, ও যজ্ঞফলরূপধনদাত্রী সরস্বতী আমাদের অন্নবিশিষ্ট যজ্ঞ কামনা করুন।
সরস্বতী প্রবাহিত হয়ে প্রভূত জল সৃজন করেছেন, এবং সকল জ্ঞান উদ্দীপন করেছেন।
একে ঋগবেদের প্রথম মণ্ডলের তৃতীয় সূক্ততেই এই নদীর নাম... ঋগবেদের সময়ে মহামহীম ইন্দ্র নন, পতিতপাবনী গঙ্গা নন... আহুতি পাচ্ছেন সরস্বতী। দেবী? উঁহু স্পষ্টতই নদীর কথা বলা হয়েছে এখানে।

এরপর একের পর এক পুরাণ, মহাকাব্য থেকে মঙ্গল কাব্য... সব জায়গায় নদীরূপিনী সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ কি না, যখন সেই প্রাচীন সরস্বতী নদী ধীরে ধীরে ক্ষীণ ধারা হ'তে হ'তে হারিয়ে যাচ্ছে বা হারিয়ে গেছে... তখনও সেই নদীর মাহাত্ম্য কমছে না। নদী থেকে মিথ হয়ে উঠেছে এই নাম 'সরস্বতী'। একাধারে বিদ্যা তথা চৌষট্টি কলার দেবী, সর্বগুণসম্পন্না স্বয়ংসিদ্ধা দেবী... অন্যদিকে সভ্যতাকে নিজের স্তন্য দান করা সাঙ্ঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ নদীমাতা। একদিকে সিন্ধু... তার পাঁচ শাখা নদী নিয়ে নাম দিলো এক সভ্যতার, এক সনাতন ধর্মের, এক জাতির... আর একদিকে সেই সনাতন ধর্মের সর্বপ্রাচীন আরাধ্যা নদী হ'ল সরস্বতী। সেই সেদিনের সরস্বতী... হয়ত আজ তারই অবশেষ ওই পাঞ্জাব থেকে রাজস্থানে নেমে আসা সরসুতী। এই সরসুতীকে দেখে সেই সরস্বতী সম্বন্ধে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসাও বড় ঝুঁকি মনে হয়। অনুমান করা যায়, সেই বৈদিক যুগের সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, সেখান থেকে ধেয়ে আসে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার সমতটে। সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর (দু'জন কেই তাদের অবশেষ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়) মধ্যস্থান দেবনির্মিত স্থান (আর্যদের পুণ্যভূমি) বলে গণ্য করা হত। কিন্তু এই উৎস আর বয়ে যাওয়ার পরেই সরস্বতীর সিগ্‌নেচার লুকোচুরির খেলা। এ শুধু আজ নয়, হাজার বছর আগে থেকেই চলছে। রাজস্থানের থর মরূভূমির (যা মোটেই চিরকাল এমন মরুভূমি ছিলো না) বালির মধ্যে 'চলুর' নামক এক গ্রামের কাছে সরস্বতী হারিয়ে যায়, আবার তাকে দেখা যায় ভবানীপুর বলে অন্য এক গ্রামে (প্রতাপগড়ের কাছে)। তাণ্ড্যমহাব্রাহ্মণে (সামবেদ-এর পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণ) প্রাচীন সরস্বতী নদীর উৎস বলা হয়েছে 'প্লক্ষপ্রস্রবণ' (প্লক্ষ অর্থে অশ্বত্থ গাছ, হয়ত কোনও বিশেষ অশ্বত্থ গাছের কাছাকাছি উৎস থেকে নিসৃত ধারা। এখানে প্লক্ষ দ্বীপ হওয়া অসম্ভব) আর তার যাত্রার শেষ 'বিনশনের' উল্লেখ পাওয়া যায়। তথ্যসূত্রে জানা যায়, রাজস্থানের পশ্চিমপ্রান্তে ওই বিস্তীর্ণ মরূ অঞ্চল জুড়ে এই লুকোচুরি চলতে চলতে সিরসা অতিক্রম করে ভূটানের মরূভূমিতে সরস্বতীর হারিয়ে যাওয়াই বিনাশন (এই ভূটান কে বর্তমানের পার্বত্য ভূটান না ভাবাই ভাল)। লাট্যায়ণের শ্রৌতসূত্রতে দেখা যায়, “সরস্বতী নামক এক নদী পশ্চিম অভিমুখে প্রবাহিত, তার প্রথম ও শেষভাগ সকলের কাছে দৃশ্যমান, কিন্তু মধ্যভাগ অন্তঃসলিলা, সে অংশ কেউ দেখতে পায় না, সেই আসলে বিনাশন”। আবার অন্য এক গোষ্ঠীর বিশ্বাস - সেই প্রাচীন সরস্বতী নদীর অবশেষ আজও গুজরাতের কচ্ছ এবং দ্বারকার কাছে আরব সাগরে মিলিত হয়েছে (খুব মনে পড়ে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে আর এক সরস্বতী নদীর কথা)। শ্রৌতসূত্র (যা শ্রবণ দ্বারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রবাহিত) বৈদিক যুগের শেষদিকে সৃষ্ট... সুতরাং এই বিষয় কোনও সন্দেহ নেই বৈদিক যুগের অবসান হওয়ার আগেই সেই প্রাচীন বন্দিতা নদী সরস্বতী 'রিভার-বেসিন' অঞ্চলের ভৌগলিক বিবর্তনের টানাটানিতে হারিয়ে যায়। অথচ তারপরেও সেই নাম নদী থেকে মিথ - মহাভারতে উল্লেখ, নিষাদদের চোখে ধূলো দিতে মরুভূমিতে কোথাও অন্তর্হিত হয়েছে পবিত্র বারিধারা... তাই তার আপাত বিনাশ... নাম বিনাশন।

অথচ সেই অন্তর্ধানের পরেও সরস্বতীর নাম মাহাত্ম্য বা ধর্মীয় গুরুত্ব সমান উজ্জ্বল। হারিয়েও হারায়নি সে। নদী সরস্বতীর প্রতি সভ্যতার যে ঋণ, তা ভারতবাসীর মনে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে পরবর্তীকালে অন্য প্রান্তে হিমালয় নন্দিনী-গঙ্গা সে স্থান দখল করলেও তারা তাকে ভুলতে পারেনি। এখনও হিন্দুধর্মের বিশ্বাস - প্রয়াগে অন্তঃসলিলারূপে গুপ্তভাবে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে সরস্বতীর সঙ্গম… তীর্থ ত্রিবেনী (সরস্বতী হারিয়েও থেকে গেছে এখানে)। কোথায় সিন্ধু-সরস্বতী নদী-তন্ত্র আর কোথায় এলাহাবাদ! খোঁজ করলে জানা যাবে, ভারতবর্ষ জুড়ে যেখানে যেখানে এমন ত্রিবেণী সঙ্গমের প্রতিষ্ঠা আছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিন জনের মধ্যে একজন অন্তঃসলীলা! আর সব থেকে মজার কথা - তাত্ত্বিকেরা অনেকেই বলেন, সিন্ধু নদই সরস্বতী। সরস্বতী ও সিন্ধু দুটি শব্দের অর্থই নদী। সিন্ধু (ইন্দাস্‌) এবং সরস্বতী (সরসুতীর লুকোচুরিতে) দু'জনেই বর্তমান পৃথক ভাবে অথচ ওই নাম উৎসে দু'জনেই নদী... এক হয়ে গিয়ে এক অস্তিত্ব। এ কথা মেনে নিলে বাকি সব কিছুই ওই সরস্বতী নদীর উৎস, বিনাশ এবং অন্তর্হিত রূপের মতই রহস্যময় হয়ে ওঠে... তাই না? ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক সভ্যতার উত্থানের সাক্ষী এই নদী হয়ত ভৌগলিক কারণেই হারিয়ে গেল এক সময়... দৃষ্টির গোচরে থেকেই ধীরে ধীরে তার বারি ধারা ক্ষীণ হয়ে আসতে আসতে একসময় রয়ে গেল শুধু সেই পথচলার রেখা। হারিয়ে গেলো একদিনের সেই জীবনসুধাদায়িনী মাতৃসমা সরস-বতী। তবু কেমন বয়ে চলেছে ঘাগগ্‌র... এসে মিলেছে এই সরসুতী ডাকনাম নিয়ে এক আঞ্চলিক সরস্বতী। মরুভূমি, যে নিজেও এক হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার অবশেষ... তার বুকের মাঝেই লুকোচুরি। সব মিলিয়ে... এই বেদগর্ভা সরস্বতী নদী... সনাতন ধর্মের আদিতে এক সভ্যতা... হয়ত একটা জাতির জন্মবৃত্তান্ত... সবকিছুরই মরুসমাধি হয়ে মিশে যাওয়া... ওই ধূ ধূ রেগিস্তানের বুকেই।

হে মাতা সরস্বতীর বরপুত্র! তুমি উজ্জ্বয়নীতে বসে কুমারসম্ভবের অষ্টম সর্গ রচনা করার সময় একবার কি ভেবেছিলে, নর্মদা থেকে বহু যোজন ক্রোশ দূরে তোমার সেই আরাধ্যা বীণাপাণির নাম ধারণ করেই এক স্রোতস্বিনী বয়ে যেতো কোনও এক কালে? তার হারিয়ে যাওয়াই হয়ত সেই শেষের শুরু ইঙ্গিত ছিল, যাকে আমরা অবক্ষয় বলি!
… … …

(২)
কখনও কোথাও নিবিড় আঁধারে...

রাতের বেলা এমনিতেই সব কিছু চুপচাপ হয়ে যায় চারিদিকে... শুধু বাইরে কুকুরগুলোর ঘেউ ঘেউ শোনা যায়। কুকুরগুলোর যেন রাত হলে ছটফটানি বাড়ে। ঠিক যেমন রাত গভীর হ'লেই ভাতে ভাত খেয়ে ঝিমোতে ঝিমোতে শুয়ে পড়া লোকটার হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। খুব খানিক ছটফট করে, আবার নেতিয়ে ঝিমিয়ে পড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে। তারপর শুধু বাইরে কুকুরের চিৎকার আর ঘরে এই নাক ডাকার শব্দ। লোকটা সবে শুয়েছে... হাতটা ঘুমের মধ্যেই বুকের ওপর শুয়ে আছে অসার হয়। সার পেলেই আঁকড়ে ধরতে চাইবে। বুকের ওঠা নামায় ঘুম ভাঙ্গে না। শ্বাস-প্রশ্বাসে ঘুম ভাঙে না। বুকের ধুকপুকেও ঘুম ভাঙ্গেই না... ঘুম ভাঙে শুধু খিদে পেলে। ঠং করে একটা কিছু পড়ার শব্দ হ’ল… বোধহয় গেলাস। হঠাৎ করেই এই নিস্তব্ধতার মাঝে সজাগ করে দেওয়া শব্দ। কান খাঁড়া করে শোনার চেষ্টা করল ভারতী, চোখ বন্ধ করেই। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা, তারপর আবার শব্দ… একাধিক ধাতব শব্দ একসাথে… থালা-বাসন ছড়িয়ে পড়ল কাছাকাছি কোথাও। কুকুরগুলোও হঠাৎ বেশ একসাথে ডেকে উঠল। আহ্‌… ঘুমের মধ্যেই পাশের মানুষটার মৃদু প্রতিবাদ। এসব শুনতে পেয়ে করল, না ঘুমের ঘোরেই… বুঝল না ভারতী। মানুষটা এরকমই। বাইরে সত্যিই একটা গোলমাল... তন্দ্রা ভাবটাও কেটে গেল এবার। লোকজনের গলার আওয়াজ... আর বাসনপত্র আছড়ে পড়ছে। অন্ধকারে, টিনের চাল... না, অন্ধকার দেখতে দেখতেই বোঝার চেষ্টা করল ভারতী। গোলমাল শুনলেই, কেমন হঠাৎ বুকটা ধুকপুক করে ওঠে। গা’টা ছমছম করে ওঠে। সাবীদি’র গলার আওয়াজ... সুর টেনে টেনে চিৎকার করছে, কেঁদে চলেছে। কুকুরগুলোর জ্বালায় কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না কি বলছে! “ঢ্যামনার বাচ্চা সব শেষ করে দিলো... আবাগীর বেটি... পোকা পড়বেএএএএ...” উফ্‌ মাগো! আবার শুরু হ’ল... নেতাইদা ফিরলেই যে রাতদুকুরে কি হয়! ওই লোকজন জুটবে গিয়ে... কিছুক্ষন চলবে ক্যাওরা-কিচিকিচি তারপর আবার যে যার ঘরে গিয়ে জড়িয়ে-জাপটে চোখ বুঁজবে। এসব এদের রোজকার ব্যাপার। ফোঁশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুতে গেলো ভারতী। সেই নিস্তেজ হাতের আঙুলগুলো হঠাৎই মুঠো হয়ে ধরার চেষ্টা করল বুকের ডানদিকটা। ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস পড়ছে... নাক আর ঠোঁট আসতে আসতে ঘষছে পিঠের ওপর। ঘুম ভাঙছে মানুষটার।

... ... ...

গায়ে গা লাগিয়ে পাশাপাশি শুয়ে থাকার মতই, গায়ে গা লাগিয়ে খালের পাড় বরাবর ঝুপড়িগুলো একটার পর একটা পড়ে থাকে সেই ভাবে। পথ চলতি যে দু’চাকা, তিন চাকা, চার চাকা গুলো চলে যায়... তাদের কাছে সবই এক। ওই এঁদো খাল আর ঘিঞ্জি বস্তি পার হ’তে পারলে বাঁচে! ওই খালের স্রোতে কালো পাঁক, ভেসে যাওয়া ছেঁড়া স্যানিটারি প্যাড, কাঠ হয়ে পড়ে থাকা মরা কুকুর, কাকদের ঠুকরে ঠুকরে হল্লা... ভেসে যায়। আর বস্তির ঝুপড়িতে ঝুপড়িতে ভাসে বিড়ির ধোঁয়া, চোলাই, ফাটা কন্ডোম, কোণ-মোড়া তাসের সাহেব-বিবি-গোলাম... আর রগরগে কুঁচো মাছের ঝাল, ভাতের ফ্যান। এসবের মাঝে ভারতী কেমন করে আছে, তা ওই পথ চলতি লোকগুলো জানে না, আমিও জানি না... ভারতীর পাশে যে লোকটা রোজ খিদে নিয়ে ঘুমোয়ে সে আর ভারতী হয়ত জানে... হয়ত। সেসব খোঁজ করে আর কি হয়? এমনিতেই ওই খাল পাড়ের আবর্জনায় টেকা যায় না, তার ওপর পাঁক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি! তাও কেমন রঙচটা হাফ প্যাণ্ট পড়া বাচ্চাগুলো কোথা থেকে ছিপ জুটিয়ে খালের আনাচে কানাচে বসে থাকে। পাঁকে নেমেই পাঁকাল মাছের ধরার নামে আরও যে কি কি ধরে তা খালের স্রোতই জানে।


খুব জোরে গান বাজছে, কোনও একটা ঝুপড়িতে সেকণ্ড হ্যাণ্ড স্পিকার কিনেছে কেউ, রেডিওর তার জুড়ে দিয়ে পেল্লায় হাঁকাই দিচ্ছে... তেরি চুনারিয়া, দিল লে গই। গানের রেলা অনেক দূর অবধি ভেসে যাচ্ছে, চায়ের গুমটির সামনে বসে পা দোলাচ্ছে তিন-চারজন... লালচোখ, হাতে চায়ের গেলাস।
সামনের চাপাকল থেকে ভিজে কাপড় সমেত প্লাস্টিকের বালতিটা নিয়ে চায়ের দোকান পার করে চলে গেল ভারতী। সেদিন রাতে তুলকালাম হওয়ার পর থেকে নেতাই একদম চুপ মেরে গেছে। পরদিন সকালে চোখমুখ অ্যায়েসা ফুলে ছিলো, দেখেই বোঝা যায় আচ্ছা কেলিয়েছে ধরে তিন-চারজন। বেশ করেছে, এমন মালের মাঝে মাঝে দাওয়াই পড়া উচিৎ। এখন ঘাপটি মেরে এই চায়ের ঠেকে বসে থাকে সারা সকাল। সন্ধেবেলা যাই করুক, রাতের আগেই সুরসুর করে নিজের বাসায় সেঁধিয়ে যায়। হপ্তা-খানেক চলবে এমন, তারপর শুয়োর ঠিক পাঁক ছিটোবে। অবশ্য এই নেতাইকে খিস্তি করেই বা কি হবে, ক’টা ঘরে আর ক’জন সজ্জন? উনিশ-বিশ সবই এক... কেউ ওপর চালাক, আর কেউ কেউ গাড়োল... তাই কেস খেয়ে যায় এই ভাবে। ভারতী বালতিটা নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, বালতি উপচে টপটপ করে জল পড়ছে। মেরুণ ম্যাক্সিটার নিচের দিকেও ভিজে... সারা রাস্তা ফোঁটা ফোঁটা জলের দাগ এঁকে যাচ্ছে। যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালো, খানিকটা জল চলকে পড়ল বালতি থেকে... মিচ্‌কে নেতাইদা ডাকছে পেছন থেকে। পেছন ফিরে তাকাতে আবার বলে উঠল, “শোন না... তোদের বউদি আদা আর কাঁচালঙ্কা নে যেতে বলেছিল... এ নে, দিয়ে দিস্‌।” ভারতী ভুরু কুঁচকে বলল, “তোমার বউ রাঁদবে বলে আদা-লঙ্কা চেয়েছে, তো আমায় ধরাচ্ছ কেন? নিজে গে দাও না!” নেতাইয়ের চোখ তখনও লাল, ভারতীর বুকের ওপর সরে যাওয়া আধময়লা ওড়নাটাও বড় বেয়ারা। কেমন মাতালের ঘোর লাগা স্বর নিয়েই নেতাই বলল, “আরে নাআআআ... আমার ফিরতে বেলা হবে না? কি করে রাঁআআআআদবে বল? এই... এ নে... তোদের বৌদিকে বলিস, আমি পাঠিয়ে দিলুম।” নেতাইয়ের চোখের দিকে না তাকিয়েই প্লাস্টিকের ছোট থলিতা হাত থেকে নিয়ে নিলো ভারতী। শুধু একটা নয়, বেশ কয়েক জোরা চোখ ওই ওড়নার ফাঁকেই আটকে আছে... ম্যাক্সিটার সেলাই পুরনো হয়েছে, আর ক’দিনই বা ধরে রাখবে সব কিছু একসাথে? এক হাতে বালতি আর এক হাতে ভেজা প্লাসটিকের প্যাকেট নিয়ে চায়ের দোকান কে পেছনে ফেলে হনহন করে এগিয়ে গেলো ভারতী। এত দূর থেকেও আওয়াজ আসছে... সরকা যো সারসে ওয়োহ ধীরে ধীরে... পাগল হুয়া রে ম্যায় ধীরে ধীরে। হারামিদের চোখগুলো সব একরকম!

... ... ...

হিশ্‌হিশ্‌ করে একটানা শব্দ হচ্ছে, সাইকেল চালিয়ে ধারওয়ালা এসেছে... কারো ছুড়ি, কাঁচি ধার দিচ্ছে হিশহিশ করে। আগুনের ফুলকি এদিক ওদিক ছিটকে পড়ছে। পুরনো কাপড়টার এদিক-ওদিক সেলাই করা পর্দাটা সরিয়ে দরজার বাইরে কিচ্ছুক্ষণ উঁকি দিয়ে দেখলো ভারতী। একহাতে হাতে চিরুনি, অন্য হাত পর্দার কোণ ধরে। সাবীদি কোমরে একটা হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে সাইকেলের পাশে, কিছু ধার দেবে হয়ত। ওই রাক্ষুশে আঁশবঁটিতে এমনিতেই খুনে ধার! আবার কি হবে? ফুলকি উড়ছে এদিক ওদিক... চড়া রোদে আগুনও কেমন ম্যাট ম্যাট করে। রাতে ওয়েল্ডিং-এর ফুলকি চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। ভারতীর চোখেও ফুলকী... ভেতরে প্যাডেলের চাপ পড়ে চাকা ঘুরতে ঘুরতে হিশ্‌হিশ্‌ করে মাঝে মাঝে। ফুলকীর ছ্যাঁকা কখন যে শরীর কোন অংশকে ঝাঁঝরা করে দেয়, কোথায় পোড়া ফোসকা কতদিন ক্ষত জমিয়ে রাখে... তা শুধু ওই শরীর কিছুটা জানে, আর মন বলে অলীক ভূতটা। হ্যাঁচকা টান মেরে পর্দা সরিয়ে ভেতরে চলে এলো ভারতী। দেওয়ালে টাঙানো দাগ ধরা আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে নিজে থেকেই ভুরু দুটো কুঁচকে উঠছিল, চিরুনি যত চুলের জটে বাঁধা পড়ে, তত বিরক্তি বেড়ে যায়, রাগ বেড়ে যায়, যন্ত্রণা আর যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করার জেদও বেড়ে যায়। সাবীদির গায়ের রঙটা ভারতীর থেকে অনেকটাই পরিষ্কার, কিন্তু গালে ছোপ মেচেতার দাগ ধরেছে, কপালে বসন্তের দাগ। এত ধোলাই খেয়েও মাগীর গতর টসকায়নি। কলতলায় কাপড় কাচুক, কিংবা চৌকাঠের পাশে বসে ওই রাক্কুশে বঁটি দিয়ে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে শাকের আঁটি কাটুক... সবসময়েই কাপড়চোপড় আলুথালু... গায়ের কাপড় আর গতর ধরে রাখতে পারে না! সাবীদির ঘরের সামনে দিয়ে দুপুরবেলা আসতে-যেতেই দেখতো ওই আঁশবঁটি নিয়ে বসে আছে... স্টোভে রান্না চাপিয়ে। নেতাইদার সঙ্গে রাতদুকুরে হল্লা হলে মাঝে মাঝে মনে হয় কেউ একজন এখনই এক কোপে শেষ হবে... বঁটিটা হাঁ করে রয়েছে! কিন্তু সেসব কিছু হয় না, কোপ বসানোর কলজে ওদের নেই। দাগ ধরা আয়না এসবের ছায়া সেভাবে কোনওদিনই পড়ার কথা নয়; অথচ ওই ধার দেওয়ার হিশহিশ শব্দ, খালে বয়ে যাওয়া মাছের আঁশ আর বঁটি সব কিছুই কেমন এক হয়ে গেছে। নেতাইদা কিংবা সাবীদি নয়... অতগুলো টিনের চাল টপকে এই ভারতীর ঘরটাতেই কোপ মারার জন্য বেছে নিলো ওই মাগীর আঁশবটি। ঘরের মানুষটা এমনিতেই মাঝে মাঝে একটানা বেশ কয়েকদিন বাইরে কাটায়... কখনও স্টেশনের কাজে, কখনও কোথাও মজুরের দরকার পড়লে... পার্টির দালালদের ডাক পড়লেও। তারপর বাইরে কোথায়, কতদিন সেসবের ঠিক নেই। শুধু ফিরে আসবে, আর ফিরে আসা অবধি হাতের টাকাগুলো থাকুক... ব্যাস্‌। বাইরে কোথায় কি করছে, তার কিছুই ভারতীর জানা নেই। শুধু মানুষটা বাইরে যায়, আর টাকা নিয়ে ফেরে... খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে ফেরে... কখনও গা-হাত-পায়ে চোটের দাগ। সেইবারও এমন বেরিয়েছিল, তিন-চার দিন বেপাত্তা। দুপুরবেলা কলতলা থেকে ফিরতে সাবীদির ঘরের দরজা বন্ধ দেখে অবাক হয়েছিল, রোজ তো বঁটি নিয়ে দরজার সামনেই হাঁটু অবধি কাপড় তুলে বসে থাকে, মাঝে মাঝে ডেকে এক বাটি কুঁচোমাছের বাটি চচ্চরি ধরিয়ে দেয়। আলগা করে ভেজানো জানলায় কান পাততে পাখা চলার শব্দ ছাড়াও আরও কিছু কানে এলো। আর ওই অল্প ফাঁক দিয়েই দেখা গেল ঘরের মেঝেতে সাবীদি চিৎ হয়ে পড়ে আছে, মেঝেতে লুটোচ্ছে আটপৌরে কমলা রঙের শাড়ীর আঁচল আর হুক খোলা ব্লাউজ। আর একজন চেটেচেটে হাঘরের মত দু’হাতে খাচ্ছে সাবীদিকে... যেন কতদিন খেতে পায়নি। নাহ্‌... নেতাইদা নয়, ভারতীর নিজের ঘরের লোকটা... ঘরে না ফিরে বৌদির কাছে নেমন্তন্ন খেতে এসেছে! কাঁদতে ইচ্ছে হ’ল না... দরজা ধাক্কাতে ইচ্ছে হ’ল না... চেঁচিয়ে ভর-দুপুরে লোক জড় করতেও ইচ্ছে করল না। মানুষটা রোজ রাতে যখন ভারতীর ভেতর-বাইরে সব কিছু হাতড়ে খোঁজে, তখন নিজেকে দেখতে পায় না ভারতী। নিজের মুখ-চোখ কেমন হয় জানে না। এখন চোখের সামনে সাবীদিকে দেখে কেমন লাগছে... নেতাইদা ওপরে চড়লেও কি এমনই করে? হাত দু’টো কখনও মাটিতে এলিয়ে পড়ছে, মেঝেতেই আঁচড় কাটছে... আবার কখনও মানুষটার পিঠে আঁকড়ে ধরছে, নখ বসিয়ে। মানুষটা হাঁফিয়ে উঠছে, তবু থামছে না... এত বড় গতর, একা খেয়ে শেষ করতে পারছে না! মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে থেকেছিল... কি করে দাঁড়িয়ে থেকেছিল... কি ভেবেছিল, কিচ্ছু মনে নেই। শুধু মনে আছে... অল্পদূরেই আঁশবঁটি পড়েছিল, ওই ঝুপড়ি ঘরের অন্ধকারেও ধার চকচক চকচক করছে।

চিরুনিটা হাত থেকে ছিটকে পড়ল মাটিতে। একরাশ কালো চুলের জট আটকে তার দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে। মানুষ কার ওপর রাগ করবে, সব সময় নির্ধারণ করতে না পারলেও, রাগটা থাকে... মাঝে মাঝে অন্তর্মুখী হয়ে যায়... যখন নিজের ওপর রাগ দেখানো মনে হয় সব থেকে সহজ। মানুষটার জন্যই মাথার ওপর চাল, দু’বেলা ডালভাত... না হ’লে পথে, নয়ত বাজারে নামতে হবে। কবে কোন কালে আদি সপ্তগ্রামের পাট চুকিয়ে এসেছে, এখন মুখ পুড়িয়ে গেলেই বা কে দেখছে? তাই হয়ত সেদিন চুপচাপ পাথরের মত দু’মিনিট দাঁড়িয়েছিল জানলার সামনে ভারতী। মাঝখান থেকে শিকে ছিঁড়ে গেলো মাতাল নেতাইটার। একটা দুপুর যায়... আর এক দুপুর আসে। ডাক পড়তেই আবার বেরিয়ে গেল মানুষটা... আর সেই ফাঁকে পালটি গোলটা দিয়ে গেল নেতাই। এবারও নিজেকে দেখতে পেলো না ভারতী, চোখ বন্ধ করে সাবীদির কথা ভাবছিল। কিন্তু কই, ওর নিজের নখ তো ওই ভাবে বেরোলো না, নেতাইয়ের পিঠে আঁচড়ের দাগও বসাতে পারল না। উলটে নেতাইয়ের থাবা আর নখ সহ্য করল খানিকক্ষণ। সেদিন বুঝেছিল ভারতী, কেন সাবীদির সঙ্গে অশান্তিটা মেটে না... কেন সাবীদির নখ ওই ভাবে অন্য মানুষের পিঠে ডুবে যায়। নেতাইদা আনাড়ি লোক নয় তার নিজের ঘরের মানুষটার মত... কিন্তু আসল কাজে ঘন্টা, ইঞ্জিন পুরনো হয়ে গেছে। ঠিক সাবীদির ওপর প্রতিশোধ নয়, নিজের ওপর রাগ দেখিয়েই সেদিন... এখন মনে করলে হাসি পায়। কোই মাঈ কা লাল জানতেও পারল না, নেতাই নেপো হয়ে দই মেরে দিয়ে চলে গেল ভর দুপুরে... বেচারা নেতাইদা, কত্ত কায়দা জানে... কিন্তু বারুদ কম... হা হা হা। নিজের মনেই হেসে ওঠে মাঝে মাঝে ওই রণে ভঙ্গ দেওয়া লাল চোখ দু’টোর কথা মনে পড়লে। কিন্তু কে যে জিতল বুঝতে পারে না... নিজেকে ঐ সামনের এঁদো খালটার মত মনে হয় আজকাল... সাবীদিরও কি এমন মনে হ’ত একদিন?

... ... ...

এত রাতে গোলমালটা শুনে বুঝতে পারেনি ভারতী প্রথমে, কাদা হয়ে গেছিল গভীর ঘুমে। বাইরের বেশ একটা হই হই হচ্ছে... মানুষ আর কুকুরের। পাশে লোকটাও নেই, টিনের দরজা খোলা। ম্যাক্সির ওপর গামছাটা জড়িয়ে দরজার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল ঘুম ঘুম চোখে কৌতূহল নিয়ে। নেতাইদার চালের সামনে লোকজনের ভিড়, কয়েকটা ঘরে আলো জ্বলছে। আবার কিছু একটা ক্যাচাল হয়েছে নির্ঘাৎ। মানুষটা ওই ক্যাচাল দেখতে জুটেছে। অন্যসময় ঘুম ভাঙে না, আজ বৌদির জন্য সোহাগে ঘুম হচ্ছে না! ক’দিন ধরে বৃষ্টি হয়ে খালের জল অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে, জল বয়ে যাওয়ার শব্দ আসছে। সাপখোপের ভয়ে খালি পা’টা রাস্তায় রেখেও তুলে নিলো আবার, হাওয়াই চটিটা পায়ে গলিয়ে এগিয়ে গেলো নেতাইদার ঝুপড়ির সামনে ওই গোলমালের দিকে। ফোন করেছে... এখুনি আসবে... এই বাপি! ফোন লাগা না মাল!... ধরে রাখ... এই নেতাইদা কি হচ্ছে কি!... মাগো! আবার থানা পুলিস... এমনিতেই লাথি মেরে তুলবে ক’দিন পর। কথাগুলো কানে ভেসে আসছে এদিক ওদিক থেকে... হনহন করে হেঁটেও যেন ভিড়টা অনেক দূরে। বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে, একটা চাপা আতঙ্কে। খুন হয়েছে... খুন! ভিড়ের মধ্যে থেকে উঁকি দিয়ে ভারতী দেখল। দেখেই মাথা বোঁ করে ঘুরে গেলো, পা টলে উঠল। পাশে কাউকে একটা ধরে নিজেকে সামলে দাঁড়াল, কাকে ধরেছিল কে যানে, তার ‘কি হলো... কি হলো’ কানে যাচ্ছে না। ঝুপড়ির দরজার সামনে একটা মেয়ে মানুষ... না, মেয়ে মানুষের শরীর উপুর হয়ে পড়ে আছে। কমলা রঙের শাড়ীর আঁচল মাটিতে লুঠোচ্ছে... খোলা পিঠ। ঘাড়ের কাছ থেকে রক্তে ভাসছে... মাথাটা নেই! গতর দেখেই বোঝা যায় ও লাশ কার। নেতাইদাকে অল্প দূরে ধরে রেখেছে তিন চারটা ছেলে, মাঝে মাঝেই হাত ছিটকে লাশের দিকে ছুটে আসছে... পিঠে, পেটে দমাদ্দম লাথি চালিয়ে চেঁচাচ্ছে – ‘বল কার বাচ্চা, বল কার বাচ্চা!’ নেতাইদার ডান হাত দিয়ে রক্ত ঝড়ছে, ঠিক যেন কামড়ের দাগ... কেউ দাঁত বসিয়েছে। রক্তে ভাসা ঘরের মেঝেতে আঁশবঁটি পড়ে আছে হাঁ করে। পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল... শিরশির করে উঠল সমস্ত শরীর।

মিতুলের মা, হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করছে, এইটুকুই বুঝতে পারছে ভারতী। ভিড়ের মধ্যে ঘরের মানুষটাকে দেখতে পায়নি সে, এখনও ধারে কাছে কোথাও নেই। ঘরটাও তার নয়। কপাল, মুখ, চোখের পাতা ভিজে... বোধহয় জল ছুঁড়েছে কেউ। তবে এর বেশি কিছুই বুঝতে পারছে না, কারও কথাও কানে ঢুকছে না। মনে হচ্ছে তার নিজেরই তলপেটে কেউ ক্যাঁৎ ক্যাঁৎ করে লাথি মারছে... বল কার বাচ্চা... বল!

(৩)
সেই আর এই... আছে, তবু নেই

বাঁশবেড়িয়া, কৃষ্টপুর, বাসুদেবপুর, নিত্যানন্দপুর, শিবপুর, সাম্বচোরা আর বলদঘাটি... বাংলার এই সাতটি গ্রাম মিলিয়ে সপ্তগ্রাম... চলতিতে সাতগাঁও কিংবা সাতগাঁ। এই সাতগাঁওয়ের বিরাট প্রতিপত্তি ছিল এক কালে, কেবল মাত্র ব্যস্ত বন্দর নগরী হিসেবে। দিল্লী সুলতানাতের বঙ্গাল সুবহ্‌তে যে প্রধান অঞ্চলগুলি, তার মধ্যে সব থেকে বর্ধিষ্ণু এই সপ্তগ্রাম। তাকে সামলাতে তিনটি পৃথক শাসনতন্ত্র নিয়োগ করা হয়েছিল - সাতগাঁও সরকার, সেলিমাবাদ সরকার ও মান্দারন সরকার (যার থেকে গড় মান্দারন)। যা দেখে অবাক লাগে, বখতিয়ার খিলজীর গৌরবঙ্গ দখলের পরেও সপ্তগ্রাম অঞ্চলে তাদের শাসন ব্যবস্থা বলিয়ান হয়েনি। সে অর্থে মুসলমান শাসন শুরু হয়েছে অনেক পরে দিল্লীর সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবানের রাজত্বের শেষ দিকে (বলবানের পুত্র নাসিরুদ্দিন বুঘ্রা খান বঙ্গাল সুবাহ-র দায়িত্বে ছিল, পরবর্তীকালে স্বল্পসময়ের জন্য বাংলার স্বাধীন শাসক)। এরপর সাতগাঁওয়ের গুরুত্ব বাড়তে বাড়তে মুহম্মদ বিন তুঘলোকের আমলে টাঁকশাল শহর হিসেবে পরিচিতি পায়, যা শের শাহ-র আমলেও একই ভাবে প্রচলিত ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বাড়তি গুরুত্ব পেতে থাকা এই পূর্বদিকের শহরটি ক্রমে বন্দর নগরী হয়ে ওঠে। চাল, পরিধান-বস্ত্র থেকে শুরু করে রান্নার মশলা পর্যন্ত সব রপ্তানী হ'ত এই বন্দর থেকে। বাংলায় প্রথম ইয়ুরোপীয় উপনিবেশের বীজ ব্যপন হ'ল ১৫৩৫ খ্রীষ্টাব্দে... যেদিন সুলতান গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহ অনুমতিপত্রে শিলমোহর দিলেন - সপ্তগ্রামে পোর্তুগীজ কারখানা স্থাপন করার। তারপর হঠাৎ করেই শোড়শ শতকের শেষদিকে এতদিনের বিত্তশীল, সমৃদ্ধশালী বন্দর নগরী চট্টগ্রাম যেন ধুঁকতে শুরু করল! প্রশাসনিক কারণেই গৌড় থেকে বাংলার শাসন কেন্দ্র প্রথমে তান্ডা এবং পরে নদীর অপর পাড়ে রাজমহলে স্থানান্তরিত করা হয়। এবং প্রায় সেই সময় থেকেই মুগল-আফগান সংঘর্ষ সাতগাঁও বন্দরের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয়। ওই সময়ে আরাকানিদের (মগ দস্যুও বলা চলে) সহযোগিতায় পর্তুগিজ জলদস্যুরা ভাগীরথী নদীর মোহনা নিজীর নিয়ন্ত্রণে রাখত (একদম প্রচলিত ইয়ুরোপীয় বোম্বেটে কায়দায় জলপথ নিয়ন্ত্রণ)। ফলে বাংলার এবং সপ্তগ্রামের স্থানীয় মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল অচিরেই। অবশেষে, ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দের পর সাতগাঁও বন্দর প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং বাণিজ্য কেন্দ্র হুগলীতে সরিয়ে নেয় পর্তুগীজরা (যা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে আর এক সংঘাতের ইতিহাসের সূচনা)। নদীর পশ্চিম পাড়ে বেতর গ্রামটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। একে একে বহু বণিক পরিবার সপ্তগ্রাম ছেড়ে হুগলীতে চলে আসতে শুরু করেন। শেঠ ও বসাকেরা চলে আসেন বেতরের অপর পাড়ে গোবিন্দপুর গ্রামে (নাম টা চেনা ঠেকে?)। অনেক পরে সুতানুটিতে আসেন জোব চার্নক... ব্যস্‌, খেল খতম। সপ্তগ্রাম বন্দরের সম্পূর্ণ পতন হ’লে উত্থান ঘটে নতুন বন্দর নগরী কলিকাতার... উত্থান-পতনের ভিন্ন ইতিহাস। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে, যখন ওলন্দাজরা তাদের দলবল নিয়ে ব্যবসা ফাঁদতে চুঁচুড়া তে এলো, তখন কাছাকাছি এই পরিত্যক্ত পারা-গাঁ সপ্তগ্রামকে দেখে আর সেই দিল্লি সুলতানাতের বন্দরনগরী সাতগাঁও বলে চেনার উপায় নেই। মুঘল-আফঘান দ্বৈরথ, বারো-ভুঁইয়ার অধীশ্বরদের বিদ্রোহ, সামগ্রিক রাজনৈতিক অরাজগতা... এবং সর্বোপরি বন্দরনগরী হিসেবে পর্তুগীজদের কাছে সপ্তগ্রামের গুরুত্ব কমে যাওয়া... এই সব কিছুই হয়ত এত বড় একটা জনপদের দ্রুত পতন এবং মর্মান্তিক পরিনতির কারণ (এই অঞ্চল আজ কেবল পিছিয়ে পড়া গ্রাম-মফঃস্বল ছাড়া আর কিছুই নয়)। কিন্তু সপ্তগ্রামের পতনের মূল এবং কীলক কারণটা খুঁজতে গেলে যে শব্দে গিয়ে ধাক্কা খেতে হবেই... তা হ’ল ‘সরস্বতী’।

ঠিক যেমন উত্তর ভারতে, সেরকম এই পশ্চিমবঙ্গেও এক ত্রিবেণী সঙ্গম রয়েছে... রয়েছে এক সরস্বতী নদী... তারও ক্রমে হারিয়ে যাওয়ার আখ্যান। বাংলার এই সরস্বতী নদী প্রসঙ্গে কিছু বলতে হ’লে বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায়ের রচনা থেকে একটি বিশেষ অংশের দিকে তাকানো খুব প্রয়োজন –
“… জাও ডি ব্যারোস(১৫৫০) এবং ভন ডান ব্রোকের নকশায়(১৬৬০) পুরাণোক্ত প্রাচীণ প্রবাহপথের ইঙ্গিত বর্তমান বলিয়া মনে হয়। এই দুই নকশার তিলনামূলক আলোচনা করিলে দেখা যাইবে, সপ্তদশ শতকে জাহানাবাদের নিকট আসিয়া দুইভাগে বিভক্ত হইয়া দামোদরের একটি প্রবাহ (ক্ষমানন্দ কথিত বাঁকা দামোদর) উত্তর-পূর্ববাহিনী হইয়া নদীয়া-নিমতার দক্ষিণে গঙ্গায়, এবং আর একটি প্রবাহ দক্ষিণ বাহিনী হইয়া নারায়ণগড়ে্র নিকট রূপনারায়ণ-পত্রঘাটার সঙ্গে মিলিত হইয়া তম্বোলি বা তমলুকের পাশ দিয়া গিয়া সমুদ্রে পড়িতেছে। আর মধ্য ভূখণ্ডের ত্রিবেণী-সপ্তগ্রামের নিকট হইতে আর একটি প্রবাহ(অর্থাত সরস্বতী) ভাগীরথীর হইতে বিযুক্ত হইয়া পশ্চিম দিকে দক্ষিণবাহিনী হইয়া কলিকাতা-বেতোড়ের দক্ষিণে পুণর্বার ভাগীরথীর সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে। এক শতাব্দী আগে, ষোড়শ শতকে জাও ডি ব্যারোসের নকশায় দেখিতেছি, সরস্বতীর একেবারে ভিন্নতর প্রবাহ। সপ্তগ্রামের (Satigam) নিকটেই সরস্বতীর উত্পত্তি, কিন্তু সপ্তগ্রাম হইতে সরস্বতী সোজা পশ্চিম বাহিনী হইয়া যুক্ত হইতেছে দামোদর প্রবাহের সঙ্গে, বাঁকা দামোদরের সঙ্গমের নিকটেই। এই বাঁকা দামোদরের কথা বলিয়াছেন সপ্তদশ শতকের কবি ক্ষেমানন্দ(১৬৪০) তাঁহার মনসামঙ্গল কাব্যে। …যাহাই হউক, দামোদর বর্ধমানের দক্ষিণে যেখানে হইতে দক্ষিণবাহী হইয়াছে, সেখানেই সরস্বতীর সঙ্গে তাহার সংযোগ- ইহাই জাও ডি ব্যারোসের নকশার ইঙ্গিত। আমার অনুমান, এই প্রবাহপথই গঙ্গা-ভাগীরথীর প্রাচীণতর প্রবাহ পথ, এবং সরস্বতীর পথ ইহার নিম্নঅংশ মাত্র।”

অর্থাৎ, আপাত ভাবে দেখে সঙ্গমের মত মনে হলেও, ভাগিরথীরই এক শাখা ভাগিরথী থেকে বেরিয়ে এসে আবার তার ভেতরে প্রবেশ করছ অন্য এক যায়গায়। স্পষ্টতই ‘গাঙ্গেয় অববাহিকা’-এ ভাগিরথী, হুগলী, দামোদর প্রভৃতি নদীর এই ভাঙা-গড়ার খেলায় এই সরস্বতী নদীর এক কালে জন্ম। এবং এই সরস্বতী নদীই সপ্তগ্রামের উত্থান এবং পতনের প্রধান কারণ। বোঝাই যায় এই সরস্বতী নদী মোটেই সেই বৈদিক সরস্বতীর মত প্রাচীন প্রবীণা নয়... কালের হিসেবে তার যৌবন ছিল কিছুকাল আগেও... এখন অবিশ্যি শুধু বিগত যৌবনাই নয়... নিখোঁজ। যা আছে, তাকে আর নদী বলা চলে না কোনও মতেই। সরস্বতী নদী হুগলী নদীর বর্তমান গতিপথের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে আনুমানিক তেরশো বছর আগেই। দ্বাদশ শতকের প্রথমার্দ্ধে সরস্বতী নদী ত্রিবেনীর সংযোগস্থল থেকে (হুগলী জেলায় ব্যান্ডেলের কাছে) বের হয়ে আসে এবং পশ্চিম দিকে কিছুদূর প্রবাহিত হওয়ার পর হাওড়ার বিপরীতে বেতরে হুগলী নদীর সাথে আবার মিশে যাওয়ার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নেয়। এভাবে প্রবাহিত হওয়ার ফলে একটি শাখানদী সৃষ্টি হয়। উনিশ শতকের শেষের দিকে সপ্তগ্রামের সেই জনপদের ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায় - শাখানদীর ওপরের দিকে নদীর দক্ষিণ তীরে সেই বর্ধিষ্ণু নগরী অবস্থিত ছিল। এই সরস্বতীর নদীর প্রবাহ এবং নাব্যতা... আর একটু এগিয়ে ভাগিরথী-হুগলী-আদিগঙ্গ সিস্টেম... এরাই ছিল সপ্তগ্রামের বন্দর নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণ। পর্তুগীজদের সপ্তগ্রামকে বেছে নেওয়ার কারণও এই সরস্বতী নদীর জলপথই। এমন কি, কারও কারও মতে ওই সরস্বতী নামক শাখানদীটিই ছিল হুগলী নদীর মূল প্রবাহ এবং হুগলী নদীর বর্তমান প্রবাহ তখন গঠন প্রক্রিয়াধীন ছিল।

পর্তুগীজদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে মনে হয়, সপ্তগ্রামের বিস্তার শুরু হ’লে তা প্রথমে নদীর দক্ষিণ তীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়, এবং পরে নদীর সমান্তরালে দক্ষিণ দিকে মোড় নেয়… আর একসময় হঠাৎই পূর্বদিকে ভাগীরথীর দিকে বিস্তার পেতে শুরু করে। ফরাসি পর্যটকের বিবৃতি থেকেও মনে হয় যে, নগরটি ভাগীরথী নদী পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। এই সময়ের মধ্যেই সাতগাঁওয়ের বিবর্তনের এই তিনটি দশা ধরা পড়ে –
প্রথম দিকে নগরটি পশ্চিম দিকে নদীর সমান্তরালে অগ্রসর হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে, নদী সমান্তরালে দক্ষিণ দিকে এগোতে থাকে।
শেষ দিকে, নগরটি পূর্বদিকে সরে যেতে থাকে ক্রমশ। আসলে, ভাগীরথীর জলপথে প্রবাহিত হওয়ার জন্য নগরটি এই সরস্বতী নদী থেকে দূরে সরে যায়।
এর থেকে সরস্বতী নদীর, বিশেষ করে পলিজনিত কারণে এর মোহনার দিকে ক্রমশ ভরাট হওয়া এবং ক্রমে তার জলপ্রবাহ ক্ষীণ হতে হতে হারিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট। আর এই ভাবে নদীর অকাল মৃত্যুর কারণেই সপ্তগ্রামও হারিয়ে গেল নদী মোহনায় পলি জমে জমে।

আর এখন, সেই সরস্বতীর অবশেষ বলে যে জলের ধারা (নাকি নেহাতই দূষিত জলাশয়) তা ওই ত্রিবেণীর কাছে এক ক্ষীণ ধারা, বয়ে যাওয়া খাল... তারপর কিছুই না! ত্রিবেণী থেকে বেরিয়ে শঙ্খনগর, তারপর সপ্তগ্রাম পার করেই হারিয়ে গেছে প্রবাহপথ। আবার যাকে অন্ত বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেই সাঁকরাইলের কাছ থেকে যদি পিছু হাঁটা শুরু হয়, (ওই হুগলী নদীর জল ভেতরে প্রবেশ করেই তার যা কিছু জলসম্পদ) কিছু দূরে আন্দুল, তারপর জঙ্গলপুর পার হয়ে ভাণ্ডারদহ’র কাছে এই সরস্বতী নদীই বেবাক পার্বতীপুর খাল! তারপর ডোমজুরের কাছে একই ধারা ডমজুর-জগদীশপুর খাল! আবার গয়েশপুরের কাছে সরস্বতী নদী... আর কালীপুর(একেবারেই বিশেষ কোনও জায়গা নয়) পেরিয়ে আর একটু এগিয়ে প্রবাহের রেখা হারিয়ে গেছে... হয়ত খাল-বিলে, অথবা বুঁজে যাওয়া অথবা বুঁজিয়ে দেওয়া জনবসতি, কিংবা মাছের ভেরিতে। সেই সপ্তগ্রামের পর কিছু নেই, আর এই কালীপুরের পর আর কিছু নেই... তার মাঝে এই যে হারিয়ে যাওয়া... কি অদ্ভুত ভাবে সেই বৈদিক সরস্বতীর মাঝপথে হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এক হয়ে যায়! বিনাশন যেন নিজের ধর্মেই সরস্বতীকে খুঁজে নেয় এই ভাবে। নর্মদা বাঁচাওয়ের মত গলা ফাটিয়ে কোনও মেধা পাটেকার তো সরস্বতীর জন্য বসেননি (সরস্বতী নদী রক্ষা কমিটির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি), আর উত্তাল আন্দোলন, অনশন, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সাংঘাতিক দ্বৈরথের কোনও বাজার গরম করা গল্পও প্রচলিত নেই। তাই এই ভৌগলিক হিসেব, ম্যাপ নিয়ে বসা... আর ক্ষীণ স্রোতে গঙ্গার ঘোলা জলে সাঁকরাইলের সরস্বতীকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিই বা করার থাকে? এই বাংলাদেশে এক কালে খুব সোহাগ করে নাম রাখা হ’ত বটে নদীদের... সে ছিল অন্য প্রজন্ম, ভিন্ন সময়... তারপর তার কি হ’ল, কেমন করে মরে-হেজে গেল, তা দেখার আর সময় কই?... অন্য প্রজন্ম, ভিন্ন সময়! কোথাও এক উদাসীন কণ্ঠ বলে উঠবে ‘ও বেসিন এরিয়াতে নদীর ধর্মই তাই, বার বার খাত পালটায়, আর একটা শাখা তৈরী হয় অন্য শাখা শুকিয়ে যায়।’ আবার কেউ হয়ত বলবে, ‘এখন আর এই নিয়ে কে কি করতে পারে? সরস্বতী তো তিন’শ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছিলো, এখন ওই মরা খালে জল এনেই বা কার কি উগ্‌গার হবে?’
কিংবদন্তী নদী ‘সরস্বতী’র সত্ত্বাই হয়ত এমন যে একবার হারিয়ে গেলে আর তার পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়ে ওঠে না। হয়ত সেই প্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতা এমনটাই অনুভব করেছিল... কালের কাছে আত্মসমর্পন করেছিলো সভ্যতার সেই অধ্যায়। কিছুটা হলেও সেরকমই যেন দেখতে পাওয়া যায় এই পশ্চিমবঙ্গতেও। এক বহু জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক সংবাদ পত্রের কিছুটা অংশে সরস্বতী নদীর দুর্দশা এবং বর্তমান হতাশাজনক পরিস্থিতির এই চিত্রটা ঠিক সেই ইঙ্গিতই দেখাচ্ছে –
“দীর্ঘ চার বছর ধরে সরস্বতী নদীর সংস্কারের কাজ চলার পরেও তার অবস্থার কোনও পরিবর্তনই হয়নি বলে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ। জঞ্জাল, কচুরিপানা আর দু’ধারে দখলদারির জেরে নদী বলে সরস্বতীকে চেনা দুষ্কর। বেশ কিছু এলাকায় খালের পাড়ে নেমেছে ধস। নদীর পাড়ের কংক্রিটের স্ল্যাব ঢাকা পড়েছে জঙ্গলে। কিছু কিছু এলাকায় ওই স্ল্যাবগুলি ধসে নদীতে নেমে গিয়েছে।
ডোমজুড়ের বাসিন্দা কাশীনাথ পাড়ুই বলেন, ‘শুনেছিলাম সরস্বতী নদীর সংস্কারের ফলে আবার আগের মতো তার প্রবাহ ফিরে আসবে। কিন্তু তা আর হল না। নদী দেখতে মালুমই হয় না যে সংস্কার হয়েছে। আবর্জনা, কচুরিপানার জঙ্গলে ফের ভরে গিয়েছে নদী। এত টাকা খরচ করে সংস্কারের কোনও সুফলও মিলল না।’
সরস্বতী নদী বাঁচাও কমিটির সম্পাদক বাপিঠাকুর চক্রবর্তী বলেন, ‘সরস্বতী নদীর সংস্কারের দাবিতে আমরা প্রথম কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থে মামলা করি। এর পর এই মামলায় জেতার পর সরস্বতী নদী সংস্কারের জন্য ৩২ কোটি ১০ লক্ষ টাকা অনুমোদিত হয়। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি।’
সেচ দফতরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার স্বপন দত্ত বলেন, ‘সরস্বতী নদী সংস্কারের পর আর কোনও ডেভেলপমেন্ট হয়নি। আবার নদীতে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। তবে ফের ভাবনা-চিন্তা চলছে, যাতে নদীর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।’ ”

(৪)

পিঁপড়ে... কেন কামড়াস?

তারপর? তারপর আর কি... সে আর্যবর্তই হোক, বা রাজস্থান, বা মধ্যপ্রদেশ, অথবা এই পশ্চিম বাংলা... সরস্বতী নদীর অবস্থাটা একই… সে যেন আমাদেরই সভ্যতা, সমাজ-ব্যবস্থা এসবের একটি অবস্থানগত প্রতিনিধি, যার এত হাজার বছরেও কোনও পরিবর্তন হয়নি। ওই মাঝের হারিয়ে যাওয়াটাই সময়ের এক বিরাট বড় শিক্ষা, যেন কান ধরে শিখিয়ে দেয় সকলকে... যা কিছুর জন্য রক্তক্ষয়ী সবকিছু, সবই বিনাশনে লীন হবে ওই ভাবে। অজয়, আত্রেয়ী, বিদ্যেধরী, ফুলেশ্বরী, ইছামতী, কংশাবতী, চূর্ণী, মহানন্দা, ময়ূরাক্ষী, পূর্ণভবা, পিয়ালি, রায়মঙ্গল, সরস্বতী, শিলাবতী, সুবর্ণরেখা...আরও কত... দেখলে মনে হয় কেউ সযত্নে নিজের সন্তানের নাম দিয়ে গেছে কেউ। না জানি কত বছর ধরে শিরা-ধমনীর মত বাংলার বুকে এরা বয়ে চলেছে... ছড়িয়ে দিয়েছে অমৃত ধারা। ধরণীর বুকে প্রাণ সঞ্চার করার এই ঋণ পরিশোধ করার বৃথা চেষ্টা না করে হয়ত প্রতিদানে এমন নাম দিয়ে আপন করে নিয়েছিল এদের কোনও প্রজন্ম। সেই সব নদীগুলোর একে একে শুকিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া মাটির বুক থেকে... যেন সেই সন্তান-স্নেহ’র হারিয়ে যাওয়া... হয়ত এক একজন মায়ের হারিয়ে যাওয়া। ওই যে বয়ে যাওয়া দূষিত খালগুলো, তার নাম যে কোথাও সরস্বতী... ওই যে আলিপুরের পাশ দিয়ে মড়ার মালা, আর কুকুরের আধখাওয়া লাশ ভেসে যাওয়া নালাটাকে সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা এক কালে আদিগঙ্গা বলে তার পাড়ে ঢাক পিটিয়ে বলি দিতো... কয়েক বছর পর হয়ত কেউ আর সেভাবে মনে রাখবে না। যেমন ভারতীও চেনেনি ওই বয়ে যাওয়া এঁদো খালটার কি নাম... ওকে কেউ কোনওদিনও বলে দেয়নি - কোথাও লেখা আছে, সরস্বতীরই আর এক নাম ভারতী। ভারতী নামটা ধরেই বা শেষ কবে কে ডেকেছিলো? শুধু নিজেই নিজেকে চেনে এখন ওই নামে। এও জানে না কবে কে রেখেছিলো এই নাম। আরও কত কিছুই তো জানে না। যেমন জানে না, এর পর কোথায় যাবে। সকালের আলো ফোটার আগেই ওই খাল পাড়ের বস্তি ছেড়ে চলে এসেছে কাপড়ের ব্যাগটায় যা কিছু নিয়ে। ভোর থেকে স্টেশনে... একদিকে হাওড়া স্টেশনের ট্রেন, আর উলটোদিকে ব্যান্ডেলের। একরাশ ধূলো উড়িয়ে ঝাঁট দিয়ে চলেছে ছেলেগুলো... স্বচ্ছ ভারত। কোন দিকের টিকিট কাটবে ভাবতে ভাবতেই দু’টো ট্রেন চলে গেল। কোন দিকে যাবে তাও জানে না। শুধু এ’কদিনে মোক্ষম জেনেছে... ওই মানুষটাকে ছাড়াও বাঁচা যায়... সব কিছুর ওপরে বেঁচে থাকা।