হারিয়ে যাওয়া কবি: সুশীল ভৌমিক

জয়দীপ মৈত্র


ভাষা ভুলে গেলে
গলগন্ড দিয়ে কবিতা লিখবো,তোমরা
পড়বে আর হাসবে সবসময়,যখনই মনে পড়বে
এভাবে ক্রমশঃ জুড়ে ফেলবো বন-
রাস্তা,পার্ক থেকে মাছের বাজার


তোমাদের গ্রন্থিতে ঘুম,সে-ঘুমও
হাসবে আমার কবিতার কথা মনে করে”

.
অন্ধকার ঘরে একা তিনি শুয়ে আছেন।চোখ বন্ধ।দরজা বন্ধ।জানালা দিয়ে ঠান্ডা চাঁদের আলো এসে পাঁজরের সাদা হাড় ঝকঝক করছে।অনন্ত সাদা হাড়।ভেঙে পড়া সাম্রাজ্যের শেষ রাজপ্রাসাদের থামের মতো।কোথাও কোনো চিৎকার নেই।ত্রাস নেই।শুধু মৃদু বিপন্নতা কাঁপছে।চোখ বন্ধ অবস্থাতেই একটু একটু উঠছেন,আবার শুয়ে পড়ছেন।দূরে,বহুদূরে কোনো হলুদ ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তে শেষবারের মতো দশটার ঘন্টা বাজতেই তাঁর চোখ খুললো।কারো আসার কথা আছে।জ্যোৎস্না তার জুতোর শব্দে মিশে যাবে।সে আসলেই তিনি বিছানা থেকে উঠবেন।হাসিমুখে তাঁকে সে এগিয়ে দেবে টেবিল-ল্যাম্পের কাছাকাছি।তারপর তাঁর সারা শরীর ভরিয়ে দেবে শান্ত কালো অক্ষরে।ল্যাম্পের আলোয় নতুনভাবে উদ্ভাসিত হবেন তিনি।কিছুক্ষণ, তারপর জানলা দিয়ে উড়ে যাবেন অন্য কোথাও,যেখানে কেউ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেনা।যেখানে অপেক্ষার অর্থই হচ্ছে গন্তব্য থেকে আলোকবর্ষ দূরের কোনো নিঃসঙ্গ জাহাজযাত্রা।সম্পূর্ণ একা।রক্ত,মাংস,ঘাম,লোভ থেকে দূরের সেই গুহার দিকে।অন্ধকারই যেখানে আলোর উৎসের সন্ধান সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবে দিতে সক্ষম।এমনকী,এসব যদি নাও হয়,সেই রহস্যাবৃত আগন্তুক তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে টেবিলের নিচে ছুঁড়ে দেবে তাঁকে।কিংবা, ছিঁড়ে ফেলে অন্ধকার ঘরের শীতল মেঝেতে ছড়িয়ে রাখবে।দুভাবেই তিনি পুড়বেন।তিনি আসলে এক সাদা কাগজ।তিনি ধবধবে পৃষ্ঠা।ব্যক্তিগত অস্তিত্ত্বহীন,কিন্তু তীব্রভাবে সম্ভাব্য।জঙ্গলের গভীরে হঠাৎ দেখা কালো বাঘের চোখ।তিনি সুশীল ভৌমিক।
.
সম্ভবত ফেব্রুয়ারী মাসের এক সন্ধে।বহরমপুরের স্কয়্যারফিল্ডে অনুষ্ঠিত বইমেলায় এক মেঠো আড্ডা চলছিলো।সেখানেই সমীরণ দা(ঘোষ) এবং অমিতাভ দা(মৈত্র)র মুখে প্রথম শুনি ওনার নাম।“সুশীল ভৌমিকের লেখা না পড়লে বহরমপুরের কবিতার ইতিহাস সম্পর্কে কোনো ধারণাই পাবিনা” বলছিলেন অমিতাভ দা।তার পরের মাসে কবিতা কার্নিভাল অনুষ্ঠিত হলো বহরমপুরেই।প্রকাশ পেল “কথামুখ” পত্রিকা।পত্রিকার প্রথম কবিতাতেই আমি সুশীল ভৌমিকের মুখোমুখি।“জল দাও।কোনো এক পাথরের জল”-বোধের অতলান্ত থেকে উঠে আসা এই প্রথম লাইনটি আমার হৃৎপিন্ডতে প্রথমে মৃদু টোকা দিয়ে তারপর রক্তমাংস সুদ্ধ ঝাঁকিয়ে দিয়েছিলো।মোচড় দেওয়া এক পাহাড়প্রমাণ যন্ত্রণার ডগাটুকুই দেখেছিলাম সেদিন সমূদ্রে।আর নিজের শরীরে অনুভব করেছিলাম অতল ফেনা,ঢেউ আর তীব্র নুন।গোটা কবিতাটার সামনেই স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম অনেকক্ষণ।প্রথম সাক্ষাতে সেই মুহূর্তের অনুরণন যে একটা বাদ্যযন্ত্রের জন্ম দেবে কোথাও এটুকু বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।
.
সেপ্টেম্বর মাসের এক সকাল।অমিতাভ দার লেখা “সাপলুডো”র একটা পৃষ্ঠা কিছুটা ভিজে গেছে।ফোঁটা ফোঁটা জল ছড়িয়ে আছে দু-তিন জায়গায়।সাদা পাতা তাকে শুষে নিচ্ছে আর ওই অংশগুলো একটু চুপসে গেছে।শক্তি বলেছিলেন “বুকের মধ্যে কিছু পাথর থাকা ভালো”।সুশীল ভৌমিককে নিয়ে লেখা অমিতাভ দার অংশটুকু বুকের কোথায় যে ধাক্কা মেরেছিলো জানিনা।তবে হঠাৎ করেই-

“জানিনা কেন যে কান্না এলো”


একজন মানুষ হারিয়ে যেতে কেন চায়?কোথায় সরে যেতে চায়?রাস্তা থেকে চুপচাপ সরে যেতে শুরু করলে গলিরা তাকে মনে রাখে,কিন্তু গন্তব্য তাকে অস্বীকার করতে শুরু করে।সে করুক,ক্ষতি নেই।অজানা গলিঘুঁজির অজানা অন্ধকারে যারা আগুন পোহায়,তারা হয়তো মুখ তুলে তার দিকে তাকায়।বরফের কুচি ঝেড়ে ফেলে আগুন তখন সাহস করে সেই শীতার্তের দিকে এগিয়ে যায়।আর তারপর-


“সাদা রুমালের জন্য ধন্যবাদ।দ্রুত ফিরে আসার জন্য ধন্যবাদ।
একজন অনুতপ্ত শুধু সরে বসে জায়গা করে দিচ্ছে
তিনজন অনুতপ্তের জন্য।”
-অমিতাভ মৈত্র

আগুন যাকে আলোর জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়,আগুনে পুড়ে পুড়ে সে হারিয়ে যেতেই তো চায়।অজানা উৎসের সন্ধানে,ব্যক্তিগত খোঁজের গলিগুলোতে দগ্ধ হয়ে সুশীল বাবু হারাতেই তো চেয়েছিলেন।সারা জীবন এক অদ্ভূত নীরবতার ঘেরাটোপে নিজেকে এবং নিজের কবিতাকে আবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছিলেন।তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো কোনো অজানা গভীর গাছের কাঠ কেটে তৈরি করা এক বাঁশীতে কোনো রক্তাক্ত বাদক তার শেষ ফুঁয়ের জন্য বাতাস ভরে রেখেছেন কিছু কিছু করে।বোধের চারণভূমি থেকে ঊদ্ভূত প্রত্যেকটি কবিতা আছড়ে পড়েছে বহুদূরের কোনো সাদা সমুদ্রে।যেখানে কোনো পায়ের ছাপ মিলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।কোনো জাহাজের দেখা পাওয়া যাবেনা।শুধু একটানা এক প্রচন্ড গুমরে ওঠা,যা বিস্ফোরণের আকারে নৈঃশব্দ তৈরী করেছে,তাকে কিছুটা ছুঁয়ে আসা যাবে।বহু কবিতা উদ্ধার করা হয়তো যায়নি।এর মূলে আছে তাঁর অদ্ভূত স্বভাব।কবিতা লেখার সময় তাঁর ঘরে কেউ এলে তিনি সটান সেটি ছিঁড়ে ফেলে দিতেন,বা লুকিয়ে রেখে দিতেন এবং কখনোই আর সেটি লিখতেন না।এমনকী, কোনো কবিতা লিখেও তৃপ্তি না পেলে তিনি সেটি ছিঁড়ে ফেলে দিতেন।“ব্যক্তিগত জীবন ও কবিতায় আমি পুড়েই যেতে চেয়েছি-সঠিক ভাবে এই ছিলো কবিতায় আমার উদ্দেশ্য”-এটাই তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন এবং তিনি পুনঃমার্জনার পক্ষপাতী ছিলেন না এজন্যে “যে প্রত্যেক মুহূর্তের মানুষ আলাদা,অসত্যের সম্ভাবনাও থেকে যেত নাহলে”।পরবর্তী কালে বহু কবিতাই তিনি তাঁর নিজের প্রকাশিত কবিতা সমেত,তাঁর ভাষায় “ঝাঁকামুটের মাথায়” তুলে দিয়েছেন।এই অদ্ভূত সাধনা জগতের মধ্যে বিষণ্ন সন্ন্যাসীর মতো তিনি অপেক্ষা করেছেন কী কোনোকিছুর?

“উজ্জ্বল কিছুর জন্য ফাঁকা আগুনের শান্ত অপেক্ষা
যখন দূরত্বও পর্যাপ্ত নয় পৌঁছনোয়

এবং দূরত্বই নেই বলে অতিক্রমও করা যাচ্ছে না

এতদূর,যেন নদীর ভেতরে কোনো সরু কাঠ তলিয়ে যাচ্ছে
ফাতনা হতেই পারে সেটা
আদিগন্ত নৌকার দাঁড়ও হতে পারে”

সত্যিই জানিনা এই পংক্তিগুলি আমি নিজেই বা কেন লিখে ফেলেছিলাম।সত্যিই হয়তো জানিনা সুশীল ভৌমিক কেন হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।যারা “Waiting for godot” পড়েছেন তাঁরা কি মিল পাবেন সুশীল ভৌমিকের সাথে সেই অপেক্ষারত দুজনের?সত্যিই জানিনা।হারিয়ে গিয়েছে তাঁর বহু কবিতা।তবু যা আছে তার মধ্যে থেকেই কয়েকটি কবিতা পাঠকের সাথে শেয়ার না করে পারছিনা-

বাড়ি
*********
বাড়িঘর ভাবতে গিয়ে ঘুম পায়,গভীরতা পায়
বাড়ি মানে......
মাঠে আমি,দূরে সব লোকজন
নেকড়ের দাঁতে তখন সরোদ বাজছিলো
বাড়ি মানে মাথার স্মৃতিশূন্য খুলি,রোদা অনুভব
যা কিনা বেজে ওঠে অতিসূক্ষ্ম অতলের
কাছে...
আয়নাগুলো কথা বলে,জল কথা বলে,আমি
থাকি একা শূন্য আমার গভীরে


কি নির্লিপ্ত কন্ঠস্বর নিয়ে একজন গভীরতার কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন আর অনুভবের শেকড় ধরে নাড়া দিচ্ছেন!সূক্ষ্মতম শূন্যতাকে জট পাকাচ্ছেন এমন ভঙ্গীতে,যেন কোনো বাড়ির সবথেকে নির্জন জায়গায় বসে কেউ পৃথিবীর বিষণ্নতম সন্ধ্যে হতে দেখছে।এই ভাষা আজ থেকে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে লেখা।যেন সময়ের ওপার থেকে শূন্যতা তাঁকে হাতছানি দিচ্ছে,আর কালো পাঁচিলের ওপর সবুজ শ্যাওলার মতো তিনি,নিত্যনতুন দাঁড়াচ্ছেন তাঁর আদি অনন্ত চেতনা নিয়ে।সেই হারিয়ে যাওয়া,সেই চলে যাওয়া বারবার।

আরেকটি কবিতার কথা মনে পড়ছে-

অসুস্থতার গল্প
**********
অসুস্থতা,আমিও প্রেমিক
অসুস্থতার পাশে বসে অসুস্থতা,জানি
তবু ও পার্কের বেঞ্চে মৃদু হাওয়া-বিনয়ী বাদামওলা
আসে সন্ধ্যা এলে
মামাতো বোন রোজ ফোন তুলে খোঁজ নেয় মামাতো বোনের

এইটুকু জানা হলে
করিডোর ক্রমাগত বাঁকা ও ফাঁকা হতে থাকে
দ্রুত হেঁটে নার্সরা ড্রেস খুলে নেমে যায়
পুরুষ নামক শ্লথ অবকাশে
দূর থেকে দেখা নদী শাদা হয়..........
আমার অসুস্থতা সুটকেস নিয়ে ছোটে ভিড়ের ভেতর
অসুস্থতা ,অসুস্থতা , অসুস্থতা;
এখনও তো ঝুঁকে আছি উত্তর দিকেই
আমিও প্রেমিক জেনে ওষুধ ও পৃথিবী আছে,আর কিছু নেই


এইরকম অসহ্য এক উচ্চারণ তিনি শরীরের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে দিতে পারেন।কলার ধরে ঝাঁকিয়ে দিতে পারেন এবং এক অজানা রহস্যময় ভয়ের দরজা খুলে দিতে পারেন-
“এইটুকু জানা হলে
করিডোর ক্রমাগত বাঁকা ও ফাঁকা হতে থাকে”

যেন নিরুদ্দেশের সেই গুহার সামনে খুল যা সিম্ সিম্ করছে কেউ,আর ঝর্ণায় ভিজিয়ে দিচ্ছে তার ঘোড়া,লাগাম এবং ব্যক্তিগত অনুভুতিগুলো।

আরো একটি কবিতার কথা বলা যেতেই পারে-

প্রকৃত কারুর কাছে
****************
সারাদিন ড্রাইভারের মতো ক্লান্ত শরীর টেনে ফিরে এলে
প্রকৃত কারুর কাছে যাওয়া শুরু হয়
স্মৃতির অরণ্য ঘুরে সার্চলাইট আলো দেয়
আহতের চোখের ওপর
দুদিকে চেয়ার সাজিয়ে তখন
এক নিদ্রিতের সঙ্গে আমার যেন দেখা হয়
বহু কাল পর
তখন পাঞ্জাবি গলিয়ে বন্ধুদের সাথে শুধু বারান্দা অবধি
যাওয়া যায়
তখনই প্রকৃত কারুর কাছে যাওয়া শুরু হয়,
প্রকৃত কারুর কাছে যেতে পারি ।
তখন হলুদ টেলিপ্রিন্টার নিউজের মতো সমস্ত শরীর
টিপ-টিপ জমা হয়
রুদ্ধদ্বার ঘরের ভেতর

লক্ষ্য করুন পাঠক –“দুদিকে চেয়ার সাজিয়ে তখন/এক নিদ্রিতের সঙ্গে আমার যেন দেখা হয়
বহু কাল পর/ তখন পাঞ্জাবি গলিয়ে বন্ধুদের সাথে শুধু বারান্দা অবধি/যাওয়া যায়”
হাসপাতালের হলুদ চাদরের গন্ধ ছড়িয়ে আপনি কোথায় চলে যেতে চেয়েছিলেন সুশীলবাবু?চলে যেতে গিয়েও এমন তীব্র আকুতি যেন নিশ্চিত পরিণামেরও একটি পেছন দরজা থাকে।সমাজ রাজনীতি জীবনযাপন সমস্ত কিছু থেকে এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিয়ে অন্তরালে চলে গিয়ে মানুষের চিরন্তন শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।আসলে কবিতা শূন্যেরই সাধনা,এমন এক যাত্রাপথ যার কেন্দ্রটি শূন্যবিন্যস্ত, অনির্দিষ্ট এবং বিপজ্জনক।টার্নারের “Dawn after the wreck”নামক সেই ছবির মতোই যা স্নিগ্ধ অথচ নেপথ্য ভয়ঙ্কর এক শূন্য অস্তিত্ত্ব জর্জরিত।ওপরে আলোচিত কবিতায় বহু,কাল এবং পরের মধ্যবর্তী এই স্পেস ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দেয় যখন তিনি নিজের হলুদ শরীরকে টেলিপ্রিন্টার নিউজের মতোই ঘরের ভেতরে পাঠিয়ে দেন।এই স্বেচ্ছা নির্বাসন তখন আরেকজনের স্বপ্নে অনধিকার প্রবেশের মতো হয়ে ওঠে।হয়ে ওঠে আহতের চোখের মতোই একইসঙ্গে নিষ্প্রভ এবং অপেক্ষমান।এই অপেক্ষাই সারাটা জীবন ক্লান্ত করেছে তাঁকে।হারিয়ে দিয়েছে বারবার এবং ক্লান্ত ড্রাইভারের মতোই শূন্যতার কেন্দ্রস্থলে কড়া নাড়তে বাধ্য করেছে।

“আমি কোনো গাছ দেখে এখনো বিস্মিত আছি
এখনও শরীরে দেখি সব ঘটনা বা অভিজ্ঞতা
শাদা হয়ে আছে;
আসলে সবকিছু বায়বীয় শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নয়
গাছচিহ্নহীন একটা স্কোরবোর্ড বীজের ভেতর
এখন কোথায় আমি
বা কে কোথায় আছে
কী এক বিধাতা দুদিকে প্রদর্শনীর
দরজা খুলেছে”

.
ফাঁকা মাঠের মাঝখানে লোহার চেয়ারে বসে আছেন শীর্ণকায় এক বৃদ্ধ।বুকের গভীরে পেসমেকার যা কখনো পোড়ানো যায় না।একটু পরেই বিদ্যুতের শক্ দেওয়া হবে তাঁকে।না,একটানা কখনোই নয়।থেমে থেমে,খুব মৃদু তারপর তার মাত্রা বাড়ানো হবে।মাঝেমাঝে পাশের পুকুরে ডুবিয়ে ধরা হবে তাঁর হাত।ছটফট করতে করতে যখন একটুখানি দম ফেলবেন তিনি,অপেক্ষা করবেন নিশ্চিত কিছুর,তখনই আবার যন্ত্রনার সর্বোচ্চ পরিসরে নিয়ে যাওয়া হবে তাঁকে।তিনি সেই কাঁপতে থাকা আঙুল নিয়ে যাবেন দিস্তা কাগজের ওপর।নিজের আত্মার ওপর।সাদা কাগজ আসলে অপেক্ষা করতে করতে মরে যাওয়া কিছু কলম।জীবনকে তিনি বলবেন “একটু দাঁড়াও নয়তো কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দেবো”।হারিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর দুটো আঙুল তিনি তুলে ধরবেন দরজার ছিটকিনির দিকে।আসলে দরজা কোথাও ছিলনা।রুদ্ধদ্বার ঘরের ভেতর তাঁর অপেক্ষা ছড়িয়ে পড়তে পড়তে চুরমার করে দেবে গন্তব্যের অস্তিত্ব।আর গভীর রাত্রে হঠাৎ কোনো রেডিয়ো চলতে শুরু করবে।বলতে শুরু করবে-

আমার জন্য রাত দশটায়
*****************
আমার জন্য রাত দশটায় কোনো ঘর খুলে যেতে পারে
আমি কিন্তু আদৌ জানিনা আমার জন্য কয়েক জোড়া জুতো
বাইরে চন্দ্রালোক মেখে আছে কিনা
আমি কি কয়েকটি হৃদপিন্ড বাইরে আঢাকা রেখে পাপ
কোরে যাচ্ছি ক্রমাগত
আমি কোনো বন্ধুর নাম ভুলে গেছি-কোনো
অবশ্য সাক্ষাৎ এড়িয়ে অব্যবহৃত জঙ্গলে আছি
আমার জন্য কেউ আজ ঘন ঘন মৃত মানুষের মতো
খারাপ সুইচে হাত রেখে
আমার জন্য রাত দশটায় কোনো ঘর খুলে যেতে পারে


**[ একটিই কাব্যগ্রন্থ আছে ওনার-“আমি,তবু”।এবং আছে তাঁর আরো কবিতা,যা তিনি লিখে রেখে দিতেন ঘরের গোপনে,কুলুঙ্গি এমনকী জুতোর বাক্সেও।সেইসব অমূল্য কবিতা উদ্ধার করে ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ প্রকাশ করেছে তাঁর “নির্বাচিত কবিতা” শীর্ষক বইটি ]