আজও রূপকথা

ঋতম্‌ মুখোপাধ্যায়


একথা আমরা সকলেই জানি, রাজা-রাণী-রাজপুত্র-রাজ কন্যা-রাক্ষস-দৈত্য এসব নিয়েই রূপকথার অপরূপ আর মায়াবী জগৎ। শিশুমনে যে জগতের হাতছানি অপ্রতিরোধ্য। শতবর্ষ পার হওয়া দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি থেকে হাল আমলের হ্যারি পটার সেই রহস্য আর ঐন্দ্রজালিক মায়াঘোর সৃষ্টি করেছে বলেই এত উন্মাদনা। বাস্তবের রূঢ়তা থেকে কল্পলোকের পথে পাড়ি দেওয়াই কি তবে রূপকথার লক্ষ্য? রূপকথা আসলে অপূর্বকথা বা অপরূপকথা; অবান্তর,অপ্রধান ও ছোট আখ্যায়িকা – বলেছিলেন ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেন। জনৈক ইংরেজ সমালোচক রূপকথায় দেখেন ‘aspiration to a higher life, freer and purer life’ আর অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘রূপকথা’ শীর্ষক ছোট অথচ ভাবনাজাগর প্রবন্ধে জানিয়েছেন : ‘প্রকৃতপক্ষে দেখিতে গেলে রূপকথা অবাস্তব নহে, উহা একটা বাস্তবতার দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।...রূপকথা কতগুলি অসম্ভব বাহ্যঘটনার ছদ্মবেশ পরিয়া আমাদের মনের সহিত ইহার প্রকৃত ঐক্যের কথা গোপন রাখিতে চেষ্টা করে। কিন্তু ছদ্মবেশ খুলিলেই ইহার সহিত আমাদের যোগসূত্র সুস্পষ্ট হইবে।’ ( রূপকথা / বাঙ্গালা সাহিত্যের কথা )
আর এই সমাজের,সময়ের ক্ষতমুখ রূপকথায় উৎকীর্ণ রয়েছে বলেই এগুলি ‘ছদ্মবেশী সত্যকথা’। দেশে-বিদেশে সর্বত্রই এই রূপকথা বা ফেয়ারি টেল-এ নারীসমাজের যন্ত্রণার ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। স্নো হোয়াইট, সিন্দারেলা,হ্যানসেল-গ রেটেল, দ্য ফ্রগ প্রিন্স, বুদ্ধু-ভুতুম, নীলকমল-লালকমল, সুখু-দুখু, সাতভাই চম্পা ইত্যাদি সমস্ত গল্পেই দেখা যায় সুয়োরাণী সুখী, দুয়োরাণী বঞ্চিতা। কিংবা স্বামীর আগের পক্ষের ছেলেমেয়ের প্রতি সৎ মায়ের নিষ্ঠুরতার ছবি দেখানো হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেই সন্তানেরা রাজকন্যাকে জয় করে ও মায়ের দুঃখ ঘোচায়। আসলে অপ্রাপণীয় যে জীবন ও অচরিতার্থ যে স্বপ্ন তাকেই কাহিনিরূপ দেওয়া হয়েছে এসব গল্পে, অলৌকিকতার আগমনও সেই কারণেই। তাই লোকসাহিত্যের গণ্ডিতে রূপকথাকে বেঁধে রাখা হলেও আধুনিক সাহিত্যের আঙ্গিনায় সে ব্রাত্য নয়।
বিশিষ্ট অবয়ববাদী আখ্যানতাত্ত্বিক ভ্লাদিমির প্রপ রাশিয়ার একশোটির বেশি রূপকথা ঘেঁটে তাদের কথনবিন্যাসে পুনরাবৃত্তির একটা সাধারণ ছক খুঁজে পান। প্রায় একত্রিশটি ‘নির্বাহণ’(Functions) তথা কার্য ও প্রতিক্রিয়ার সূত্রে প্রপ দেখান কিভাবে নায়ক কঠিন কাজের প্রস্তাব পান ও খলনায়ককে পরাজিত করে রাজকন্যাকে জয় করেন। সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সিনেমার কাহিনীতেও এজাতীয় সূত্রায়ণ আমরা খুঁজে পেতে পারি। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য থেকে আধুনিক যুগের বাংলা কবিতায়,গল্পে, উপন্যাসে এই রূপকথার আবির্ভাব ঘটেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ, ত্রৈলোক্যনাথ, জীবনানন্দ, অজিত দত্ত, বুদ্ধদেব বসু থেকে রূপক সাহার উপন্যাস বা একালের কবির ‘ঠাকুরমার ঝুলির ভূমিকা’র কথা আমরা মনে করতেই পারি। আর বিশ শতকের অধিবাস্তবতা,অমূর্তবা কিংবা জাদু-বাস্তবতা এসবের মধ্যেও যে বাস্তব-অবাস্তবের আলোছায়া খেলা করে তার জন্যেও রূপকথার কাছে ঋণস্বীকার করলে অসঙ্গত হবে না। এই ভাঙাচোরা সময়ে রূপকথার বাতায়ন দিয়ে আমরা স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশা করতেই পারি।
প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির বিরোধে আমার মন প্রায়ই চলে যায় রূপকথার দেশে। কিন্তু শান্তি কি আছে সেখানেও? প্রেম কিংবা জীবনের পথচলার জটিল গ্রন্থিগুলো রূপকথার দেশে গেলেই কি খুলে যায়? সেখানেও তো রাক্ষস-খোক্কস-দত্যি-দা নো আর নিষ্ঠুর রাজা কিংবা সৎমা। তাহলে? শেষে ইচ্ছাপূরণের স্বর্গলোক তো রয়েছে। কেরিয়ার, প্রেম আর নানা জটিলতার বিদ্ধ আমাদের যৌবন। সেখানে স্বপ্ন দেখার মূল কথা অর্থের উপাসনা। তবু এসবের মাঝখানে আমি অন্যরকম। আছে আমার মতো আরো কেউ কেউ। যারা স্বপ্নে বাঁচে, রূপকথায় রঙ্গিলা পাখি কিংবা পরীর দেশের বন্ধ দুয়ারে গিয়ে হানা দেয়। কিন্তু তারা তো যে-কোনো মুহূর্তে বস্তুলোকের রূঢ় আঘাতে ভেঙে পড়তেই পারে। অথচ ভাঙে না তারা। বীরত্ব, সাফল্য আর শেষে সুন্দরী প্রেমময়ী রাজকন্যার জন্যই যেন আমার এই কল্পভ্রমণ। আমার মনের চুপকথারাও প্রতিদিন এই রূপকথার গল্প লিখে চলে; নিখাদ সারল্য আর অসম্পূর্ণতাহীন এই রূপকথার দেশ-কে বাস্তবে পাওয়া যায় না জেনেও।

অনুকথন
২০১৪-এর বইবাজার থেকে ‘গ্রিমভাইদের রূপকথা’র অনুবাদ কিনে নতুন করে পড়তে পড়তে মনে হল, আজকের জগতে রূপকথার সেই মোহময় হাতছানি শিশুরা কি পায়? হয়তো পুরোটা পায় না। সেই শৈশবের সারল্য হারিয়ে গেছে। তবু রূপকথা কার্টুনের দুনিয়াতেও যে টানটান আবেদন রাখে তার সাম্প্রতিক প্রমাণ স্টার জলসার জনপ্রিয় মেগা-সিরিয়াল ‘কিরণমালা’; সেখানেও মানুষ-রাক্ষস-রাজা-রানি আর শুভ অশুভর লড়াই। তাই রূপকথা রঙ বদলেছে, তবু গল্পে-নাটকে-কবিতায় এবং সিনেমা, কল্পবিজ্ঞানে কিংবা সিরিয়ালের আড়ালে আজও তার চোরাস্রোত বহমান। স্বপ্ন দেখার মন যতদিন থাকবে ততদিন রূপকথাও রয়ে যাবে।