সব ভাষা ঘরে ফেরে? সব মিথ্‌? ... থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার

প্রবুদ্ধ ঘোষ


পথ হাঁটছে। আতঙ্কে জন্মভূমি ছাড়তে হচ্ছে। হয়তো যুদ্ধের কারণে, হয়তো দখলদারের চাপে ছেড়ে যেতে হচ্ছে প্রিয় মানুষদের। পুরোনো খোলসের মত পড়ে থাকছে কিছুটা। কিছু ধ্বনি রয়ে গেছে নিরুদ্দিষ্ট লোকমুখে। কিছু লিপি রয়ে যাচ্ছে প্রায়ান্ধকার গুহাশরীরে। সে স্মৃতি কেবল আঁকড়ে রাখবে সময়। নতুনের দায় কিছু নেই তত। সে পুরোনোর স্মৃতিকে ঝাপসা করে দেবে। নতুন হরফে লিখে দেবে অন্য ইতিহাস। শুধু, যে চলে যাচ্ছে আজ বাধ্যতঃ, তার ভবিষ্যৎ নিরুদ্দেশের। যত যাবে, তত ক্ষয়ে যাবে পথ। তত খসে খসে যাবে তার রূপ। যে দেশে চলে যাবে, সে দেশের বাতাস তাকে অভিযোজিত করবে, নতুন কথ্যরূপ দেবে। শিকড় ছিঁড়ে এই যে কেবলি যাওয়া আর যাওয়া, তাতে কিছু মিথ্‌ হারিয়ে যাবে। তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা মিথ্‌, তার জন্মভূতিতে সযত্নলালিত মিথ্‌। সেইসব মিথ্‌ হেমন্তের রোদের মত ঝুপ করে চলে যাবে। এমনকি, বসন্তের বিশেষ ফুলের যে আপাতঅলৌকিক বিশ্বাস যাকে সে ধারণ করে রেখেছিল নিজের বোধ দিয়ে তা-ও। যে চারা-জন্মানো পাথর, যে সোনাকুড়ানো নদীর গল্প সে বেঁধে রেখেছিল নিজের শরীরে সেসবই পড়ে থাকবে সীমান্তে। কখনো দখলদার কেড়ে নেবে। কখনো কাটা ঘুড়ির মত কিছুদিন, তারপর টুপ করে... অথবা সে জানত নিষাদ নয়, আদরজরজর ক্ষণে সেই কবিই ছঁড়েছিল তীর। তারপর, অনুতাপে আগামীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনায় অজ্ঞাত নিষাদকে করেছে হন্তারক। কিন্তু, সে এসব বলতে পারল না কাউকে। কারণ, সে ক্ষমতার অনাদরের। কারণ, তাকে পালাতে হচ্ছে। প্রান্তিক হতে হচ্ছে। বিজিতের মত। হেরে যাওয়া মানুষের শব্দ বুকে নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে। না-বলা প্রেমের আখরমালা লুকিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে অন্য কোথাও। কিছু বিজয়ের বিষাদও তাতে অনিবার্য মিশে। তবু, সব নিয়েই... তার কাঁখে শব্দরূপ, তার হাত ধরে ধাতুরূপ। তার পায়ে পায়ে অর্থিত, প্রবচন, লোককথা, সংস্কার স-ব চলেছে। এরপর সে ছড়িয়ে পড়বে, তারা বিচ্ছিন্ন হবে একে অপরের থেকে। মিশিয়ে নেবে অন্য শব্দের সাথে নিজেকে, অন্য অর্থিত গ্রাস করে নেবে মূল অর্থ। হয়তো কালান্তরে সে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে, অন্য দখলদার আবারো তাড়িয়ে দেবে। হয়তো মিশতে মিশতে, অন্য অন্য নামে বাঁচতে বাঁচতে সে ভুলে যাবে শিকড়। তার আদি। তার দেশ। তার লিপি। তার উচ্চারণ। সে এভাবেই গিয়েছিল, তারা এভাবেই চলেছে। ভাষা-পরিবার। ভাষা ডুবে মরে, ভাষা ভেসে যায়।



কিছু বিশেষ গাছের ছাল শুকিয়ে শক্ত পৃষ্ঠআর মত করে তার ওপরে লেখা হত। স্প্যানিশ যাজকরা প্রথমেই এই পাণ্ডুলিপিগুলিকে পুড়িয়ে ফেলত, নষ্ট করে দিত। Bishop Diego De landa ছিল এমনই এক যাজক। তবু, মাত্র কয়েকটি অক্ষত থেকে গেছে। খ্রিঃপূঃ ৩০০ শতকের, তার পরের কিছু। তাদের বাক্যের মধ্যে ধ্বনি ও চিত্রের মিশ্রণ। তাদের ছিল বেশ পরিণত এক হায়ারোগ্লিফিক লিপি যাতে সাহিত্য রচিত হয়েছে। বেশ কিছু সমীক্ষা থেকে জানা যায় খ্রিঃ পূঃ ২৫০০ সময়ে তাদের প্রধানতঃ একটি ভাষাই প্রচলিত ছিল। পরে তাতে মেশে অন্য অন্য ভাষা। ঋদ্ধ হয়, কিছু বা মূল থেকে হারিয়েও যায়। পাশ্চাত্য(ইউরোপীয়) গবেষকরা অনেক পরে আবিষ্কার করেন হুম্‌, সে ভাষা সুন্দর ছিল বটে। ধ্বনিমাধুর্যে ভরা। তাদের বিস্তার ছিল দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর দিকের কিছু অংশ, উত্তর আমেরিকার দক্ষিণের বিস্তীর্ণ অংশ, বর্তমান গুয়াতেমালা, মেহিকোর বড় অংশ। এখন তাদের কিছু জনশাখা এধারে-ওধারে। Quiche, Tz’utujil ইত্যাদি। কিন্তু, সেই মূল ভাষা হারিয়ে গেছে। হয় ওপনিবেশিক ভাষার সাথে সংমিশ্রণ ঘটেছে বাধ্যতঃ বা ইচ্ছাকৃত নয়তো ঔপনিবেশিকদের দখলদারিতে সরতে সরতে মূল জনপদ, মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং নতুন অঞ্চলের ভাষা মিশিয়ে নিতে নিতে... ‘মায়া’ময় সভ্যতার ভাষা নিরুদ্দিষ্ট।
রিগোবের্তা মেঞ্চু নামক এক ‘কিশে ইণ্ডিয়ান’ বিদ্রোহিনী নারীর আত্মজীবনীতে ক্রমে প্রান্তিক হয়ে ওঠা কিশে জনজীবনের আখ্যান ধরা পড়ে। ঔপনিবেশিক স্প্যানিশ ‘সভ্যতা’র চাপে কিভাবে দমবন্ধ হয়ে আসে উপনিবেশিত ভাষার, তার ছোট্ট উদাহরণ... রিগোবের্তা, তাদের গ্রামের লোক শাসকের ভাষা স্প্যানিশ জানত না বলে অহরহ সমস্যায় পড়ত। তাদের জমি ছলেবলে ছিনিয়ে নিত জোতদার, তাদের চাকরি হতনা, তুলোক্ষেতে তাদের ঠকিয়ে দিত মালিক। পর্যুদস্ত আর্থ-সামাজিক শোষণে বেড়ে ওঠা রিগোবের্তা ঠিক করে স্প্যানিশ সে শিখবেই। “I couldn’t speak Spanish but I understood a little because of the Finca overseers who used to give us orders, bully us and hand out the work. Many of them are Indians but they won’t use Indian languages because they feel different from the laborers.” তার আত্মকাহিনীতেই থাকে গুয়াতেমালার ২৩ধরণের জনজাতির ২৩টি ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির কথা এবং আস্তে আস্তে শাসকের ভাষা কিভাবে গ্রাস করে নেয় অন্যদের। ঔপনিবেশিক স্প্যানিশদের মতই স্প্যানিশ+ইণ্ডিয়ান সংকর Ladino-রা অত্যাচার করতে থাকে আদি অধিবাসীদের উপর। এই মিশ্র চাপে পড়ে অস্তিত্বসংকটে থাকে কিশে জাতির ভাষা, অন্যান্য আদিভাষা। মায়া সভ্যতার উত্তরবাহকরা ক্রমেই আরো বিচ্ছিন্ন হন মূল থেকে।


মৌখিক ভাষার ইতিহাস। সেই মৌখিকতাতেই বিধৃত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জনজাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি। মৌখিক সাহিত্যের ভাণ্ডার। প্রচুর লোককথা, মুখে মুখে ফেরা মানুষের গান, মিথ্‌, বাস্তব। ভিন্ন কথকের কথন ও কথনভঙ্গিতে নতুন ভাবে জন্ম নেয় পুরোনো, নতুনতর সাহিত্য। শ্রুতি-স্মৃতি নির্ভর সংস্কৃতিতে কোনো অপরিবর্তনীয় বয়ান থাকেনা। সনাতন নিজেকে মিলিয়ে নেয় আধুনিকে- কখনো যুক্ত হয় নতুন কথা, উপাদান কখনো বা বিযুক্ত হয় কিছু উপাদান।আর, এভাবেই জীবন্ত থাকে কথ্যসাহিত্য। না, লেখ্যভাষা নেই বৃহত্তর অংশের। [লেখ্যভাষা নেই একদম তা নয়, বরং আফ্রিকার লেখ্যভাষার সভ্যতা বহু প্রাচীন। এ সম্বন্ধে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একটি প্রবন্ধে বলছেন- ‘গ্রিক-লাতিনের পর ইয়োরোপের অনেক দেশেই যখন নিজেদের কোনো লিখিত ভাষাই উদ্ভাসিত হয়নি, তারও অনেক আগেই আফ্রিকার কিছু-কিছু দেশে লিখিত সভ্যতা কায়েম হয়ে বসেছিল।’] আর, যেহেতু ঔপনিবেশিকদের অভিধানে Literature শব্দের উৎসে Literate বা স্বাক্ষরতার ব্যাপার ‘অনিবার্য’ অতএব খুব সহজেই ঔপনিবেশিকেরা উপনিবেশিতদের ‘নিরক্ষর, অশিক্ষিত, সাহিত্যহীন’ বানিয়ে ফেলে! তারা উদার, তাই তারা সেই মৌখিকতার পরিপুষ্ট সাহিত্যনিদর্শনকে অবজ্ঞা করার প্রাজ্ঞতায় লিখতে-পড়তে ‘শেখাতে’ উদ্যোগী হয়। তারা ‘সভ্য’ হতে শেখায় দক্ষিণ ও মধ্য আফ্রিকার মানুষকে। সচেতন অবজ্ঞায় শাসকের ভাষা গ্রাস করে ফেলতে থাকে শোষিতের ভাষা, মৌখিকসাহিত্য। শাসক ইংরাজি শেখাল, ফ্রেঞ্চ শেখাল, পর্তুগীজ শেখাল। এক বিস্তীর্ণ মহাদেশের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে ‘হাওয়া’ করে দেওয়া! তার সাথে তাদের জমি, তাদের সত্তা সমস্তই। একটা গোটা মহাদশের জমি ও মানুষ দখল করার উপায় কি? অস্ত্র দিয়ে, যুদ্ধ করে দখল করলে লোকক্ষয় এবং সময়ক্ষয়ের সম্ভাবনা। তাই, আফ্রিকা মহাদেশের অতীতটাকেই নিরুদ্দেশ করে দেওয়া। ক্রমাগতঃ আদি অধিবাসীদের বুঝিয়ে যাওয়া যে, তোমাদের ভাষা নেই হে, শিক্ষা নেই, লিপি নেই অথবা যা আছে সব ভুল। এসো, বাইবেল শেখো, ইংরাজি শেখো। তোমাদের লোককথা ভুল, তোমাদের ঈশ্বর কাঠ-পাথরের জড়! এই দেখো আমাদের ঈশ্বরই আসল প্রভু। তোমাদের শ্রুতি-শ্রুতআখ্যান ভিত্তিহীন, সংস্কার ভুল, পূর্বপুরুষদের নির্দেশ, ছন্দোবদ্ধ নিয়মাবলী, সঙ্গীত সব মিথ্যে। দেখো আমাদের সভ্যতা, এসো, নত হও। কথ্য ঐতিহ্য বা Oral Literature-কে ভুলিয়ে দেওয়ার এই দশচক্র কি যথেষ্ট নয়? মনে পড়ে যাচ্ছে কি নাইজিরিয়ান লেখক চিনুয়া আচিবের ‘থিংস্‌ ফল অ্যাপার্ট’-এর গল্প? আস্তে আস্তে ভুলিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি, ভাষা। আর, Okonkwo যেমন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দাঁড়াতে একা হয়ে আত্মহত্যায় বাধ্য হয়, তেমনি বোধহয় ভাষাও, সাহিত্যও। টারজান বা অরণ্যদেব-রা শ্বেতাঙ্গ ভাষায় হয় বুড়ো মজ, ওয়াজিরিদের বশ করে অথবা ‘বুনো, অসভ্য’দের হত্যা করে।
চিনুয়া আচিবে তাঁর লেখায় জানান শৈশব থেকেই তাঁর গ্রামে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরাজির একচ্ছত্র আধিপত্য। বাইবেল, বাইবেলের মিথ, খ্রিস্টান ‘নৈতিকতা’, যোসেফ কনরাড, জয়েস কেরি-দের ভিড়ে নিজেদের সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যময় ভাষা-সংস্কৃতি জানার কোনোই জায়গা নেই। সেখানে ‘হার্ট অব্‌ ডার্কনেস’-এর মত লেখায় আফ্রিকার ইতিহাসকেই অস্বীকার করা হয়েছে আর সেই লেখা বাধ্যতামূলক ভাবে কেনিয়া বা নাইজিরিয়ার কোনো বালক যখন পড়ে, তার কাছে নিজের উত্তরাধিকারের ভাষা নয়, ইংরেজদের ভাষাই একমাত্র অবলম্বন। কেনিয়ার এনগুগি-ওয়া-থিয়াং ও খুব যন্ত্রণাবিদ্ধতায় নিজের মাতৃভাষা নিরুদ্ধেশ হওয়ার বিবরণ দিয়েছেন- স্কুলে মাতৃভাষা গিকুয়ু(Gikuyu)তে কথা বললে বেদম মার, জরিমানা। ১৯৫২ সালে কেনিয়াতে নির্দেশিকা জারি করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভাষা হয় ইংরাজি। গিকুয়ু ভাষায় কে কথা বলছে তা ধরার জন্যে একছাত্রকে অপরছাত্রের ওপর বাধ্যতামূলক নজরদারি করতে হত। অন্যদিকে ইংরাজিতে কথা বললে, সাহিত্যরচনা করলে লোভনীয় পুরষ্কার! প্রাথমিক স্কুল থেকে উঠে গেল কথ্যসাহিত্য চর্চা। যেসব প্রবাদ-প্রবচন, মিথ্‌, রূপকথা, শব্দ-ভাষার খেলায় সমৃদ্ধ ছিল সংস্কৃতি, সেগুলোর বদলে এল বিদেশী ভাষার ‘চাপিয়ে দেওয়া’ রূপকথা, ঔপনিবেশিকদের নির্মিত ‘আফ্রিকা’র ভুল ব্যাখ্যা। আচিবে-র মত সাহিত্যিক ইংরাজিতেই আজীবন চর্চা করেছেন এবং সেই ভাষা দিয়েই আফ্রিকার নিজস্ব সভ্যতাকে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছেন ঔপনিবেশিকদের ‘নির্মাণ’ ভেঙ্গে। কিন্তু, নিরুদ্দিষ্ট ভাষার চর্চায় মন দিয়েছেন এনগুগি ও আরো কয়েকজন। তাই হাজার লাঞ্ছনা সয়েও গিকুয়ু-তে লিখেছেন, সওয়াল করেছেন বিলুপ্ত বা প্রায়-বিলুপ্ত ভাষার ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনার, তাকে ধারণ করার জন্য।

#
“যতদিন না সিংহদের মধ্যে ইতিহাস লেখকের জন্ম হবে, ততদিন শিকারের গল্পে শিকারির জয়গানই হবে”- একটি আফ্রিকান প্রবাদ।
নাইজিরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ইগ্‌বো ভাষার লিপি তৈরির কাজ করেছিলেন ডেনিস, ১৯০৬ সালে। কথ্যভাষা তা ঔপনিবেশিকদের কাছে যতই অবোধ্য হোক, তবু সেই ভাষাকে নিজেদের মত করে সাজয়ে লিপি ‘তৈরি’তে উঠেপড়ে লাগলেন তাঁরা। লিপি তৈরির ক্ষেত্রে আরো উল্লেখযোগ্য হল, রোমান হরফকেই ব্যবহার করা হল। দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু, ক্সখোসা ভাষাকে রোমান হরফে লেখা হল। ডাচ্‌ শব্দের সাথে বাণ্টু শব্দ মিশিয়ে ফেলা হল, ইগ্‌বো ভাষার শব্দে অবধারিত ইংরাজি বেনোজল ঢুকিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু, উদ্দেশ্য? “ঔপনিবেশিকরা যখন আমাদের দেশে এল, তখন তাদের হাতে ছিল বাইবেল আর আমাদের হাতে জমি... চোখ খুলে দেখি আমাদের হাতে বাইবেল আর ওদের হাতে জমি”। হ্যাঁ, বাইবেলের প্রচার করতে খ্রিস্টান মিশনারিরা বহু কথ্যভাষার লিপি তৈরি করে, সেই ভাষায় মনোমত বাইবেল প্রচার। ‘প্রভু ও শান্তি’-র আড়ালে সুপ্রাচীন ঐতিহ্যময় ভাষাগুলোকে গিলতে থাকল যাজকভাষা। আর, শাসক হবার পরে সেইসমস্ত ভাষায় আধিপত্য করে, হঠিয়ে দেওয়া আরো সহজ। মালি দক্ষিণ আফ্রিকার একটি দেশ। ফ্রেঞ্চরা দখল নিয়েছিল। ওইদেশে প্রায় ৪৯টি কথ্যভাষার সন্ধান মিলেছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে ফরাসি ও অন্যান্য কয়েকটি আদিভাষার মিশ্রণে নতুন ভাষা হয়েছে অনেক। মূল ভাষা-পরিবার মান্দে এখনও বহুল প্রচলিত, তার সাথে আফ্রো-ইয়ুরোপীয় বা আফ্রো-এশিয় ভাষা-পরিবার। কিন্তু, এখনো এমন প্রচুর কথ্যভাষা আছে যা নিরুদ্দেশের পথে। হারিয়েও গেছে অনেক। সামোমা ভাষায় কথা বলা লোক এখন ৬ জন আর জারমাচি ভাষায় ২ জন মাত্র- সমীক্ষা বলছে। অতএব, মূল ভাষা ধীয়ে ধীরে নিশ্চিত খেয়ে নেবে এদেরও। ঠিক যেভাবে আজতেক সভ্যতার নাহুয়াতি ভাষায় বহু কথ্যরূপ হারিয়ে গেছে। আকার-ইঙ্গিত এবং ছন্দোবদ্ধ বাচনভঙ্গী। উত্তর-আমেরিকার পশ্চিমদিকের কোমান্‌শে বা পিমা জনগোষ্ঠী প্রায়-বিলুপ্ত, তেমনি তাদের নাহুয়াতি ভাষার কথ্যরূপ। আজতেকদের পরস্পরের সাথে যোগাযোগের পবিত্র মাধ্যম ছিল কবিতা যাকে তারা বলত Xochicuicatl বা পুষ্পসঙ্গীত। ছন্দোবদ্ধ স্তোত্রের মত মৌখিক ভাষ্য শ্রুতিনির্ভর, আফ্রিকীয়দের মতই লেখ্যরূপ সেভাবে না নেই। ১৫২১ নাগাদ ফার্নান্দো আন্দ্রে দে অমোস চেষ্টা করেন এই মৌখিক সাহিত্যকে লেখ্যরূপ দেওয়ার, লাতিন হরফ ব্যবহার করে। কিন্তু, পরবর্তী স্প্যানিশ শাসকেরা সেই সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে, সেইসব শ্রুতি-স্মৃতির বাসিন্দাদের হত্যা করেছে যাতে প্রমাণ করা যায়- কলম্বাস আসার আগে এখানে ‘বর্বর’রা থাকত! কিছু দেওয়ালচিত্র, লিপির বিবর্ণ সন্ধান মিলেছে- আবৃত্তিরত আজতেক পুরোহিতের ছবি। কিন্তু, সেইসব হারিয়ে যাওয়া শব্দরূপ? দেশজ শব্দগুলিকে ক্রমে গ্রাস করে নিয়েছে স্প্যানিশভাষার বর্ণসংকর, ইণ্ডিয়ান বর্ণসংকর। আদি আজতেকদের মধ্যে একটি বড় অংশের মধ্যে কালের নিয়মে স্প্যানিশরা দখল করে নিয়েছে, তবু কিছু আদি জাতি রয়ে গেছে। তাদের স্বতন্ত্রতা ক্রমেই আরো বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, সংক্ষিপ্ত পরিসরে মুছে আসছে।

‘শিখণ্ডী-যুক্তি’ খাড়া রয়েছেই। শাসককথনে বরাবর বলা হয়েছে- ওরা বিক্ষিপ্ত, অশিক্ষিত তাই বহুভাষা, বহুজাতিকে একসূত্রে তাদের বেঁধে রেখেছে ইংরাজি, ফ্রেঞ্চ, পর্তুগীজ। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় রোমান ক্যাথলিক্‌ ধর্ম সেই ‘ঐক্য’-র সূত্র। আর, ভাষা দিয়েই কোনো জাতির অথবা মহাদেশের আত্মাকে ক্রীতদাস বানানো যায়। এনগুগি তাঁর এক প্রবন্ধে লিখছেনঃ “The cannon forces the body and the school fascinates the soul.”। নিরুদ্দিষ্ট ভাষাগুলির সাথে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে নিরুদ্দিষ্ট ‘কাল্‌চার’। ভাষা হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের সঞ্চয়ের মাধ্যম। ভাষা সংস্কৃতিকে উত্তরাধিকারে পৌঁছে দেয়। কিন্তু, যদি শাসক ‘অপ্রয়োজনীয়’ করে দেয় মাতৃভাষাকে, তা’লে সেইসব ভাষা হারিয়ে যায়। আর, হারিয়ে যায় সংস্কৃতি। কিন্তু, সেই সংস্কৃতির মানুষেরা? তাদের চালান করে দেওয়া হয় দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকায়। কফিক্ষেতে, কোকোচাষে, আখবাগিচায়। তাদের শিকড় থেকে উপড়ে এনে ছুঁড়ে দেওয়া হয় অন্য এক শাসিত অঞ্চলে। আর, এর ফলে যে উপনিবেশিত অঞ্চলে অন্য-উপনিবেশিতদের ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে তাদের ভাষা-সংস্কৃতিও ঘেঁটে দেওয়া যায়। সংকর-প্রক্রিয়া চলতেই থাকে, নৃতত্ত্ববিদ্‌রা অ্যাফ্রো-ইণ্ডিয়ান, অ্যাফ্রো-লাতিন এসব নামে চিহ্নিত করেন, শ্বেতাঙ্গ ‘প্রভু’রা ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’ বলে মিলনের দৃঢ়চিহ্ন হিসেবে ‘প্রভুর ভাষা’ কে প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে, প্রান্তিক হয়ে পড়ে উপনিবেশিতের সংস্কার, ভাষা। ১৯৭১ সালের এক সুমারি থেকে জানা যায় কিউবা-তে ৭৩% শ্বেতাঙ্গ (স্প্যানিশ বা ব্রিটিশ) এবং বাকি ২৭% ‘নিগ্রো(শাসক এই আদরনামে আফ্রিকার লোকেদের ডাকে)’ অথবা মেস্তিজো। ১৫১৭ সাল থেকে কিউবাতে ক্রীতদাস আনা শুরু। ফুলাহ্‌, মান্দিঙ্গো, বাম্বারা, বাণ্টু জনজাতির লোকেদের বাধ্যতামূলক অভিবাসনে নিজেদের মানিয়ে নিতে হয়েছে লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতিতে। তাদের ভুলে যেতে হয়েছে ভাষা। তবু, নিরুদ্ধেশের পথে গিয়েও কিছু শাখা রয়ে গেছে হয়তো। শাসকের এস্প্যানিওলের সাথে শোষিতের এস্প্যানিওলে তফাৎ রয়েছে। উচ্চারণের তফাৎ, শব্দের তফাৎ। আফ্রিকা থেকে আসা মানুষেরা নিজেদের মূল ভাষা থেকে সরে সরে এস্প্যানিওলে মিশিয়ে নিয়েছে নিজেদের শব্দ কিছু, দক্ষিণ আমেরিকার আদি বাসিন্দারা তাদের ভাষা মিশিয়ে দিয়েছে শাসকের ভাষাতন্ত্রে। আফ্রিকার কথ্যভাষা ঐতিহ্যে, যেখানে কথ্য ও শ্রাব্য সাহিত্য, অনুপ্রাস, অন্ত্যমিল, পুনরাবৃত্তি খুবই স্বাভাবিক। লাতিন আমেরিকার স্প্যানিশ ভাষার লেখক আলেহো কার্পেন্তিয়ের যখন লেখেন তখন তাঁর লেখায় ঢুকে পড়ে সেই ছন্দ, তাল, অনুপ্রাস। হয়তো সেই মূল আফ্রিকীয় সাহিত্য, সেই ভাষার ধ্বনিমাধুর্য নিরুদ্দেশ, কিন্তু তার রেশ রয়ে যাচ্ছে অন্য এক উপনিবেশিত-র লেখায়। এমোস টুটুওলা যখন “Palm Wine Drinkard” লিখলেন, তখন বিশুদ্ধ ভাষাতান্ত্রিকরা চিন্তিত হলেন ইংরাজি ভাষার ‘বিশুদ্ধ ব্যাকরণ’ নিয়ে। কারণ, টুটুওলা ইংরাজিকে রেখেছিলেন খোলস হিসেবে, তিনি তাঁর মাতৃভাষা য়োরুবা-তেই আখ্যানরচনা করেছিলেন। আর, এই যে ভাষাকে নিরুদ্দেশ হতে না-দেওয়ার লড়াই এনগুগি বা টুটুওলার, তা বোধহয় হারিয়ে যাওয়া সব প্রিয়ভাষার তর্পণ।
হোর্হে আমাদো তাঁর ‘দ্য ভায়োলেণ্ট ল্যাণ্ড’ উপন্যাসে সূক্ষ্ণভাবে ধরে রেখেছেন ভাষা-সংস্কৃতি নিরুদ্দেশের আখ্যান। উপন্যাসটি মূলতঃ ব্রেজিলে কোকোচাষকে কেন্দ্র করে জনবসতির পত্তন এবং অপরিসীম শোষণ, ব্যক্তিগত জীবন ও সামগ্রিক রাজনীতিতে তার ছায়া। কিন্তু, সেখানে একজায়গায় আছে, যখন দুই মূলবাসী কৃষিজীবি Altino ও Orlando-র থেকে জমি কেড়ে নেয় বিদেশি কর্ণেলরা। কর্ণেল ও তার লোকেদের ভাষার চাতুর্য বোঝার পরে তারা বোঝে যে অরণ্যের যে অংশে তারা কোকোচাষ করত, তা হাতছাড়া! ভাষা ও সংস্কৃতির বিপন্নতা শুরু। আরেক উল্লেখযোগ্য চরিত্র ‘নিগ্রো দামিয়ানো’। সে কর্ণেল সিনো বাদারোর দেহরক্ষী, তার পূর্বপুরুষকে বোধহয় আফ্রিকা থেকে উজিয়ে আনা হয়েছিল ব্রেজিলে, সে কর্ণেলের হয়ে একের পর এক হত্যা করে চলে, সে নিষ্ঠুর। তবু, কোনো কোনো চন্দ্রাহত রাতে অরণ্যানী শোনে তার নিজস্ব ভাষার কান্না, তার অনুতাপ-তার ভাষা বোঝার সেখানে কেউ নেই। তার ভাষা-সংস্কৃতি সবই ক্রীতদাস হয়ে অন্য এক উপনিবেশে উপনিবেশিতদের হত্যা করে চলেছে...


লেখার শুরুতে বলছিলাম ভাষা-লিপিকে নিরুদ্দেশ করে দিতে স্প্যানিশ যাজকরা কিভাবে পুড়িয়ে দিয়েছিল মায়া সভ্যতার লিপি। ১৫৬২ সালে সেই দিয়েগো দে লান্‌দা যাজক হয়েই নিজেদের ভাষা-সংস্কারের প্রতিষ্ঠা করতে মায়া-দের লিপি ও শিল্প ধ্বংসের বার্তা দেন। তথ্যানুযায়ী, ১৫৩৪ সাল নাগাদ বিশপ ফ্রান্সিস্‌কো ম্যারোকিন্‌ খ্রিস্টধর্ম দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত করেন গুয়াতেমালায়, তিনি ও তাঁর যাজকসঙ্গীরা মায়া-দের মূর্ত সবকিছুই ধ্বংসে তৎপর হন যাতে খ্রিস্টধর্মের বাণী প্রচার অবাধ হয় যাতে ‘সভ্য’ এস্প্যানিওল ভাষায় আলো ছড়ানো যায়! প্রায় কুড়ি লক্ষ মূর্তি, অগণিত শিলালিপি ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়। একবার পড়ে নিই ‘শান্তির দূত’ যাজক দে লান্‌দা-র বয়ান- “We found a large number of books of these characters, and as they contained nothing in which there were not to be seen superstition and lies of the devil, we burned them all.” ১৬৯৭তে আরেক শোষক মার্তিন দে উরসুয়া আরেকপ্রস্থ পাণ্ডুলিপি ধ্বংসলীলা চালান! একটি সভ্যতার শিকড় উপড়ে ফেলতে কী প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! আর, আফ্রিকায় ফরাসি উপনিবেশে? আফ্রিকার ইতিহাস-সংস্কৃতি মুছে দিতে একদিকে ধ্বংস অন্যদিকে জোর করে উপনিবেশগুলির ‘ফরাসিকরণ’। আই দ্বিমুখী চাপে উত্তর বা মধ্য আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভাষা বিলুপ্ত হওয়া খুব আশ্চর্য কি? আর, তাই যখন জেরাল্ড মুর্‌ বা গ্যাব্রিয়েল ওকানা-র মত লোকেরা আফ্রিকায় ইংরেজিকে ‘স্বেচ্ছানির্বাচিত ভাষা’ বলে শ্লাঘা বোধ করেন, তখন অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া ভাষার আত্মবলিদান স্পষ্ট হয় আরও।
টারজান অরণ্যে বড় হয়েও অনায়াসে ইংরাজি শিখে নিতে পারে। আর, শুধু এই ভাষাটি জেনেই প্রভত্ব করতে পারে ‘কালা আদমি’ দের ওপর। বনচারী ‘অ-সংস্কৃত’, অ-ইংরাজিভাষীরা নত হয়ে থাকে তার সামনে। অরণ্যদেবও তাই ‘মিথ্‌’ হয়ে ওঠেন। আর, এভাবেই শ্বেতাঙ্গ, ইংরাজিভাষীরা অন্যান্য ভাষা-সংস্কৃতি-লোককথা-ম িথ্‌ সবেতে জাঁকিয়ে বসে শত শত বছর। Unoka-র মত মানুষেরা নিজেদের সমাজ-সংস্কারে তেমন টান পাচ্ছিল না, তাদের টেনে নেয় এইসব ইউরোপীয় ভাষা, বাইবেল, চার্চ। তারা অবজ্ঞা করতে শেখে নিজেদের অতীত। ভাষার ‘হারিয়ে যাওয়া’র আরেক দৃষ্টান্ত উত্তর আমেরিকার মূলবাসীদের ভাষা। Algonquian ভাষা-পরিবার ছড়িয়ে রয়েছে উত্তর আমেরিকার পূর্ব-উপকূল থেকে রকি পর্বতমালা অবধি। বহু সময়ে প্রাকৃতিক বা অর্থনৈতিক কারণে মূল ভাষাভাষী মানুষদের সরতে হয়েছে, বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেছে। প্রায় ২৫০০বছর আগের প্রোটো-অ্যাল্গোন্‌কি ান ভাষা এখন মৃত। ১৯৯০-র দশকে দুই ভাষাতাত্ত্বিকের সমীক্ষা থেকে অধুনা ‘মৃত’ ভাষার কথা জানা যায়। সমতলে যে গোষ্ঠী ছড়িয়ে পড়েছিল, তাদের Nawathinehena এবং Besawunena ভাষা নিরুদ্দেশ। পূর্বাভিমুখে যারা গেছিল, তাদের একটা বৃহত্তর অংশের ভাষা হারিয়ে গেছে- Powhatan, Unami, Shinnecock ইত্যাদি। কলম্বাসের দেখানো পথে ঔপনিবেশিকরা আসে, ক্রমেই মূলবাসীদের ব্রাত্য করে দখল নিতে থাকে জমি-সংস্কৃতির। ‘রেড ইণ্ডিয়ান, জংলী’ বলে ঠেলে দেওয়া হয় প্রান্তিকতার সীমায়। আর, ইউরোপীয় ভাষাই হয়ে ওঠে প্রধান। তার ফলে ফল্গুধারার ভাষাগুলি, তার কথ্যরূপ আরো শুকোতে থাকে সময়ের সাথে সাথে। উত্তর আমেরিকায় এভাবেই হারিয়ে গেছে Eyak ভাষা, Na-Dene ভাষা-পরিবারের একটি ভাষা। ইউরোপের চাপ ও তাপের ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছেন আদাই জনজাতির মানুষ। মনে করা হয় যে, তারাই উত্তর আমেরিকায় প্রথম ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে আসেন ষোড়শ শতকে। তারপর সেই উপনিবেশিতের চেনা ইতিহাস, তাদের ভাষা Caddoan বিলুপ্ত হয়ে গেছে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে হারিয়ে গেছে আইভরি-কোস্টের এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ভাষা এস্যুমা। দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ উপনিবেশের আগে একটি অংশে (বর্তমান আজেন্তিনা ও চিলে) বহুল প্রচলিত ছিল Cacan ভাষা। মূলতঃ কথ্যভাষা হলেও কিছু লেখ্যভাষা ছিল। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে যাজক অ্যালোন্সো একটি খসড়া তৈরি করার চেষ্টা করেন এই ভাষার। কিন্তু, অষ্টাদশ শতকে ভাষাটি হারিয়ে যায়... আরো অনেক ভাষা Chane (বর্তমান আর্জেন্তিনা ও বলিভিয়া) Chana (বর্তমান উরুগুয়ে)- আর, প্রাচীনদের তাড়িয়ে গেঁড়ে বসে এস্প্যানিওল এইসব দেশে। আর, এই তালিকা ইণ্টারনেটে রয়েছে আরো অনেক নাম, মহাদেশগুলি থেকে হারিয়ে যাওয়া ভাষা-জাতির দীর্ঘ তালিকা। কলম্বাসের ‘আমেরিকা আবিষ্কার’র দিন ঘিরে মোচ্ছবে মাতে ইউএসএ-র মানুষ আর, আরো বিস্মরণ আরো অতলে নিয়ে যায় উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বহু ভাষাকে।


প্রতিরোধ আছে, অতি অবশ্যই। কিকুয়ু গোষ্ঠীর ভাষা গিকুয়ুতে লেখার জন্যে সংগ্রাম করেছেন, সে ভাষায় লিখে, সেই ভাষার কথা অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে সক্রিয় রেখেছেন এনগুগি ওয়া থিয়াং-ও। গিকুয়ু ভাষা চর্চার মধ্যে দিয়ে আহ্রিকা সম্বন্ধে গড়ে তোলা ইউরোপীয় গুলগল্প ‘ডার্ক রিজ্যিয়ন’ কে ভাঙ্গেন এনগুগি, প্রবল বিক্ষোভে প্রবন্ধ লেখেন ভাষাসত্তাকে জাগিয়ে তুলতে। আবেদন করেন সমগ্র আফ্রিকা জুড়ে ইউরোপীয় ভাষাচর্চা আইন করে ‘বিলোপ’ করে দেশীয় কথ্যভাষা ও লেখ্যভাষাকে প্রধান মর্যাদা দেওয়া হোক। মাসাই, য়োরুবা, কিম্বোন্দো, গালা ইত্যাদি ভাষাচর্চা সমৃদ্ধ হোক, প্রতিষ্ঠা পাক। অন্যদিকে, ওলে সোয়িঙ্কা, আচিবের মত লেখকেরা য়োরুবা, ইগ্‌বো শব্দ-ভাষার সাথে ইংরাজির মিশ্রণে এক নতুন ভাষারীতি গড়ে তুলতে চান উত্তর-ঔপনিবেশিক আফ্রিকায়। এ প্রসঙ্গে হয়তো অপ্রাসঙ্গিক নাইজিরিয়ার বোকো-হারামের কথা, তাদের স্কুলছাত্রী অপহরণ, অ-ইসলামি মানুষদের নির্বিচার হত্যা জঘন্য কাজ, তাদের মত বা পথ সমর্থনযোগ্য নয় কোনোভাবেই। কিন্তু, বোকো-হারামের উৎসের পিছনে কি লুকিয়ে নেই ঔপনিবেশিক শাসন, যাজক-পাদ্রিদের জোর করে ধর্মান্তরকরণ, উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্যায়ের স্বৈরাচার, বিদেশী ভাষা-সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার ইতিহাস? বোকো-হারাম ঘোষণা করে তারা পাশ্চাত্য শিক্ষার বিরোধী, তারা আঁকড়ে রাখতে চায় নিজেদের ভাষা-সংস্কার। ভাষা-নিরুদ্দেশে ঔপনিবেশিক চাপের কথা বলতে গিয়ে এই ঘৃণার কথাও বোধহয় মাথায় রাখা জরুরি। তবে, আফ্রিকার ঐতিহ্যে মূলভাষাকে বিলোপ করার ব্যাপারে আরবি লিপির অবদানও রয়েছে। ইসলামিক শাসকরা আরবি বা ফারসি ভাষাকে রাজভাষা বানিয়ে পশ্চিম ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ শাসনের সময়ে সেইসব ভাষার গর্ভে চলে গেছে প্রাচীন অনেক ভাষা। যেমন আজামি লিপিটি আরবি ভেঙ্গে, তার মিশ্রণে তৈরি। আজামি ভাষার মূল কথ্যরূপের হদিশ নেই। তেমনি বহুল প্রচলিত সোয়াহিলি ভাষাটির আদিরূপ যা বাণ্টু গোষ্ঠী ব্যবহার করত তার হদিশ নেই বরং, আরবি-ফারসি মিশে যে নব্য-সোয়াহিলি ছিল, তাতে হয়তো কিছু ইংরাজিও মিশেছে। আর, সবই শাসকের মর্জি অনুযায়ী!
আফ্রিকার ভাষা, কথ্যেতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জুড়ে থাকে মিথ্‌। মিথ্‌ এখানে সংস্কৃতিকে ধারণ ও বহন করে, এক শিক্ষাপদ্ধতির মত বয়ে চলে। মিথ্‌ নাচ-গানে পারফর্ম করা হয়। এনগোক-লিতুবার মিথ্‌ সংগৃহীত হয়েছে একাধিক লেখকের দ্বারা। আর, মূল গল্প এক রেখেও সেই মিথ্‌এর পাঠ ভিন্নতর হয়। সেখানেই এর জীবন, সেখানেই এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আর, এইসব মিথ্‌ যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন ভাষা-সংস্কৃতি সংকটে পড়ে। দেশ-মহাদেশ উজাড় করে ‘দাস’ যোগান দেওয়া হয় যখন অন্য উপনিবেশে, তখন মিথ্‌ বইবার কেউ থাকেনা। আস্তে আস্তে হয়তো হারিয়ে যায় বহু মিথ্‌। বহু ভাষ্য এভাবেই হারিয়ে গেছে ইন্‌কা বা আজতেক সভ্যতার। অন্য অন্য উপনিবেশ গুলোর। আসলে, আফ্রিকার বহু মিথ্‌ সঙ্ঘবদ্ধ জীবন, একত্রযাপনের গোষ্ঠীবদ্ধতার পরম্পরার কথা বলে। উপনিবেশগুলিকে শাসিত রাখার অন্যতম মন্ত্র হচ্ছে এই সঙ্ঘবদ্ধতাকে ভাঙ্গা, বিচ্ছিন্নকরণ। আর, তাই ‘উমুণ্টু নগুমুণ্টু নগাবাণ্টু(মানুষ একজন মানুষ, অন্য মানুষদের জন্যই)’ এইসব প্রবচনকে ভেঙ্গে ফেলা হয়, নিরুদ্দেশ করে দেওয়া হয় সচেতনভাবেই। ভাষার সাথেই হারিয়ে যায় মিথ্‌, প্রবাদ, প্রবচন, যাপনের মন্ত্রগুলো। মায়া-সভ্যতার উত্তরপুরুষ কিশে্‌ জনজাতির দলিল ‘পোপোল ভুহ্‌’ গ্রন্থ, যার অর্থ সম্প্রদায়ের গ্রন্থ বা মানুষের বই- যেখানে রয়ে গেছে মিথ্‌, সামাজিক পাঠ। কথ্যসাহিত্য, মিথ্‌, লোকমুখে ফেরা পূর্বপুরুষ/ঈশ্বর নির্দেশ কিছু কিছু যে ষোড়শ শতকে লাতিন হরফে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, তারই একটা অংশ রয়ে গেছে কিশে্‌ জনজাতির কাছে। তাদের পবিত্রতম এই গ্রন্থে জীবনের উৎস, সঙ্ঘবদ্ধতার যে আখ্যান রয়েছে সেই গ্রন্থের প্রথম লাইনগুলি এরকম- “THIS IS THE ACCOUNT of when all is still silent and placid… The face of the earth has not yet appeared. Alone lays the expanse of the sea, along with the womb of all the sky. There is not yet anything gathered together. All is at rest. Nothing stirs.”। এই পবিত্রতা হারিয়ে যাবার ভয়ে খুব গোপনে সংরক্ষণ করা হত, যাতে খ্রিস্ট যাজক তথা শাসকেরা থাবা না বসায়। কলম্বাসপূর্ব যুগের মূল অনেক শব্দ, আখ্যান হারিয়ে গেছে। এমনকি, ঔপনিবেশিক আঁচ থেকে বাঁচাবার তাগিদে একে সুগোপন করায়, পরবর্তী মায়াসভ্যতার উত্তরপুরুষেরাও অনেকেই বিচ্ছিন্ন হয়েছেন এই গ্রন্থ থেকে। আর, আফ্রিকার সেই একসাথে, হাতে হাত রেখে বাঁচার মতই এখানেও সেই বিশ্বাস- সমস্ত কিশে্‌রা ভাই যারা য়াকুই ভাষা বলে এবং তাদের একজনই দেবতা তোহিল। তবু, সেইসব বিশ্বাস, রীতি, ভাষারা হারিয়েই যায়। উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্যায়ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভয়ঙ্কর শোষণের। তাই, নিরুদ্দিষ্ট ভাষা-সংস্কৃতিকে ফেরাতে বিজ্ঞাপন দেয়না কেউ, ক্রমেই তারা মৃত বলে ঘোষিত হয়...


ভারতেও রয়েছে এই ভাষা-বিপন্নতা। ‘মূল’ ভাষা বা শাসকভাষার চাপে অন্যান্য ভাষাদের প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার চেনা গল্প। কারণ, বারবারই এই উপমহাদেশ আক্রান্ত হয়েছে। কখনো আর্যসমাজ অনার্যদের দখল করে তাদের ওপর কায়েম করেছে নিজেদের গল্প। কখনো নায়িকা-উদ্ধারের অছিলায় অনার্যদের দখল করে, অনার্যের সংস্কৃতিবোধ কেড়ে নিতে তাকে হত্যা করে, কোনো অনার্যকে লেজসমেত ‘প্রভুভক্তির পরাকাষ্ঠা’ বানিয়ে তাদের ভাষাকে কেড়ে নিয়েছে। কখনো বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসে শাসক হয়ে বসেছে, নিজেদের ভাষাকে শাসনরীতির একমাত্র চাবুক বানাতে অন্য অন্য ভাষারীতির মানুষদের সরিয়ে দিয়েছে। নিবিড় বনাঞ্চলে যতদূর শাসকের নখ গেছে, খিম্‌চে তুলে এনেছে সেখানকার ভাষা-লোককথা, মিশিয়ে নিয়েছে/দিয়েছে নিজের ‘উন্নয়নের’ ভাষা। অভিজাতদের সাহিত্যভাষা ‘সংস্কৃত’-র সমান্তরালে যে অসংস্কৃত, প্রাকৃতের চর্চা চলেছে, তাও বিবর্তিত হয়েছে বারবার। সেইসব প্রাকৃতেরও আবার নানান কথ্যরূপ- স্থানভেদে, কালভেদে। প্রতিষ্ঠান হয়তো সেইসব অসংখ্য কথ্যরূপের কোনো একটিকেই বেছে নিয়েছে শাসনের সুবিধার্থে। আর, তার ফলে অন্য কথ্যরূপগুলি ‘অশিক্ষিত’-এর ভাষা হিসেবে অমর্যাদা পেয়েছে। হয়তো বা হারিয়েও গেছে অনেক। পিপল্‌স লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব্‌ ইণ্ডিয়া-র এক সুমারি বলছে বিগত ৫০ বছরে ২২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষা হারিয়ে গেছে! আর, আগামী ৫০ বছরে আরো ১৫০ টি ভাষা হারিয়ে যাবে কারণ, হয় সেই ভাষাভাষী কেউ জীবিত থাকবেনা নয়তো সেই ভাষার নতুন শিশুরা মাতৃভাষা বলতে শিখবেনা! ইণ্টারনেটে রয়টার্সের একটি পাতা থেকে প্রসিদ্ধ হিন্দি-সাহিত্যিক গণেশ দেবীর একটা সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। গণেশ দেবী সাক্ষাৎকারে ভারতীয় ভাষা নিরুদ্দেশ হবার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যে যুক্তিগুলো দিচ্ছেন তার একটি অভিবাসন আরেকটি শাসক-আইন। মূলতঃ উপকূল অঞ্চল থেকে জীবিকার অভবে মানুষেরা সরে আসছেন মূল শহরে। আর, এই কেন্দ্রাভিমুখী আকর্ষণে ফেলে আসছেন নিজেদের ভাষা-সংস্কার, তাঁরা হয়তো বলছেন কিন্তু তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম ব্যবহারিক অভাবে ভুলে যাচ্ছে সেইসব ভাষা-সংস্কৃতি। আর, শাসক-আইন? তিনি বলছেন- “Nomadic communities. We had a very terrible law brought in by the British called the Criminal Tribes Act, 1871 (Rescinded in 1952). Under that act, many communities were described as criminal by birth, not criminal by act. So those communities got stigmatised. … They are mostly nomadic in habit, and today in India those people are trying to move away from their cultural identity. They are trying to conceal their cultural identity. Therefore they are giving up their language.” পাঠকের নিশ্চই পান্না কোটালের বহুশ্রুত এবং বহুবিস্মৃত বাস্তব মনে আছে? ভারতের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক দখলদারি হয়েছে বহুবার। কখনো আরবি-ফারসি হয়েছে রাজভাষা, কখনো বা ইংরাজি, মেক্‌লের শিক্ষানীতি... কিন্তু, আফ্রিকা বা আমারিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মত ভারতের আদি ভাষাগুলিকে ‘খেয়ে’ ফেলা যায়নি। ইউরোপীয়রা যেখানেই উপনিবেশ করেছে মুছে দিয়েছে সেখানকার সভ্যতা, কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু অন্যরকম। সাংস্কৃতিক আধিপত্য তারা এখানেও বিস্তার করেছে তবু, তার ধরণ অন্যরকম। ঊইলিয়াম জোন্‌স-এর মত প্র্যাচ্যতাত্ত্বিকের া শাসন দৃঢ় করতে মুছে দেননি প্রাচীন সাহিত্য-ভাষা বরং তাকে ভালভাবে জেনে নিয়েছেন, সেইসব ভাষাতন্ত্রে মিশিয়ে দিতে চেয়েছেন আধিপত্য! তাই, নাদির শাহ্‌-এর জীবনী পারস্যভাষা থেকে অনূদিত হয় ইংরাজিতে। পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, জার্মান সবশেষে ইংরাজদের হাত ধরে সংস্কৃতভাষার সাহিত্য অনূদিত হতে থাকে ইউরোপে। কালিদাসের সাহিত্য, মনুশাস্ত্র, কৃষ্ণজীবন অনুবাদ করেন জোন্‌স প্রাচীন ভারতের শাসনব্যাবস্থার আঁটঘাট বুঝে নিতে! আফ্রিকীয় বা উত্তর-আমেরিকার আদি বাসিন্দাদের মত মূল ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি ভারতীয়দের। কিন্তু, প্রশাসনিক কাজের জন্য কিছু বিশেষ ভাষার ওপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে অবহেলিত হয়েছে অন্যান্য ভাষা-সংস্কৃতি। ব্যাবহারিক প্রয়োজনেই সেগুলোর প্রয়োগ কমতে কমতে হয়তো হারিয়ে গেছে বা হারিয়ে যেতে বসেছে। আর, তার সাথে রয়েছে কোনো কোনো প্রদেশ বা রাজ্যে বিশেষ একটি ভাষার শাসন। সরকারি স্বীকৃতি পায়নি বহু ভাষা। সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী মহারাষ্ট্রের মেহ্‌লি, গুজরাতের সিদি, অসমের দিমাসা ভাষা অবলুপ্ত হয়ে গেছে। আরো যাবে...


কার্তিকের পড়ে আসা বেলায়, বৃদ্ধ। একা। সেই রাজপথে, যেখানে একসময় কাঁচাপথ, আড্ডা। ফিরে আসার গল্প, নদী থেকে। ফিরে যাওয়া আবার। পাড়ানির কড়ি গুনতে গুনতে আলাপন। কতটা সুখ বহমান জলে, খরস্রোতা তিস্তা কি গল্প শোনালো আজ। কতটা ঢেউ কতটা ডুবো-পাথরে লেগে। অথবা, রোদের রঙ কিভাবে বদলে, প্রখর থেকে নরম। সান্ধ্য আসরে অন্নের কথা, গৃহসুখ অস্বস্তি অথবা নিকোনো কেমন। এ ওর ক্ষতের প্রলেপ, এ ওর ঠোঁটে ঠোঁটে ফেরা তামুক। আড্ডা শেষে নির্ধারিত অন্নের দিকে, তখনই হয়তো কোনো উদ্বেগদীর্ণ পরিচিত পাহাড়ের গ্রাম থেকে সমতলে যাবে। কিংবা, শ্রান্ত কেউ, ফিরতে দেরী, যাবে সমতল থেকে পাহাড়ে। আবার কিছুটা সময় ঢেউয়ে দুলে দুলে। এসবই কুয়াশার মত, ঘন। এখন রাজপথ প্রসারিত। দ্রুত পৌঁছানো যান, রাত আর গহীন নয় তত। নৌকাটি কবে যেন ক্ষয়ে, মরচে কিছু। শ্যাওলা বৈঠার গায়ে। ঝরাপাতা মরশুমে বৃদ্ধ, নদীর ধারে রাজপথে, সেই গাছের নিচে। এখন বাঁধানো, বেদী। পুরোনো অক্ষর, গুঁড়িতে ঘষে লেখা সম্ভাষণ আবছা। ভাষাটির মত। সেসব নদীভাষা ডুবে গেছে, সেই বন্ধুরা। মাঝে তীব্র কিছু দিন, স্বতঃস্ফূর্ত নদীভাষা আত্মস্থ করে সামাজিক মর্যাদার দাবি। শাসকের অবজ্ঞাতালিকা থেকে বিযুক্তির লড়াই। সবাক বিস্ময়ে সিকিম ঢুকে যায় ভারতে। নদীবরাবর কাঁচাপথ পাকা। আর, বিচ্ছিন্ন পরিজন, নেপালের দিকে চলে যাওয়া বহু পরিচিত। অপরিচিত, যারা ভূমিপুত্র নয়, দলে দলে তিস্তার এই পাড়ে। আর, সেই রাজপথ। গিলে নিল নদীর ওপরে সংসার মাঝিদের ভাষা, মাঝিভাষা। এখনো চাঁদ ভাঙ্গে জলের উপরে। হয়তো আগের মত আহ্লাদে না, দুঃখে। বৃদ্ধ একাকী বসে। অশীতিপর। জানে, তার রক্তের সম্পর্কেও নেই তার মাঝিভাষা। উত্তরপুরুষ শাসকের ভাষায় কথা, রাজপথ সেই নদী-পার জীবিকাও ভুলিয়ে দিয়েছে। শেষ পারানির কড়ি প্রবল অভিমানে তিনি, মুঠো খুলে। টপ্‌। নদীজলে। দু-একটা হলুদ রঙ গাছ থেকে, খসখস। একা তিনি। একা, মাঝিভাষা ঠোঁটে নিয়ে...
অনুবাদ সাহিত্যের অধ্যাপক একটি গল্প বলছিলেন। মণিপুর থেকে একজনের পাঠানো একটি গল্প অনুবাদ করা হয়, অনুবাদক লেখেন ‘ফ্রম মণিপুরী ট্যু ইংলিশ’। যদিও, গল্পটি যিনি পাঠিয়েছিলেন, তিনি উল্লেখ করেছিলেন গল্পটি বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় লেখা। কিন্তু, অনুবাদক বাদ দিয়ে দেন বিষ্ণুপ্রিয়া! আর, এভাবেই বাদ হয়ে যায় ভাষাটি, সরকার-স্বীকৃত প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে আসে মেইতেই ও ইংরাজি। ধীরে ধীরে কমে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাভাষী, কখনো বা ‘বিষনুপ্রিয়া আসলে বাংলা ভাষারই কথ্যরূপ’ বলে অবজ্ঞা করা হয় সাহিত্য-ঐতিহ্য। এখনো বিলুপ্ত নয় বটে, কিন্তু বিপন্ন। আর, এই তালিকায় পড়ে চাক্‌মাও। বাংলা লিপির সাথে সাদৃশ্যের কারণে বোধহয় জোর করেই বাংলা ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির অপচেষ্টা। আর, তা চলে আসছে দীর্ঘদিন। বহুভাষা, স্বতন্ত্র ঐতিহ্যকে মর্যাদা দিতে গেলে শাসকের কিছু অসুবিধে হয়। বরং, কাছাকাছি লিপি বা কথ্যরূপের ভাষাকে মূল একটি ভাষার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে ব্যাপারটা ‘ইউনিফায়েড’ ও হয়, প্রশাসনিক কাজেরও সুবিধে। তাই, ভাষাসত্তার আন্দোলন চলে, বিষ্ণুপ্রিয়াভাষীদের তীব্র আন্দোলন, চাক্‌মাভাষীদের আন্দোলন... বিক্ষোভে ফেটে পড়েন গোয়ার কোঙ্কনিভাষীরাও। পর্তুগীজ দখলদারি থেকে মুক্তি মিললেও ষাটের দশকে মারাঠিরা দাবি করতে থাকে মারাঠা ভাষার কথ্যরূপ কোঙ্কনি, তাই স্বতন্ত্র স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই! যদিও, কোঙ্কনি ভাষার লিপি সুবিস্তৃত, স্থানবিশেষে আলাদা। কেরলে মুসলিমরা ব্যবহার করে আরবি হরফ, গোয়ার হিন্দুরা মিশিয়েছে নাগরী। কিন্তু, কোঙ্কনিসাহিত্যের ঐতিহ্যও সুপ্রাচীন। সেই স্মৃতিতেই ভাষার আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই। চলছে। পর্তুগীজ, ইংরাজি আর মারাঠির ত্রিভুজে অস্তিত্বরক্ষার বিপন্ন সংগ্রাম।
আর, বিশ্বায়নী সংস্কৃতিতে ক্রমশঃ ভাষাবৈচিত্র কমে আসা। ভারতে ‘নব্য-বৈদিক’ মুখোশে আধিপত্যকারী ক্ষমতার প্রবল উত্থানে চাপা পড়তে থাকা ক্রমশঃ প্রান্তিক নিম্নবর্গের, অন্যধর্মের ভাষার দিনরাতে আমরা বড়জোড় আঁকড়ে ধরতে পারি আমাদের ভাষা। বিস্মিত হতে পারি সেইসব নিরুদ্দিষ্ট সভ্যতা, ভাষার জাদুগল্পে। শ্রদ্ধায় আনত হতে পারি সমস্ত অবহেলিত, হারিয়ে যাওয়া কথ্যসাহিত্যের সামনে। হয়তো সেইসব মিথ্‌, সংস্কারের বিশ্লেষণে বাস্তবকে দেখে নিতে পারি। কখনো বা বুঝে নিতে পারি ক্ষমতা-র সাথে জ্ঞান কী অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে, বয়ান কিভাবে প্রতিষ্ঠা পায় ভাষার সাথে। ভাষা এক প্রবহমান নদী। তার গতি সরলরেখায় নয়, হতে পারেনা। নিজের ইচ্ছামত সে বাঁক নেবে, শাখানদী মিশবে তাতে। ঋদ্ধ হবে। আর, যদি তা না’হয় তা’লে বদ্ধমুখে একদিন তা শুকোতে বাধ্য। এ লেখায় কিছুটা ধরা রইল সেইসব ভাষাকাহিনী যারা বাধ্যতঃ হারিয়ে গেছে। যাদের নিরুদ্দেশ করেছে উপনিবেশ, চাপিয়ে দেওয়া শাসকের সংস্কৃতি। কিন্তু, এমন ভাষাও আছে অনেক, যা উপনিবেশিতর ভাষা না হয়েও শুধুমাত্র বদ্ধতার জন্যেই হারিয়ে গেছে। কিছু লিপি, কিছু হরফ পাওয়া গেছে। কিছু-বা কালের গর্ভে। কিন্তু, নিরুদ্দেশে ‘পাঠানো’ বেশিরভাগ ভাষারই সন্ধান পাওয়ার কোনো পথ রাখা হয়নি। অবহেলিত ভাষারা বিপন্নতায় ছাই রঙের অন্ধকারে। আর, এখনো যখন দখলদারি, উপনিবেশ, সংস্কৃতিকে গিলে নেবার রীতি অব্যাহত, তখন এই বিপন্নতাও ক্রমবর্দ্ধমান। ভাষার এই যে দুঃখ, ব্যক্তিগত সংলাপ এ বোঝার দায়বদ্ধতা আমাদেরই- যারা বহন করি, ধারণ করি। জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলনের সাথেই কি সম্পৃক্ত নয় ভাষারক্ষার লড়াই? আমাদের প্রত্যেকের শিকড় চারিয়ে দেওয়া ভাষা। আমাদের সত্তা, আমাদের কথা জানানোর ভাষা। ক্ষমতার কাছে হার না-মানার ভাষা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে, জীবনযাপনে আরো গহীন আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকা- তার মধ্যে দিয়েই ভাষার বেঁচে থাকা। বেঁচে থাক। আর, আজ যদি সেইস-ব অভিমানী ভাষা ফিরে আসে? প্রশ্ন করে সমস্ত সভ্যতাকে, জবাব চায় নিরুদ্দেশের?




তথ্যসূত্রঃ
লাতিন আমেরিকার তিন সভ্যতাঃ ড. সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়
Popol Vuh: Sacred book of the Quiche Maya people: Translation & Commentary by Allen Christenso
I, Rigoberta Menchu, An Indian Woman in Guatemala
The Violent Land: Jorge Amado
Things fall apart: Chinua Achebe
Decolonising the mind: The politics of Language in African Literature: Engugi Wa Thiang’o
আফ্রিকার সাহিত্য সংগ্রহঃ কাগজ প্রকাশন
আলেহো কার্পেন্তিয়ের রচনা সংগ্রহঃ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
আন্তর্জাল ও অন্যান্য পত্রপত্রিকা, বই।