স্নান

রুচিস্মিতা ঘোষ


বাথরুম! অনেকের কাছেই বাথরুম মানে শুধু স্নান করা, ছোট বাইরে, বড় বাইরে... বাথরুম আমার কাছে প্রাইভেসি! আঃ! দরজা বন্ধ করলেই নিজস্ব সবকিছু। আত্মউন্মোচনের এক নিভৃত ঘর। বড় কাছের ঘর। কখনও কখনও শুধু নাওয়া-ধোয়া নয়, শোক-দুঃখ তাপের থেকে মুক্তি পাওয়ারও আশ্রয়। প্রাইভেসি, স্বাধীনতা ... এসব এখন আধুনিকতা।
আমাদের সেই ছোটবেলায়, আমাদের মা-পিসিমাদের সময়ে যা দেখেছি, ভাবা যায় না। অবহেলা আর উপেক্ষা। এখনকার ছেলেমেয়েদের মত তখন আমরা ঠিক আধুনিক হয়ে উঠিনি। সত্তা সচেতন, স্বাধীনচেতা। এখন বেডরুমের মত বাথরুমও বিলাসবহুল। জীবনসংগ্রাম এখন বিলাসে। মডেল বাথরুম এখন মডেলের মেয়ের মতই সেক্সি আর অ্যাট্রাক্টিভ।
ছোটবেলাটা রাঁচিতে কাটলেও তখনকার লম্বা লম্বা গরমের ছুটিগুলো কাটত চুঁচুড়ায় মামার বাড়িতে। সেখানে চানঘর বা বাথরুম ছিল না। স্নানের বিলাসিতা তো বাহুল্য। ছিল কুয়োতলা। সেখানে অন্যরকম স্নান।
মামাবাড়ি বলতেই মনে পড়ে দাদুর ডিসপেনসারি, দিদিমার রান্নাঘর, মায়ের দূর সম্পর্কের পিসিমা আর উঠোনের এক কোণে সেই কুয়োটার কথা।
দাদু ছিলেন হোমিওপ্যাথির ডাক্তার। রাশভারী চেহারা। রোগীদের ভিড় দেখে বুঝতে পারতাম তাঁর পসার। দিদিমার রান্নার হাতটা ছিল খুব ভাল, যা তৈ্রী করতেন সবই অমৃত। মায়ের সেই পিসিমার স্নেহমাখা চেহারাখানা এখনও চোখে ভাসে। আর সেই কুয়োটা স্বপ্নে এসে প্রায়ই হানা দেয়।
পিসিমা থাকতেন মামাবাড়ির রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ছাতে ওঠার সিঁড়ির একপাশে ছোট্ট একটা ঘরে। অন্ধকার-অন্ধকার। ঠিকমত বাতাস খেলা করে না সেই ঘরে। দাদু আর দিদিমার ঘরের থেকে অনেক আলাদা। একে তো দূর সম্পর্ক তায় বিধবা। আশ্রিতাদের ঘর বোধহয় এমনই হয়।
উঠোনের পাঁচিল ঘেঁষে ঝাঁকড়া আমড়াগাছটা ছায়া দিত। সেই ছায়ায় বসে পিসিমার কাছে আমরা ভাইবোনেরা নানা ধরনের গল্প শুনতাম। তাঁর হাতপাখাটি অবিরাম আদর ছড়াত। পিসিমার পরনের সাদা থানটির মত তাঁর মাথার চুলও সাদা। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। আশ্রিতা হলেও তাঁর চেহারায় একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। ছিল একটা স্নেহশীল মন। পিসিমার শাড়ির আঁচলে বাঁধা থাকত একগোছা চাবি। কিসের চাবি? সম্বল বলতে তো ছিল একটা টিনের বড় তোরঙ্গ। আসলে নিজের সংসার ছেড়ে আসার সময় চাবির গোছাটি ছেড়ে আসতে পারেন নি। সেইসময় প্রায় সব বাড়িতেই একটা বা দুটো কুয়ো থাকত। দিদিমা অবশ্য মাটির বড় জালায় গঙ্গাজল রাখতেন। একজন ভারী বাঁকে করে গঙ্গাজল এনে দিত। অবাক ভাইবোনেরা জিজ্ঞেস করতাম, দিদা, গঙ্গাজল রাখো কেন গো? দিদিমা হেসে বলতেন, গঙ্গাজলে পোকা হয় না। আর পুণ্যের কাজেও লাগে। বলে কপালে হাত ছোঁয়াতেন। সেইসময় গঙ্গার জল এত দূষিত হয় নি। হয়তো সত্যিই পোকা পড়ত না। আমরাও সহজ বিশ্বাসে সেই জল খেয়েছি।
একদিন কুয়োর পাড়ে স্নান করতে গিয়ে পিসিমার আর্তনাদ শোনা গেল। মা-দিদিমা, আমরা ছোটরা সকলে ছুটে এলাম। দাদু ডিসপেনসারি সেরে সবে ঘরে ঢুকেছেন, দাদুও ছুটে এলেন। দেখি পিসিমার শরীরে জড়ানো ভেজা গামছা। মাথার চুল ভিজে। পরনের থানখানিও ভিজে চপচপে। তিনি কাপড় পরেই স্নান করতেন। ওই যে প্রাইভেসি নেই। অগত্যা ওভাবেই স্নান করতেন তখনকার মহিলারা। পিসিমা সেই অবস্থাতেই আমাদের দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন –‘ওরে, সর্বনাশ হইসে। আমার চাবির গোছাটা কুয়ার মধ্যে পইড়্যা গ্যাসে’। দিদিমা তা শুনে মুখ বাঁকালেন। বললেন, যা গ্যাসে, ভালই হইসে দিদি। ওই চাবির গোছায় তোমার কাজ কি? হেইয়া তো তোমার আগের সংসারের।
-“না-না ওই চাবি আমার বুকের ধন। ও সুবোধ, চাবি তোলনের ব্যবস্থা কর”।পিসিমা আকুলস্বরে দাদুকে অনুরোধ জানালেন। পিসিমার সেই কান্নাভেজা মুখখানি দেখে আমার চোখেও জল চলে এল। ভয়ে ভয়ে দেখছি দাদুকে। এই বুঝি পিসিমাকে ধমক দেন। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে তিনি নরম গলায় বলে উঠলেন, আগে ভিজা কাপড়খান ছাড়ো দিদি, আমি হারাধনরে খবর পাঠাইতাসি।
হারাধন কে? আমাদের ভাইবোনদের চোখে প্রশ্ন। মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। কিন্তু দাদুকে জিজ্ঞেস করার সাহস নেই। শুধু দেখলাম পিসিমা নিশ্চিন্ত হয়ে তাঁর নিজের ঘরটিতে ঢুকে গেলেন।
হারাধন এল। রোগা ছিপছিপে চেহারা। মুখে বসন্তের দাগ। এসেই হাঁক পাড়ল, কই গো মা-ঠাকরুণ? ঘটি পড়ে গেছে কুয়োয় না বালতি, না এই বাচ্চাগুলোর খেলনা? পিসিমা তখন পরিষ্কার সাদা থানে, চুল পরিপাটি আঁচড়ানো, চোখে চশমা –নিজের পরিচিত চেহারায়, যে চেহারার সঙ্গে একটু আগের দেখা পিসিমার কোনো মিল নেই। তিনি হারাধনকে দেখে একগাল হেসে বললেন, কেমন আছিস রে হারাধন? ভাল তো? দ্যাখ না বাবা আমার চাবির গোছাটা পড়ে গেছে। তুই নিশ্চয়ই তুলে দিতে পারবি। পারবি না?
--তা পারব। কী দেবেন মা-ঠাকরুণ, তাই বলেন। দিদিমা হেসে বললেন, দিদির আর আছে কী? দাও তুলে চাবির গোছাটা। ডাক্তারবাবু যা দেবার দিয়ে দেবেন।
হারাধন একবার আমাদের দেখে হাসল। তারপর তার ধুতিটা একটানে খুলে ফেলল। কাঁধে রাখা গামছাটা কোমরে বেঁধে নিল শক্ত করে। অবাক হয়ে দেখলাম দিদিমা তার হাতে একটু সর্ষের তেল ঢেলে দিলেন। সে আঙুলে করে সেই তেল নাক আর কানের ফুটোয় লাগিয়ে বাকি তেলটা মাথায় মেখে নিল। তারপর এক অদ্ভুত উপায়ে কুয়োর দেয়াল বেয়ে তরতর করে নেমে গেল জলের ভেতর। দিল এক ডুব। আমরা সব ভয়ে ভয়ে কুয়োর দিকে তাকিয়ে আছি। লোকটা উঠতে পারবে তো? যদি ডুবে যায়? কিন্তু আমাদের ভয়কে অমূলক করে হারাধন পিসিমার চাবির গোছা হাতে নিয়ে দিব্যি জলের তলা থেকে বেরিয়ে এল। তার সারা শরীর থেকে জল পড়ছে টুপটাপ। হাতের মুঠোয় ঝকঝক করছে পিসিমার চাবির গোছা। পিসিমার মুখে প্রশান্ত হাসি।
পিসিমা হারাধনের হাতের থেকে চাবির গোছাটা নিয়ে তার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। বললেন, বেঁচে থাক বাবা। তোর নামটা সার্থক হল। আমার হারানো ধন খুঁজে দিলি।
দাদু তাকে খুশি করে দিলেন। কত টাকা দিয়েছিলেন ঠিক জানি না। দিদিমাও তাকে পেটভরে ভাত খাইয়েছিলেন সেদিন। হারাধন হাসিমুখে বলেছিল, যাই, মা - ঠাকরুণ। আবার ডাক দিবেন।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মামাবাড়ি যাওয়াও কমে গেল। মা-র কাছ থেকে শুনেছি, দাদু নাকি তারপর একটা কুয়োর কাঁটা কিনে এনেছিলেন। সেই যন্ত্রটার ওপরে দড়ি বাঁধার একটা আংটা ছিল। আর সেই আংটা থেকে একটা লোহার মোটা ডাঁটি নেমে আসত, অনেকটা মাছ ধরার বড়শির মত। এরপর থেকে কুয়োতে কিছু পড়ে গেলে দড়িতে বেঁধে সেই কাঁটাটাকে কুয়োর মধ্যে নামিয়ে কায়দা করে ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়া জিনিস উদ্ধার করা হত।
মা - কে প্রশ্ন করেছি, সেই হারাধনের কী হল, মা? মা হেসে জবাব দিয়েছেন, হারাধন কি আর বুড়ো হবে না? তাছাড়া কুয়ো থেকে জিনিস তুলে ক’টা পয়সাই বা পেত?
এখন আর সেই মামাবাড়ি নেই। হারিয়ে গেছে হারাধনও। সেই কুয়োতলা ... খোলা আকাশের নীচে সেই স্নান এখন স্বপ্ন...