লুপ্ত কথা উপ্ত কথা

সৌমিত্র চক্রবর্তী


কথায় কথা আনে, কথায় কথারা গড়ে নেয় নতুন বসত। মতবিরোধ হলে কথায় কথা কাটে অনিবার। আসল তো সেই রোটি-কাপড়া আউর মকান। তার জন্যেই এত হ্যাপা, এত ভ্যাংরাজি, এত কথার চাষ। সবই সেই পাপী পেট কি সওয়াল। এই পেট ভরানোর তাগিদে কতরকম ছলাকলা, কত নানান কায়দায় টাকার হাতবদল। আর পেট ভর্তি হলেই এটা সেটা শরীর মন, চাহিদা গুলো হামলে পড়ে বিকেলের রোদের পেছনে ছায়ার মতোই। সময় এগোয়, এগোয় দুপেয়েদের আর্থ সামাজিক ধরণ ধারণ। ঘড়ির টিকটিকের সাথেই পেছনে পড়ে স্মৃতির র্যা কে জায়গা করে নেয় হরেক রীত, হরেক পেশা।
পর্দায় আবছা হয়ে আসা ছবিগুলো পিলপিল করে চারদিক থেকে ছুটে আসছে। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে কচি কচি অতীতের মুখগুলো আসছে, ডেকে বলছে, “এই যে যাযাবর! আছ কেমন? সেই যে আমাকে ছেড়ে এসেছিলে রুক্ষ ধূলোমাখা শৈশবের বায়োস্কোপের বাক্সে, আর তো খোঁজ নিলে না কখনো আছি কেমন? কেমন আছ হে যাযাবর এই প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়া সাজানো শবের দুনিয়ায়? এসো না প্লিজ! এসো - এসো, দেখ আবার তোমার সামনে সেই কাঁচা লালমাটির রাস্তা এঁকেবেঁকে কোন দূরের মাঠ জলা পাহাড়ের সুগন্ধ গায়ে মেখে নাচতে নাচতে হাজির হয়েছে। দেখতো চিনতে পারো কিনা, ওই রাস্তার ওই দূরতম প্রান্তে হেঁটে আসছে একটা কালো তুবড়ে যাওয়া মুখ। কত বসন্তের ক্ষত সেখানে আঁকিবুকি কেটেছে নিশ্চিন্ত প্রশ্রয়ে। দেখ, এই তোমার সামনে মেলে ধরলাম মায়াবাক্স। সেখানে ঝুঁকে চোখ লাগালেই না জানি কতো আশ্চর্য জগত সরে সরে যাচ্ছে একের পর এক। দেখ, দেখ, দেখে নাও হে বুরবক! তামাম মাল্টিপ্লেক্স ঢুঁড়লেও এ জগতের আশ্চর্য ছবি কোথাও খুঁজে পাবেনা”।
গ্রীষ্ম আসে - গ্রীষ্ম যায়, শীত আসে - শীত যায়। স্লো মোশন থেকে প্রকৃতির আসা যাওয়ার নিরবিচ্ছিন্ন গল্পকে যদি হঠাৎ ফাস্ট মোডে চালিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে হুশহুশ করে পেরিয়ে যাবে কত রঙ, কখনো উজ্জ্বল কখনো বিবর্ণ। ইতিহাস বড় স্বার্থপর। নিজের স্বার্থের বাইরে একটাও মুখের ছবি সে মনে রাখেনা। তবুও না চাইলেও ঝেড়েও ফেলে দিতে পারেনা অবাঞ্ছিত ভেঙে যাওয়া স্মৃতির আয়নার টুকরোগুলো। অন্ধকার খাঁজে ওপরের দিকে ভেসে ওঠে ঝলক দেওয়া আলোর কণা। হঠাৎ আলোর প্রতিফলন চোখের পাতায় ফেলে চোখ ধাধিয়ে দেয় মুহূর্তের জন্যেও। আর যতই লুকোতে চা’ক, ফাঁকে ফোকরে ভেসে উঠবে জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া বহু ফুটিফাটা মুখ –“দাদা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম!”
বাঁচার জন্য, বাঁচতে চাওয়ার জন্যে সকাল থেকে উদয়াস্ত নানান ফিকির, নানান বুদ্ধির কসরৎ। তবুও সেই আদ্যিকাল থেকেই প্রচন্ড বহুমুখী প্রতিযোগিতায় কেউ এগিয়ে টিকে যায়, কেউ মিলিয়ে যায় কালের ব্ল্যাক হোলে। সকাল গড়িয়ে বেলা হয়। বাড়ির কর্তা গেছেন সেই কাল পেটের গর্ত ভরানোর উপায়ে। গিন্নী হরেক কাজে ব্যস্ত। জামাকাপড়গুলো খুব ময়লা হয়েছে, সোডা দিয়ে ফুটিয়ে ধপধপে সাদা করতে হবে। শিলে বাটনা বেটে রান্নার হরেক পদ রেঁধে ধরতে হবে সকলের সামনে। এরমধ্যেই গুছিয়ে তুলতে হবে অগোছালো সংসার। টুকিটাকির এদিক ওদিকে পেছনে ঘুরঘুর করে স্কুল ছুটি থাকা অবোধ সন্তান। দৈনন্দিন একঘেয়েমির মাঝেই বাড়ীর সামনে দিয়ে এঁকেবেঁকে নিজের বেখেয়ালি দেহাতী মনের আনন্দে চলে যাওয়া রাস্তার অন্যপ্রান্ত থেকে আচমকা কানে ভেসে আসে এক সুরেলা সুর। “চাই ফিতে, সিঁদুর, চুড়ি, মণিহারীইইইইইই…”
হাতের কাজ ফেলে দরজায় দরজায় ভীড় করতো সংসারের যাঁতাকলে পিষে যেতে থাকা মুখগুলো। তাদের রোজকার জীবনচক্রে কখনো আলোয় ভরিয়ে দিতে কোনো দেবদূত আসেনা। বিয়ের পর থেকেই সংসারের সং সেজে তারাও এক একটা মেশিন হয়ে গেছে। সকাল হলেই রোজই সেই একই কাজ, রান্না, ছেলেমেয়ে, গৃহপালিতের, স্বামী-শ্বশুর-শ্বাশুর সমেত হরেক কিসিমের গুরু আর লঘুজনের খিদমত খাটা, আর রাত্রি হলেই যন্ত্রের মত নিজেকে উলঙ্গ মেলে ধরে অন্যের সুখ মিটিয়ে ওপাশ ফিরে শোওয়া। বৈচিত্র কবেই যেন বাই বাই করে কেটে পড়েছে নির্বান্ধব যুদ্ধভূমিতে তাদের একলা ছেড়ে দিয়ে।
সেই ভাবলেশহীন ভাঙাচোরা মুখেরা আলোয় ভরে যেত সেই কালো কুচকুচে লোকটার হাতের বাক্সের দিকে তাকিয়ে। সামনে বসে একটানা বকবক করতে করতে লোকটা যখন খুলতো সেই প্যান্ডোরার বাক্স, ওমনি এটা… সেটা… দেখি… দেখি… দেখি…! একটুও বিরক্ত না হয়ে লোকটা একের পর এক দেখিয়ে যেত সেই শাঁখা, সিঁদুর, হরেকরকমবা রঙের চুড়ির সম্ভার। কি নেই সেই ছোট্ট কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়ানো কাচের বাক্সে! আংটিও আছে, আছে সস্তার ফেসপাউডার। মাথার তেল আছে, আছে সায়া বা পাজামায় বাঁধার দড়ি।
সবই শস্তার, বাড়ীর গৃহিণীদের ধরাছোঁয়ার মধ্যেই। তাদের লুকিয়ে দুচার পয়সা করে জমিয়ে তোলা কষ্টের সাধ্যের মধ্যেই। তাহলেও শুরু হতো দরাদরি। ফেরিওয়ালাও তার রুজি শুরু ইস্তক জেনে ফেলেছে এটা। তাই কোনো জিনিস মনে ধরার আগেই কিছুতেই সে দাম বলতে চায় না। “নিন না দিদি, দাম হয়ে যাবে। আমি কি আপনার অচেনা দিদি? বলুন নতুন আসছি আজ? আপনার কাছে বেশি দাম চাইতেই পারব না”। ইত্যাদি কথার জাল পাক দিয়ে ছড়াতে থাকে সে। আর বেচারা গৃহিণী সন্দিহান হয়ে চুড়ি বা অন্য সাজগোজের জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই থাকে। হবে তো এটা তার দামের মধ্যেই? হাতছাড়া হয়ে যাবে না তো এত সুন্দর জিনিসটা? আর হাতছাড়া হয়ে যদি ওপাশের বাড়ীর বউটার হাতে এটা চলে যায়, তাহলে কি হবে! কত দুশ্চিন্তা তখন তার।
মোবাইল মনিহারী ফেরিওয়ালাও বুঝতে পারে সেই অন্তঃপুরচারিনীর মনের টানাপোড়েন। আস্তে আস্তে হুইলের সুতো ছাড়ে সে। সে বুঝেছে মাছ ঠুকরাচ্ছে। এ খাবেই খাবে লোভনীয় টোপ। এরপর সে অন্তত দুগুন দাম বাড়িয়ে যখন বলে, তখন প্রথমে আঁতকে ওঠে খরিদ্দার। এবার শুরু হয় দড়ি টানাটানির প্রাচীন খেলা। মায়ের পেছনে কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে অবোধ সন্তান। আশেপাশে জুটে যাওয়া মেয়েদের মন্তব্যের ফাঁকে যেন হার স্বীকার করে নিচ্ছে, এরকম ভাব দেখিয়ে ফেরিওয়ালা খুব হতাশ স্বরে বলে ওঠে, “ আচ্ছা দিদি নিন। কিন্তু আপনাকেই দিলাম এই দামে, কাউকে বলবেন না যেন। খুব লস হয়ে গেল দিদি”। কোনোদিন শহুরে সফিস্টিকেটেড মঞ্চ না দেখা ওই অশিক্ষিত ফেরিওয়ালারা যে কি সুন্দর অভিনয় করত সেই সময়ে, এ যে না দেখেছে, সে বুঝবেই না।
দিন গড়ায়। পাড়ায় নতুন ষ্টেশনারী দোকানও আস্তে আস্তে সময়ের হাতের ছাপে পুরনো হয়ে গিয়ে ধুঁকতে থাকে। পাশেই বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরী হয় ঝাঁ চকচকে শপিং মল। গ্লোবালাইজেশনের চূড়ান্ত উদ্দামতা সেখানে। বেকহ্যামের বউ এর জুতো থেকে কাঁধের আধুনিকতম উল্কি, সবই পাওয়া যায় সেখানে। ধীরে ধীরে মোবাইল মনিহারী ফেরিওয়ালার মুখের সামনে বন্ধ হয়ে যায় দরজাগুলো। শক্ত হয়ে এঁটে বসে কেড়ে নেয় ফেরিওয়ালার মুখের সব কথা। বোবা দৃষ্টিতে খোদাই হয়ে যায় বাড়ীতে উপোসী অপুষ্ট বউ আর ছেলেমেয়েদের রেখে আসা ফেরিওয়ালার হেরে যাওয়ার গল্প। গ্লোবের পূর্বপ্রান্তে শুরু হয়ে গেল গ্লোবাইলাজেশনের নতুন পরিচ্ছেদ। এখানে শপিং মল আছে, ঝাঁ চকচকে শো রুম আছে, নিদেন পাড়ার ঝকঝকে ভ্যারাইটি স্টোর আছে, নেই শুধু মোবাইল দেহাতী অশিক্ষিত মনিহারী ফেরিওয়ালা।
যতদিন যাচ্ছে মানুষের মাথায় ভরে যাচ্ছে জলস্থলে মেশানো প্রতিদিন পরিবর্তিত এই গ্রহ। রোজ প্রত্যেক সেকেন্ডে জন্মাচ্ছে মানুষ - মানুষ - শুধু মানুষ। শিল্পবিপ্লব হলো ইংল্যান্ডে। আর সাথে সাথেই ঢাক বেজে গেল সামন্ততন্ত্র বিসর্জনের। দুন্দুভির কানফাটানো আওয়াজে চাপা পড়ে গেল সামন্তরাজের নহবতের সুর। একটু অবস্থাপন্নের বাড়ীতে বিয়ে কিম্বা অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়ীর সামনে তৈরী হত নহবতখানা। সেখানে ভোর থেকে ভৈঁরো বা পূরবী রাগে বেজে উঠতো সানাই। আনন্দে থইথই করা অনুষ্ঠানবাড়ীর পরিবেশ বদলে যেত কন্যা বিদায়ের সময় সানাইএর করুন সুরে। শুধুই বিয়েবাড়ীতে বাজানো ছাড়া এই সানাইবাদকদের আর কোনো জীবিকা ছিল না। কিন্তু খরচ বাঁচিয়ে অন্যদিকের আধুনিকতম প্রমোদের নেশায় মানুষ ঢলে পড়লো অর্কেস্ট্রার দিকে, সঙ্গে লাইভ শো। নিগূঢ় অভিমানে সানাই বাজানোর শিল্পীরা পেশা ছেড়ে চলে গেলেন অন্যদিকে। হারিয়ে গেল কয়েক প্রজন্মের ইতিহাস।
একইসাথে বিদায় নিলো একসময়ের প্রচুর স্মৃতির দাগ গায়ে নিয়ে “হুমনা হুমনা…” হেঁকে যাওয়া পাল্কীবাহকের দল, একদিক থেকে অন্যদিকে যাত্রীদের বয়ে নিয়ে যাওয়া এক্কাগাড়ী, পাথর কেটে রোজকার ঘরোয়া গেরস্থালীর বাসনপত্র তৈরীর কারিগর, বায়োস্কোপওয়ালা, খাটা পায়খানা পরিস্কার করা মেথর, গ্রামের প্রসূতির ভগবান ধাইমা, জলের পাইপ দিয়ে রাস্তা ধোওয়ার কর্পোরেশন কর্মী, আরো কত কি। আবার সামন্তযুগের কিছু ব্যবস্থা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে জুটি বেঁধে টিকে থাকার চেষ্টা করল কিছুদিনের জন্যে। যেমন ঘোড়ার সঙ্গে জোট বেঁধে সাময়িক কিছুদিনের জন্য চললো ঘোড়ায় টানা ট্রাম। কিন্তু রাজারাজরা বিদায়ের রেশ ধরে এরাও আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। এরমধ্যেই একটা হল সেই প্রাচীন সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার রানার। আধুনিক শিল্পবিপ্লব পরবর্তী ডাকঘরের সঙ্গে জুটি বেঁধে নিল ডাক হরকরা। কত গল্প কত স্মৃতি। তারাশংকর থেকে সুকান্ত, রানার বারবার উঠে এসেছে তাদের নিত্যকার জ্বালা যন্ত্রণা, অভাবের বৃত্ত সঙ্গী করে মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি। মানুষ বড় নিষ্ঠুর। নিজের স্বার্থে, নিজের চাহিদায় সে এগোতে চায় দ্রুত থেকে দ্রুততর। রানারের শ্লথতা থেকে তার উত্তরণ মোবাইল মেসেজে। মুহূর্তের মধ্যে গ্লোবের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত খবর ছুটিয়ে নিয়ে যাবার চাহিদা আর নেশায় মাথা নীচু করে একদিন ডাক হরকরা বললো, “আমি আর চাকরী করব না বাবু”।
একদিন এই বন, এই জঙ্গল উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল যে নতুন সবুজ পাতায়, অন্য আর এক বিকেলে সেখানে শীত এলো। ঠান্ডা হাওয়ার কাঁপনে জরা পরম আদরে জড়িয়ে ধরল তাকে। সবুজ পাতা আস্তে আস্তে হলুদ হয়ে যেতে যেতে একসময় হঠাৎ খসে পড়ল তার জন্মাবধি আশ্রয় গাছের থেকে, নিস্প্রাণ। মানুষ হইহই করে এগিয়ে গেল আরো আরো সামনের দিকে। তাদের বেখেয়ালি পায়ের চাপে পিষে গিয়ে মুড়মুড় করে ধূলোয় মিশে গেল সেদিনের প্রাণের পাতা। কেউ খেয়ালই করল না।