নিরুদ্দেশের ধুলোখেলা

সরোজ দরবার


আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে, তখন কে জানত, তোমার মতো খেলারাও সব মিলিয়ে যাবে নিরুদ্দেশের সীমান্তে। তুমি মানে তো সেইসব ‘বউ বসন্ত’ বিকেল। সেই ডানপিটে ‘ডাংগুলি’ কৈশোরের সন্ধে ঘনিয়ে বাড়ি ফেরা...বাউন্ডুলে ‘বাগাডুলি’র বেপরোয়া দিনকাল। এখন এই কার্টুন নেটওয়ার্কের অধীন কৈশোরে ভিডিও গেমসের স্বায়ত্তশাসন। ফলে তুমি তো সেই যাবেই চলে...। গেছও। যে খেলারা জমা ছিল লাইব্রেরি পিছনের মাঠে, যে খেলারা ছিল পড়া ফেলে একছুট, সেই সব পাড়া-পড়শি ধুলোখেলারা আজ বেপাত্তা। বস্তুত এই পালটানো সময়ে যে স্বপ্নের পাখিরা বেঁচে থাকবে না সে কথা আমরা সেদিন আঁচ করিনি। সেদিন পড়শি ছাদের থেকে ঘুড়ি নামাতে গিয়ে চিলেকোঠার ঘরের দিকে তাকিয়ে আমরা মুহূর্তমাত্র থমকে গেছিলাম মাত্র।তারপর ভেবে নিয়েছিলাম, ওখানে বয়সে একটু বড় দুজনের মধ্যে যেটুকু চোখে পড়ল তা আমাদের দেখার কথা ছিল না। খেলা নয়...নয়...নয়...বলে আমরা খেলাতেই মন দিয়েছিলেম। সেদিন কে জানত, আমাদের দেখার কথা ছিল এই যে, সকল খেলা সাঙ্গ করে চিলেকোঠাখানিই বিকিয়ে যাবে প্রোমোটারি লালা মুখে। ধরা না পড়া বিকেলরা সব বেড়াতে যাবে ঢাকুরিয়া লেকের ধারে, অল্প বয়সে, আর আমাদের খেলারা সব পাড়ি জমাবে নিরুদ্দেশে-কে জানত। আজ যখন বিজ্ঞাপনের মায়েরা ইউ টিউব দেখে স্ট্রেট ড্রাইভ রপ্ত করেন, আজ যখন শপিংমলের গেম পার্লারে বাবা-মায়ের হাত থেকে বেরিয়ে আসে বাহারি ক্রেডিট কার্ড, আজ যখন ছিটেফোঁটা ধুলোও সার্ফ এক্সেলের নিশ্চিত নিরাপত্তা খুঁজে নেয়, তখন আমাদের মনে হয় আর যাই হোক আমাদের বাবা-মা এতখানি গেম কনসাশ ছিলেন না। আমরা মানে যারা দাদুর মুখে মোহনবাগানের খালি পায়ে ইংরেজদের হারানো গল্প শুনে নিজেরাই খালি পায়ে দেওয়ালে বল মেরেছি। আমরা অর্থাৎ যারা এক পাড়ায় একটা টিভিতে শচীন তেন্ডুলকরের লেগ গ্লান্স ও সৌরভ গাঙ্গুলির ‘বাপি বাড়ি যা’ দেখে শ্যাডো প্র্যাকটিস করতে করতে যে যার নিজের বাড়ি ফিরে গেছি। অতঃপর পিচ-ব্যাট-প্যাডের অভাব দেখে দু’দলে ভাগ হয়ে অবশেষে কানামাছি খেলে সারা হয়েছি। নাহ আমাদের কোনও কোচিং সেন্টার ছিল না, তবে পকেটে হরদম বেশকিছু মার্বেল মজুত থাকত। আমরা অর্থাৎ যারা ক্লাসে এ-গ্রেড, বি-গ্রেড বলে কিছু ছিলাম না। পাশ আর ফেলের মধ্যে দিয়ে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বাৎসরিক ক্যালেন্ডার পূরণ হতে থাকলে, পড়াশোনার বেশি আমাদের প্রতিযোগিতা জমত ইস্কুল মাঠে। যে ছেলে অঙ্কে দড় নয়, সে যে ‘অঙ্ক দৌড়’-এ প্রথম হবে না, এ গ্যারান্টি স্বয়ং কেশব নাগ মহাশয়ও তো দিতে পারতেন না। আজ নবীন কিশোরের দল নেইমারের জার্সি গায়ে জায়েন্ট স্ক্রিনে যখন বিশ্বকাপ দেখে আর ফেসবুকে ফার্ম হিরো সাগার রিকোয়েস্ট পাঠায়, তখন এই আমরা স্মৃতিকে বলি, খেলা দাও। স্মৃতি বলে তবে ফিরে যাও সেই লাইব্রেরি মাঠে, সেই ছাতিম গাছের গা ঘেঁসে দাঁড় করিয়ে রাখা বাই সাইকেলগুলোর কাছে। মস্তিষ্কে এই স্মৃতি সরণী খুঁজে পেয়েই এবারের নোবেল এসেছে, কিন্তু এ তো আমাদের ন্যাড়ার বেলতলা। মনে মনে পৌঁচ্ছলেও মনখারাপ হয়, তবু যেতে ভারী ইচ্ছে করে।
খেলা খেলা দিয়ে শুরু...
কো-এড স্কুলে যতদিনে আমারা ছেলে-মেয়ের ভেদাভেদ বুঝতে শিখেছি তার আগেই কয়েকশো বার পলকা সুমন খেলায় বউ হয়েছে। আর ডাকাবুকো মলি তাকে কতবার যে দু’হাতে তুলে নিয়ে একদমে ঘরে পৌঁছেছে তার ইয়ত্তা নেই। কেউ সেদিন লজ্জা পায়নি কারণ তা ছিল খেলায় জিত। ‘বউ বসন্ত’ খেলার রীতিই এই। দু’দলে এর মধ্যে একদল হবে পাহারাদার। অন্যদলের একজনকে বউ হিসেবে দূরে কোথাও বসানো হবে। দলের বাকি সদস্যরা একটা আয়তকার জায়গায় থাকবে। তারপর একদমে মুখ কিৎ কিৎ জাতীয় আওয়াজ করতে করতে বয় আনতে যাবে। দম শেষ হয়ে গেলে আর বউকে নিরাপদে ঘরে ফেরানো হবে না। অন্যদিকে দম থাকতে থাকতে যদি পাহারাদারদের কাউকে ছুঁয়ে ফেলতে পারে তাহলে সে আউট। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ঠিক হয়ে যায় সাতবার বা দশবার বউ আনার সুযোগ পায় এক একটা দল। এর মধ্যে আনতে পারলে ভালো, নইলে হার। বসন্ত না হলেও দেদার এই খেলা খেলতে দেখা গেছে। কিন্তু অনুপ্রাসের জন্য এ খেলার এরকম নাম বলে মনে হয় না। এই যে বউকে নিরাপদে বাড়ি নিয়ে যাওয়া এর মধ্যে আমাদের বাঙালি সমাজের ছবিটা এতটাই স্পষ্ট যে বাক্যব্যয় নিষ্প্রয়োজন। একদমটা সেখানে পুরুষের সাহসিকতা বা এরকম কিছুর সমতুল্য। কিন্তু হতচ্ছাড়া আমরা ছেলেপুলেরা সেদিন পুরুষ নারীর এমন চমৎকার ইকুয়ালিটিতে পৌঁছেছিলাম, সিমোন দ্য বোভেয়া চর্চিত প্রগাঢ় বিজ্ঞতা ছাড়াই।
‘বউ বসন্ত’ ছিল তুলনায় অনেক নরম খেলা। ডাকাবুকো পৌরুষের যারা যথার্থ উত্তরাধিকার বলে ভাবত, তারা বেছে নিত ‘ডাঙগুলি’। ডাঙগুলিতে একটা শক্ত কাঠ বা বাঁশের টুকরো থাকত। সেটির নাম ‘কড়ে’। প্রথমে কড়েকে ছুঁড়ে দেওয়া হত সামনে দাঁড়ানো খেলোয়াড়দের দিকে। কেউ যদি তা তালুবন্দী করতে পারত তাহলে ‘ডাঙ’ধারীর যাত্রায় ইতি। না পারলে সেটাকে বার তিনেক ‘ডাঙ’ দিয়ে মেরে বেশ খানিকটা দূরে নিয়ে যাওয়া হতো। দূরত্ব মাপা হত ডাঙ দিয়ে। খেলায় সকলে একবার করে এই জিনিস করত। যার ক্ষেত্রে দূরত্ব কম হত তাকে একটা মজার শাস্তি দেওয়া হত। যেমন এক পায়ে মুখে চু করতে করতে খানিকটা যাওয়া। কোনও অঞ্চলে এ খেলাকে ‘কড়ে-ডাঙ’ খেলাও বলে। ‘কড়ে-ডাঙ’-এ বড় বকাঝাকা পাওনা হত বলে, কিংবা কড়ের খোঁচায় চোট খেলে আপাতত ক’দিন ‘কানামাছি’ই সই। ‘লুকোচুরি’টা ইন্ডোর-আউটডোর দুই ধারার গেমসই বটে। গ্রাম-গঞ্জ-মফস্বলের বাস্তুর সীমানা এত মিউটেশন মেনে মাথাউঁচু ছিল না। ফলে আনাচে কানাচে বেশ খানিক লুকিয়ে পড়া যেত। এ সব আবার কিছুই টানত না যাদের পকেটে দেদার মার্বেল জমা থাকত। পাথরের, কাচের, নানা রঙের মার্বেলে খেলা জমত, তবে হিসেবে পাকা হওয়া চাই। খেয়াল করে দেখেছি যাদের তখন মার্বেলের নেশা ছিল তারা পরে সকলেই ব্যবসাদার হয়ে উঠেছে। খেলাতে ব্যবসা বাণিজ্যও হত বটে। দোকানদারি খেলার কোনও নিয়ম নেই, যে পাড়ার দোকানে যা যা পাওয়া যেত না, সে পাড়ায় খেলনা দোকানে সে সবেরই বিক্রি ছিল বেশি।
পুতুলখেলার সঙ্গিনীরা...
সফট টয়েজ বলে তখন কি কিছু ছিল? থাকলেও মাটি ছেড়ে প্ল্যাস্টিকের পুতুল, যাদের আবার শোয়ালে ঘুমে চোখ বুজে আসত, তাদের লালন-পালন নিয়ে ব্যস্ত খুদে গৃহিণীরা অন্য কোনও দিকে মন দিতে পারেনি। হাতে পুতুল নিয়ে আজও পুঁচকিরা ঘোরাফেরা করে বটে, কিন্তু এই মাইক্রোআভেন শাসিত মড্যুলার কিচেনের যুগে সেভাবে তাদের ‘রান্নাবাড়ি’ জমে কি না কেজানে? অথচ তখন জমত। সংসারের ভিতর নিপাট আর এক সংসার। হিসেবি মায়ের উদ্বৃত্ত দিয়েই পুতুলের সংসারের হিসেব চলত। মাঝে মাঝে পুতুলের বিয়েবাড়ি কিংবা জন্মদিনও হত। পুতুল-গিন্নির মা একটু সহৃদয় হলেই পাশের বাড়ির পল্টু-বিল্টুরাও পলির পুতুলের জন্মদিনে গিয়ে কাকিমার হাতে পায়েশ খেয়ে আসত। শরৎচন্দ্রের ‘পরিণীতা’তে ললিতার মামাতো বোন কালির পুতুলের বিয়ের কথা নিশ্চয়ই সকলের মনে পড়বে। পরিবার তন্ত্রে মেয়েদের অবস্থান তুলে ধরার এমন আয়না বোধহয় আর নেই।
পুতুলখেলার সংসারে যাদের তেমন মন বসত না তারা ছিল ‘কুমীর ডাঙায়’। ছেলেরাও তাতে বাদ যেত না। তবে খেলার উদ্যোগটা নিত মূলত মেয়েরাই। একটা উঁচু জায়গা হত ডাঙা। নীচে যে থাকত সে কুমীর। উঁচু থেকে নীচে নেমে একজন করে বলত, কুমীর তোর জলে নেমেছি। কুমীর ধরতে পারলে সে খেলাছুট। আর ছিল ‘কিত কিত’। একটা বড় আয়তকার জায়গা ছোট ছোট ঘরে ভাগ করে নেওয়া হত। আর থাকত একটা গুটি। মুখে কিত কিত আওয়াজ করে দম না ফেলে, এক পায়ে সেই গুটিকে এক ঘর থেকে আর এক ঘরে নিয়ে যেতে হত। শুধু নিয়ে গেলেই হত না, আরও বেশ কিছু নিয়মকানুন ছিল। দমদার যে সে ঘর কিনতেও পারত। আজ প্রোমোটারি নজরদারিতে এক স্কয়্যার ফুট জায়গাও যখন মহার্ঘ তখন কোথায় আর ‘কিত কিত’-এর পরিসর? ‘কিত কিত’ এর মতোই আর এক খেলা ছিল ‘এক্কা দোক্কা’। সে সব বিকেলরা আর আসে না। কোনও প্রশ্নচিহ্ন নেই, গেছে যে দিন একেবারেই গেছে।
বাদলা দিনে মনে পড়ে...
কিন্তু ঝরো ঝরো মুখর বারিধারা এই সব খেলাদের মোটেও প্রশ্রয় দিত না। এদিকে ঘরবন্দিদের মনও কেন যে কিছুতে লাগত না কে জানে। সুতরাং বন্ধ ঘরের জন্যও কিছু খেলার দরকার হল। যেমন ‘আগবাগডুম’। আসন-পিঁড়ি কেটে গোল হয়ে বসে ছড়াটা পুরোটা শেষ করত। যার কাছে গিয়ে শেষ হত, সে সেই হাঁটু মুড়ে বসত। চলত ছেলেমানুষি খেলা। পা থেকে হাতে উঠে এল ছিল ‘ইকিরমিকির’ আর ‘রস-কষ-সিঙ্গারা-বুলবুল ি-মস্ত’। একটিতে হাত মুঠো করে ছড়াটা বলতে হত-ইকিরমিকির চামচিকির/চামে কাটা মজুমদার/ মজুমদারের হাড়িকুড়ি/ দুয়ারে বসে চাল কুটি/চাল কুটতে হল বেলা/ বেলা গেল সেই সন্ধেবেলা...। অঞ্চলভেদে ছড়ার কথার তফাৎ হতে পারে, তবে মূল কথাগুলো কম বেশি ছিল এরকমই। আর একরকমের ঘরবন্দি খেলা চলত টুকরো কাগজ কেটে। ছোটদের তাসখেলা ধরনের খেলা। নাম ছিল ‘রাম-সীতা’। টুকরো কাগজে রাম, সীতা, ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন লিখে বেঁটে দেওয়া হত চারজনের মধ্যে। ঠিক তাসের মতোই কাগজের টুকরো হাতফের হত। মেলানো হত চারটে রাম, কিংবা চারটে সীতা। যে আগে মেলাতে পারত তার জিত। ছিল ‘চাইনিজ চেকার’। অনেক বাড়িতে মেঝের উপর বা কিংবা সান বাঁধানো পুকুরঘাটে বা রকে, যেখানে একটু আড্ডা দেওয়া সম্ভব সেখানে পার্মানেন্ট ঘর টানা থাকত। গুটি দিয়ে হত ‘বাঘবন্দী খেলা’।
‘বুক ক্রিকেট’ ছিল পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার সেরা অস্ত্র। বইয়ের যত সংখ্যক পৃষ্ঠায় পেনসিল বা আঙুল পড়ত ততো রান সংগ্রহ হত, এবং তা লেখা স্কোর খাতায়। নিয়ম সব ক্রিকেটের মতোই। ‘অন্ত্যাক্ষরী’ এবং ‘মেমোরি গেম’ তো বড়দের সঙ্গে সঙ্গে ছোটদেরও প্রিয় খেলা ছিল। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’তে রবি ঘোষের সেই অসামান্য অতুল্য ঘোষের নাম সংযোজন কে আর ভুলেছে! সেই সব দিনে ঘরে ঘরে ‘অনুরোধের আসর’ বাজত বলেই বোধহয় অন্ত্যাক্ষরি খেলতে সকলেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। মোবাইলে ইউ টিউব কিংবা শব্দ মেঘ ভ্রমণ করে গান খোঁজার চল ছিল না, ফলে স্মৃতিই ভরসা। এবং স্মৃতি বেশিরভাগ সময়েই বেইমানি করত না। খালেদ হোসনির ‘দ্য কাইট রানার’-এ প্রায় অন্ত্যাক্ষরির মতোই আর একটা খেলার উল্লেখ মেলে। খেলার নাম ‘শেরজাঙ্গি’ (sherjangi)। যেখানে একটি শের-এর শেষ অক্ষর দিয়ে আর একটি শের বলতে হত। ঠিক এই খেলার কথাই উল্লেখ করে গেছেন আর একজন। প্রমথনাথ বিশী। আর খেলাটি আবিষ্কারের নাটের গুরুদেবটি কে তা বলাই বাহুল্য। প্রমথনাথ লিখেছেন, ‘ ... এক একদিন সন্ধ্যাবেলা তিনি ছেলেদের এক একটি ঘরে ঢুকিয়া পড়িতেন; নানারকম নূতন খেলা তিনি উদভাবন করিতেন। ... ইহাকে মিলের খেলা বলা যাইতে পারে। একটা শব্দ তিনি মনে মনে ভাবিতেন। তাহার অন্যরূপ মিল বলিয়া, প্রশ্ন করিয়া করিয়া, মূল শব্দটিকে বাহির করিতে হইত। ... আর একটা খেলা ছিল- তিনি কবিতার একটা ছত্র বলিতেন, তাহার সঙ্গে মিল দিয়া অর্থের সঙ্গতি রাখিয়া দ্বিতীয় ছত্র আমাদের বলিতে হইত। অধিকাংশ সময় আমাদের হাতে পড়িয়া হয় মিলটা দ্বিতীয় শ্রেণীর হইত, নয়তো অর্থের সংগতি থাকিত না। এখনো তাঁহার গোটা দুই ছত্র আমার মনে আছে। একটা নদী পারাপারের বর্ণনা চলিতেছিল-নদীর স্রোতে আমাদের মিলের নৌকা বানচাল হইবার উপক্রম হইলে তিনি বলিয়া গেলেন
সে কি পাড়ি দিল এই ভাদ্দরে
ও বাবা! কার সাধ্য রে!’

মুখে মুখে গল্প বানানোর খেলারও উল্লেখ আছে প্রমথনাথের লেখায়। ফিলহাল ‘চতুষ্কোণ’ ছবিটিতে এই মনের হদিশ খোঁজার খেলার উল্লেখ আছে বটে। কিন্তু ওই চলতি ‘ড্রামসেরাজ’ এর আদলে যেমন সিনেমা বা ব্যক্তির নাম নিয়ে খেলা হয়, সেরকমই।
এই ঘনঘোর ইংলিশ মিডিয়াম দিনে বাংলা শব্দ-মিল নিয়ে খেলায় মাতবে, ‘ও বাবা! কার সাধ্য রে!’

বইখাতা ফেলে ইস্কুল মাঠে
ভাগ্যিস জল আর জলপাই এক জিনিস নয়। অঙ্ক আর ‘অঙ্ক দৌড়’ও তো তাই এক নয়। ইস্কুল মাঠের এমন কিছু খেলা ছিল, যা একান্তই ইস্কুল মাঠের। পাড়ার মাঠ কখনও ‘বিস্কুট দৌড়’-এর স্বাদ পায়নি। দৌড়ের যে এত রকমফের ছিল খেলায় নাম লেখানোর খাতাই তার সাক্ষী থাকত। উঁচু ক্লাসের জন্য তো শুধু ১০০ মিটার, ২০০ মিটার কিন্তু নীচু ক্লাসের রকমফের চোখ টানার মতো। অঙ্ক দৌড়- ১০০ মিটারের মধ্যিখানে অঙ্কের খাতায় একটা অঙ্ক রাখা থাকত। দৌড়ে গিয়ে অঙ্ক কষে বাকিটা দৌড়তে হত। ঠিক অঙ্ক নিয়ে যে আগে পৌঁছতে পারত তার জয়। বিস্কুট দৌড়ে বিস্কুট রাখা থাকত ওই মাঝখানেই। হাত থাকত বাঁধা। বিস্কুট আবার মাথার একটু ওপর থেকে ঝোলানো থাকত। কামড় দিয়ে বিস্কুট মুখে নিয়েই দৌড় শেষ করতে হত। ‘গুলি-চামচ দৌড়’ ঠিক দৌড় নয়, তবে লম্বা লম্বা পায়ে চলা বলা যেতে পারে। মুখে চামচের উপর থাকত একটি মার্বেল। মাঝরাস্তায় সেটি পড়ে গেলেই চিত্তির। ‘থলি দৌড়’ তুলনায় কঠিন ছিল। একটা থলির ভিতর থাকত পা, কোমরের কাছে বাঁধা। এবার ওই অবস্থায় আধা দৌড়, আধা হেঁটে পৌঁছতে হত। এতরকমের দৌড় ফেলে কেন যে ইঁদুড় দৌড়টাই শৈশবের জন্য শিরোধার্জ হয়ে গেল কে জানে!
স্কুলের মাঠে খেলার মধ্যে ছিল ‘খো খো’। এমনকি মাধ্যমিকে যারা অ্যাডিশনাল পেপার হিসেবে ওয়ার্ক এডুকেশন নিত, তাদের মধ্যে ছেলেদের জন্য বরাদ্দ ছিল কাবাডি, মেয়েদের ‘খো খো’।
খেলতে খেলতে শেষ...
তারপর একদিন আমরা খেলতে খেলতে বড় হয়ে গেলাম। আমাদের শরীর থেকে ঝরে গেল বিকেলবেলার খেলা-ধুলো। গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেললে যে স্বর্গের কাছাকাছি থাকা যায় এ মনিষীবচন না জেনেও আমরা স্বর্গের কাছাকাছিই ছিলাম। কিন্তু বড় হওয়ার উদগ্র বাসনা যখন শরীর-মন দুটোকেই ছেয়ে ফেলল, তখন আমরা শাপগ্রস্ত দেবদূতের মতো স্বর্গচ্যুত হয়ে বড় হয়ে গেলাম। এবং একদিন বুঝে গেলাম বড়দের খেলা আলাদা। কোন টেবিলে কতখানি তেল দিলে নিজের চেয়ার পাকাপোক্ত হয় সে খেলার কাছাকাছি থেকে স্বর্গের বিপ্রতীপে শুরু হল আমাদের হাঁটা। আর পিছু পড়ে রইল আমাদের খেলাগুলো। প্রযুক্তি এসে আমাদের লাইট দিল, ফ্যান দিল, হাতে হাতে একটা করে ভিডিও গেম ধরিয়ে দিয়ে গেল। বিশ্বায়ন এসে আমাদের আর কিছু দিক না দিক বাচ্চাবুড়ো সকলের পকেটে মোবাইল গুঁজে দিয়ে গেল। তার ভিতর হরেক খেলা। ক্রিকেট, ফুটবল, দাবা, সাপ-ব্যাং সব। শপিং মলে ভিডিও পার্লার তৈরি হল। উঠতি মধ্যবিত্ত বাপ-মা নিজেদের চারচাকা কেনার সখ ছেলেকে ভিডিও গেমের গাড়িতে চাপিয়ে মিটিয়ে নিল। বিকেলেরা সব বন্দি হয়ে গেল ঠান্ডা চোখরাঙানিতে। কমপিউটারের স্ক্রিন হয়ে উঠল দুনিয়াদারির ঠিকানা। সেখানেই জমছে ইতিহাসের যুদ্ধ খেলা, সেখানেই বিশ্বকাপ। সেখানেই নগর বানানো। সুতরাং ক্রমশ পুরনো হতে হতে একদিন মনখারাপের ডানা মেলে নিরুদ্দেশের দিকে পাখা মেলল ওই ‘বৌ-বসন্ত’ বিকেলরা।
আমরা পেয়েছিলাম। আমরা তা শিখিয়ে দিতে পারিনি। নিজেরাও ভুলে যেতে পারিনি। বস্তুত গেম পার্লারের চোরা কুটরি যে প্রজন্মের ললাটলিখন, রান্নাবাড়ির শৈশবকে ছুঁয়ে দেখা তার সাধ্যাতীত। সে বড়জোর ব্লক মিলিয়ে ঘর বানাতে পারে। যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনওদিনই নস্টালজিয়ার দায় নেয় না, সিলেবাসেও রাখে না, তবু হারানো খেলার ইতিহাস থেকে যায় আমাদের স্মৃতির পঠনপাঠনে। আমরা দেখতে পাই পশ্চিম আকাশের লালচে আলো। ইস্কুল শেষের ঘন্টা বাজছে। লাইব্রেরি মাঠের পাশে জমা হচ্ছে শিশু-কিশোর-কিশোরী বাহিনি। ভাগ হয়ে যাচ্ছে দল দল করে। আর জমে উঠছে খেলা। কোথাও কোনও বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না, কোথাও কোন ঘোষণা বেজে ওঠে না। শুধু নিরুদ্দেশের সীমান্ত থেকে বেজে ওঠে নস্ট্যালজিয়ার গান। আর সে গান গাইতে গাইতে আমরা স্মৃতির দরজায় গিয়ে দাঁড়াই। বড় হয়ে যাওয়ার গ্লানি আর পাপ বইতে বইতে, আত্মগর্বের সীঘ্রপতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলে আমরা শুধু হারানো খেলাধুলোর দিনকে ডেকে বলে উঠি- ‘বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেলবেলায়/আর একবার যদি তোমাদের দলে নাও খেলায়’।
সে গান কেউ কোত্থাও শোনে না। কেউ খেলার দলে ডেকেও নেয় না। আমরা বুঝি যা চলে যায়, সে আর ফিরে আসে না। টাকার অঙ্কে লাভ ক্ষতির গাণিতিক প্রশ্নমালা সমাধান করে আসা আমরা বুঝতে পারি ক্ষতি আসলে কী এবং কতটা! শিব্রাম চক্রবর্তী তো সেই কবেই বলেছিলেন ‘টাকার ক্ষতি আবার ক্ষতি নাকি?’ আমরাই বুঝে উঠতে পারিনি। আমরা ভাবতাম খেলা বোধহয় শুধু আমরাই জানি। কে জানত খেলারাও একদিন সুমনকে দিয়ে বলিয়ে নেবে, ‘হয়তো জীবন তোমায় নিয়েও খেলতে জানে’।