মিসিং ডায়েরি

সমর রায়চৌধুরী


আচ্ছা , আমাদের স্কুলের , আমি যখন ফাইভ-সিক্সে পড়তাম , সেই সময়কার সেই হাইবেঞ্চগুলো কোথায় গেল ! সেই যে , যার ওপর দুই প্রান্তে দুই খুদে ও চৌকো আকারের টিনের পাত্র স্থায়ী ভাবে বসানো । এমনিতে সারাবছর নির্দিষ্ট উপলক্ষ্য ছাড়া তার কোন উপযোগিতা ছিল না । ব্যবহার হত শুধু পরীক্ষার সময়ে । পরীক্ষা শুরুর আগে স্কুলের দপ্তরী এসে সেখানে তরল কালি ঢেলে দিয়ে যেত ; সেই কালিতে নিব লাগানো কলম ( তখনো বল পেনের প্রচলন সেভাবে হয় নি আর ঝর্ণা কলম ছিল ব্যয় সাপেক্ষ ও বিলাসিতা ) ডুবিয়ে উত্তর লিখতে হত ... কবে থেকে কোথায় উধাও হয়ে গেল তারা ! কোথায় গেল আমাদের পাঠ্য উপকরণ সামগ্রী থেকে উধাও যাওয়া , যতটা না লেখাপড়ার জিনিস , তার চাইতে বেশি খেলার সাথী ব্লটিং পেপার কপিং পেনসিল , যে পেনসিলের শিস্‌ জলস্পর্শ করা মাত্র সেই জলে সুতোর মত বেগুনি রঙের রেখা এঁকেবেঁকে নানা বিভঙ্গে ছড়িয়ে পড়ত !
অজ্ঞাতসারে অমন যাদু-বাস্তবতায় সংক্রমিত হতে হতে , দেখতে দেখতে কতদিন কত সময়ই না পার হয়ে গেছে ! তারা আমার জীবন থেকে উধাও হয়ে গেলেও আজ তবু মনে হয় , আমি যেন সেই অতিবাহিত সময়েরই বীজ ! আমার ভেতরেই আছে সেই জাগ্রত হাইবেঞ্চ , আছে ব্লটিং পেপার আর কপিং পেনসিলের রুদ্ধশ্বাস প্রাণবায়ু ।
কবে , কোথায় , কেন এসব আজ যদিও ঠিক স্মরণে নেই , তবু শুধু মনে পড়ে অতি শৈশবে একবার যেন কিভাবে , কারো সাথে কোন একজন হোমড়া-চোমড়া পদাধিকারীর দপ্তরে পৌঁছে গিয়েছিলাম । সেটা ছিল এক গ্রীষ্মের দুপুর । গিয়ে অবাক হয়ে দেখি একজন শীর্ণ , বয়স্ক লোক একটা ভারী পর্দা টানানো দরজার পাশে একটা টুলে বসে ঝিমোতে ঝিমোতে ঘরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা একটা দড়ির প্রান্ত একবার সে তার কোলের দিকে টেনে পরক্ষণেই ফের তার আলগা করে দিচ্ছে । ব্যাপারটা সেই বয়সে আমার বেশ খেলার মত কৌতুকপ্রদ মনে হয় । সেদিন একটু পরেই অবশ্য ওই দরজা অতিক্রম করে ঘরে প্রবেশ করা মাত্র রহস্য উন্মোচন হয় , ঘর ভরা শরীর জুরানো শীতলতা ও স্নিগ্ধ হাওয়া । সেই দড়ি বেয়ে আমার দৃষ্টি পৌঁছায় ঘরের সিলিংয়ে , যেখান থেকে আড়াআড়ি ভাবে ঝোলানো এক বাঁশের সাথে সংবদ্ধ এক ভারী ও দীর্ঘ পর্দা চেয়ারে আসীন আধিকারিকের মাথার ওপর হাত পাখার মতই স্লথ গতি ও ছন্দে এদিক-ওদিক দুলছে । সেই চলমান অভিনব পাখাটির লয় ও ছন্দের নিয়ন্ত্রক যে দরজার বাইরে বসা লোকটিই , তা বুঝতে পারি । কালক্রমে জানতে পারি পদমর্যাদার দিক থেকে তার পরিচয় একজন ‘পাঙ্খাপুলার’ ।
বড় হয়ে তেমন একজন ‘পাঙ্খাপুলার’কে আর কোথাও কোনদিন আমি দেখি নি । বিজ্ঞান ও বিদ্যুতের প্রসারে হারিয়ে গেছে তার ম্লান জীবন ও জীবিকা । তবু এখনো রয়ে গেছে তার একঘেয়েমী , ঝিমুনি , ক্লান্তি আর অবসাদ , আছে আমাদের সফল আপাত হাসিখুশির নীচে তারা মমি হয়ে ......
ছোটোবেলায় ‘অনেক কমলা রঙের রোদ’ আর ‘কাকাতুয়া পায়রার’ পাশাপাশি আমাদের আকাশটাও ছিল অনেক বড় আর অন্ধকারও ছিল অপরিসীম , অনেক বেশি । আকাশের সেই বিস্তৃতি ও অন্ধকারের সেই ঘনত্ব কোনোটাই আর আমাদের তেমন নেই । অন্ধকার প্লাবিত চরাচরে দিগন্ত প্রসারিত রাত্রির তারা-ভরা আকাশে একদিন দেখি একটা বেশ বড় আকারের তারা আকাশের একদিক থেকে আর একদিকে স্পষ্টতই ক্রমশঃ ভাসতে ভাসতে সরে সরে যাচ্ছে । বিস্ময়ে হতবাক ! চলমান তারা ? কিভাবে সম্ভব ! তারা তো স্থির । তবে কি বিমান ? অজানা উড়ন্ত বস্তু ? বিহ্বল হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে তার অপসৃয়মানতা লক্ষ্য করি ! এরপর বেশ কিছুদিন পর তাকে যখন আবার দেখি , ততদিনে জেনে গেছি – ওটা ফানুস ; কিন্তু সেই জানাটাও আমার বিস্ময় ও মুগ্ধতাকে কিছুমাত্র লঘু করতে পারে নি । এমনকি বেশ বড় হয়ে গিয়েও যখন দেখেছি ফানুস , তখনও তার দিক থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারি নি । রাত্রির আকাশে ফানুস ওড়ার মত এত নয়নাভিরাম দৃশ্য আমি আর কোথাও খুব বেশি দেখিনি । ফানুস যেন আমারই মন , আমারই উড্ডীন স্বপ্ন , যা দেখতে দেখতে পৃথিবীকে মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হত ; সেই ফানুসগুলি আমাদের সমগ্র ছোটোবেলা জুড়ে উড়তে উড়তে কোথায় যে উধাও হয়ে গেল শেষমেশ তার হদিস আমাই পাইনি । তারাআর ফিরে আসে নি , ঠিকই , কিন্তু আমাকে তো শিখিয়ে গেছে মাটির এক ইঞ্চি ওপর দিয়ে কিভাবে হাঁটতে হয় , অলীক জল আর অচিন পাখির সংস্পর্শে কিভাবে ভেসে যেতে হয় । ভাসি আমি , মানুষকে আর মানুষ বলে যেন গ্রাহ্যই করি না ; মানুষের অন্তরালে , মানুষের ছদ্মবেশে থাকা ফানুসগুলি খুঁজে বেড়াই ; যদি পাই তবে একদিন মানুষই ওড়াবো , উড়তে উড়তে আমি শুনবো নিরুদ্দিষ্ট ফানুসদের হাততালি ।