হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ

মধুছন্দা মিত্র ঘোষ


“ অনুগ্রহ করে শুনবেন , রাণাঘাট নোকরি থেকে এসেছেন শ্রীমতি শিখা রাণী বসাক – আপনার স্বামী শ্রী নির্মল বসাক বাবু আমাদের অনুসন্ধান অফিসে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন । “
“ বারাসাত চাঁপাডাঙ্গা মোড় থেকে এসেছ অনুপ ধর । অনুপ তোমার জামাইবাবু প্রতীক সিনহা আমাদের নিরুদ্দেশ সম্পর্কিত ঘোষণা অফিসে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন । তুমি সত্বর আমাদের ঘোষণা অফিসে এসে দেখা কর । “
“ অনুগ্রহ করে শুনবেন আমাদের মেলার মাঠে একটি বছর চারেকের বালিকাকে একা পাওয়া গেছে । শিশুটি খুব কান্নাকাটি করছে । আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর শিশুটি নিজের নাম বলেছে বুব্‌লি ।বাবার নাম বলছে সুবীর । সুবীরবাবু আপনি যেখানেই থাকুন সত্বর আমাদের মেলাপ্রাঙ্গনের অনুসন্ধান দপ্তরে এসে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে আপনার শিশু কন্যাকে নিয়ে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে । “
“ বালি পাঠকপাড়া থেকে এসেছেন শ্রীমতি বন্যা রায় । আপনি যেখানেই থাকুন আমাদের ঘোষণা অফিসের সামনে চলে আসুন । আপনার জন্য আপনার বন্ধু অতুল দত্ত অপেক্ষা করছেন । “
“ বেহালা সরশুনা থেকে এসেছেন আয়েসা খাতুন ও শরনম বিবি । আপনাদের জন্য আপনার বাড়ির লোক নাসের মোল্লা আমাদের ঘোষোণা অফিসে অপেক্ষা করছেন । “
এসব ক্ষেত্রে এই ‘হারিয়ে যাওয়া’ কেন হারিয়ে যাওয়ার মতোই – এ প্রশ্ন অবান্তর । কোনও মেলাপ্রাঙ্গণে , সে শহর শহরতলী মফঃস্বল , যেখানে যে প্রান্তেই হোক না কেন , প্রতিদিনই কেউ না কেউ তাদের পরিবার বা প্রিয়জনের সাথে মেলার ভিড়ে হারিয়ে যাবেন বা বিচ্ছিন্ন হবেনই ।
আর সেই হারানোর মুহূর্তে যাবতীয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-চোখ ছলছল । অন্যদিকে পরিবার প্রেমিক বা বন্ধু , যার সঙ্গে আপাত হারানো ব্যক্তিটি সেই মেলায় বা পুজো প্রাঙ্গনে এসেছিলেন , তারাও বা তিনিও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উৎকণ্ঠায় এদিক ওদিক করছেন । অবশেষে নিরুপায় হয়ে অনুসন্ধান অফিসের দ্বারস্থ ।
মেলায় বেরাতে আসা অন্যান্য অনেকে ‘নিরুদ্দেশ সম্পর্কিত ঘোষোণা’ শুনে বেশ বিরক্ত হন । কেউ বা টিপ্পনী কাটেন , “ মেলায় বৌ হারিয়েছে ? তা বেশ তো । সোজা বাড়ি ফিরে যান দাদা । ” কোনও মা হয়ত তার সঙ্গের শিশু সন্তানের হাত আরও জোরে মুঠোয় ধরে কপট শাসন করে কাছে টেনে নেন । “ দেখলি তো , ছোট্ট বুনুটা ভিড়ে হারিয়ে গেছে । কাঁদছে । বলছি না , হাত ছাড়বি না ! এবার কিন্তু সক্কলের সামনে বকা দেবো । “ বান্ধবী হারিয়েছে শুনে মেলায় আসা চ্যাংরা ছেলেগুলো সরস মন্তব্য ছোঁড়ে , “ উই বাপ , বান্ধবীকে সামলেসুমলে রাখতে পারিস না । তুই কেমন ঢ্যামনা প্রেমিক রে ভাই । “
ওদিকে অনুসন্ধান অফিসের ঘোষোণার দায়িত্বে থাকা ছেলেটি বা মেয়েটি সারাক্ষণ সেই একই চেনা গতে ঘোষোণা করে করে কখনও খেই হারিয়ে ফেলে । হাতের চিরকুটে লেখা নাম ঠিকানা , এর ঘাড়ে ওর নাম জুড়ে ভুল ঘোষণা হয়ত বা ভুলবশতঃ করেই ফেলল । অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিটি কাঁচুমাচু মুখে পাশের ঘোষককে বা ঘোষিকাকে হয়ত শুধরে দিলেন তার একটু আগে হারিয়ে যাওয়া কাছের জনের সঠিক না্ম-বাসস্থান । ঘোষক আবার মাইক্রোফোনে – “ মার্জনা করবেন , ‘অমুক’ জায়গা থেকে এসেছেন ‘তমুক’ – আপনার জন্য আপনার বাড়ির লোক আমাদের অনুসন্ধান অফিসে অপেক্ষা করছেন । “
বাংলা গল্পে তো একসময়ে নৌকাডুবিতেই কত চরিত্র হারিয়ে যেতেন বা বলা যায় একে অন্যের চেয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেন । নিরুদ্দেশ কীই আর শুধুমাত্র নৌকাডুবিতেই হত ? পরবের মেলা , ঝড়ঝঞ্ঝা , রথের মেলা শুনসান পথে পালকিতে যেতে যেতে ভয়ঙ্কর ডাকাত দলের খপ্পরে পড়া কত কী । রেলগাড়ির ভিড়ে ঠাসা কামরা থেকেও কত চরিত্র বেমালুম হাপিস হয়ে যেত গল্পতে । তারা হয়ত তারপর অন্য জীবন বা অন্য আশ্রয়ে পালিত হচ্ছেন । এমনতর হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ গল্প চলচিত্রকারদেরও ভারি পছন্দেরও প্রিয় বিষয় ছিল একসময়ে । ’৬০-’৭০-‘৮০র দশকে এমন ‘হারিয়ে যাওয়া’ চরিত্র এবং পরে ‘ফিরে পাওয়া’ চরিত্র নিয়ে বলিউড টলিউডে জাঁকিয়ে সিনেমা হয়েছে । তাতে এক ঢিলে পাখিও মরেছে বেশ কয়েকটা । কাহিনির প্লট , অভিনয় , চরিত্র , নির্মাণ , কাহিনির শেষে টুইস্ট – প্রোডিউসারের ঘরেও লক্ষ্মী এলেন । দর্শক তো বিয়োগান্ত নাটক শেষে মিলনটাই আশা করেন – দর্শকেরও পয়সা উসুল ।
অনেক পরিবারে কোনও কোনও মানুষ নিজে নিজেই হারিয়ে যান । হয়ত কেউ মানসিক অবসাদে । কেউবা পরিবারের ওপর প্রবল অভিমানে । এ যেন তাদের কাছে সেই ‘মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো –‘ । দেখা গেল হয়তো কিছু বছর পর তিনি এক্কেবারে নিজে নিজেই দিব্যি ফিরে এসেছেন । কোনও মানে হয় এমন হারিয়ে যাওয়ার ? হারালে না হয় ঝোঁকের মাথায় । তাই বলে হারিয়ে যেয়ে , আবার ঘরের মায়ায় ফিরে আসা কেন বাপু ?
পরিশিষ্ট ঃ-
কতোদিন থেকে যেন , মেলার মাঠে ইদানিং , ‘নিরুদ্দেশ সম্পর্কিত’ ঘোষোণাও হারিয়ে গেছে । কই , আর তো তেমন শুনি না – “ অনুগ্রহ করে শুনবেন ... অমুক জায়গা থেকে এসেছেন তমুক ... আপনার জন্য আপনার ...... আমাদের অনুসন্ধান অফিসে এসে অপেক্ষা করছেন । “
অ্যাদ্দিনে প্রায় সক্কলের হাতে চলভাষ যন্ত্র । নিজে নিজে হারিয়ে যাওয়ার মওকা নেই । ভিড়ের দাপটে একটু বিচ্ছিন্ন হয়েছ কি হওনি – অমনি মোবাইলে টুংটাং । “ হেই ! হোয়ার আর ইয়্যু ? ওকে ওকে । লিসন্‌ , আমি এক্সিট গেটের সামনে ওয়েট করছি । কাম সার্প । “ কিংবা , “ তুই কোথায় লা-পাতা হয়ে গেলি বস্‌ ? ঠিক আছে তুই ওখানেই স্ট্যাচু হয়ে যা । দু মিনিটেই পৌঁছে যাচ্ছি । “
ঝাঁ চকচকে শপিং মলে এ ফ্লোর ও ফ্লোর ঘুরে উইন্ডো শপিং করতে করতে হঠাৎ হুঁশ হল পাশে কর্তাটি তো নেই । যাচ্চলে । হারালো কোথায় । ক্রেডিট কার্ড তো ওরই পার্সে । নিজের মোবাইলটা বের করে কল করার আগেই চেনা রিংটোন , “ হানি আমি ‘স্মোকিং জোনে’ অপেক্ষা করছি । হাতের সিগারেটটা শেষ করে নিই , তুমি শপিং মলের এপাশটায় চলে এসো । “ বোঝো কান্ড !