অ্যালবাম

মধুমিতা ভট্টাচার্য


দেখ্‌ না দেখ্‌ বদলির আদেশ এসে হাজির। এ সময় আসার কথা ছিল না, কিন্তু হঠাত করেই কোম্পানীর কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমাকে তড়িঘড়ি বদলির বিধান দিলেন কোম্পানীর মালিক। চা-বাগানে বদলি কিছু নতুন কথা নয়, তবে বছর দুই তিন মোটামুটি এক জায়গায় থাকা হয়েই যায় সাধারণতঃ। এই আমার বেলাতেই দেখছি ব্যতিক্রম। যে বাগানে যেতে হবে সেটা আসামের এক কোণায় অবস্থিত একেবারে পান্ডব-বর্জিত জায়গা। বাগানটা আমাদের কোম্পানী সদ্য কিনেছে। আগের মালিক ছিলেন কোনও মাড়োয়ারী ভদ্রলোক। বছরখানেক আগে মারা গেছেন। ওনার ছেলেমেয়েরা সব বিদেশে নিজের নিজের জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত। কারও পক্ষে বাগান চালানো সম্ভব নয় বলে দিয়েছে। তাই এই বিক্রিবাটা।

অবশ্য ভাল মালিকের হাতেই এল। আমাদের প্রতিষ্ঠান সারা বিশ্বের নামজাদা কোম্পানী গুলোর একটা। ব্যবস্থাদির অনেক উন্নতি হবে সন্দেহ নেই। শ্রমিকেরাও ভালভাবে থাকার সুযোগ পাবে। নিয়মিত বেতন, বোনাস মিলবে। মিলবে থাকার ঘর, ডাক্তারী পরিষেবা, কাঠের জ্বালানী, বুনিয়াদী শিক্ষা, চা-পাতা...যেগুলো সবই বিনামূল্যে। নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে চাল, আটা রেশনও পাবে তারা। তবে আপাততঃ সবই ডামাডোল হয়ে আছে। সেসব ঠিকঠাক করতে সাহায্য করার জন্যেই আমায় সেখানে পাঠানো হচ্ছে।

কোম্পানী আমার ওপর ভরসা করছে, তাতে আমার খুশি হওয়ারই কথা। তবে যখনই মনে হচ্ছে সে এক প্রায়-জঙ্গল জায়গা, ততবারই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একটু যে ভয়ও লাগছেনা, তা নয়। আতঙ্কবাদের কালো থাবা এসব জায়গাগুলোতেই বেশ ভালোরকমই আছে। কয়েক বছর আগে ওপাশেই কোনও একটা বাগানের সহকারী পরিচালক তাদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হয়েছিলেন। এ বাগানটারও সেসব ব্যাপারে খুব সুনাম নেই।

বাড়িতে বদলির কথা জানাতেই বাবার আর দিদির মন খারাপ। সাথে উদ্‌বেগ। দিদি তো বলেই বসল, “ছেড়েছুড়ে চলে আয়। অন্য কোথাও চাকরী পেয়ে যাবি চেষ্টা করলেই”। বাবা অবশ্য বুঝদার। বললেন, “আগে গিয়েই দেখনা। তেমন বুঝলে ছাড়তে কতক্ষণ”।

আমি প্রথমটায় একটু দোটানায় ছিলাম। শুনে অভিজ্ঞ বড়সাহেবও বোঝালেন। বললেন, “কেউ না কেউ তো যাবেই। সবাই যদি ‘আমি যাবোনা, আর কাউকে পাঠাও’ বলে তাহলে তো কোম্পানী লাটে উঠবে। তোমারও ইম্প্রেশন খারাপ হবে। তার চেয়ে গিয়েই দেখোনা। ওখানে ম্যানেজার আমার পরিচিত, ওনাকে বলে দিয়েছি, তোমার কোনও অসুবিধে হবেনা”।

অবশেষে আমি এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিলাম। গিয়ে দেখাই যাক। আরও যে এতগুলো মানুষ ওখানে থাকেন, তাঁরাও তো বেঁচেবর্তেই আছেন। কপালে মৃত্যু থাকলে যে কোনও জায়গাতেই মরতে পারি।

গোছগাছ শুরু করে দিলাম। আমি ব্যাচেলর, তবে পাঁচ বছর চা-বাগানে কাটিয়ে বেশ কিছু জিনিষপত্র কিনে জমিয়ে ফেলেছি। আসলে আমাদের বাংলো গুলো বেশ বড়সড়। কিছু না কিছু দিয়ে না ভরালে বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তাছাড়া চা-বাগান মানেই শহর থেকে দূরে। কোনও কিছুই হাতের কাছে সহজলভ্য নয়। সন্ধ্যের পর সময় কাটানোই মুস্কিল। তাও তো এখন টিভি আছে, মোবাইল ফোন আছে, আছে কম্পুটার, ইন্টারনেটের মত বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগের সাধন। আগে তো অনেক বাগানের আউট-ডিভিশনে বিজলীবাতির কানেকশনও ছিল না। রাত হলে কেরোসিনের ল্যাম্পই ছিল ভরসা। এখন সেসব কিছুই নেই। আধুনিকতার হাওয়ায় এসব ছবির ক্যানভাস আমূল বদলে গেছে। আলো, জল সবই পাওয়া যায়।

মাঝে মাঝে ভাবি আগের মানুষ গুলো কিভাবে থাকত! সাহেবরা যখন বাগান চালু করেছিল, তখন তো মশা, বন্য জন্তু, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর ছাড়া কিছু ছিলনা। আমরা তো সেই তুলনায় স্বর্গে বাস করি। অন্ততঃ সেসব অসুবিধে গুলো তো নেই! আমার বড়সাহেব বলেন, সহকারি পরিচালক থাকাকালীন ওনারা নাকি সপ্তাহে একদিন শহরে গিয়ে সিনেমা দেখতেন, তাও ট্রাকটরে চেপে। জিপ একটা ছিল, কিন্তু সেটা ম্যানেজার বাগানের কাজে ব্যবহার করতেন। সিনেমা দেখে সন্ধের আগে বাংলোতে ফিরতে হোত আবার সেই ট্র্যাকটরে সওয়ার হয়েই। রাত হলে রাস্তায় হাতির সাথে মোলাকাত হওয়ার ভয় থাকত।

ওনার স্ত্রীর কাছে গল্প শুনেছিলাম, আগে ওঁদের বারান্দায় বসলে হাইওয়ে দেখা যেত। দূর থেকে গাড়ির হেডলাইট দেখলে মনে মনে প্রার্থনা করতেন, ‘হে ভগবান গাড়িটা যেন আমাদের বাংলোতেই আসে’। লোকজন আসলে এত খুশি হতেন ওঁরা যে রাতের খাবার না খাইয়ে ছাড়ার কথা ভাবতেই পারতেন না। আজকাল চারিদিকে প্রচুর ঘরবাড়ি। রাস্তা দেখা যায়না।

“সাহেব, আজ কী খাবেন”? রান্নার মানুষ নির্মল এসে জিজ্ঞেস করল। বললাম, “যা আছে বানিয়ে দাও। তাড়াতাড়ি খেয়ে নেব আজ। অনেক কাজ আছে”। ঘাড় নেড়ে যেতে যেতে নির্মল বলল, “আপনিও চলে যাবেন সাহেব। আমরাই কেবল পড়ে থাকি এক জায়গায়”। আমি একটু হেসে মাথা নাড়লাম। বললাম, “ভালই তো। কত দিনের চেনা পরিচয় হয়ে যায় তোমাদের একটা জায়গার সাথে। তোমাদেরই তো শিকড়ের টান। ভালো থেকো তোমরাও। আবার যদি কখনও ঘুরে আসি এখানে, দেখা হয়ে যাবে”। নির্মল একটু ম্লান হেসে বলে “আর কি এখানে আসবেন সাহেব! একবার চলে গেলে আর আসেনা কেউ। অন্ততঃ এ বাগানে তো দেখিনি কোনওদিন”! বললাম, “দেখা যাক”। নির্মলের কথাটা কানে লেগেই থাকল। একবার গেলে ঠিক সে ভাবে আর আসা যায় কি?

রাতের খাওয়া সেরে গোছগাছ নিয়ে বসলাম। চৌকিদার কে নিয়ে কাঁচের কাপ-ডিশ, ফুলদানী, আর যা যা ঘর সাজানোর জিনিষপত্র সব কাগজে মুড়িয়ে পরিপাটি করে অ্যালুমিনিয়ামের ট্রাঙ্কে ভরে ফেললাম। দরকারী বাসনপত্র ছাড়া বাকি সবও আরেকটা বাক্সে ঢুকে পড়ল। বাকি থাকল আমার জামাকাপড় আর দরকারী কাগজপত্র। আজই সেরে ফেলব সে সব। যত রাতই হোক। সেকথা ভেবে আলমারীটা খুলতেই একরাশ ন্যাপথালিনের গন্ধ আছড়ে পড়ল আমার নাকে মুখে সারা শরীরে। বেশ লাগে গন্ধটা আমার। বহু পুরোনো স্মৃতি ভুসভুস করে ভেসে উঠতে থাকে মনে। এখনও তাই হোল। সেই কবে কি হয়েছিল তার চিত্রমালা একে একে বায়োস্কোপের ছবির মত উড়তে থাকল আমার চারপাশে।

আমার মা চলে গেছেন বহুদিন আগে। শুনেছি আমি তখন বছর দুয়েকের ছিলাম। আমাকে বাঁচাতে গিয়েই নাকি একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু মা চলে গেছেন আমাকে ছেড়ে। মার মুখটা এখন আবছা। স্মৃতি বলতে কয়েকটা ছবি। সাদা - কালো। সে সময় রঙ্গিন ছবির চল হয়নি তেমন। আমি চা - বাগানে আসার আগে নিয়ে এসেছিলাম একটা অ্যালবাম।

জামাকাপড় গুলো ভাঁজ করে স্যুটকেসে রাখব বলে আলমারী থেকে বের করে বিছানার ওপর রাখতে গিয়ে ধুপ করে পায়ের কাছে কি যেন একটা পড়ল। নিচু হয়ে দেখি সেই অ্যালবামটাই। কাপড়ের ভাঁজেই ছিল। কাজের চাপে অনেকদিন বের করা হয়নি। নাকের কাছে ঠেকিয়ে গন্ধটা নিলাম বুক ভরে। বাড়িতে ট্রাঙ্কের ভেতর রাখা মা-র শাড়ির গন্ধ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়তে থাকল আমার মাথার ভেতরে। মা-র সব জিনিস বাবা যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। বর্ষার পরে প্রতি বছর তাদের রোদ খাইয়ে বাক্স ঝেড়েঝুড়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। আজ অ্যালবাম খুলে সেই গন্ধেরই যেন তাল-ফের্‌তা।

-“আয় না একটু গল্প করি”! কে ডাকল? কোথা থেকে এল আওয়াজটা? মনে হোল খুব কাছ থেকে কেউ ডাকল। এই অ্যালবামটা? এর ভেতর থেকেই উঠে এল ডাকটা? কানে নয়, আমার মনের দরজায় মৃদু করাঘাত করে গেল বোধহয় কেউ। আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ভাবতে থাকলাম... “কে ডেকে গেল? তার সাথে আমার কি সম্পর্ক? তাকে কি আমি চিনি”?

আমার অ্যালবাম ধরা হাতে কি এক শিরশিরানি টের পাচ্ছি। কেউ যেন জোর করে বলছে “আমায় খোলো, অনেকদিন আমি বাইরের আলো দেখিনি। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আমায় মুক্তি দাও। তোমাদের গচ্ছিত ধন বহুদিন হয় আগলে আছি”। আমি মোহমুগ্ধের মত বসে পড়লাম কার্পেটের ওপর। ভুলে গেলাম আমার বাক্স গোছানো বাকি, যা আজই শেষ করে ফেলার কথা ছিল।

বহু পুরনো অ্যালবাম এবং বহু ব্যবহারে কিছুটা ম্লান। শক্ত কার্ড বোর্ডের ওপর বিবর্ণ চামড়ার মলাট। নতুন অবস্থায় বাদামী রঙের ছিল বলেই মনে হয়। তার মাঝে একটা বৃত্তের ভেতর পদ্মফুল ধরা হাত এম্‌বস্‌ করা। চাঁপার কলির মত সে হাতের আঙ্গুল। হাতের চুড়ি আর পদ্মফুলে হালকা কয়েকটা রঙের আভাস। কোনও এক সময় হয়ত লাল, সবুজ, হলুদ, নীল ছিল। এখন কালের হাত ধরে সেসব রঙ একেবারেই ফিকে। মলাটে বার কয়েক হাত বোলাতে মনে হোল ঘরে যেন আমি একা নই, আরও অনেকে উন্মুখ হয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে আছে অ্যালবামে কি আছে দেখবে বলে। আস্তে ধীরে চামড়া বাঁধাই কার্ড - বোর্ডের মলাট উল্টে অ্যালবাম খুললাম।

অ্যালবাম জুড়ে ন্যাপথালিনের সেই চেনা স্মৃতিমেদুর গন্ধ। ভেতরের পাতাগুলো কালো, হ্যান্ডমেড কাগজের। একটু খসখসে, আঁশ লেগে থাকা। ওভাবেই ছিল প্রথম থেকে। আর তার গায়ে সাদা কালো ছবি হয়ে জেগে আছেন আমার পূর্বপুরুষেরা। সবাই নীরব অথচ নিস্তব্ধতায় কি ভীষণ মুখর। প্রথম পৃষ্ঠার ছবিতে চেয়ারে বসে আমার রাশভারী ঠাকুরদাদা আর পাশে ঘোমটা মাথায় কিছুটা জড়সড় হয়ে দাঁড়ানো ঠাকুমা। ছবির চারকোনা চারটে ফটো-কর্ণার দিয়ে আটকানো। ওঁদের কাউকেই আমি চাক্ষুষ দেখিনি। আমার জন্মের আগেই গত হয়েছিলেন দুজনেই। তবু যেন ওঁরা আমায় জিজ্ঞেস করলেন “কেমন আছিস? নতুন জায়গায় যাবি, সাবধানে থাকিস”। আমিও মোহাবিষ্টের মত ঘাড় নেড়ে জানালাম ‘থাকব’। ঠাকুমা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, প্রণাম করলাম।

পরের পৃষ্ঠার ছবিটা একেবারে ঝাপসা। একটা ছোট্ট ছেলে বসে আছে দোলনায়। আমার মামা। ন’ বছর বয়েসেই জলে ডুবে মারা যান। ওনার সাথে আমার দেখা হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। এই ছবিতেই যা চিনি। আবছা ছবির আড়ালে ছোট ছেলেটা কি একবার ফিক করে হাসল আমায় দেখে? আমার মাসি বলতেন আমার সাথে নাকি মামার চেহারার খুব মিল ছিল। সাদৃশ্য খুঁজতে যেতেই ছবি বলে উঠল, “পাবিনা, সব জলে ধুয়ে গেছে”। ছবিটার কেবল তিনটে কোনা আটকানো, এক কোনের একটা সোনালী ফটো-কর্ণার কোথাও হারিয়ে গেছে বোধহয়। তাই ছবিটা খুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বারবার। মানুষকে ধরে রাখা যায়না, কিন্তু তাদের অবয়বকে অনায়াসে চারটে ফটো - কর্ণার ধরে রাখতে পারে স্মৃতি - সাগরের অ্যালবামে। জীবন-যাপনেও এমন সরঞ্জাম থাকলে হয়ত কাউকে হারিয়ে যেতে হোতনা কোনওদিন।

এই পৃষ্ঠায় দিদিমার ছবি, রামায়ণ পড়ছেন বসে। দিদিমার ভীষণ প্রিয় ছিল এই কৃত্তিবাসী রামায়ণ বইটা। পাতাগুলো আলগা হয়ে যাওয়ায় কালো পিচবোর্ডে বাঁধিয়ে আনা হয়েছিল। আর ছিল শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনামের চটি বই একটা। বইদুটোই রোজ সকালে বিকেলে সুর করে পড়তেন, জানলার ধারে বসে। অষ্টোত্তর শতনামের পুরোটাই দিদিমার মুখস্থ ছিল, তবু মুখের সামনে খুলে রাখতেন, পাছে ভুল হয়ে যায়! রয়ে গেছে সাদা কাপড়ের বটুয়ার ভেতরে রাখা দিদিমার জপের মালাটি। তিনটে জিনিসই আজও আছে আমাদের বাড়িতে, শুধু মালকিন হারিয়ে গেছে।

ওপাশের পৃষ্ঠায় আমার মা আর বাবার ছবি। বিয়ের পরে পরেই তোলা সম্ভবতঃ। সাদা কালো ছবিতে লাল - কালির কলম দিয়ে কেউ মার সিঁথিতে সিঁদুর আর কপালে ছোট্ট লাল টিপ এঁকে দিয়েছিল। এয়োতির স্বাক্ষর হিসেবে। অল্প বয়েস। কি সুন্দর লাগছে দুজনকেই। মাকে দেখলাম অনেকক্ষণ ধরে। পূর্ণ বয়স্ক বাবাকে আমি চিনি। মাথায় পাকা চুল, মুখে চোখে বয়েসের আঁচড়। কিন্তু মা বুড়ো হলে কেমন লাগত আমি জানিনা। কে জানে কোথায় আছে এখন? কতদূরেই বা!

-“এইতো, তোর পাশেই”। চমকে উঠলাম। কে বলল? মা? এরকমই ছিল মায়ের গলার আওয়াজ? সত্যিই কি মা আমার পাশে বসে আছে এখন? “আছি রে। তুই দেখতে পাচ্ছিস না”। আমার ঘরের চারদিকে যেন মিহি চন্দনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। “কেন ফেলে চলে গেলে” জিজ্ঞেস করতে গিয়ে হাহাকার করে উঠল মনটা।

তারপর আরও আরও পৃষ্ঠা উল্টে গেলাম। সাদা-কালো ছবির ভেতরে বিভিন্ন পরিবেশে স্থির হয়ে থাকা আত্ম - পরিজনেরা একে একে এসে জানান দিয়ে গেল তাদের অশরীরী উপস্থিতি। ঠিক তখনই খেয়াল করলাম হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর সাথে কালো পৃষ্ঠার এই অ্যালবাম গুলোও হারিয়ে গেছে দোকানের তাক থেকে। হারিয়ে গেছে তাদের গায়ে ছবিকে আটকে রাখার সরঞ্জাম এই সোনালী রঙের ছোট ছোট ফটো-কর্ণার গুলোও। মনে পড়ল আমাদের বাড়ির বারান্দার এক কোণে পড়ে থাকা পুরোন একটা টেবিলের জীর্ণ ড্রয়ারের কোনায় দেখেছিলাম একটা ছোট কাগজের বাক্সে গোটা কয়েক এমনি ফটো-কর্ণার অনাদরে পড়ে থাকত। কাজে লাগেনা, তাই কদরও ছিলনা। কি হবে ও দিয়ে!

আমাদের একটা বক্স ক্যামেরা ছিল। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, পূজো বা অন্য কোনও অনুষ্ঠানে বাড়ির সব আত্মীয় স্বজন একজায়গায় হলে তাতে রিল ভরা হোত। তখন সবাই মিলে ফটো তোলার ধূম। এই অ্যালবামের বেশিরভাগ ফটো বোধহয় সেই ক্যামেরাতেই তোলা। ফটো ওয়াশ হয়ে বাড়িতে এলে শুরু হোত এক বিরাট হই চই। আমার কাকু খুব যত্ন করে প্রতিটি ফটোর চারটে কোণ ফটো - কর্ণার এর ভেতর ঢুকিয়ে অ্যালবামের কালো পাতায় সেঁটে দিতেন। তারপর বেশ কদিন আমরা যখন - তখন অ্যালবাম নিয়ে বসে যেতাম। কার চোখ বন্ধ, কে ব্যাঁকা হয়ে বসেছে কিম্বা তখুনি একটা হাই তুলতে গিয়ে হাঁ মুখটাই ছবিতে উঠেছে এসব নিয়ে জোর আলোচনা চলত। এক্ষুনি এই মুহূর্তে যেন সেই সব শব্দজট কানে ভেসে এল। একার ঘরটা আর একলা হয়ে রইল না। বিস্মৃত অ্যালবাম আর ফটো - কর্ণারগুলো আজও তাদের ভালবাসার আগলে বেঁধে রেখেছে।

কেন হারিয়ে গেল তারা? আজকাল তাদের কেউ খোঁজেনা, সেই অভিমানে? এমন চামড়া বাঁধাই অ্যালবামের খবরও কেউ নিইনা আর। হারিয়ে গেছে রিল ভরা বক্স-ক্যামেরায় তোলা এমনি সব সাদাকালো ছবির সম্ভার। আজ আর কেউ তাদের চায়না। তার জায়গায় আসীন হয়েছে রংবেরঙের ছবি অথবা সেলফি। যেমনটি চাওয়া যায়, ঠিক তেমনটিই হাতে পাওয়া যায়, মিনিটের ব্যবধানে। নতুন যুগের অ্যালবামে তাদের জমিয়ে রাখার জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা। টুক করে ফটোটি তার মধ্যে সেঁধিয়ে দিলেই হোল। রঙ চটে যাওয়ার ভয়ও নেই। স্মৃতিময় সাদা - কালো ছবিরা পুরোন অ্যালবামের মধ্যেই বেঁচে থাকে। কিছুটা বা স্বস্তিতেও।

ছায়ারা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকল। তাদের ছুঁতে চেষ্টা করেও পারলাম না। বয়ঃবৃদ্ধ অ্যালবামটাকে আলতো করে শুইয়ে দিলাম স্যুটকেসে। আবার আমার যাত্রাপথের সঙ্গী হবে এইসব হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর সাদা - কালো দ্বিমাত্রিক অবয়ব। অধুনা বিলুপ্ত অ্যালবামের শরীরে মাখামাখি হয়ে জেগে থাকবে তাদের হাসি - কান্না, সুখ - দুঃখ, চাওয়া - পাওয়ার বিন্দু বিন্দু পসরা। ভুলে যাওয়া চামড়া - বাঁধাই অ্যালবাম তাদের আগলে রাখবে অতি যত্নে, বুকের ওমে। ন্যাপথালিনের মৃদু গন্ধে বুঁদ হয়ে থাকবে স্মৃতির জার্নাল।

ঠিক...ঠিক...ঠিক..., একটা টিকটিকি জানলার ওপরে বসে আমার ভাবনায় সশব্দে সায় দিতেই চমক ভাঙল। মোবাইল অন করে দেখলাম ভোর চারটে। কখন কোন ফাঁকে গোটা একটা রাতকেই হারিয়ে ফেললাম টের পাইনি। টের পাইনি এমন সব কত কিছু হারিয়ে ফেলার মুহূর্তগুলো, সাদায় কালোয় আলো-ছায়া মেখে যাদের হারিয়ে যাওয়া আমার চৌহদ্দি থেকে। এমন কোনও অ্যালবাম নেই যার হৃদয়ে তাদের বন্দী করে রাখি চিরকালের মত।