খাটা-পায়খানা এবং আফগান স্নো

বিজয় দে



--- আমার জন্মের কয়েক বছর পরে শহরে নাকি হঠাৎ তান্ডব। পাকিস্তানের বদলা চলছে।চারদিকে আতঙ্কের পরিবেশ। একদিন মা নতুনপাড়ার ভাড়াবাড়ির খাটা-পায়খানার ভেতরে ঢুকে দেখেন ,একজন হতদরিদ্র মূসলমান যূবক,মলের টিনের পাশে লুকিয়ে আছে।ভয়ার্ত চোখ মুখ। সে প্রাণভিক্ষা চাইছে ।রাত্রি হলেই সে এ শহর ছেড়ে পালিয়ে যাবে। হ্যাঁ, সে এই শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।---
(বিজয় দে ভূমিপুত্র আনন্দবাজার পত্রিকা উঃ বঃ সংস্করণ)

প্রথমত
যেটা বলার, সেটা হচ্ছে,আমার বাবা তখনকার পূর্ব - পাকিস্তানের এক অজপাড়াগাঁ থেকে মা’কে বিয়ে করে জলপাইগুড়ি শহরের নতুনপাড়ার প্রথম যে-ভাড়াবাড়িতে উঠেছিলেন, সেই বাড়িতে, আমার জন্মের পর’ এবং এই জেলাশহরে স্বল্পমেয়াদী এক - তরফা
দাঙ্গা - পরবর্তী - সময় পার করে বেশি দিন থাকতে পারেননি । কেননা বাড়ির মালিক সেই সময়ের বিখ্যাত (অজিত)চক্রবর্তী-পরিবার ও সদস্য - সংখ্যায়, বহরে,অনেক সমস্যা নিয়ে বড় হচ্ছে, তাদেরও ঘর দরকার, সুতরাং বিদায়, বিদায়। ফলে, উপায়ন্তরহীন বাবা এবার একটা নতুন বাড়ির খোঁজে। বাড়ি ছাড়ার আরও একটা কার্‌ণ ,হয়তোবা খাটা-পায়খানা-সংক্রান্ হলেও হতে পারে, মানে চক্রবর্তী-বাড়িটি ছিল বিঘাখানেক জমির ওপরে, সেই অনুসারে,খাটা - পায়খানাটি নিশ্চয়,বাস্তবসম্মত কারণেই জমির শেষ প্রান্তে ছিল এবং মায়ের মনের গভীরে, ওপরের লেখামাফিক - মলের টিনের পাশে ভয়ার্ত মুসলমান যুবকের আত্মগোপনের ঘটনাটি নিয়ে ভেতরে ভেতরে একটা আতঙ্ক তো থাকতেই পারে, যদিও এসব নিয়ে , আমরা বড় হয়ে ওঠার পরে, মায়ের মুখ থেকে শোনা শুধু ওই ঘটনাটি বাদ দিয়ে,বাড়িতে বিশদভাবে কোনোদিন আলোচনা হয়নি বা শুনিনি, মানে, কেউ কিছু বলেননি।“আতঙ্ক” - সম্পর্কিত ভাবনাটি, এটা আমার নিজস্ব অনুমানমাত্র।
যাই হোক, বাড়ি পাওয়া গেল, শহরের কেন্দ্রে ,একেবারে কদমতলায়। এবং এর সাথে সাথে শুরু হোলো আমাদের একঘেয়ে বাড়ি-বদলের কাহানি।


আমার একদা-ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু যার অর্থনীতি - শাস্ত্র সম্পর্কে বালক - বয়স থেকে কিছুটা শৌখিন কিন্তু প্রবল আগ্রহ ছিল ,সে নাকি একবার এবিষয়ের কোনো পাঠ্যপুস্তকে দেখতে পায়, সেখানে লেখা আছে,”যার কোনো পুঁজি নেই, সে কোনো ব্যক্তি নয়“ এবং তক্ষুনি সে ওই বিশেষ - বিদ্যা বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, যদিও ওই পুস্তকের সত্যাসত্য নিয়ে এখনও আমার কোনো ধারনা নেই ।ওই উক্তির সূত্র ব্যবহার করে একথা তো বলা যেতেই পারে “যে ব্যক্তির নিজস্ব গৃহ নেই, সেই ব্যক্তি ‘মনুষ্যপদবাচ্য’ নয়”। এবং একই সাথে বলা যেতে পারে ,তখন আমার বাবার যা মাসিক উপার্জন ও সঞ্চয়, তা দিয়ে “মনুষ্যপদবাচ্য” হওয়াটা শুধুই স্বপ্ন । সঠিকভাবে, যুগসম্মত - বেঁচে থাকার কূটকৌশলগুলো বাবা তখনও শিখে উঠতে পারেন নি।
কিন্তু এসব তো অনেক পরের কথা, এদিকে আমাদের কদমতলার ভাড়া-বাড়ির ‘গপ্পো’টার কী হোলো? যদিও এসব তথাকথিত ‘গপ্পো’তো আমি অনেক বড় হয়ে শুনেছি এবং বুঝেছি।তাদের বলা বয়ান অনু্যায়ী, কদমতলার ওই বাড়িটি , সেখানে কয়েক বছর আমরা বেশ হেসে-খেলে থাকলাম। তারপর ওটা ছেড়ে দিয়ে,একেবারে কাছেই আরেকটি বড় বাড়িতে ঢুকে গেলাম, কেননা আমাদেরও তো সংসার বড় হচ্ছে, সাথে সাথে সমস্যাও বাড়ছে। অথচ এখানেও বেশিদিন থাকা গেলনা। “হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোনোখানে”,যদিও তখন এই রবীন্দ্রবাক্যের হদিশ আমরা কেউ জানতাম না । এবার আমরা সোজা চলে এলাম রেললাইন পেরিয়ে, পান্ডাপাড়ায়, ঠিক কংগ্রেসঅফিসের উল্টো দিকে। সেখানে অনেক বছর। ততদিনে আমাদের সব ভাইবোনরা জন্মে গেছে।মা-বাবা আর ছয় ভাইবোন নিয়ে আমাদের ভরভরন্ত সংসার। নানা কারণে এখানেও বেশিদিন থাকা গেলনা।আমি তখন কিছুটা বড় হয়েছি।চোখ খুলে গেছে।বাড়ি-বদলের মূল কারণগুলো একটু একটু বুঝতে পারছি। টের পাচ্ছি,মায়ের গোপন ও প্রকাশ্য চোখের জল আমাদের ভেতরটা কিভাবে যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে।কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে, ছেলে-মেয়েদের বক্তব্য তখন একেবারেই গ্রাহ্য নয়।তাই এক রাতের সিদ্ধান্ত, এবার আমরা সাময়িকভাবে, কাছে্‌ই, পান্ডাপাড়া-বড় রাস্তার ওপারে পূর্ব - পরিচিত একজনের বাড়ীতে গিয়ে উঠলাম। সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে, তারপর আবার, সেই সাময়িক-আস্তানা ছেড়ে, অনেক বছরের জন্য, সেই নতুনপাড়ায়, সেই চক্রবর্তি-বাড়ীর উল্টোদিকের গলিতে, যে - গলির তখন ডাকনাম ছিল “রমেশ ব্যারাক”।ওই গলি বা কানাগলিতে আমরা বেশ কিছু বছরের জন্য থিতু হলাম। কেন জানিনা, মনে হয়েছিল,যেন নিজের বাড়িতেই ফিরে এসেছি ।

আমাদের মত সাধারণ পরিবারের,প্রত্যেক স্ত্রী’র একটা স্বপ্ন থাকেই, নিজস্ব একটি বাড়ি, সেই বাড়িতে, নিজের মনের মতো করে ,নিজের মেজাজে, নিজের হাতে সাজিয়ে গুছিয়ে সংসার করার । অথচ, এদিকে ক্রমশ - বেড়ে - যাওয়া আর্থিক চাপ আর ছাপোষাকেরানীস্বামী’র পক্ষে সেই চাপ সামলাতে না-পারা,তার ওপরে প্রায়-বছরবছর বাড়ি-বদল, এই তিনের যোগফলে মায়ের আক্ষেপ ও যন্ত্রনা আর তো গোপন থাকল না।এটাতো সকলেই জানেন ,শহরের এই সব তৃতীয়–শ্রেণীর ভাড়া-বাড়ি, যা নিম্নবিত্তদের জন্যেই তৈরি,যেখানে শুধুই টিকে - থাকা আর টীকে - থাকা, স্বপ্ন দ্যাখার কোন পরিসর নেই এবং তার ফলে পরিত্রাণহীন, ক্ষোভ ক্ষোভ আর ক্ষোভ। গোটা বাড়িটাই যেন অসুস্থ হয়ে পড়লো।আমরা খুব তাড়াতাড়ি অশান্তির গুহামুখে পৌঁছে গেলাম।
যাই হোক, ক্ষোভ মিটলো। মায়ের এক টুকরো ইচ্ছা শেষপর্যন্ত পূরণ হোলো অনেক অনেক বছরের পর’। মানে, ১৯৬৮র সেই বিখ্যাত বা কুখ্যাত তিস্তা-বন্যার ঠিক কয়েক দিন আগে, আমরা কোনওক্রমে, এই জলপাইগুড়ি শহরে, তথাকথিত “মনুষ্যপদবাচ্য” হলাম।

দ্বিতীয়ত
যেটা বলার, সেটা হচ্ছে , এই যে নিজস্ব ঠিকানা খুঁজে পাওয়া, সেটা তো অন্য গল্প, সেই গল্প এখানে অপ্রয়োজনীয়।প্রায় কুড়ি বছরে , ওই বাড়িভাড়া থেকে ভাড়াবাড়ি ,ছয়-ছয়টি ,ছয়বার ঠিকানা পরিবর্তনের মধ্যেই আমরা কি সীমাবদ্ধ থাকবো, নাকি আমরা দায়বদ্ধ থাকবো ”খাটা-পায়খানা সিরিজ” নামক কোনো গা-ঘিনঘিন করা শিরোনামের প্রতি? আমি দ্বিতীয়টিতেই থাকতে চাই ,কেননা ঠিক এই জায়গায় আসবো বলেই তো এতটা কথা বলা। কেননা, ওই ছয়টি ভাড়াবাড়ির অন্য কোন মিল থাকুক বা না-থাকুক, ওই ছ’টিই ছিল খাটাপায়খানাসমৃদ্ধ।
সুতরাং, এতক্ষণ ধরে যতটুকু লেখা হয়েছে, সেটিকে একটি ভূমিকা হিসেবে গ্রহণ করবেন,এই কামনা করি। এবং মূল লেখাটি শুরু করার আগে বলে নিই ,”খাটা-পায়খানা”সম্পর্ ে প্রাথমিকভাবে আমার যা যা মনে হয়েছে এবং আমার বিশ্বাস , এটা প্রাক - স্যানিটারি ও উত্তর-স্যানিটারি পিরিয়ড,এই দুই টাইম - ফ্রেমে মিলেমিশে লিখিত ।যেমন

আপাতদৃষ্টিতে ,সব খাটা-পায়খানার স্থাপত্য দেখতে একরকম হলেও,প্রত্যেকটির ইনটেরিয়র ও ইকড়িমিকড়ি কিন্তু আলাদা।

গ্রীষ্মকাল বর্ষাকাল এবং শীতকাল , এই তিন ঋতুতে খাটা-পায়খানা এবং তার ব্যবহারকারীর মেজাজ ও মুদ্রাদোষ ভিন্ন ভিন্ন ।

বর্ষা এবং শীত, এই দুই সময়, গভীর রাতে যারা ওখানে গিয়েছে বা গিয়েছেন, তারা মোটামুটিভাবে মানব-জাতির আদর্শ নমুনা,বাচ্চাদের এরকমভাবে বলা যেতে পারে।

“ওপেন-এয়ার খাটা-পায়খানা”। এ নিয়ে আমাদের অল্পবিস্তর অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু কোনও ডকুমেন্টারি-শট নেই ।চাঁদনী রাত, লন্ঠন হাতে নিয়ে,’এমন চাঁদের আলো মরি যদি সেও ভালো’ গাইতে গাইতে, তেপান্তরের মাঠে আপনি কেন গিয়েছিলেন, সেটা কি আর আমরা জানিনা !

“আইন আইনের পথে চলবে । খাটা-পায়খানা খাটা-পায়খানার পথে চলবে।“ বাঙলা নিউজ-চ্যানেলে ‘আলু ও শৌচাগার’ মন্ত্রীর উক্তি।

“প্রস্তরযুগের খাটা - পায়খানা এবং মস্তিযুগের কমোড - ক্রান্তি, এনিয়ে একটা‘ কমপারেটিভ স্টাডি’ হবে নাকি, গুরু?”

শিল্পসাহিত্য - ইতিহাস - পাঠ্যে ‘পোস্ট - মডার্ন
খাটা - পায়খানা’, এই ধরনের কোনো জটিলতা সিলেবাসে-টীলেবাসে পেয়েছেন কি?

“সাহেবদের খাটা - পায়খানায় ফুলগাছ থাকে। পাখি ডাকে ।মিউজিক শোনা যায়” এটা কিন্তু একেবারেই গুজব।সাহেব মানেই সাকসেস,এই কথাটার প্রচারই গুজবের মূল উদ্দেশ্য।

খাটা - পায়খানা আছে, তার মানে কুপি আছে । কুপি আছে, তার মানে এই গৃহে চুপিচুপি কথা বলার জন্য কুয়োতলা আছে। কুয়োতলা আছে, তার মানে এই বাড়িতে ঈশ্বরের চলাচল আছে ।

ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে শুয়ে লাখ টাকা’র স্বপ্ন দ্যাখা’র এবং খাটা-পায়খানায় বসে বসে সেই স্বপ্ন পালিশ করার কপাল নিয়ে যারা জন্মেছে,তারা আসলে কবি ।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের হাতে কোনও অক্ষরলেখা নেই।

সেই ন্যাশনাল কুইজ কম্পিটিশনে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিলো “কমোড কে আবিষ্কার করেন? র্যা পিড ফায়ারে, এটাই ছিল লাস্ট কোয়েশ্চন ।ছেলেটি উত্তর দিয়েছিল ‘বোধ হয় একজন স্পন্ডিলাইটিসের রুগী’। এটা তো ভাল, এর আগে একজনকে খাটা-পায়খানা নিয়ে একই প্রশ্ন করা হয়েছিল ।সম্ভবত ঘাবড়ে গিয়ে,তার উত্তর ছিল ‘আমার বাবা’।

ভেটারেন চন্দ্র খাটা-পায়খানা এবং নবীনকুমার কমোড, এই দুইয়ের সাক্ষাত, এ বিষয়ে আপনার কোনো ধারণা আছে কি ? অনেকেই, নানা যায়গায় এরকম দেখা - শোনা’র কথা বলে থাকেন বটে ,অথচ এর কোনো হাতে-গরম প্রমাণ কেউ দ্যাখাতে পারেনি।

পুরসভা‘র পক্ষ থেকে শহরের নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য ‘মলের টিন’ কেনা, সেটা যে টেণ্ডার ছাড়াই হয়েছিল, সেটা সবাই জেনে গেছেন, কিন্তু বাজার-দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনে পুরসভার কত ক্ষতি হোলো , সেটা কি জানেন? তা’হলে বাড়তি চুরির টাকাটা কা’র কা’র পকেটে গেল?একটা পোলিটিকাল শ্লোগান কি এখনও আপনার কানে যায়নি?
“গলি গলিমে শোর হ্যাঁয়
কঊন মলেট্টিন চোর হ্যাঁয়”

“ চোপ, টোমরা সব বেয়াআডপ আদমি আছো, হ্যাঁগা পাঈয়াছে বলিয়া ড়াশটায় বসিয়া পড়িবে? য়ল নেটিভ ফূলশ, গাভমেণ্ট টোমাডেড় যন্য বহুত কিছু করিটেছে ,টোমাডেড় বাড়িঘর সব কালারিঙ করিয়া দিতেছে, টোমাডেড় বাচ্চাডেড় নাম ঠীক করিয়া দিতেছে,কীতনা কীতনা এডুকেশন দিতেছে, ঔড় তূম্লোগ বদতমীজ,গাভমেণ্টকা ইমেজ খাড়াপ করিয়া দিতেছ, তূম সব নামকহারাম হ্যায়, আভী হামি টোমাডেড় চাবূকসে মারিব ,জেঈল খাটাইব, খাটাপাঈখানামে ঘূসাঁঈয়া দিবো।–
’নিউবাবুবিলাস’ প্রহসনের এই সংলাপে আসতেই, প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে একটি শিশু ভয়ে কেঁদে উঠলো ।

“আরে, আমাগো কথা ছাড়ান দ্যান ,আমরা হইলাম গিয়া খাটা - পাঈখানার আমলের মানুষ, দ্যার কেজি চাইলের ভাত খাইয়া কাজে নামতাম, দ্যার দ্যার তিন মিনিটে চাঊল হজম, বা্য্যি পাইলে খাটা ,নাইলে মাঠা, মানে আইলের ধারে গিয়া বইসা পড়তাম, লোকে একসময় গিয়া দ্যাখতো, হালায়্‌ ,আমাগো পাড়ার কুমার পালের বানানো কচি কচি হইলদা রঙের হাতগুলান সাড়ি-সাড়ি পইরা আছে”

“ ‘খাটা-পায়খানার দিনগুলিতে প্রেম’ এবং ‘আমার জীবনে যত খাটা-পায়খা্না’, এই দুটি পুরনো বই এখনও অবধি বেস্টসেলার লিস্টের ওপর দিকে থাকে ।কিন্তু আপনার নতুন বইগুলো সেভাবে পপুলার হোলোনা কেন? লেখক হিসেবে আপনার কী মনে হয়?উত্তরে লেখক যা বললেন ,”খাটা-পায়খানা আসলে এক ধরনের গ্রাম্য যৌনতা। দরজায় ,পর্দায় ফুটো থাকেই, আর ফুটো থাকলেই নিষিদ্ধ কামনা-বাসনা,তার ফলে—“

শোবার ঘর থেকে আপনার খাটা-পায়খানার দূরত্ব কত? জঙ্গল পেরোতে হয়? নদী পেরোতে হয়? পাহাড়? সাপ? শাঁকচুন্নী? শূর্পনখা?— যেখানে যাচ্ছেন যান, আপনার পেছনে কি পিতামাতার অলটাইম আশীর্বাদ আছে? যদি থাকে, তাহলে কদম কদম এগিয়ে চলুন।

তৃতীয়ত
যেটা বলার ,সেটা হচ্ছে অনেক আনতাবড়ি - তানটাবড়ি অনেক কথা, ওপরে সতেরো দফা, ইচ্ছে করলে ওগুলো বাদ দিয়েও লেখাটি পড়তে পারেন, কোনো অসুবিধে হবেনা। কিন্তু এবার যে-কথাটি বলার জন্য এত আয়োজন সেটি আপনাকে পড়তেই হবে।


“খাটাপায়খানার নিচে থাকে মলের টিন
তার পাশে আত্মগোপন, একটু সুযোগ নিন”


খুবই হাস্যকর পদ্য, সন্দেহ নেই। তবুও এটা জরুরী মনে করে গ্রহণ করবেন। কেননা,

আততায়ীরা চিরকাল আছে এবং আততায়ীরা চিরকাল থাকবে

জাগ্রত দাঙ্গাপ্রণেতা জাগ্রত ধর্ষণকারী জাগ্রত হত্যাব্রতী জাগ্রত তারা আজ আরও বেশি জাগ্রত

মায়ের দ্যাখা, জলপাইগুড়ি শহরের সেই কোন পুরাতন সন্ধেবেলায়,মলের টিনের পাশে বসে - থাকা ভয়ার্ত মুশ্লিম যুবকটি প্রাণে বেঁচেছিল,একথা ঠিক, সেটা কিন্তু নিরাপদ আত্মগোপনের জন্যই।
আত্মপ্রকাশ যেমন আত্মগোপন তেমন
মানুষের অধিকার


আত্নগোপন কামদুনি পারেনি। আত্মগোপন ধূপগুড়ি পারেনি
তাদের মরতে হোলো। রাষ্ট্র ঠিক করে ফেলেছে ,তাঁরা কা’কে বাঁচাবে।





…..যে কোনো টেবিল ধরা যাক, সেলাইয়ের কল, ফুলদানি, চামড়ার ছোট অ্যাটাচে কেশ, অসম্পূর্ণ সেলাই, নতুন পুরনো নোবেল লরিয়েটদের দু-চারখানা বই, বিস্তর রাবিশ লেখার আবর্জনা, স্কুলের ছেলেমেয়েদের অঙ্ক ইংরেজির খাতা সংশোধনের জন্য টাল মারা, আধ পেয়ালা চা, সাবান পাউডার, মুড়ির বাটি, খড়কুটো,কচি আমের টূ করো,রিবন,এলোমেলো চিঠি,এলেনবাড়ির ফিডিং বোতলের পেটে খানিকটা দুধ, এই সব….
(কোনো গন্ধ # জীবনানন্দ দাশ)

এবং আফগান স্নো।

‘খাটা - পায়খানা সিরিজ’ শেষ হলে শুরু হয় আমার তথাকথিত কাঠূরিয়া -সিজন’য়ের হিজিবিজি। জাগ্রত হয় ‘মায়া স্টোর্স’ বা একটি অসম্পূর্ণ কবিতার শিরোনাম
“-- অন্ধকার থেকে একটিই মাত্র প্রশ্ন উঠে এলো ‘তুমি কে গো’ উত্তরও চমৎকার ‘আমি আফগান স্নো’---
দূলাল’কে আমরা কিন্তু কখনও ভুলিনি। ভুলিনি এবং ভুলবোনা
তালমিছরির দেশে তাই কখনও রব উঠেছিল ,‘থ্রি চিয়ার্স ফর ওভালটিন’
কেউ যেন,পলসন মাখনের কৌটো মাথায়, বাজারের জয় হোক,বলতে বলতে
কবিতার ভেতরে ঢুকে গেল

সংসার অপার,সুতরাং, নাহি পারাবার ,শ্যামাসঙ্গীত শেষ হলে শুরু হয় শীতকাল
শেষ হোলো মায়ের পায়ের জবা, এবার কিছু নকশা - কা্টা মুণ্ডু চাই
শেষ হোলো সাধ-না-মিটিলো, এবার কিছু কুন্ডু-স্পেশাল চাই

অগুরুর আতর - গন্ধ ছাড়া আমরা কি কখনও ছন্দে লিখতে পারিনি?
রবিন-ব্ল্যু দিয়ে আমরা কি কখনও দাঁত মেজেছিলাম?
বউ-ভাতের দিন, লিলি’র সঙ্গে কি কোলে বিস্কিট হাজির ছিল?

এসব রহস্য জানতে জানতে এত বছরের পর’
মনে হয় ঘরের হর্লিক্সেরও কোনওদিন এসেছিল জ্বর

মায়া স্টোর্স। আমার বাম দিকে ঢোল কোম্পানী’র মলম
মায়া স্টোর্স। আমার ডান দিকে হীরালাল পালের শটি

আমার মাঝখানে আর কোনো পঞ্চবটি নেই
হে মায়া স্টোর্স ,তোমাকে জানতে আমার কেন এতদিন সময় ?”
২ক
এইতো,মাত্র কয়েক লাইন, লিখতে আমার কেন যে এতদিন লাগলো! আর, মায়া স্টোর্স’য়ের কথা যখন একবার উঠলো, তখন না - হয় বলে ফেলা যাক
“সেদিনটার কথা আমার খুব পড়ছে। সকাল হতে - না - হতেই বাড়িতে সাজ সাজ
রব । আজ আমরা দুই ভাই, জীবনে প্রথম,বাবার হাত ধরে সেলুনে চুল কাটাতে যাবো। সেলুন কোনোদিন দেখিনি এমন নয় ,ইস্কুল - যাতায়াতের পথে,কিছুটা দূর থেকে দেখেছি, বড় বড় আয়না-অলা ঘর, চুল - কাটা’র ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, দেখতাম বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষেরা গায়ে সাদা কাপড় জড়িয়ে বসে আছে।আর কেবলই ভাবতাম, এখানে কবে যে আমাদের প্রবেশাধিকার ঘটবে!
যাই হোক, বাড়ির এত কাছেই যে এই গল্পের সেলুনটি আছে, সেটা আগে বুঝতে পারিনি , সরকারী নালা’র ওপরে,অনেক দোকানের মাঝখানে চাপাচুপা এক ফালি ঘর, দু’টি আয়না একখানি কাঠের চেয়ার আর বিজুভাইয়া কি হরিভাই, এরকম নামের একজন নাপিত।
চুল কী কাটালাম - না কাটালাম, সেটা কিছুই মনে নেই, অথচ ওই ঘরটির কথা এখনও মনে আছে।যদিও ঘর আবার কোথায়, ওপরে পুরনো জং - ধরা টিনের ছাদ,চারপাশ মুলিবাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা,আর নিচে নড়বড়ে ‘ধর - তক্তা - মার -পেরেক’ - মার্কা কাঠের মেঝে।
কিন্তু যেটা বলার, সেলুন বা ঘর,যাই বলুন ,গোটা চাটাইগুলো ছিল,অধুনালুপ্ত’দৈনিক যুগান্তর্‌’ ,খবরের কাগজ দিয়ে সাঁটানো,একটুও ফাঁক নেই। ওই খবরের কাগজের ওপরে,চাটাইয়ের গায়ে যেমন আয়না লটকানো,তেমনি ছিল একখানি ক্যালেন্ডার - কাটা বেশ বড় রঙিন ছবি।

এবং ওই যে জীবনে - প্রথম - সেলুনে - চুল - কাটানো - দিন,আর তার পর’ থেকে ,বছর বছর, একা বা দোকা ,কেউ জানেনা, সেলুনে ঢুকেছি শুধু ওই ছবিটির টানে
সবুজের থেকেও সবুজ কাঁচাসবুজ একটি পাহাড়ি উপত্যকা
নরমসাদা লোমের চাইতেও সাদানরম লোম - অলা কিছু ভেড়া
নদীর বন্ধু’ঝর্ণা’র চাইতেও বেশি আপন একটি নির্জন জলস্রোত
স্বর্গদৃশ্যের চাইতেও বেশি স্বর্গীয় কোনো আপেলবাগানের আভাষ
নারী’র চেয়েও বেশি নারী এক যুবতীকন্যার হাশিখুশিআদর্শলিপি
শুধু এই ছবিটির টানে।খবর পুরনো হয়,কাগজ পুরনো হয়,সব পাল্টে যায়,কিন্তু ওই ছবিটি একই থাকে।তার মানে ছবিটি নাপিতভায়া’রও খুব পছন্দের ছিল,এবং আমারও।বছরের পর’ বছর ধরে,এই ছবিটি দেখতে দেখতেই তো সাবালক হয়ে উঠলাম। বলা বাহুল্য, ওই ক্যালেন্ডারটি যে আফগান স্নো’য়ের ছিল সেটা নিশ্চয় আপনাদের বলে দিতে হবেনা!”
২খ
আপেলবাগানের কথা যখন উঠলো, তখন তো একবার লেখা যেতেই পারে
“আমার মায়ের একটি রংবাহার কৌটো ছিল।সেই কৌটোর ভেতরে ছিল মায়ের নিজের হাতে বোনা,কাঁথাফোঁড়ের স্বপ্নজোড়া পাহাড়পর্বত, মাঠ যেন সবুজ সূতোর ঘন আদর,
নদী স্বরূপ ঝর্ণা,ঝর্ণা স্বরূপ সমুদ্র , আর ছিল একটি সিদূঁরচাপা আপেলবাগিচা।সেই বাগিচার একটি গাছের ডাল ধরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়,সাদা ফুলশার্টের হাতা গুটিয়ে গান গাইছেন ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায় ফাগুন মাসে’….। গানের উচ্ছ্বাসে ,কী যেন উচ্ছ্বাসে্‌, কৌটো টলমল করছিল।

আমার মায়ের একটি বেগমবাহার কৌটো ছিল।সেই কৌটোর ভেতরে ছিল মুখে-মাখা’র এক ধরনের পরশমণি মাখন।স্বর্গের ঘনিষ্ঠ - উদ্যানে সেই প্রফুল্ল মাখনের নাকি প্রচুর চাষ হয়।এবং মাখনচাষিদের মেয়েরা যখন বিকেলবেলায় ওই পরশমণি মাখনের গন্ধ মেখে পথে বেরোয়,তখন আলোর বন্ধু আলো,ভালোর বন্ধু ভালো,তখন ওই মেয়েদের গোটা শরীরটাই যেন এক পশলা বিচিত্র প্রেমপত্র,তখন চিঠির ছত্রে ছত্রে কামরাঙা আপেলের উত্তাপ, তখন কৌটোর ভেতরে ‘আগুনের পরশমণি’ নামক একটি গ্র্যান্ড-অর্গান বাজতে থাকে ।

আমার মায়ের একটি চাঁদবাহার কৌটো ছিল।সেই কৌটোর ভেতরে সবসময় ছিল একটি জ্যোছনাবরণ জলসা আর ছিল জলসা’র বিভিন্ন হৈচৈ ।বাংলা গান থৈ থৈ।সবাই যেন পাত পেড়ে খাচ্ছে ।উলুউলু দেয় উড়ুউড়ু করে।নাক ডাকে ,ঘুমায়, কখনও কখনও এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে। একদিন মা আমাকে ডেকে বললো “এগুলিরে তুই সামাল দে তো,অগো জ্বালায় একটা ভালো কিছু শুনতে পাই না।“
‘ঠিক সেই সময় ,বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, কে একজন ,অন্তর্গ্‌ত , দেবব্রত হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে ,মা’কে শুনিয়ে শুনিয়ে গাইতে শুরু করলেন,’আমার নিশীথরাতের বাদলধারা,এসো হে ,গোপনে,আমার স্বপনলোকে দিশাহারা….’। আর এই গান শুনতে শুনতে, মা ওই যে কৌটোর ভেতরে ঢুকে, হৈচৈথৈথৈয়ের অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন, তারপর থেকে মায়ের আর কোনও খোঁজ আমরা পাইনি।“
২গ
হে মায়া স্টোর্স ,এবার শেষ কথা হোক।
“আত্মহত্যা’র পর’ নতুনপাড়ার পুতুলরাণী’র বালিশের নিচে পুতুলরাণী’র পুরনোপাড়ার নব কুমারের লেখা একটি প্রেমপত্র পাওয়া যায়।প্রেমপত্রে্র সঙ্গে একটি আফগান স্নো’য়ের কৌটোও বালিশের নিচে ছিল।“
প্রেমপত্রে কী কী লেখা ছিল আমরা কিন্তু এখনও জানতে পারিনি।
শোনা যায়, আফগান স্নো’য়ের কৌটোটি এখনও শহরের হাতে হাতে মুখেমুখে ঘুরছে।