ডার্করুম

দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়


উপসংহার
(সময়- ধীর, সলিলকি, বৃদ্ধ, আবছা আলো)
"হারানো বড্ড সোজা একটা কাজ। যে ভাবে সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই মনে হচ্ছে। সব্বাই চলে যাচ্ছে বেইমানি করে। তাসের পার্টি'র আর কেউ নেই। সেদিন নির্মাল্য সস্তা খাটে শুয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে... বাবান-টাও দেশ ছেড়ে চলে গ্যালো। এই পুকুরটাও এতো ছোট ছিল না আগে। আমার কবে... "
ফ্ল্যাশ ১
(সময়- নড়বড়ে, সলিলকি, যুবক, প্রচণ্ড সাদাটে আলো)
রোববার আবার চাকরির পরীক্ষা, দু'ঘণ্টায় একশো টা করে প্রশ্ন। সব জানতে হবে। দূর দূরান্তে সিট পড়বে। ও'কেও দিতে পারতাম না। কেটে যাবে যাবে করছিল অনেকদিন। অবশেষে। আমবাগান ক্রিকেট তো কবেই পায়ের ধূলো নিয়ে টাটা করে দিয়েছে। সেই বাঁধানো পাড় থেকে ঝাঁপ পুকুরে... আঙুলের মাথা কুঁচকে কিশমিশের মত দেখতে না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। সাইকেলের সরু চাকার দাগ... সেই হাতে বানানো ব্যাট।

ফ্ল্যাশ ২
(সময়- মধ্যগতি, বিড়বিড়, মধ্যবয়স্ক, ডিম আলো)
এভাবে রোববার মাংসের দোকানে লম্বা লাইন দিতে... উফ্‌... অসহ্য... আগে রোববারের কৃষ্ণ কা'র চায়ের দোকানে সকাল ফুটত দুপুর পর্যন্ত। মাংস ভাত আর শাহরুখ খান... কিংবা ইংলিশ ভূতের সিনেমা। স্নিগ্ধার আলতো গন্ধের সঙ্গে দেখা হত বিকেলে। আর এখন? এখনও সামনে বারো জন... রাং-টা পাবো না। বাবানের কম্পিউটার ক্লাস আছে। তারপর ওকে নিয়ে একটু শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে। আজ আবার মায়ের সাথে দেখা করার দিন। কখন করব এতো কিছু? ধুস!
ফ্ল্যাশ ৩
(সময়- থেমে আছে, অন্ধকার, একটা জোনাকি)
শাহরুখ খানের সেই হেয়ার স্টাইলটা আর নেই। শাহরুখ খানের অনেক নায়িকাও আর নায়িকা নেই। দাদু'র বিড়ির কৌটোটা অনেকদিন বাদে পাওয়া গ্যাছে। ছাতা ফুটো হয়ে গেছে। আমার প্রথম খাওয়া ওই কৌটো থেকে ঝেড়ে। সেইদিনই পাওয়া গ্যাছে আমার ক্লাস সিক্স-এর জন্মদিনে পাওয়া ভিডিও গেম্‌স টা। জয়স্টিকটা কাজ করলেও ক্যাসেট গুলো থম মেরে গেছে। মারিও। পোস্ট অফিসে পোস্টকার্ড চেয়েছিলাম। অবাক হয়ে বলেছিলো, দাদা ওসব আর নেই। বাবা দার্জিলিং থেকে তিন খানা পোস্ট কার্ড পাঠাতো একেবারে। একটা আমার, একটা দিদি, একটা মায়ের জন্য। বাবা আর দার্জিলিং-এর গন্ধ মাঝা সে সব পোস্ট কার্ড গুলো... আর নেই? বাড়িতে এখন খালি এল আই সি আর টেলিফোনের বিল ছাড়া কোনও চিঠি আসে না।
ফ্ল্যাশ ৪
(সময়- কিছু একটা খুঁজছে, একটা ডুগডুগির শব্দ, শহরের ভাত ঘুম দেওয়া গলি)
- একদম খাবি না সোনামণি, ওতে বিষ আছে
- এ কেমন কথা গো... তোমার বাঁদর কে বিষ কেন দেবো?
- না মা ঠাকরুন, বিশ্বাস হয়না মানুষকে। সোনামণির আগেরটা একটা বাড়ি থেকে বিস্কুট খেয়ে মরে গেছিল।
- আমরা অমন মানুষ নই গো
- নাচ সোনামণি। একটু ঋতুপন্নার মত নেচে দে তো।
ফিকে হয়ে আসা ডুগডুগির আওয়াজ...

ফ্ল্যাশ ৫
(সময়- জ্যাম-এ আটকে ব্যাস্ত রাস্তা, দুপুর)
অর্কুট। চিলেকোঠার ঘর। রাজদূত। ভিজে তারা, মাধুরী দীক্ষিত এবং... এরকম ভাব বলতে থাকতেই কোনও বাক্য লেখার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। এক একটা শব্দ বেশ খানিকক্ষণ আটকে রাখার ক্ষমতা রাখে তো বটেই। লেখাটা লেখার সময় দাদুকে ভীষণ মিস্‌ করছি। একটা ইন্টারভিউ নেওয়া যেতো বেশ। এই যেমন, হাতে ঠেলা আইসক্রিম গাড়ি। গায়ে কোম্পানীর নাম নেই, খালি 'আইস ক্রিম' লেখা ইংরেজীতে। উফ্‌ ধুমধারাক্কা স্মৃতি কব্‌জি বেয়ে কনুই অবধি। এখন তো সব ভ্যান কে সাজিয়ে লাল লাল গাড়ি । আগে এরকম গাড়ি খালি কোয়ালিটি ওয়াল'স্‌-এর ছিলো। বাকি'রা ২টো কাঠের হাতল। টিনের বডি। ছোটো ছোটো দুটো চাকা। আর ভেওত্রে চাপ চাপ সাজানো আজকের ডিপ ফ্রিজ... আর আমাদের মুঠোয় ধরা এক টাকা বড় কয়েন।
ফ্ল্যাশ ৬
(সময়- ফুরফুরে, একটা ঘুড়ি, মেঘলা আকাশ, সেপিয়া টোন)
থাক দেওয়া ঘুড়ি। একটা পচা সুতো জড়ানো লাটাই। পোকায় কাটা ফেলুদা সমগ্র। ঘুলঘুলিতে ছ্যাতরানো বাসা। ঝুল। একটা ভ্যাপসা পুরনো গন্ধ।
কাট
ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট...
একটা ছেলের পিঠ থেকে ঘাম গড়াচ্ছে। লাটাইটা ছাদের ছায়া তে পড়ে। সারা ছাদ জুড়ে সুতোর জাল। ফেলু দা রিং ছাড়তে ছাড়তে কি যেন ভাবছে। ওর সারা ঘরে রিং গুলো ফাটছে।
ফ্ল্যাশ ৭
(একটা কাঁচাপাকা মুখ, কোনও অনুভূতি নেই সেখানে, মুখের ওপর ফোকাস, বাকিটা তেলতেলে অন্ধকার)
যা হারিয়ে যায়, তা কালের গর্ভে যায় না। কারণ উৎপাদন আর রিসাইক্লিং ব্যাপার দুটো আলাদা, যথেষ্ট দূরত্ব সহ। প্রথমেই এটা ক্লিয়ার করে দেওয়া হল। যা সব কিছু হারিয়ে গ্যাছে, সেসব আপাতত অপেক্ষাশীল। অপেক্ষা, অন্তিম যাত্রী অবশ্যই। শেপ, শেড, মাস্কিং... এগুলো এক একটা মেক আপ... কাল কে চুক্কি দেওয়া। কল্প-র মত আর কি কাল কে সহয এ চুক্কি দেওয়া যায় না যদিও... ওসব সাময়িক। আমার ঠিক পেছনে কাল... কেমন অন্ধকার দেখছেন? এবার আর একটা সত্যি জানুন... আসলে ওটা তীব্র আলো! উচ্চমাত্রার শব্দ যেমন মানুষ-কান শুনতে পায়ে না। তেমন উচ্চমাত্রার আলোও মানুষ চোখ দেখতে পায় না। দেখা গেলে ঝলসে যাবে কর্নিয়। কালের নিজস্ব একটা আলো আছে... তরল আলো। যেখানে যা হারিয়ে যায়, তারা খেলা করে, ভেসে বেড়ায় ওই আলোতে। ওখানে গ্র্যাভিটি শূন্য... ওখানে পাপবোধ শূন্য... নমস্কার!
(তারপর শুধু ওই কালো... অথবা আলো... যাই চিনে থাকো... তাই রইল... তাই থাকে... আর কিছু নেই)