বিস্মৃতির টোটকা

ইন্দ্রনীল বক্সী


স্কুলের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বাচ্চুর বেশ নামডাক । এর দুটো কারন মোটামুটি ১) বেশ মিশুকে ও পরপোকারী ২) প্রয়োজনে দারুন ঝাড়পিটে ওস্তাদ । তাই যা হয় , নিজের সেকশানের একদম ফার্স্টবেঞ্চাররা ছাড়া সবার প্রিয় হলেও অন্য সেকশানে , বিশেষ করে হিন্দি মিডিয়ামে ওর বেশ কিছু দুশমন আছে । ওর জন্যই তারা বিশেষ সুবিধে করতে পারেনা স্কুলে দাদাগিরি করার । তা তারাও তক্কে তক্কে থাকে সুযোগ বুঝে একা বাচ্চুকে পেলে তিন চারজন মিলে একটু ‘বানিয়ে’ দিতে । একদিন হলোকি বাচ্চু একাই ফিরছিলো আপন মনে গুন গুন করতে করতে । সঙ্গে যারা ছিলো তাদের বাড়ি চলে আসায় কিছুটা পথ একা বাচ্চুকে পেরোতে হয় । হঠাৎ কোথা থেকে হিন্দি মিডিয়ামের তিনচারজন ওকে ঘিরে ফেল্লো , একজন আচমকা পিছন থেকে ওর দুটো হাত মুড়িয়ে ধরলো , একজন সামনে এসে দাঁড়ালো, বাচ্চু চিনতে পারলো তাকে , মনোজ, ওর স্কুলে ওর জাত শুত্রু ,হিন্দি মিডিয়ামের ... “ কিরে ? খুব হিরো হয়েছিস শুনলাম ! ” বলেই মোক্ষম এক ঘুঁসি সপাটে ওর নাকে । অপ্রস্তত বাচ্চু কিছু বোঝার আগেই মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠলো , নাক দিয়ে হড় হড় করে রক্ত পড়তে লাগলো । রক্ত দেখে যারা একশান করতে এসেছিলো তারাই নার্ভাস হয়ে পড়লো । এদিকে সামনের এক কোয়ার্টারের কাকিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনাটা দেখছিলো তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন “ এই ... এতজন মিলে একজনকে মারছিস !!দাঁড়াতো ...” আগেই নার্ভাস একশান টিম বেগতিক দেখে পিঠটান দিলো । সেই কাকিমা বাচ্চুকে ধরে ঘরে নিয়ে এলেন , যতনা যন্ত্রনা হচ্ছিলো তার থেকে নিজের উপর রাগ হচ্ছিলো বাচ্চুর এভাবে মার খেলো বলে ... হাতটা যদি নাধরতো ... কাকিমা প্রথমে জল দিলেন নাক-মুখ ধোওয়ার জন্য বললেন “ নাকে জল টান , রক্ত বন্ধ হবে ...ইস কিভাবে মেরেছে দেখো !! এই তোর বাড়ি কোথায় ? ” বাচ্চুর কাছে জেনে বললেন “ঠিক আছে , একটু দাঁড়া , আগে রক্ত পড়া বন্ধ হোক ” জল টেনেও রক্ত বন্ধ হয়না ,অল্প অল্প আসছে তখনো । ভেতর থেকে এক বুড়ি ঠাকুমা এবার বেড়িয়ে এলেন , সম্ভবত কাকিমার শ্বাশুড়ি । বললেন “জলে বন্ধ হবেনা , ওরে একটু সরষের তেল দাও বৌমা , নাকে ঠানুক ...” সরষের তেল ! নাকে টানতে হবে ? শুনেই বাচ্চুর ব্যাথা বেড়ে গেলো । এলো সরষের তেল , ভয়ে ভয়ে নাকে টানতেই তীব্র জ্বলুনিতে বাচ্চু ছটফট করে উঠলো ......কিন্তু কি আশ্চর্য ! একটু পরেই নাক ফুলে মোচার মতো হয়ে গেলেও রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেলো !

তখন কালবৈশাখী বলে একটা ব্যাপার ছিলো । বৈশাখ মাস এলেই বাচ্চু ওদের কোয়ার্টারে জানালা দিয়ে দুপুরে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকতো , ঠিক সাড়ে তিনটে –চারটে নাগাদ দিগন্তে ঘনিয়ে আসতো মেঘ , থম মেরে থাকতো চরাচর কিছুক্ষন । তারপর শুরু হতো প্রবল শোঁ শোঁ শব্দ করে ঝড় , ঝড় কমে এলে নামতো বৃষ্টি । এই বৃষ্টিকেই বেশী ভয় বাচ্চুর , বেশীক্ষন চললে আজ আর মাঠে যাওয়া হবেনা , ফুটবল পন্ড । মুড খারাপ করে বসে থাকতো আর মায়ের দিয়ে যাওয়া আমপোড়ার সরবতে চুমুক দিতো । ওদের বাড়িতে এটাই নিয়ম , তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ আমপোড়ার সরবত দিত মা ,গ্রীষ্মে লু লাগবেনা - তাই , মাঝে মধ্যে স্কোয়াসের সরবত জুটতোনা এমন নয় । বৃষ্টি থামতেই ছুট্টে মাঠে , উদ্দাম ফুটবল । যারা ফুটবল খেলেছে ভিজে যাওয়া , কাদা মাঠে, তারা জানে বৃষ্টির পর মাঠে ফুটবলে কি আলাদা মজা । পাঁই পাঁই করে বল পায়ে ছুটছে বাচ্চু বিপক্ষের গোলের দিকে ...বাঁ দিক থেকে মনা এসে সাঁ করে স্লাইডিং ট্যাকেল করলো ... কাদায় এটা করতে বেশ সুবিধা । বাচ্চু ছিটকে পড়লো , ডান পায়ের চেটোতে জোর লেগেছে ।।তবু উঠে আবার খেলতে শুরু করলো । সন্ধ্যায় যখন বাড়ি এলো বাচ্চু তখন খোঁড়াচ্ছে ।
“ আবার আজকে পা ফুলিয়ে এসছিস ? ...বোস চূনহলুদ লাগিয়ে দি ...” বলে মা ভিতরে চলে গেলো । কিছুক্ষনের মধ্যেই এলো একটা তোবড়ানো হিন্ডেলিয়ামের বাটিতে চূন-হলুদের মিশ্রন , রংটা এখন মিশে গিয়ে কমলা হয়ে গেছে । আসতে আসতে মা লাগিয়ে দিতে লাগলেন আর ফুঁ দিতে লাগলেন । প্রথমে একটু ছ্যাঁকা লাগলো বাচ্চুর গরম চূনহলুদের প্রলেপ চামড়ায় পড়তেই , তারপর বেশ আরাম লাগতে লাগলো । পরদিন আবার যথারীতি মাঠে ...ফিট বাচ্চু ...
এরকম কত যে ম্যাজিক জানতো মায়েরা , ঠাকুমারা , কাকিমারা ! তার সব যে খুব স্বাদু বা আরামপ্রদ ছিলো এমন নয় । এই যেমন যেবার হুপেন কাশি হলো বাচ্চুর , বাবা পাশের পাড়ার ঘোষেদের বাগান থেকে নিয়ে এলো বাসক পাতা , মা তাতে তাল মিছরি , তেজপাতা আরো কি কি সব দিয়ে একটা পাঁচন বানালো , যেমন বিকট গন্ধ তেমন খেতে ! উফ ! একবার মুখে দিলে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসবে ,অন্তত ঘন্টা দুয়েক মুখ তেতো হয়ে থাকবেই । কিন্তু কাজ হবে অব্যার্থ ! অল্প সল্প খুসখুসে কাশিতে আদা দিয়ে চা ছিলো বরাদ্দ । এছাড়া ছিলো বিটনুন মাখানো রোদে শুকানো আমলকির টুকরো চুষে খাওয়া ।
একবার হলোকি বাচ্চুর সেকি হাল ! খালি পেট মুচড়ে উঠছে আর বড়বাইরে ছুটছে । দুদিন স্কুল কামাই , দুতিনদিন তেমন পাত্তা দিলোনা বাচ্চু , তিন দিনের দিন বেশ ভয় পেয়ে গেলো ,কারন এবার ব্যাথার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অল্প অল্প থক থকে রক্ত আসতে লাগলো । মাকে বল্লো , মা বল্লো “ সব্বোনাশ ! রক্ত আমাশা বাধিয়েছিস তো ! রোজ বলি ওই মন্টুর দোকানের বারোভাজা খাস না পই পই করে ...কে শোনে কার কথা ! এখন বোঝ কষ্ট ” বাচ্চু জানে যতই বলুক মা বোঝা-বুঝির যা মা-ই বুঝবে । শুরু হলো অখাদ্য পথ্য – পেঁপে-গাঁদাল পাতা দিয়ে পোনা মাছের ঝোল ! কি করে যে খায় মানুষে এসব ! মা বলে পেট ঠান্ডা হবে । সকালে একদম খালি পেটে উঠোনে ঝোপ হয়ে থাকা থানকুনি পাতার ঝাড় থেকে একগাদা তুলে এনে রোজ মা দিতে লাগলো আধকাপ করে থানকুনির রস , কষা –বিস্বাদ জিনিসটির স্বাদ বর্ধনের জন্য সামান্য এক চিমটে নুন মিশিয়ে । কোনোরকমে গলধঃকরন করেই এক গ্লাস জল খেতো বাচ্চু , কদিন চা বন্ধ সকালে । দিন সাতেক এভাবে চলার পর বাচ্চু একদম সুস্থ – কোনো ডাক্তার-বদ্যি , ট্যাবলেট-ক্যাপশুল ছাড়াই !
এরকম কত ঘরোয়া টোটকাইনা ছিলো , পাশের বাড়ির বুড়িদি একদিন চা করতে গিয়ে হাতে ফোসকা ফেল্লো , বুড়িদির মা বাচ্চুদের কোয়ার্টারের জবা গাছ থেকে জবা পাতা নিয়ে গিয়ে তাতে ঘি গরম করে লাগিয়ে চেপে ধরলেন ফোসকায় ,দিব্যি ফোসকা ম্যানেজ হলো । বুড়িদিও সেরে উঠলো । জবা গাছের কুঁড়িও মাঝে মাঝে নিয়ে যেতেন ১২ নম্বরের বোস কাকিমা তার বিবাহযোগ্যা মেয়ে মলিদির মাথায় বেটে লাগানোর জন্য ,তাতে নাকি চুল ভালো হয় । মলিদিকে কত্তদিন দেখেছে বাচ্চু দূধের সরের সঙ্গে হলুদবাটা মিশিয়ে হাতে মুখে মেখে বসে থাকতে , এতে চামড়া ফর্সা হয় এবং জ্বেল্লা বাড়ে । সেবার যখন কুঁচকি ফুলে ব্যাথা হলো , মা নিয়ে এলেন নুনের পুটুলি , কেরোসিন ল্যাম্প জ্বেলে তার মাথায় ধরে গরম করে সেঁক দিতে বললেন । বেশ আরাম হলো ।
জ্বর হলে বেশ মজা হতো বাচ্চুর । কেউ পড়তে বলবে না , সবাই বেশ কেয়ার নেবে , তখন জ্বর হলে রাতে পথ্য ছিলো নির্দিষ্ট – দূধ আর পাঁউরুটি । রোজ ভাত খেয়ে খেয়ে বোর বাচ্চু কদিন এই পাঁউরুটি খাওয়ার বরাতে বেশ মজাই পেত ।
একবার হলো কি ! ডালিমদের বাড়িতে বেল পারতে গিয়ে সে কি বিপত্তি ! একটা আস্ত বেল কাঁটা প্যাঁক করে বিঁধে গেলো বাচ্চুর গোরালিতে ! উফ কি যন্ত্রনা । খালি পায়ে খেলতে গিয়ে কতইনা কাঁটা ফোটে ও সেফটি পিন দিয়ে বের করে ফ্যালে , কিন্তু বেল কাঁটা বের করে নিলেও ব্যাথা কমে না । শেষে সেই মায়ের শরনাপন্ন । মা প্রদীপের সলতে পুড়িয়ে কাঁটা ফোটার জায়গায় দিতে লাগলেন । একদিনেই ব্যাথা কমে গেলো ।
বাড়ি শুদ্ধু চিকেন পক্স আক্রান্ত । বাবা-মা –বাচ্চু কেউ বাদ নেই । পনেরো দিনের ধাক্কা কম করে । বিছানায় নিম পাতা ছড়ানো ,তার উপরেই শুতে হয়ে , আমীষ খাওয়া বন্ধ । সবার আগে বাচ্চুর পক্স শুকোতে লাগলো , এবার মারাত্মক চুলকানোর পালা । কিন্তু যতই সুর সুর করুক , চুলকানো মানা । একগুচ্ছ নিমের ঝাড় দিয়ে শুধু গায় বুলোনোর পারমিশন পাওয়া গেছে । পক্স আর নিমপাতা ছিলো অবিচ্ছেদ্য । যেমন জন্ডিসে বরাদ্দ ছিলো অরহড় পাতা জলে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে খাওয়া । কমলজ্যেঠুর ছিলো হাই ব্লাডপ্রেসার , তিনি রোজ সজনে পাতা ফুটিয়ে তার জল খেতেন – এতে নাকি ব্লাডপ্রেসার নিয়ন্ত্রনে থাকে ।
বাচ্চু যখন একদম ছোট্টটি তখন ওর মা তেলের প্রদীপের শিখায় কাজল লতা ধরতেন , ধীরে ধীরে প্রদীপের কালি জমে উঠতো কাজললতায় , সেটাই হতো কাজল । নিজেও পড়তেন মাঝে মধ্যে প্রসাধনের সঙ্গে আর ছেলেকেও পড়াতেন টেনে টেনে । চোখ বড় বড় হবে , ভালো থাকবে , সঙ্গে কপালে একধারে কাজলের টিপ দিয়ে কড়ি আঙুলে আলতো কামড়ে তিন বার থু থু করতেন বিকেলে পাড়ায় বাচ্চুকে খেলতে পাঠানোর আগে – এতে নজর লাগেনা ।
নজর লাগা কত জরুরী মা জানতেন না । কিন্তু বাচ্চুর মায়ের মতো তখন সব গেরস্থ মা-ই কতশত ঘরোয়া টোটকাইনা জানতেন ! মাঝে মাঝে বেশী টোটকা নির্ভরতা যে বিপদ ডেকে আনতো না এমন নয় ,কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেসব ছিলো চটজলদি ঘরোয়া সফল ফার্স্ট এইড । এখন এসব করতে বললে পাব্লিক হেসেই খুন হবে ,নয়তো গাঁইয়া বলে গাল পারবে ! কিন্তু এসব ছিলো , বেশ জোরালো ভাবেই ছিলো । এখন কেনা বহুজাতিক ‘স্মাজ ফ্রি’কাজলের ভিড়ে কোথায় হারিয়ে গেছে সেই হোম মেড কাজল , নেই সেই কাজললতাও । বাসকপাতা খাওয়াই ছেলে-মেয়েদের এখনও , নাজেনেই ‘সার্ভিল’ কাফ সিরাপের সুদর্শন বোতল জাত করে । গুচ্ছের এন্টিবায়োটিকের দাপটে ঘরোয়া টোটকা এখন ‘ আন হাইজেনিক’ । আজকাল আমরা গরুর দুধ খাইনা ! খাই সাইকেলের দুধ ! সে দুধে যে সরই পড়েনা ! রামদেববাবার ‘পতঞ্জলি’ দোকান থেকে কিনে আনি রেডি ‘এলোভেরা জুস’ । ঘৃতকুমারীকে এখন সবাই ‘এলোভেরা’ নামেই ডাকে যে !
নাঃ এখন আর বাচ্চু মাঠে খেলতে যায়না । বাচ্চুরা এখন অফিস যায় , দোকান খোলে । মায়ের এত চেষ্টার পরেও কখন যেন বাচ্চুর শৈশবে-কৈশোরে ‘নজর’ লেগে গেলো কার ! এখন আর টানা বৃষ্টি বন্ধ করতে বন্ধুরা মিলে ব্যাঙ মেরে মাটিতে পোঁতে না ওরা । দুই শালিক –এক শালিক দেখার ত্বত্তও ভুলে গেছে কবে । খেলতে নামার আগে মাঠ ছুঁইয়ে প্রনাম করেনা ও , কিন্তু বাড়ি থেকে বেরনো সময় অভ্যাসে কপালে হাত ছোঁয়ায় , কার উদ্দ্যেশে ! ...জানে না । মা-কাকিমাদের সেসব ম্যাজিক সব এখন মহেঞ্জদারো ।
সেদিন হঠাৎ আবার চমকে উঠলো ,যখন শুনতে পেলো ওর ৬ বছরের ছেলেকে ছেলের মা বলছে “ এই ! ভালো করে হাত ধুয়ে আয় ...নাহলে রাতে খারাপ স্বপ্ন দেখবি ... ” মনে হলো কিছু ম্যাজিক এখন রয়ে গেছে জ্বর গায় কপালে জলপট্টির মতো ...