ছাদনামা

স্বদেশ মিশ্র


নিসর্গ বদলে যেতো দরজা পেরোলেই, কার্ণিশ ঘেরা অনন্ত, পারাবার। সমস্ত ছাদ টা নিজেই একটা সিনেমার মত । অথচ সব শো-ই শেষ হয় । বাড়ি বেচে নাকের তেল কিনে হাওয়া হয়ে যায় মালিক । প্রোমোটার দখল নেয় ছাদ সমেত পুরো বাড়ির । এরপর ছাদের দরজায় তালা পড়ে যায় কারণ আমি একবার প্রোমোটারেরদারোয়ান কে একপ্রকার পয়সার লোভ দেখিয়েছাদ অবধি ওঠার চেষ্টা করেছি ।
কোলকাতার অসংখ্য ছাদ আছে, বহু ছাদে স্যাটেলাইট টিভির ডিশ বসানো । কোনো কোনোছাদে অনেকগুলো । সেই সময় অনেক কেব্‌ল্‌ এর তার যেতো ওই ছাদ এর ওপর দিয়ে ।
যেভাবে রোদ্দুর বদলে যায় । শুকনো পাতার ভেতর দিয়ে চলাচল শ্যাওলা জগতের ।
রাত এগারোটার পর অনেকে আসতো মনে হয়,যাদের কাউকে দেখা যেতনা । এখন ছাদ টাকেই আর দেখা যায়না । এই ভাবে কোলকাতার যাবতীয় ছাদ গায়েব হয়ে যাওয়া কে আটকে দেওয়া কারোর পক্ষেই সম্ভব নয় । বিশ্বাস দা-র ফ্ল্যাট এর ছাদে গেলে নীচে সন্তোষপুরের অনেক দূর দেখা যেত, হাইল্যান্ড পার্ক এর টাওয়ার । বিশ্বাস দা এখন ওই ছাদেইসারাক্ষণ বসে থাকে, ডার্ক সাইড অফ্‌ দ্য মুন চলতেই থাকে, ক্যাপ্সটান খায়, একটার পর একটা, এখন আর ক্যাপ্সটান কোনো দোকানে রাখতে দেখিনা, এছাড়া আমার সাথে আর যোগাযোগ ও হয়নি বিশ্বাস দা-র ।
পাহাড়ে গেলে ওপরের ধাপ থেকে নীচের ধাপের সমস্ত ছাদ দেখতে পাওয়া যায় । অধিকাংশ ছাদেইকমপক্ষে তিন চারটে করে জলের কালো ট্যাঙ্ক রাখা থাকে যার মধ্যে একটা বা দুটো তে বর্ষার সময় স্টোর্‌ড্‌ হয় বৃষ্টি । অনেক বাড়িতে ছাদথাকেনা, করোগেটেডশীট বা টিন দিয়ে ঢাকা থাকে ।
ওই ছাদ এ যে টব গুলো থাকতো সেগুলো আমরা নতুন বাড়ি তে নিয়ে এসেছিলাম । একটা টব ছাদ থেকে নামাবার সময় সিঁড়ি তে পড়ে ভেঙে গেছিলো । আসলে সমস্ত মাটি সে সময় সরে যাচ্ছিলো । তাই সারা ঘরময় ছাদের টবের মাটি ছড়িয়ে যাওয়া কে সহজে মেনে নেওয়া গেছিলো । যখন অনেক ছোট ছিলাম, ছাদ থেকে রাস্তায় বল পড়ে গেলে , রাস্তা দিয়ে যেতে থাকা মানুষ দের বলতাম , বল টা ফের ছাদে ছুড়ে দিতে, অনেকে নিজের থ্রোয়িংস্কিল প্রমাণ করার চেষ্টা করতো, অনেকে পাত্তাই দিত না । বাড়ির মালিকের ড্রাইভারদলুই (চামচে) থাকতো চিলছাদের ঘরে । আমাদের ছাদের ফুটবল বা ক্রিকেটে তার অস্থিমজ্জায় বাতের ব্যাথা বাড়তো কারণ আমরা নিয়মিত ছাদে গেলে সে ছাদ টা কে নোংরা করতে পারতো না , অন্যথায়, মাছের কাঁটা, ডাঁটার ছিবড়ে, নানা উচ্ছিষ্ট ফেলে ছাদ নোংরা করার সুযোগ খুঁজতো । মালিক কে সে গিয়ে লাগান-ভাজান করতো । একদিন বলেছিলো আমাদের ছাদে উঠতে দেবেনা, তালা মেরে দেবে, উত্তরে আমার মা দলুই কে বলেছিলোবাড়ির মেইন গেটে তালা মেরে দেবে, দলুই দের কাউকে বাড়ির মেইনএন্ট্রান্স দিয়েই ঢুকতে দেবেনা । তখন অন্য সিঁড়ি বানিয়ে দোতলা পেরিয়ে ছাদে উঠতে হবে ওদের । এই কথার পর দলুই আর উচ্চ্যবাচ্যকরেনি । বাড়ি বিক্রি হবার সময় এই দলুই কে বাড়ির মালিক কেয়ারটেকার হিসেবে দেখিয়ে প্রোমোটার দের থেকে অনেক টাকা পাইয়ে দেয় । টাকা পাবার এক সপ্তাহের ভেতর জানা যায় দলুই এর নাকে ক্যান্সার, কেবলই রক্তের দমক, বাঁচার চান্সছিলোনা, দলুই এর গ্রাম ছিলোকাঁথি বা এগ্‌রার কাছে ।

যে ছাদ টা এখন নেই সেটা একসময় আমার জাহাজ হয়ে যেতো । জামাকাপড় মেলার তার গুলো টেনে ভাবতামসিন্দ্‌বাদ । অদৃশ্য মাস্তুল কেবল ভিজে চলতো বৃষ্টি তে । শিল পড়লে সাদা হয়ে যেতো সব । একটা মেয়ে কে খুব কাছ থেকে দেখতে কেমন লাগে জানিয়েদেবার এক বছরের মধ্যেধুলো হয়ে গেলো সমস্ত টা । এখন আমার কোনো ছাদে যেতেই ইচ্ছে হয়না । দার্জিলিং গেলে ঢালের বাড়ির ছাদ গুলো দেখে আজব লাগে । অথবা অনেকের মুখে শোনা দিল্লীর মত, এক ছাদ থেকে আরেক, পরপর অনেকঅনেকছাদ, হাওয়া নিয়ে উধাও, উড়বার ভান ছেড়ে ঘুড়ির গোঁত্তা খেতে থাকা ।