হলুদ মায়া

রাজর্ষি মজুমদার


প্রথম কথাগুলো একদা অন্ধকারের। যা বাড়লে ভয় হতো, পড়া ছুটিতে যেত খানিকক্ষণ ... তখনও ঝিঁ ঝিঁ, ভাড়াবাড়ির ছোটবেলা আমায় জড়িয়ে। দালানের ফাটা ফাটা মেঝে , টিনের টঙের পাশের ছাদ আর দেখা যেতোনা সন্ধ্যের পর। বারান্দায় বসে পড়া করতাম আমি , সেখানেই তার সাথে পরিচয় আর কিছুদিন পরেই সম্পর্ক খারাপ হওয়া। মফঃস্বলের লোডশেডিং, সেই হঠাৎকালো - যার বয়স বেশি নয় একশোর হিসেবে ধরলে। আমার এককালে রোজ শুনতে পাওয়া অনেক শব্দ তার সাথে ছিল ... আজকাল হারাতে হারাতে অনেকেটাই একা হয়ে গেছে।
আর প্রায় হারিয়ে গিয়ে নেই হয়ে গেছে মিঠে আলোর হ্যারিকেন, তার কেরোসিনের গন্ধ ও পোকাটোকা সমেত।
অনেক দূরের থেকে দেখি সেই হলুদ সময়টাকে। অন্ধকার চুঁইয়ে আসা গরম আলোগুলোর থেকে, শুনতে পাই পড়া শুরু করবার ডাক। আরও ছোটোবেলার কথা মনে করলে বলব , সেই মায়ের কোল থেকে দেখা কাঁচের মধ্যেকার আলো। কোনো একদিন যেটাকে ধরতে গিয়ে হাত পুড়িয়েছিলাম। আলু থেঁতো করে লাগিয়েছিল কেউ। তার পর থেকে হ্যারিকেনের সাথে সম্পর্ক খারাপ না হয়েও দুরত্ব বেড়ে গেছল।
দুরত্ব একেবারে ঘোচে গল্পের বই পড়তে শেখার পর। ওই আলোর জাদুবাস্তবতা আমায় যা ইচ্ছে ভাবতে দিত , আমিও দিল খুলে কল্পনা করতাম খুব।হ্যারিকেন সেই অন্য জগতের সাথে আমার যোগ। যাকে আমি আলোর শেষ টুকুতে দেখতে পেতাম ; অন্ধকারের ঠিক আগেই। তখনও আমি বিখ্যাত কিশোর ক্লাসিকগুলো পড়িনি। উপেন্দ্রকিশোর তার বাঘ, শেয়াল, গরিব চাষাগুলোকে নিয়ে ঐ প্রচ্ছায়ায় ভেসে থাকতেন। আর থাকতেন নন্দলাল। সেই সহজ পাঠের ছবিগুলো অন্ধকারের দিকে ফুটে উঠত। আর আমাদের ছাদ পেরিয়ে সেগুন গাছগুলোর দিকে ছড়াত মিঠে আলো। দূরে দেখা যেতো রাইদের বাড়িতে জেনারেটার চলছে। মজায় পেয়ে বসত আমায়, আগুন উস্কে দিতাম আর ভুষোকালি ভর্তি হয়ে আসত কাঁচে। এরকম বুদবুদে, সময় আমাকে আটকে রাখত রহস্যময়তায়। যা আমায় নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল।
আমার বাড়ির পাশের নদীর নাম ছিল শিলাবতী। ঢঙের নাম নয়। কিন্তু সে তাতেই কাজ চালিয়ে নিত। রাত্রে আমি নদী দেখার জন্যে হ্যারিকেন নিয়ে জানালায় বসে থাকতাম , সেই আলো নদী অবধি পোঁছত না। দেখতে পেতাম ওপারে তখনো কারেন্ট , হলুদ ডুম ঝুলছে জোনাকির মতন। দু একটা জেলে ডিঙি চলে যাচ্ছে, তাদের খোলায় কুপি জ্বালিয়ে।
বড় মামীমা মাঝে মাঝেই সন্ধ্যেবেলায় আসতো। আর সেসময় লোডশেডিং হলেই আমি গান শোনার বায়না করতাম। মা হ্যারিকেন রেখে রান্না করতে চলে যেতো। মামীমা আমায় শোনাত " ওরে নীল যমুনার জল... "। যমুনা দেখিনি তখনও , শ্যামকেও শুধুই ছবিতে। বিরহ না বুঝলেও চুপচাপ শুনতাম। গুমরে গুমরে কষ্ট আসতো বুকে। আসলে ওই আলো, ওই বারান্দাখানা, মামীমার দরদ ভরা গলা - গানকে চিরন্তন করে গেছে।
সেটা এক নওজোয়ান সময়। আমার রবিবার আটকে থাকত চুল কাটা , শক্তিমান আর মাংস ভাতে। দুপুরের ঘুম থেকে উঠে দেখতাম বাবা হ্যারিকেন পরিষ্কার করছে, নরম ন্যেকড়ায় আলতো করে মুছে নিচ্ছে কাঁচগুলো। তারপর নতুন সাদা সাদা ফিতে পরিয়ে দিচ্ছে অদের। ওরাও এক মনে নীল কেরোসিন খেয়ে নিচ্ছে চুঙি দিয়ে। তখন আমাদের বাড়িতে ক্যামেরা ছিলোনা কোনো , তবু ঠিক মনে রয়ে গেছে সার দিয়ে দাঁড় করান চারটে সাজু গুজু করা হ্যারিকেনের ছবি।
একদিন মা বাবা দুম করে ট্রানস্ফার হয়ে গেলো জেলা শহরে। সেখানে লোডশেডিং কম। বান্ধবী নেই, আর নদীও অনেক দূরে। প্রথমে পোর্টেবেল চার্জার আর আরো কিছু পরে ইনভার্টার কোথায় হারিয়ে দিলো আমার দিলরুবা হ্যারিকেনকে। শেষ দেখা হয়েছিল একবছর আগে ভাঙ্গা জিনিসেপত্রের মাঝখানে। আমিও তাড়ায় ছিলাম, কথা হয়নি ...
কথায় কথায় আমার কয়েক দিন আগের স্বপ্নটা বলে রাখা ভালো - শুধু হ্যারিকেন নয় দেখলাম দূরের সমুদ্রতট আমার অনুভবে এলো, হাতের সামনের বই রহস্য ছড়াচ্ছে চারদিকে। আর সেই থেকে হলুদ মায়ায় ভরে আছি আমি।