হারিয়ে যাওয়া রঙ্গমঞ্চ

বিমোচন ভট্টাচার্য


অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে জীবন থেকে , অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে আমার শহর
থেকে । তাদের জন্যে আমার মন কেমন করে । হাজার চেষ্টা করলেও আর ফিরে আসবে
না সেই সব জিনিস , ঘটনা , মানুষজন ।
আমি আমার শহরে যা সবচেয়ে বেশী মিস করি তা হল পাবলিক থিয়েটার , বাংলায় যা
পেশাদার রঙ্গমঞ্চ । সত্তরের দশকের গোড়ার দিকেও যা রমরমিয়ে চলতো কলকাতায় ।
আমার পেশাদার রঙ্গমঞ্চ এবং সেখানে অভিনীত নাটক দেখা শুরু ১৯৫৮ সালে ।
হাওড়ার ভাড়াবাড়ী ছেড়ে আমরা এসে উঠলাম একেবারে বিশ্বরূপা থিয়েটারের ভেতরে
। বিশ্বরূপা থিয়েটার দিয়েই যাতায়াত করতে হত আমাদের । আমাদের আগে সেই
বাড়িটিতে থাকতেন নাট্টাচার্য । শিশির কুমার । বিশ্বরূপার আগের নাম ছিল
শ্রীরঙ্গম । সেই রঙ্গমঞ্চে নাটক করতেন শিশির কুমার স্বয়ং ।
আমরা যখন বিশ্বরূপায় এলাম তখন সেখানে অভিনীত হচ্ছে বাংলা পেশাদারী
থিয়েটারের সর্বকালের সফলতম নাটকের একটি । "ক্ষুধা" ছিল সেই নাটকের নাম ।
প্রত্যেক সপ্তাহে মোট চারটি অভিনয় হত এই সব নাটকের । বৃহস্পতিবার এবং
শনিবার সন্ধে সাড়ে ছটায় একটি করে এবং রবিবার ডবল শো । সরকারী ছুটির দিনেও
দুটি করে শো হত । মোট চারটি রঙ্গালয় ছিল কলকাতায় তখন । বিশ্বরূপা , স্টার
, রংমহল এবং মিনার্ভা । পরে আরো কয়েকটি যোগ হয় , রঙ্গনা , বিজন থিয়েটার ,
সারকারিনা, কাশী বিস্বনাথ মঞ্চ ।
ক্ষুধাতে অভিনয় করতেন নরেশ মিত্র , শান্তি গুপ্তা , কালী ব্যানারজী ,
তরুন কুমার , বসন্ত চৌধুরী , তপতী ঘোষ । অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন তারা । আমি
রবিবারের সকালে দেখেছি গ্রাম থেকে সপরিবারে দর্শক এসে অগ্রীম টিকিট কেটে
অপেক্ষা করছেন দুপুরের শো দেখবেন বলে ।
সেই সময় স্টারে অভিনীত হত শ্যামলী , তাতে উত্তমকুমার অভিনয় করতেন । কয়েক
বছর পরে মিনার্ভায় উৎপল দত্ত শুরু করলেন নাটক "কল্লোল" বিশ্বরুপায় শুরু
হল "সেতু" । দুটি নাটকেই আলোর যাদু দেখালেন আলোর যাদুকর তাপস সেন । প্রথম
নাটকটিতে কয়লাখনিতে জল ঢুকিয়েছিলেন মঞ্চে, আর দ্বিতীয় টি তে মঞ্চে ট্রেন
এনেছিলেন।
কি এমন ছিল পেশাদারী মঞ্চে ? মহিলা অভিনেত্রীদের ছোটরা ডাকতেন মা বলে ,
প্রভা মা , আঙ্গুর মা , ইন্দু মা , সরজু মা । আমার নিজের দেখা সেই
অন্তরঙ্গ পরিবেশ । এটা পাল্টিয়ে গেল যখন তৃপ্তি মিত্র এলেন সেতু নাটকে
অভিনয় করতে। ম্যাডাম ডাক চালু হল ।
নতুন নাটক যখন পড়া হত আগের নাটকের সবাই গোল হয়ে বসতেন । নাটক পড়া হয়ে
গেলে পরিচালক বলে দিতেন কোন চরিত্রের জন্যে কাকে ভাবা হয়েছে । দেখা যেত
কেউ কেউ বাদ পড়েছেন । থিয়েটার এর টাকাটাই তাঁদের স্থায়ি রোজগার ছিল । ফলে
বেকার হয়ে যাবার ভয়ে নাট্যকারের কাছে ছুটতেন তাঁরা ।নাট্যকার লিখেও দিতেন
কোন ছোট চরিত্র। ব্যাস , অন্তত এক দু বছরের জন্যে নিশ্চিন্ত হতেন তাঁরা।
বড় ভাল ছিল সেই পরিবেশ । একেবারে শৈশব থেকে কৈশোরের শেষ অবধি ভেতর থেকে
দেখেছি রোজ । দেখেছি একেবারে ছোট বেলায় অহিন্দ্র চৌধুরী কে সাজাহান করতে
। দেখেছি ছবি বিশ্বাস অভিনয় করছেন । দেখেছি সরজুবালাকে । ওই ছোট্ট খাট্টো
চেহারায় কি অসম্ভব দাপট নিয়ে অভিনয় করতেন তিনি । আর কি কন্ঠস্বর ছিল !
কোন প্রথিতযশা অভিনেতা / অভিনেত্রী প্রয়াত হলে সেইদিন অভিনয় বন্ধ থাকতো ।
শুনেছি এই প্রথা শ্রীরঙ্গমে চালু করেছিলেন শিশির কুমার । প্রভা দেবীর
প্রয়াণে । সেই দিন একটি ব্ল্যাকবোর্ড এর ওপর শিশির কুমার নিজের হাতে
লেখেন শো বন্ধ হবার কথা ।
আমি পরে সেই ব্লাকবোর্ড দেখেছি , দেখেছি তাতে কেউ প্রয়াত হলে আমার
পিতৃদেবকে সেই ব্ল্যাকবোর্ড এ লিখতে । তখন কোন অভিনেতা/অভিনত্রী মারা
গেলেই তাঁর পার্থিব শরীর থিয়েটারে থিয়েটারে ঘোরানো হত। একটা লরীর ওপরে
তাদের দেহ রাখা হত। থিয়েটারের হেড দারোয়ান সিপাই সিং একটা মালা কিনে এনে
ডাকতেন বাবাকে। বাবা গিয়ে সেই মালা বিশ্বরুপা থিয়েটারের পক্ষ থেকে দিতেন
সেই প্রয়াত মানুষ টিকে। একদিন বাবা এইরকম মালা দিয়ে ফিরে এসে কেঁদে
ফেললেন। প্রিয় পাঠক, আমি আমার বাবার চোখে সেই একবারই জল দেখেছি সারা
জীবনে। মা জিজ্ঞাশা করলেন - কে গেল? তুমি কাঁদছো? বাবা ভাংগা গলায় উত্তর
দিলেন - রানী চলে গেল।
প্রিয় পাঠক, রানীবালা কে মনে আছে আপনাদের? সত্যজিত বাবুর "পরশ পাথর"
চলচিত্রে তুলসী চক্রবর্তীর স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যিনি তিনিই
রানীবালা।বাবা,মার কাছে শুনেছি অসম্ভব সুন্দরী ছিলেন রানীবালা।নাচে, গানে
এবং অবশ্যই অভিনয়ে মাতিয়ে রাখতেন এক সময়ের পেশাদারী থিয়েটার। বাবা সেদিন
বলেছিলেন- রানীবালা মারা গেল একটা মানুষ ও জানতে পারলো না। এক সময় শুধু
রানীকে দেখবে বলেই টিকিট কেটে আসতো দর্শক।

এই সুযোগে একজনের কথা বলে নিই, কেউ তো বলেন বা তার কথা। লীলাবতী
করালী।প্রিয় পাঠক, ভ্রান্তিবিলাশ চলচ্চিত্রটি দেখেছেন ? এই ছবিতে
সাবিত্রী-উত্তম এর বাড়ির কাজের মহিলা। যদি কোনদিন আবার দেখেন
ভ্রান্তিবিলাস, লীলাবতী করালী কে দেখুন, অসাধারন কথাটি এখন বহু ব্যবহারে
জীর্ণ, কিন্তু সত্যি সত্যি অসাধারন অভিনেত্রী ছিলেন লীলাবতী করালী,
আমাদের করালী পিসি, আমি নিজে দেখেছি অনেক নামকরা অভিনেতা/ অভিনেত্রী
করালী পিসিকে ভয় পেতেন । থিয়েটারে করালী পিসিকে আমি করতে দেখেছি
আলিবাবায়"আবদাল্লা" , কুচকুচে কালো ছিলেন, মেক-আপ এর প্রয়োজন হত না । নাচে
গানে একাই টেনে নিয়ে যেতেন নাটক। সমসাময়িক সব নাটক মুখস্ত থাকতো করালী
পিসির,তার কারন সোম একবার আমার মনে আছে সাজাহান নাটকে শেষ মুহূর্তে
সরযুবালা দেবী অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তিনি করতেন জাহানারা, দরবারে যখন
বলতেন"আবার বলি ঔরংজেব-চমৎকার। হাততালি তে ফেটে পড়তো হল, তিন বার বলতেন,
তিনবার তিন রকম করে। কানু বন্দ্যোপাধ্যায় করবেন ঔরংজেব, হন্তদন্ত হয়ে
বাড়িতে এসে বাবাকে বললেন সরযুবালার অসুস্থতার কথা।বাবা একটুও না ভেবে
বললেন করালীকে ডাক। কাছেই থাকতেন, করালী পিসি এলেন, শুনলেন, নেমে পড়লেন
এবং বিশ্বাস করুন তুমুল হাততালি পেলেন ওই জায়গায়। তিনবারই।বাংলা থিয়েটার
মনে রাখেনি পাবলিক থিয়েটারকে, মনে রাখেনি সেই সব নাটক,মনে রাখেনি পাবলিক
থিয়েটারে ঘটে যাওয়া অজস্র ঐতিহাসিক ঘটনাকে, সেখানে কে আর মনে রাখবে
লীলাবতী করালীকে।

মিউজিক ছিল লাইভ । সারাক্ষন মিউজিসিয়ানরা বসে থাকতেন । শিফটাররা থাকতেন ।
পরের দৃশ্য সাজিয়ে রাখতেন । ড্রেসার থাকতো। দৃশ্য যখন ঘুরতো তখনো লাইভ
মিউজিক বাজতো । আর এরা সবাই ছিলেন মাস মাইনের কর্মচারী।কত কত নামীদামী
মানুষ আসতেন নাটক দেখতে ।আমার বাবা পেতেন ১০ টাকা রয়্যালটি হিসেবে প্রতি
শো এর জন্যে। মাসে মোটামুটি কমবেশী ২০০ টাকা । তার মধ্যে ১১০ টাকা বাড়ি
ভাড়া হিসেবে কেটে নেওয়া হত।

শিবরাত্রীর দিনে কম্বিনেশন নাইট হত সারা রাত ধরে । কে অভিনয় করতেন না সেই
সব নাটকে । সেই সবনিয়ে জমজমাট ছিল পেশাদার থিয়েটার ।
কিন্তু আর বেশীদিন থাকলো না সেই থিয়েটার । অনেক কারন ছিল তার । যে সব
দর্শকেরা গ্রাম থেকে আসতেন কলকাতায় , তারা সেই সব নাটক গ্রামে বসে দেখতে
শুরু করলেন 'ওয়ান ওয়াল’ নাটকের সুবাদে । স্টারেরা যেতে শুরু করলেন গ্রামে
। টেলিভিশন এসে গেল । ভাঙতে শুরু করল পাব্লিক থিয়েটার । এক এক করে আগুন
লাগলো বিশ্বরূপায় , স্টারে । ভস্মিভূত হল পেশাদার নাটকের বাসভুমি । রঙমহল
ভাড়া দেওয়া শুরু হল বিয়েবাড়ির জন্য । যে সব প্রেক্ষাগৃহ একদিন দেখেছে
বাংলার দিকপাল অভিনেতা/অভিনেত্রীদের অনায়াস বিচরন , সেগুলি কে দেখে মনে
হতে লাগলো পোড়ো বাড়ি ।
হারিয়ে গেল পেশাদার থিয়েটার । অবলুপ্ত হল বাংলা থিয়েটারের এক অমুল্য
ঐতিহ্য । যে কালজয়ী নাটকগুলি অভিনীত হত সেখানে সেইগুলি রয়ে গেছে পুস্তক
আকারে কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই সব মঞ্চগুলি । কোন কোন মঞ্চ আছে নব কলেবরে
। কিন্তু সেই জৌলুশ নেই ।
যে মঞ্চগুলি তে একদিন দাপিয়ে অভিনয় করেছেন গিরীশ ঘোষ , তার সুযোগ্য পুত্র
দানী ঘোষ , যোগেশ চৌধুরী , আচার্য মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য , অহিন্দ্র চৌধুরী
, দুর্গাদাস বন্দোপাধ্যায় , ছবি বিশ্বাস , কানু বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু
করে উৎপল দত্ত , অজিতেশ বন্দোপাধ্যায় , আবার প্রভা দেবী , ইন্দু বালা ,
আঙুরবালা , সরযুবালা , শান্তি গুপ্তা থেকে কেয়া চক্রবর্তী , মায়া ঘোষ ,
অবধি সবাই , তা আর নেই , কোথাও নেই । চলে গেছেন কালের গহ্বরে ।


আমার পিতৃদেব প্রয়াত নাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচার্য একটি নাটক লিখেছিলেন ।
নাম সরীসৃপ ।যখন চিত্ত রঞ্জন এভিনিউ নির্মিত হচ্ছে ( তখন বলা হত নতুন
রাস্তা) তখন বিডন স্ত্রীট এ একটি পেশাদার মঞ্চ ও ভেঙে ফেলা হয় । তাই
নিয়েই নাটক । নাটক টি রেডিওতে অভিনীত হয় । অভিনয় করেছিলেন সরজুবালা দেবি
, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় , কানু বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ । এরপর শ্রীমতী তৃপ্তি
মিত্র "আরদ্ধ" নাট্টগোষ্ঠির থেকে অনেক বার এই নাটক টি অভিনয় করেন কিন্তু
আমার জানা নেই কেউ এই পেশাদার নাট্ট মঞ্চগুলি নিয়ে কোন নাটক বা অন্য
কিছু লিখেছেন বলে ।

বাংলা নাট্য জগত মনে রাখেনি পাবলিক থিয়েটারকে, মনে রাখেনি সেই সব
নাটক,মনে রাখেনি পাবলিক থিয়েটারে ঘটে যাওয়া অজস্র ঐতিহাসিক ঘটনাকে,
সেখানে কে আর মনে রাখবে লীলাবতী করালীকে। আমি সুযোগ পেলাম, চেষ্টা করালাম
কিছু লেখার।

এখনো আমার বয়েসী প্রথম ষাটের বা আরো বেশী বয়েসের কেউ ওই মঞ্চগুলির পাশ
দিয়ে যেতে গেলে দু দন্ড থমকে দাঁড়ায় । মনে পড়ে কালী ব্যানারজীর সংলাপ
শুনে হাততালিতে ফেটে পড়ছে প্রেক্ষাগৃহ । চন্দ্রগুপ্ত নাটকে "ভিক্ষুক বেশী
কৃষ্নচন্দ্র দে কন্ঠে "ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে" শুনে দর্শক সমস্বরে
চিৎকার করছে "এনকোর, এনকোর “ ।প্রভা দেবী সীতা সেজে মুগ্ধ করছেন সাধারন
দর্শকদের। পেশাদার রঙ্গমঞ্চের দরশকদের। যে দর্শকেরা সকাল থেকে চিঁড়ে মুড়ি
বেঁধে সকাল বেলা চলে আসতেন শুধু নাটক দেখবেন বলে।
হারিয়ে গেল । মুছে গেল । অবলুপ্ত হল বাংলা পেশাদার থিয়েটার । শুধু আমাদের
মত কয়েকজন যাদের রক্তে পাবলিক থিয়েটার , যে থিয়েটারে নাটক লিখে , অভিনয়
করে আমাদের আট ভাইবোন কে লেখাপড়া শিখিয়েছেন , মানুষ করেছেন আমার বাবা,
তারা মনে মনে আজও গুনগুন করেন ওই থিয়েটারেরই অতি বিখ্যাত একটি গান-
"অতীত দিনের স্মৃতি
কেউ ভোলে না কেউ ভোলে
কেউ দুঃখ লয়ে কাঁদে
কেউ ভুলিতে গায় গীতি.....”