নৃত্যেরও তালে তালে হে নটরাজ

সৌরাংশু


গুণধর সহিসকে চেনেন? অবশ্য গুণধর সহিস তো বিশাল কেউকেটা নয়। নিদেন পক্ষে হাঁড়িরাম কালিন্দী? তার উপর তো তথ্যচিত্রও হয়েছে। চারবারের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্দেশকের ছবিতেও দেখা টেখা গেছে।
আরণ্যক নিশ্চয় পড়েছেন? বাংলা গদ্যসাহিত্যের সাবলীলতম উপাখ্যান? বাঘবাহাদুর দেখেছেন? আহাহা এতোগুলো প্রশ্ন করলে চলবে কি করে? একে সারাদিনের কাজের শেষে এসে ল্যাপটপটা টেনে বসেছেন। পত্রিকাটির আনাচে কানাচে পড়তে গিয়ে আমার সৌভাগ্যক্রমে এই লেখাটায় চোখ আটকেছে।
কিন্তু শুরুতেই এত প্রশ্ন? তাহলে তো পলায়ন করতেই হয়। আসলে আমাদের নিশ্চিন্ত জীবনে দু একটা ঢিল না পড়লে তো ঢেউ ওঠে না। কিন্তু ঢেউ তো ডুবিয়ে দিতেই পারে। তাই বাপু পাড়ে বসে জীবন কাটাই। কি নেই তার হরিকীর্তন করে কি হবে? সেই রামও নেই আর লঙ্কাও নেই, সেই শাজাহান নেই আর সাম্রাজ্যও নেই, সেই গ্রামাফোন নেই আর নেই এলপিও, সেইরেডিও আর যুববাণী-গল্প দাদুর আসরও নেই। তা নেই তো নেই! করব কি? গুণধর সহিস আছে, আরণ্যক আছে, বাঘ বাহাদুর আছে আর বুদ্ধদেব দাসগুপ্তও আছে। খালি আমাদের তুলে নেবার অপেক্ষায়।
তা বাঘবাহাদুর আর বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত না হয় বোঝা গেল। কিন্তু গুণধর সহিসটাই বা কে আর আরণ্যকের সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কি? রসুন রসুন। হাজার শব্দের তদন্ত রিপোর্ট লিখতে বসে শুরুতেই সব ক্লু দিয়ে দিলে তো আমি এরকুল প্যোয়েরো হয়ে যেতাম। অত দম নেই দাদা। তার থেকে শুরুর থেকে শুরু করি বরং।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আর বাঘবাহাদুর বেছে নিই। আব্দুল হাই শিকদারের লেখা বাঘ বাহাদুর উপন্যাস অবলম্বনে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি। পবন মালহোত্রা নামভূমিকায় অভিনয় করেছিল। সিনেমার নায়ক বাঘ সেজে অভিনয় করে রোজগার করে বেড়াত। কিন্তু সত্যিকারের ভ্রাম্যমাণ চিড়িয়াখানার আসলি বাঘ দেখে মানুষজনের আর নকল বাঘে মন ভরে না। পেটে হাত পড়লে কি আর মাথার ঠিক থাকেগা? তাই পবন লাফিয়ে পড়ে বাঘের খাঁচায় আসল নকল ভুলে গিয়ে, জাত্যাভিমানের তেজে। কিন্তু আসল বাঘ সে সব শুনবে কেন? অস্তিত্বের সংগ্রাম তো আর তার ছিল না। ডারউইনও সে পড়ে নি, মায়া দয়াও নেই। তাই দে থাবড়া, মার পেরেক। ফল স্বরূপ, পপাৎ চ মমাৎ চ। আমার গল্পটি ফুরোল নটে গাছটি মুরোল। কেন রে নটে মুরোলি? বেশ করেছি, তোর তাতে কি?
না মানে, এত দূর টেনে এনে যদি ল্যাজা মুড়োর হিসাব গুলিয়ে দেওয়া হয় তাহলে কি ছেড়ে কথা বলবে পাঠককূল? তাহলে বলেই ফেলি।
গত ফেব্রুয়ারী মাস, হালকা হালকা শীত তাতে বাঘ কেন, বাঁদরও মারা যায় না। সেই সময় দিল্লিতে দেখলাম নাটুয়া। আসলে নাটুয়া আর কবিগানের অনুষ্ঠান ছিল এবং আমার বিন্দুমাত্র কোন আইডিয়া ছিল না যে নাটুয়া আসলে কবিগানের জাত ভাই নয়। তাই যখন অনুষ্ঠানের আগে তাদের সাজঘরে গেলাম তখন রকমারি পোশাকে একটু চমৎকৃতই হলাম বটে। সর্দারকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- হয়ে গেছে? অতি বিনয়ের সঙ্গে সে জানালো হ্যাঁ।
তারপর আমাদের চর্মচক্ষুর সামনে যা উদ্ঘাটিত হল তার সঙ্গে দেখলাম ছৌ নাচের প্রভূত মিল। কিন্তু পুরুলিয়া থেকে আসা একটি দল ছৌ না নেচে অন্য কিছু নাচছে ব্যাপারটা কি? মনে পরে গেল আরণ্যকের ধাতুরির কথা।
অনুষ্ঠানের শেষে দেখা করলাম গুণধরের সঙ্গে। সামান্য চাষবাস করে কাটে তার। বাবার কাছ থেকে বিদ্যে পেয়েছে। ধরে রাখতে চায় যতদূর সম্ভব। ওর কাছেই শুনলাম যে এ নাকি পূরাণের নাচ।
শৈব পূরাণে আছে যে হিমালয়কন্যার সঙ্গে বিবাহের সময় নটরাজ মহাদেব এই নাচের প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে রাম সীতার বিবাহের সময়ও চন্দ্ররাজা নাটুয়া নাচ করেন। ছৌ নাচ নিয়ে তো উৎসাহের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিভূ করে প্রচার করি। কিন্তু নাটুয়ারা হারিয়ে যায় তার খবর রাখি না!
অথচ একটা সময় ছিল, বিবাহের আসরে নাটুয়া নৃত্য অপরিহার্য। রাজা রাজড়া বা জমিদার সামন্তপ্রভুদের সভায় নিত্য এই নাচ হত। নাটুয়াদের তখন রমরমা অন্য। রাজসভার শিল্পী হিসাবে তারা পরিচিত হত এবং শুধু মাত্র এই নৃত্যের মাধ্যমে জীবন সসম্মানে নির্বাহ হয়ে যেত। উইকিপিডিয়া বলছে, নাটুয়া নাচ একক পৌরুষ দৃপ্ত নৃত্য বিশেষ। এই নাচের মূল লক্ষ্য দৈহিক শক্তির প্রদর্শন। এই নাচে দেহ সুগঠিত ও বলিষ্ঠ হওয়া একান্ত প্রয়োজনীয়। পুরুলিয়া জেলায় সাধারণতঃ হাড়ি, বাউড়ী, ডোম ও মাহাতো সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই নৃত্যের শিল্পী হতেন। বন্দনাগান দিয়ে নাচ শুরু হয়। এই নাচে ছয়ালি, চৈতালী, ধুমসী, হলুদখেড়ি প্রভৃতি তালের ব্যবহার হয়ে থাকে। সাধারণতঃ মাঘ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত এই নাচের আসর বসত। কিন্তু এখন সে জৌলুস নেই। সোনার সময় তো সবার একই রকম থাকে না সব সময়। ধীরে ধীরে দেউটিগুলি নিভতে নিভতে এখন হারাধনের দুইটি ছেলেতে টিকে আছে।
শুরুতেই বলেছিলাম, হাঁড়িরাম কালিন্দীর কথা। হাঁড়িরাম কালিন্দী আর গুণধর এরাই দুটিমাত্র শিবরাত্রির সলতে টিম টিম করে জ্বলছে। পঞ্চাশ- ষাট বছর আগে তবুও লোকে বিয়ে উপলক্ষে ডেকে ডেকে নাটুয়াদের নাচাত। এখন একটা উত্তরা সিনেমায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত হয়তো নাচাবেন অথবা সরকারি সাহায্যে মাঝে সাঝে এরা এদিক ওদিক অনুষ্ঠান করে বেড়াবে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। পুরাকালের একটি শিল্প ধীরে ধীরে বাণিজ্যের অভাবে সরস্বতী নদীর মতো মুছে যাচ্ছে আর আমরা ভাবিই না কখনও।
লোকগুলোকে তো খেয়ে পড়ে বাঁচতে হবে তাই ধীরে ধীরে অন্য পেশার মধ্যে চলে যাচ্ছে এরা। আজ থেকে কয়েক বছর পরে হয়তো নাটুয়ার গল্প পুরাণেই থেকে যাবে। নটরাজের তো বমভোলা স্বভাব, তাই হারিয়ে যাবার নেই মানা।
আসুন না ইতিহাসটাকে একটু অন্য চোখে দেখি! সরকারের সঙ্গে সঙ্গে জন মানুষও যদি শুরু করে এদের নিয়ে ভাবনা চিন্তা। এই ছৌ, রায়বেঁশে, ঝুমুর, টুসু, ভাদু, ভাটিয়ালির সঙ্গে নাটুয়ারাও যেন খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকে এই আশাতেই বুক বাঁধতে ইচ্ছে করে। গুণধর সহিসকে যেন ধাতুরির ভবিতব্য মেনে নিতে না হয় বা পেটের খাতিরে নেশা ভুলে অন্য পেশায় হাত পাকালে কার লোকসান বলুন তো? বিশ্ব সমাজ ধীরে ধীরে হাতের মুঠোয় চলে আসছে। জাতীয়তাবাদী পরিচয়টা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু তবুও তো বাঙালীকে জাতি হিসাবে টিকে থাকতে হবে! প্রথমে তো মা! তারপর বিশ্ব সংসারের খবর!
নাটুয়াদের মতো ছোট ছোট সাংস্কৃতিক ফুলকিগুলোকে সযত্নে সংরক্ষণ কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব থাকে। আসুন আরও একটু জানি হাঁড়িরাম আর গুণধরদের কথা। চলুন একবার কোনাপাড়া গ্রামে। পুরুলিয়ায়!


https://www.youtube.com/watch?v=ei3_cyLb8HA