সুদূর মাটিতে আকাশের ভালোবাসা

শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়


ফোনে কথাটা শুনে দিদি খুব খুশি হয়েছিল। বারবার বলছিল, হ্যাঁ হ্যাঁ ... আয় আয় ... সক্কলে মিলে আয়। বন্ধুরা কী কী খেতে ভালোবাসে আমাকে জানিয়ে দিবি আগে থেকে। তোর জামাইবাবুকে বলে দেব, লাল দই আনবে, আর মাখা সন্দেশ। অনেকখানি সন্দেশ। ... দিদি এভাবেই আমাদের ডেকেছে চিরকাল। একই সঙ্গে সুর মিলিয়েছে ওর এক-কামরার মাটির বাড়ি, ছোট্ট রান্না-বারান্দা, সাদা ধুলোর উঠোন, উঠোনে আলো-পাতার ঝিলিমিলি তোলা ডালিমগাছ। চিরহাসিমুখে ডেকেছে অভাবগ্রস্থ সংসার।
মাধ্যমিক অবধি প্রত্যেক বছর শীতের ছুটিতে ধাত্রীগ্রামে দিদির কাছে যেতাম সকলে মিলে – মা বাবা আমি বোন। দিন কয়েক থাকা হত। দুপুরবেলা ডালিমতলায় পাতা খাটিয়ায় কাগজ হাতে গড়িয়ে নিত বাবা আর মাথার কাছটায় বসে বহুক্ষণ ধরে পাকাচুল তুলত বুলবুলিদিদি কিংবা টুলটুলি। বাবার কাগজ ওল্টানোর আওয়াজ আর অপরাহ্নবেলার মৃদু মর্মর ছাড়া আর কোত্থাও কোনো শব্দ হত না। ওদের গায়ে লুটিয়ে থাকত ডালিমগাছের আলোছায়া। সংসারের সুন্দর সব সম্পর্ক এই নৈঃশব্দ্যের ভেতর শীতের দুপুররোদের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে বিকিরণ করে অবিরল মায়ালোক। দূর থেকে এই ছবি যতবারই দেখেছি, শান্তির সুগন্ধি বাতাস এলোমেলো বয়ে গেছে বুকের ভেতর।
একদিন দিদিকে ফোনে জানালাম, কয়েকজন বন্ধু মিলে তোমার ওখানে যাব। অনেক গল্প করেছি তো, ওরা নিজের চোখে তোমার বাড়ি দেখতে চায়। সারাদিন থেকে বিকেলে চলে আসব। দিদি তো এক কথায় রাজি। কতদিন যাওয়া হয় না। ছেলেমেয়ে নিয়ে দিদিই আসে পুজোয়, ভাইফোঁটায়, ছুটিতে হোস্টেল থেকে আমি ফিরলে।
খুশি খুশি গলাটা শুনে ফোনটা রাখার খানিক বাদেই দিদির ফোন। বলল, একটু ঘুরিয়ে কর তো মানাই।
দিদির ফোন নেই, পাশে শরৎকাকুদের বাড়ি ফোন করে বলি ডেকে দিতে। দিদি এসে অপেক্ষা করে। ফোন করলাম। খুব কুন্ঠিত শোনাল ওর স্বর – না তোরা আসবি, সে তো ভালো কথা। খুব আনন্দের কথা। কিন্তু মানাই ... মানে আমার তো ওই ছোট্ট ঘর জিনিষপত্রে ঠাসা আর একফালি মেঝে ... আর কিচ্ছু নেই ... তুই এলি আলাদা কথা, কিন্তু তোর বন্ধুরা এলে ... মানে ... তারা বসবে কোথায়? আমার বাড়িতে অতজনের বসার ভালো জায়গা নেই যে ...
কথাটা শুনে হো হো করে হেসে উঠেছিলাম। কেন উঠোনে বসব সবাই। খাটিয়ায় বসব, ডালিমতলায়। কিংবা মেজমার বারান্দায় চাটাই পেতে দেবে। বসার জায়গার কি অভাব ... তুমি না সত্যি!
খুব বড়ো একটা নিশ্চিন্তিশ্বাস ফেলে ফোন রেখেছিল দিদি।
কী যেন একটা কারণে শেষ অবধি আর যাওয়া হয়নি সেবার। কিন্তু দিদির আকুল সঙ্কোচটুকু আজও স্পষ্ট মনে রয়ে গেছে। আদরের অতিথিদের ‘বসতে দেওয়ার’ জায়গা নিয়ে ও বড়ো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। দিদি জানেই না ওর গরিব বাড়ির চারধারে ছড়িয়ে আছে এক উদার আসন! কেউ চেষ্টা করে গড়ে তোলেনি তাকে। মনুষ্যহাতের কোনো কষ্টলব্ধ কারুকাজ নেই কোথাও। বাড়িতে ঢুকতেই দিদির শ্বশুরের নিচু চালের দোকানঘর, পাশেই কয়েকখানা বাঁশের ঝাড়। বাঁশগুলো বাঁকা হয়ে দোকানের চালে ঠেকেছে। বাঁশপাতায় সাজানো ওই ‘গেট’এর মধ্যে দিয়ে ঢুকলেই কিছুটা খোলা জায়গা। এদিকে ওদিকে জবাগাছ, ছোটো আমগাছ, তরুণ সেগুন দু’একখানা। পুরোনো রান্নাঘরের গা থেকে সারাদিন ঝুর্‌ঝুর্‌ করে মাটি খসে খসে তার দেওয়ালে বিমূর্ত কত ছবি। রান্নাঘরের কাছেই ডালিমতলা। ছোটো ছোটো লাল ফল হয় গাছে। তার নীচে দিনভর পাতা খাটিয়া। অদূরে গরুকে খেতে দেওয়ার ডাবা। খড়ের কুঁচো কেবলই উড়ে যায় হাওয়ায়। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ঘুরলেই দিদির ঘর, মেজমাদের সারবাঁধা তিনখানা ঘর। ঘরের সামনে টানা বারান্দা। সব মাটির। বারান্দার ওপর নিকানোর সরু সরু উঁচু রেখা পড়ে থাকে।
কত বছর ধরে ইস্কুল-পাঠশাল-অফিস-কাছ ারির জাঁতাকল থেকে পালিয়ে আমরা আশ্রয় নিয়েছে ওইখানে। দিনগুলো হইহই করে কেটে যেত। অস্তিত্বের সমস্ত শাখা ভরে উঠত পুষ্পে পল্লবে। দিদির বাড়ির কোনো পাঁচিল-টানা চৌহদ্দি ছিল না। দিদি ও ওর ভাসুরদের ক’খানা ঘরের চারপাশে কাঠা চারেক জায়গা ছিল মেহেন্দি গাছের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বাড়ির উল্টোদিকেই প্রাইমারি ইস্কুলের ছেলেমেয়েরা সেই পলকা বেড়া তছনছ করে টিফিনবেলায় খেলতে আসত দিদিদের উঠোনে। খুব ছোটো যারা, ইস্কুলের টিউকল পাম্প করে জল খেতে পারত না, তারা দিদিকে এসে বলত, ছোটোমা জল খাব। বাড়ির ছোটোবউ হওয়ায় দিদি ছিল সক্কলের ছোটোমা। দিদি গ্লাসে করে জল এনে দিত। দেওয়ার আগে আঁচল দিয়ে মুছে দিত গ্লাসের গা, তলাটুকু। ইস্কুলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দুপুরভর গুলি খেলতাম। অনেকের বাড়ির লোকেরা খুঁজতে আসত। দূর থেকে শুনতে পেতাম তাদের রাগত চিৎকার। সেই শব্দ কানে আসতেই গুলি তুলে বাতাসে যেন মিলিয়ে যেত দস্যি খেলুড়িরা! সারাদিন ধরে পাড়ার এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে এসে মানুষজন এসে দেখা করে যেত মা-বাবার সঙ্গে। ওদিকে ঠাকুমা রোজই তৈরি করে ফেলছেন নতুন কোনো পদ। ওনার হাতের রান্না ছিল অমৃত। বাবার চারধারে ঘুরঘুর করত দিদির তিন ভাসুরঝি – কে বাবার পাকাচুল তুলে দেবে!
আমরা সকলে মিলে যেতাম শরৎকাকুদের বাড়ি। শরৎকাকুর দাদা হিরুজেঠু ভালো গান করতেন। জেঠিমার গলাও ছিল ভারী মিষ্টি। খাটের ওপর কাছে টেনে জেঠু শোনাতেন – তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে। গাইতে গাইতে দু’চোখ বুজে বিভোর হয়ে মাথা দোলাতেন জেঠু। একটা ছাগলছানা কোলে নিয়ে ঘরের চৌকাঠে গান শুনতে বসেছে জেঠুর মেয়ে টুপুর। উঁচু চৌকাঠ পেরোলেই উঠোন। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম ওদের বিরাট বাগানে গাছপালার আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে পোষা ময়ূর। শীতের উজ্জ্বল রৌদ্রে তার শরীরের রঙ ঝলসে উঠছে কয়েক পল। হিরুজেঠুর বাবা দালানে বসে সুর করে মহাভারত পড়ছেন। তার একটানা সুর সাদা পায়রার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে বাতাসে। বাগানধারের রাস্তা দিয়ে নদীতে স্নান করতে চলেছে মানুষ।
বাগানধারের রাস্তা দিয়ে নদীতে স্নান করতে চলেছে মানুষ। তাদের কলরব এসে মিশে যাচ্ছে গানে। জেঠিমা গাইতেন - এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসিখেলায়, আমি যে গান গেয়েছিলেম। ... সে সব যেন পূর্বজন্মের কথা!
কত ভালোবাসার গান শুনিয়েছে দিদির বাড়ির ডালিমতলা। শুনিয়েছে হিরুজেঠুদের বাড়ির আসর। আমাদের বাড়ি এসে দিদির মেয়ে তুলে নিয়ে যেত নতুন গান। ফিরে গিয়ে বন্ধুদের, হিরুজেঠুদের শোনাত। যত দিন যায় আমার খুব প্রিয় গান আর দিদির বাড়ি একাত্ম হয়ে ওঠে। কিংবা বলা যায়, একেক প্রিয় গানের মধ্যে ভালো করে চেয়ে দেখি – আবছা হয়ে ফুটে ওঠে দিদির বাড়ির অখন্ড অবসরবেলা, মুক্তির পক্ষ্মবান দিন!
২।
বই পড়তে পড়তে, সিনেমা দেখতে দেখতে পাঠক দর্শকের মধ্যে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়। প্রত্যাশা আমাদের বোধের এক সীমারেখা, আঘাতে যা সহজেই বড়ো অস্থির হয়ে পড়ে। কিন্তু ভালোবাসার গানের কাছে আমাদের তেমন কোনো চাওয়া নেই। যাপিত দিনের সঙ্গে সঙ্গে গাছের শরীরে বেড়ে ওঠে আয়ুরেখা। আমার অস্তিত্বে জমে আঘাতের ক্ষত, বিশ্বাসভঙ্গের অনিশ্চয়। শরণার্থীর মতো গানের কাছে যাই। সে অনাড়ম্বরে গ্রহণ করে আমাকে। কাছে রাখে। গানের কোনো আঘাত করার ক্ষমতা নেই, সে আঘাত পেলে প্রত্যাঘাতেও অক্ষম। গান যেন আজন্ম-বিকলাঙ্গ সন্তানের মা, অসীম ধৈর্যশীলা এক শান্তির পাথার!
অবাক হয়ে এই আশ্রয়ের কথা ভাবি। অন্য কোথাও অন্য কারো সঙ্গে এই ভাবনা মিলে গেলে খুব ভালো লাগে। মনে হয় সৃষ্টির জন্মাবধি অবিচ্ছিন্ন এক প্রশান্তির ধারা বয়ে চলেছে, আমাদের যাপনের খুব কাছাকাছিই, হয়ত একটু জনহীনতায়, গাছগাছালির আড়াল দিয়ে। তাকে কেবল স্পর্শ করতে হয়। H. D. Lawrence -এর লেখায় পেয়েছিলাম অমনই এক অনন্ত আশ্রয়দানের ছবি। The Brangwens had lived for generations on the Marsh Farm, in the meadows where the Erewash twisted sluggishly through alder trees, separating Derbyshire from Nottinghamshire. Two miles away, a church-tower stood on a hill, the houses of the little country town climbing assiduously up to it. Whenever one of the Brangwens in the fields lifted his head from his work, he saw the church-tower at Ilkeston in the empty sky. So that as he turned again to the horizontal land, he was aware of something standing above him and beyond him in the distance.
আমার হৃদয়ের গানও এমনই, আমার মগ্ন অস্তিত্বের ঊর্ধ্বাকাশ জুড়ে থাকা ঈশ্বর-করতল!
ভালোবাসার গান কেমন? – এর তো কোনো সংজ্ঞা নেই। তারও নেই কোনো চিরন্তন সঙ্গের আশ্বাসও। কোনো কোনো গান সেই ছেলেবেলা থেকে রয়ে গেছে, আবার কেউ কখনও খুব কাছে এসে, আবার কবে যেন হারিয়ে গেছে অজান্তেই। সকলেই ভালোবাসার। শুধু কেউ কেউ ক’দিনের আর বাকিরা নিরন্তর এক বাড়ি হয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া আর যে সকল গান খুব টানে, তারা যেন ক্রমশই দিনের আলো থেকে চলে যাচ্ছে নির্জন আড়ালে, ঠিক অভিমানী মানুষের মতো। খুব সামান্য আয়োজন, সরল সুরকথার গান; হয়ত আমাদের জীবনের ক্রমপ্রাগ্রসর প্রকৃতিটির সঙ্গে কিছুতেই মিলিয়ে নিতে পারছে না তারা। উৎকেন্দ্রিক কালে তারা হয়ে পড়ছে আরও বেশি অন্তর্মুখী, আরও স্পর্শকাতর! যুগধর্ম মেনেই সামাজিক অনুষ্ঠান উৎসবে খুব একটা আর জায়গা নেই তাদের। আপন্নতার এই দিনে তারা শুধু আমার মতো কিছু আত্মীয়ের কাছে থাকে। আর অন্ধকার রাত্রির একাকীত্বে জীবন্ত হয়ে উঠে ঘরদুয়ারউঠোন ভরিয়ে ভরে তোলে চরাচর। একসময় আমার চিদাকাশে থইথই করে গোপনচারিণী গান!
পয়লা বৈশাখে দূরদর্শনে নানান শিল্পীদের নিয়ে যে আড্ডা-পাঠ-গান, কিছুদিন আগে থেকেই তার খবর বারবার প্রচারিত হত ডি ডি বাংলায়। একদিন অমনই চিলতে খবরে দেখলাম এক বৃদ্ধাকে। নিমন্ত্রিতজনেদের মধ্যে একটু যেন জবুথবু হয়ে বসে আছেন। মুখভরা পান, মাথার দু’পাশে দু’টি বিনুনি, চোখে শূন্য দৃষ্টি। পরমুহূর্তেই হারমোনিয়াম কাছে টেনে তিনি চকিতে গোটা ঘর ভরে দিলেন স্রোতস্বতী সুরে। তখন তো পুরোটা দেখাত না। পয়লা বৈশাখের জন্য অধীর অপেক্ষায় দিন কাটতে লাগল। মাকে ডেকে এনে দেখালাম, চেনো কে?
মা বলল, ও মা, উনি তো প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়। বয়স হয়েছে, কেমন যেন হয়ে গেছেন। অথচ গলায় এখনও কী সুর! আমাকে ডাকবি কিন্তু অনুষ্ঠানের সময়। ... পয়লা বৈশাখের দিন বাবা মা আম্মা দাদা দাদু মাসি সকলে মিলে বসলাম প্রতিমার গান শুনতে। সকলের নানান গল্প-আড্ডার ফাঁকে জরাগ্রস্থ প্রতিমা এক-গালে পান নিয়ে শুনিয়ে দিলেন – একটা গান লিখো আমার জন্য ... না হয় আমি তোমার কাছে ছিলেম অতি নগণ্য ...। আর গাইলেন – নিঙাড়িয়া নীল শাড়ি শ্রীমতি চলে ... শ্যামলের বেণু বাজে কদমতলে ...। চোখের সামনে যেন স্পষ্ট দেখতে পেলাম মায়াবিবশা রাধা, শ্যামবাঁশির সুরে সহসা থেমে যাওয়া হরিণী, বর্ষণসিক্ত গভীর কদম্ববন, পুষ্পবিভোর। অত আদর করে, অত আপন করে যে গানের তান বলা যায়, সেই দিন প্রথম শুনলাম। যেন নিছক বোল নয়, ভিন্‌-ভাষার কোনো কথোপকথনেরই শব্দ শুনছি! কী অবাধ কন্ঠ, কোথাও কোনো বাধা নেই, স্বতস্ফূর্ত ধারায় আপনমনে বয়ে চলেছে সুর; কোথাও কোনো প্রচেষ্টা নেই, নেই আরোপিত কারুকাজ। প্রতিমার সেই গান কত দিন ধরে বাজতে লাগল আমার চেতনায়!
পরে দাদুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের কোন গান তোমার সবচাইতে প্রিয়?
একটু অবাক করেই দাদু জানিয়েছিল, আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে পথ চিনি না। দাদু একসময় ধ্রুপদী সঙ্গীতচর্চা করেছে। জীবন-জীবিকার জন্য, নিজের বামপন্থী বিশ্বাসের কারণে আপোষহীন লড়াই করতে করতে হয়ে উঠেছে কিছুটা স্পষ্টভাষী, নিঃসঙ্গ ও কঠোর । ভেবেছিলাম অন্য কোনো গান হয়ত হবে। কিন্তু কেন এই গানটিই?
আগ্রহটুকু রয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছু পরে সাদাকালো ছায়াছবি ‘ছুটি’তে দেখলাম এই গান। এসেছে খুবই নিবিড় এক আবহে, কিন্তু গাইতে গাইতে নন্দিনী যেন নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন আরও উদার আরও সর্বত্রব্যাপী কোনো সখার মধ্যে; সে শুধুই প্রেমিক নয়, গানের স্পন্দে স্পন্দে তার ক্রমপ্রকাশে দেখছি সে পূজনীয়ও। সেই কি আজীবনের ঈশ্বর? কী সরল কী শব্দহীন এই প্রেম, যত দিন গেছে অকালে সঙ্গিনীহারা জীবনে দাদু বুঝি
জড়িয়ে নিয়েছে প্রতিমার এই গানের সুরভরা সারল্যটুকু।
হ্যাঁ, সরল। শুধুই সহজ নয়। সহজ কথামাত্রই কি সরল হয়? ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’ – সহজ কথা, কিন্তু সরল কি? ‘মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায় ... বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়’ – পলকে মায়াসিক্ত ছবি এঁকে দেয় সামান্য এই কথাটুকু। বড়ো সরল যে ছবি, যাকে ফেলে এসেছি আয়ুষ্কালের কোনো এক বিন্দুতে কিংবা আজীবন যার ফুল-কুড়োতে চেয়েছি সেই বকুলগাছকে দেখতে পাই খুব কাছে – নীলাভ ভোরের আলোআঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে ঘাসময় ফুল ঝরিয়ে, ডালপালা মেলে।
প্রতিমার গানের মধ্যে এই কৌশলহীন সারল্য বিরাজ করে। তাই যত দিন যায় সে কাছে ডেকে নেয় বিনা প্রশ্নে। বিনা সন্দেহে। সুর থেকে কথাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে এমন কিছুই নয় সে সব গানের বাণী। আবার গান থেকে প্রতিমার কন্ঠটুকু সরিয়ে দিলেও বড়ো দূরত্বে সরে যায় সবটাই। সুর বাণী শিল্পী সকলে মিলে রচনা করে যে একাত্ম আকাশ, নিঃসঙ্গতায় বা দুঃসময়ে আমাকে ডেকে নেই সেই অখন্ডতাই। কত তো নতুন গান শুনি, তবু আজও ঘুমের আগে দেখতে পাই ঘুট্‌ঘুটে বাঁশবনে শন্‌শন্‌ করে হাওয়া খেলে যায়, আপনমনে কাঁপে আঙুলের মতো সরু পাতাদের ছায়া; কাজলা-দিদি হারানোর অন্ধকারে জ্বল্‌জ্বল্‌ করে জীবনের নাগরিক জটিলতা কখনও আয়ত্ত করে উঠতে না-পারা এক শিল্পীর নাকের পাথর!
৩।
আজ নতুন গান আসে। আমাদের মফস্বলের হাওয়া ভরে ওঠে সদ্য সমাগত হিল্লোলে। কিছুদিন পরেই সে কিছুটি না রেখে চলে যায়। আশ্রয় হয়ে কি উঠতে পারে তারা? যদি পারে, তবে তৃষ্ণার্ত হরিণের মতো কেন বারবার ফিরে যাই অতীত সুরের ঝর্ণাতলায়? কেন সিডির কভারে লেখা হয় ‘স্বর্ণযুগের গান’? সন্ধ্যার মুখে ছাদে উঠে যদি শুনি দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো পুরোনো দিন, কেন ভাইকে বলি, চুপ চুপ ... ওই শোন! দিনাবসান আকাশে একলা পাখির মতো ভেসে থাকে সে গান। যে গান নিজে সম্পূর্ণ, যে গান ছায়াতরু হয়ে মেলে রাখে নিজের শরীর। এই পূর্ণ হয়ে উঠতে পারা, এর মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় গতায়াত। বাণীর সঙ্গে কন্ঠের, সুরের ভেতর শিল্পীর। সঙ্গীতের ঊষাপ্রদোষের আলো-অন্ধকারের ভেতর হেঁটে যায় সমর্পিত শিল্পীজীবন।
আশ্রয়দান ছাড়াও, কিছু কিছু গানের সঙ্গে অলৌকিক সখ্যের রয়েছে আরও এক কারণ। সে হল মুক্তি। গানের ভেতর ঢুকে পড়ে চলতে চলতে অনন্তে হারিয়ে যাওয়া। এক দিকশূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখতে পাওয়া আমার বিষাদিত আভায় কেঁপে উঠছে ওই নীল নক্ষত্র, যাকে বড়োই সুদূর ভেবেছি এত দিন। শুধুই কি গান, নিঃস্বার্থ জ্ঞানের মধ্যেও কি এই একই আমন্ত্রণ একই উপলব্ধি নেই?
গান নিয়ে নানা সময়ে বলেছেন লিখেছেন বহু মানুষ। এই লেখায় একটু অন্য দিকে দেখি। খুব বরণীয় একজন গণিতজ্ঞ Ian Stewart। অঙ্কের ওপর কতরকমের বই লিখেছেন তিনি। তাদেরই একটি থেকে কিছুটা পড়ি - Mathematics, then, is not like a political map of the world, with each speciality neatly surrounded by a clear boundary, each country tidily distinguished from its neighbours by being coloured pink, green, or pale blue. It is more like a natural landscape, where you can never really say where the valley ends and the foothills begin, where the forest merges into woodland, scrub, and grassy plains, where lakes insert regions of water into every other kind of terrain, where rivers link the snow-clad slopes of the mountains to the distant, low-lying oceans. But this ever-changing mathematical landscape consists not of rocks, water, and plants, but of ideas; it is tied together not by geography, but by logic. And it is a dynamic landscape, which changes as new ideas and methods are discovered or invented.
কেন পড়লাম এই লেখা? পড়লাম, কারণ আজীবনের তপোভূমিকে ঘিরে নিজের দর্শন জানিয়েছেন Ian। পড়তে পড়তে যার সঙ্গে মিল পেলাম গান নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ভাবনার। যে গানের তরঙ্গবিস্তারে দাঁড়িয়ে দেখতে পাই খোলা দশদিক, কোথাও কোনো বাঁধন নেই, আর গাছে গাছে ঘাসে ঘাসে খেলে যাচ্ছে আমারই সুখদুঃখের হাওয়া, সে-ই আমার ভালোবাসার গান। আমি তাকে অনুভব করতে করতে যখন টের পাই সে-ও নিজের মধ্যে গড়ে তুলছে আমার অবয়ব, সেই মুহূর্ত থেকে পরম বন্ধুতার শুরু। সঙ্গীতের natural landscape–এ গাছ নদী পাথর হল সুর বাণী উচ্চারণ। গায়নের ভেতর অলক্ষ্য স্পর্শ রেখে যাওয়া শিল্পীর নিজজীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, অশ্রুবিন্দু, কাতরতা। আর এই সবকিছু নিয়েই সজীব হয়ে ওঠে গানের স্পন্দিত হৃদয়!
ছেলেবেলায় একবার জন্মদিনে মা একখানা ছোট্ট চাইনিজ ক্যাসেট্‌ প্লেয়ার কিনে দিয়েছিল। তখনও আমার নিজস্ব পছন্দের গান বলতে সেভাবে হয়নি কিছু। মা-ই কিনে দিয়েছিল নিজের ভালোলাগা গানের দুটো ক্যাসেট। ছাইরঙা চার ব্যাটারির টেপ-রেকর্ডারটা পকেটে নিয়ে ঘুরতাম। আর আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত গান। সন্ধ্যা নামার মুখে একা একা ছাদে বসে চেয়ে থাকতাম দূরে। পাখির দল তখন ফিরতিপথে পেরিয়ে যাচ্ছে আকাশ। আলুলায়িত কমলাবর্ণ মেঘ। পাশে রাখা টেপ-রেকর্ডারে তখন সতীনাথ গাইতেন – ওই আকাশ প্রদীপ তারা জ্বেলো না জ্বেলো না। মনে হত আকাশকে মুখোমুখি দেখতে পাচ্ছেন তিনি। না হলে ওই আশ্চর্য আকুলতায় ‘জ্বেলো না জ্বেলো না’ বলা যায়! একটা গান, সে আমাকে অনুভব করাচ্ছে যুগ-যুগান্তব্যাপী ইতিহাসের সাক্ষী ওই বিরাট আকাশ, পাখিদের পদচিহ্নময় নীল নভোপ্রান্তর, সে কত কাছের জন! তাকে সত্যিই যেন অনুরোধ করা যায় – একটু দেরি করে তোমার আলোগুলো জ্বালো। এই বিশ্বাসের মধ্যে কোনো ছল নেই। পার্থিব জীবনতল থেকে এক ভিন্ন স্তরে গিয়ে আকাশের সঙ্গে এ আমার অনুচ্চার সখ্য, যা সম্ভব করে তোলে গান! যখন শুনি ‘ক্ষয়ে ক্ষয়ে কত দীপ নিভেছে’ মনটা হু হু করে ওঠে। গাছপালার ছায়াঘেরা এক অঙ্গন অন্ধকারের ভেতর ছোট্ট প্রদীপশিখার জ্বলে ওঠায় যে কী তীব্র মায়া, সতীনাথ এই গান না গাইলে হয়ত কোনোদিনই অনুভব করতে পারতাম না। কতদিন কতবার ফিরে ফিরে শুনেছি, শুনি আজও। আর শুনি ‘তুমি মেঘলা দিনের নীল আকাশের স্বপ্ন আমার মনে’। শুনে শুনেও শেষ হয় না। তুমি কুহু ও কেকার মিলনগীতিকা মাধবীর বনে বনে। ‘তুমি’ কথাটির এমন উচ্চারণ পেয়েছি কি আর কোথাও? ওনারই গাওয়া ‘আজ তুমি নেই বলে’, এই গান ভরে আছে বিরহব্যাকুলতায়। দুটি গানেই কতরকমভাবে ‘তুমি’ কথাটিকে বলা। তুমি পথিকজনে চলার প্রেরণা ওগো, তুমি শিশিরের লাগি পথ চেয়ে থাকা তৃণের সাধনা ওগো। আমার মেঘলা বুকে নীলাকাশের নিভৃত স্বপ্ন থেকে ‘তুমি’ হয়ে উঠছে শিশিরের জন্য তৃণের অতন্দ্র পথ-চাওয়া। স্পন্দে স্পন্দে ‘তুমি’র এই ক্রমব্যাপ্তি শুধুই বাণীতে নয়, ধরা পড়ে সতীনাথের উচ্চারণেও। আকুলতা থেকে এক অন্তর্লীন বিশ্বাস এসে লাগে ওনার ‘তুমি’ বলায়। বারবার এই গান শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে এক নতুন ভুবনের রচনা হয়, যা শুধু আমার একলারই। আমার যাপনের সব পার্থিব ও অপার্থিব কল্পনায় অনুভবে সেজে ওঠে সেই ‘natural landscape’। এই ‘Nature’ আমার আত্মপ্রকৃতি। একেবারেই আমার নিজের হয়ে-ওঠে, হতে-চাওয়া, হতে-না-পারার সঙ্গোপন অবভাস।
৪।
দিদির সেই ‘বসার জায়গা’র কথার ভাবি। বসতে দেওয়ার সেই আলোধুলোর আসন যেন গান। আর আমাদের জন্য আসন পেতে চলা দিদি যেন এক নিঃশব্দ শিল্পী। আজকাল খুব কম মানুষজন, বন্ধুবান্ধব পাই যারা এই গানেদের সঙ্গে থাকে। বড়োই কি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি দিনে দিনে? মনে হয় জনাকীর্ণ এই পৃথিবীতে আমার আপনজন নেই কেউ; এই মাটি থেকে তাকিয়ে আছি ভিন্ন কোনো দিকে, হয়ত বা আকাশে, এক অলীক আকাঙ্খায় ...
একটা ভিন্ন বোধ জেগে ওঠে। মনে হয় চারধারে যে স্পন্দমান বিশ্ব তাকে নিজের মতো বিকশিত হতে দেওয়াই বুঝি আমাদের ধর্ম। যত দিন যাচ্ছে বুঝি খুব বেশিই হস্তক্ষেপ করে ফেলছি, বিচারহীন পদক্ষেপে ডিঙিয়ে যাচ্ছি প্রাকৃতিক সীমা। কাল ও প্রকৃতির নিজস্ব কিছু ইচ্ছা ও প্রথা আছে আমাদের বড়ো করার, পূর্ণ করার। উচ্চকিত অধিকারবোধে কি ভুলে যাচ্ছি সে কথা? দিব্যেন্দু একদিন বলেছিল, জানিস, তখন খুব ছোটো। বছর দশেক বয়স হবে। হঠাৎই একদিন মনে হল এই যে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে পৃথিবীতে তার কারণ সূর্যের থেকে আমাদের পৃথিবীর দূরত্বটা optimum. সে বয়সে ‘optimum’ কথাটা জানতাম না, তবে ওইরকমই কিছু একটা ভেবেছিলাম। খুব আনন্দ হয়েছিল। ... আজ যখন বুঝতে পারি অবোধবয়সের ওই ভাবনার এক সঙ্গত মানে রয়েছে, ভাবি কিছুই তো জানতাম না তখন – কীভাবে প্রাণ আসে, সৌরজগতটা কত বড়ো; কিন্তু পৃথিবীর প্রতি, এই গোটা প্রাণীজগতের প্রতি আমার বিস্ময় থেকে খুব সহজ এক ধারণা জেগে উঠেছিল আপনা-আপনিই।
যত দিন যায়, এই ‘আপনা-আপনি’ কথাটাই হয়ে উঠতে থাকে আমার সবচেয়ে প্রিয় ও কাম্য বিশ্বাস। মাসানবু ফুকুওকার কথা জানতে পারি। কৃষি মাটি ও প্রকৃতি নিয়ে ওনারও এই একই প্রত্যয়।
দিও না, নিজের মতো থাকতে দাও। এই উদার বিশ্বাস থেকেই বোধ হয় উদ্‌গত হয় সারল্য। তার সঙ্গে মিশে সঞ্চারিত হয় অকৃত্রিম প্রেম, যা আমাদের কোনো আয়োজিত কৌশল বা গুণ নয়, যা আমাদের স্বভাবের প্রাকৃতিক নিসর্গ। এই প্রেমই বয়ে যায় সৃষ্টির নানান কাজে – কখনও গানে, কখন ছবিতে, কখনও বা কবিতায়। সে-ই আমাদের কাছে ডাকে, আশ্রয় দেয়, নিয়ে চলে মুক্তির অনর্গল আকাশে।
বহু বছর ধরে গবেষণা করে মানুষের বিবর্তন ও সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে একটি বই লিখেছেন Augusto Angelucci. সে বইয়ের উৎসর্গে রয়েছে - To the few who have the gift to witness the harmony, synthesis, simplicity, and symmetry intrinsic in all creations of Mother Nature, even a blade of grass can become an awesome, indescribable, magnificent world.
এই বই ভেসে পড়েছে আমাদের ভেতর। আর তার সমস্ত পাতার সবকটা পংক্তি জীবন্ত হয়ে উঠছে এক স্থিতপ্রাজ্ঞ বিশ্বাসের আভায়।
‘পুরোনোদিন’এর গানের শিল্পীদের কথা খুব মনে হয়। কী চেয়েছিলেন তারা? খ্যাতি? প্রতিষ্ঠা? অমরত্ব? সঙ্গীতশিল্পী নয়, আবারও ভিন্ন এক বিচরণের মানুষের কথা বলি। এক কিংবদন্তী অভিনেতার আত্মপ্রকাশিত ইচ্ছের কথা পড়ি। একদিন প্রেক্ষাগৃহে নিজের ছবি দেখতে এসেছিলেন চার্লি চ্যাপলিন্‌। জানতে চাইছিলেন তার অভিনয় কীভাবে স্পর্শ করছে দর্শকদের। কাঙ্খিত অভিজ্ঞতা নিয়ে হোটেলে ফিরে তিনি লিখছেন - That was the thing — the chuckle! Any kind of laughter is good; any kind of laughter will get the big salaries. But a good, deep, hearty chuckle is the thing that warms a man’s heart; it’s the thing that makes him your friend; it’s the thing that shows, when you get it, that you have a real hold on your audience. I have worked for it ever since.
হ্যাঁ, ক্ষণস্থায়ী কোনো উল্লাসধ্বনি নয়। নিজের দর্শকদের মধ্যে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন অজান্তেই উৎসারিত চাপা হাসি। হর্ষের স্বতোৎসারিত প্রকাশ। উল্লাস হয়ে ক্ষণজন্ম নয়, চার্লি চ্যাপলিন আকাঙ্খা করেছিলেন আনন্দ হয়ে মানুষের হৃদয়রাজ্যে অমর হয়ে থাকার।
একজন প্রকৃত শিল্পীমাত্রেই কি এটুকুরই স্বপ্ন দেখেন না?
আমার দুঃখ হয়। আমার যখন শৈশব, তার কিছু আগে থেকেই গানের জগতে এসে গেছে নতুন দিন। জীবনমুখিনতার অববাহিকায় বিস্তার পাচ্ছে গান। তার শব্দ সুর আবেগ বদলে যাচ্ছে দ্রুত। অনেক সুঠাম, অনেক ঝক্‌ঝকে হয়ে উঠছে সব কিছু। বদলে যাচ্ছে উচ্চারণ। কতরকমের বাদ্যযন্ত্র এসে সাজিয়ে তুলছে সঙ্গীতের আঙিনা। সুর শব্দ ভঙ্গিমা এদের কারোর বিবর্তনই তো বিক্ষিপ্ত কোনো ছবি নয়। মানুষ থেকেই সুর আসে। মানবচেতনা থেকেই আসে গান। আমাদের ঘিরে দ্রুত বদলে যাচ্ছে সময়। কালের এই বিবর্তন আসলে মানুষেরই বদলে যাওয়া। আর চলে-যাওয়ার সময় দেশ-ছাড়ার আগে মানুষজন গুছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার নিজস্ব যা কিছু। তার সুর তার শব্দ, তার মন।
এই নবীন সুষমার বাইরে অন্য কোনো অতীতেই হয়ত আশ্রয় পায় আমার মন। আমার টিফিন গুছিয়ে দিতে দিতে, বোনের চুল বেঁধে দিতে দিতে, ইস্কুলের খাতা দেখতে দেখতে যখন মা গুন্‌গুন্‌ করে ওঠে –
পুকুরপাড়ে লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে ... ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না ... আমি স্পষ্ট দেখতে পাই মায়ের নাকে জ্বল্‌জ্বল্‌ করে উঠছে এক অলীক পাথর! বারান্দা থেকে সন্ধ্যার বাতাসে থুতু দিয়ে চুলের গুটি উড়িয়ে দিচ্ছে মা পগারের দিকে। বলছে, থুতু দিতে হয়। এইসময় দেবতারা নেমে আসেন, নইলে তাদের অসম্মান হয়। মা ঘরে চলে গেলে সায়ংকালের ধুধু শূন্যতায় ছায়া ছায়া শরীর ফুটে ওঠে। আমার চারপাশে ভেসে বেড়ান প্রিয় গানের সব শিল্পীরা। অনেক দূরের লোক থেকে খুব কষ্ট হলেও দিনাবসানে আমার কাছাকাছি নেমে আসেন তারা। আর আলুথালু বেশে, পিপাসার্ত ক্ষীণ কন্ঠে ডেকে চলেন – কাছে এসো ... কাছে এসো ... কাছে এসো ...
[ঋণঃ এই লেখার নাম সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের একটি গান থেকে গৃহীত। গানটি অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ও সুরারোপিত। এছাড়া এই লেখায় উল্লিখিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের মূল বই আমাকে পড়িয়েছিল সুজয়, নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা জানিয়ে সহমত প্রকাশ করেছিল দিব্যেন্দু। আমার দুই ভাইয়ের জন্যই লিখতে পারলাম এতকিছু।]