সোনা ঝরা শোনার দিন

কেয়া মুখোপাধ্যায়


“তোমাদের ইন্দিরাদি বলছি। ছোট্ট সোনা বন্ধুরা ভাই, আদর আর ভালোবাসা নাও। কি, ভালো আছ তো সব?”
আর তারপরই অনেক কচিকাঁচা গলায় একটা বিরাট লম্বা “হ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যা ঁ... ।”
ব্যস! শিশুমহলের ইন্দিরাদির এই ডাকে ভরে উঠত রবিবারের সকালটা। আর বিকেলবেলা ছিল গল্পদাদুর আসর! কী না হত এই দুই আসরে! মন ভরানো ছড়া, কবিতা, গান, গল্প আবার মাঝে মাঝে নাটকও। শুনতে শুনতে কল্পনার ডানায় ভর করে মন উড়ে যেত যেখানে খুশি। শুনেছি গল্পদাদুর আসর জনপ্রিয় করেছিলেন জয়ন্ত চৌধুরী। নির্মলভাই নামে গল্পদাদুর আসর পরিচালনা করতেন তিনি। তারপরে গল্পদাদু হয়ে এলেন পার্থ ঘোষ। শিশু আর কিশোর প্রতিভা বিকাশের প্ল্যাটফর্ম ছিল আকাশবাণীর শিশুমহল আর গল্পদাদুর আসর। একেবারে ছোটবেলার রেডিওর স্মৃতি বলতেই মনে পড়ে শিশুমহল আর গল্পদাদুর আসরের কথা। আর মনে পড়ে ইন্দিরাদিকে।

বাড়িতে ছিল বিরাট বড় এক রেডিও। দাদুর আমলের। বিরাট বাক্সের বাইরেটায় বাদামী রঙ, ভেতরটা ক্রীম রঙা। সুন্দর একটা লেসের কভারে ঢাকা থাকত। সেই ঢাকা সরিয়ে, নব ঘুরিয়ে রেডিও চালিয়ে স্টেশন ধরতে হত। ঠিকঠাক স্টেশন ধরাটা খুব সহজ কাজ নয় মোটেই। রেডিও চালু হলে ভেতরে জ্বলে উঠত একটা হালকা আলো। নানারকম আওয়াজের বাধা পেরিয়ে ঠিক স্টেশনটা ধরতে পারলে সেইখানটায় তিরতির করে নড়ত মেগাহার্ৎজ দেখানোর লাল কাঁটাটা। আর ছোট্ট আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবতাম, কেমন করে ওইরকম একটা কাঠের বাক্স থেকে এক এক করে বেরিয়ে আসছে মন ভরানো সব গান, কবিতা আর ছড়ার সম্ভার!

বিনোদনের জগতের মুহূর্মুহু বৈদ্যুতিন ঘুর্ণিঝড় তখনও আসেনি। রেডিও অসহায় হয়ে পড়েনি। শৈশব জুড়ে ছিল রেডিও আর তার মধ্যেকার আশ্চর্য কন্ঠের অধিকারী মানুষগুলো। ‘আকাশবাণী কলকাতা,’ রেডিও খুললেই এই শব্দ দুটো ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই কানায় কানায় সাজিয়ে দিত হরেকরকম বিনোদনের রঙবেরঙের পশরা। উত্তর কলকাতা থেকে ট্যাক্সি করে দক্ষিণে মামারবাড়ি যাবার সময় অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম ধূসর লালচে রঙের বাড়িটার দিকে। বাড়িটার গায়ে লেখা ‘আকাশবাণী ভবন।’ ওই বাড়িটার প্রতি এক রহস্যময় তীব্র আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই। ওই বাড়িতে ঢুকেই তো গান, বাজনা, কবিতা, নাটক শোনান কত বিখ্যাত মানুষ!

রবিবার শিশুমহলের ঠিক আগে হত আর এক দারুণ জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। সঙ্গীত শিক্ষার আসর। এই আসরের প্রাণপুরুষ পঙ্কজ কুমার মল্লিক। আধুনিক রবীন্দ্রনাথ, হিন্দি সিনেমার গানেরও তিনি ছিলেন সেই সময়ের অলিখিত সম্রাট। আমাদের বাড়িতে গান-বাজনার চল ছিল। শুনেছি, বড়রা খুব মন দিয়ে সঙ্গীত শিক্ষার আসরে গলা মেলাতেন তাঁর সঙ্গে। ১৯২৯ সালের শেষের দিকে পঙ্কজ মল্লিক কলকাতা বেতারে সঙ্গীত শিক্ষার আসর অনুষ্ঠানটি পরিচালনা শুরু করেছিলেন। সঙ্গীত শিক্ষার আসরে পঙ্কজ মল্লিকের সুর করা প্রথম গানটির গীতিকার ছিলেন অলক গঙ্গোপাধ্যায়। আর দ্বিতীয় গানটি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর/ নমো নমো, নমো নমো, নমো নমো।’ এই আসরে রবীন্দ্রসঙ্গীত, কাজী নজরুলের গান, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত এবং দ্বিজেন্দ্রলালের গান শেখানো হতো। এছাড়াও তাঁর শিক্ষার সহস্রাধিক গানের তালিকায় ছিল পদকীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, পল্লীগীতি, দেশাত্মবোধক সঙ্গীত, আনুষ্ঠানিক গান, তুলসীদাস, সুরদাস, গুরুনানক, মীরাবাঈ প্রমুখের হিন্দী ভজন। রবীন্দ্রনাথের খেয়া কাব্যগ্রন্থের শেষ খেয়া কবিতা, ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’-তে অসামান্য সুরসংযোজন করে এই অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক।
১৯২৯ থেকে ১৯৭৫- সুদীর্ঘ সময়। ৪৬ বছর ধরে সঙ্গীত শিক্ষার আসর পরিচালনার পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীতকে জনপ্রিয় করে তোলার কাজেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক।১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে, আসরে তাঁর শেখানো শেষ দুটি গানও ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত। একটি হল, ‘শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে/ শেষ কথা যাও বলে/ সময় পাবে না আর, নামিছে অন্ধকার, গোধূলিতে আলো-আঁধারে/ পথিক যে পথ ভোলে।’আর অন্য গানটি- ‘তোমার শেষের গানের রেশ নিয়ে কানে চলে এসেছি / কেউ কি তা জানে/...তখনো তো কতই আগাগোনা/ নতুন লোকের নতুন চেনাশোনা/ ফিরে ফিরে ফিরে-আসার আশা দ'লে এসেছি/ কেউ কি তা জানে।’
গানের শেষ কথাটি যে তাঁর জীবনেরও কথা, তা জানা গেল আকাশবাণী কলকাতার তৎকালীন স্টেশন ডিরেক্টর দিলীপকুমার সেনগুপ্তের ৩ অক্টোবরের চিঠিতে। সেদিন ওই চিঠির মাধ্যমে সঙ্গীত শিক্ষার আসর পরিচালনা থেকে পঙ্কজ কুমার মল্লিককে অব্যাহতি দেয়া হয়। প্রায় ৪৬ বছর জুড়ে চলা পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গীত শিক্ষার আসরটির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ব্রাহ্মসমাজের ছোট গন্ডির বাইরে, আপামর বাঙালির মধ্যে বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যাপক প্রচার আর রবীন্দ্রসঙ্গীতকে সর্বজনগ্রাহী করে তোলা।
পঙ্কজ মল্লিকের পরে এই আসরের দায়িত্ব নিয়েছিলেনঅশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়। আশির দশকের প্রথম ভাগে রেডিওতে সংগীত শিক্ষার আসর পরিচালনা করতেন সুচিত্রা মিত্র আর তারপর সুবিনয় রায়। তারপর? তার আর পর নেই। জনগণ আর শুনতে চাইছেন না, রেডিও থেকে মুখ ফিরিয়ে তাঁরা দৃশ্যমান বিনোদনের হাতছানিতে সাড়া দিতে ব্যস্ত- এইসব নানা কারণ দেখিয়ে হারিয়েই গেল সঙ্গীত শিক্ষার আসর, যা একসময় কয়েকটি প্রজন্মের অগণিত প্রতিভার উন্মেষে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল।

রেডিওর গানের অনুষ্ঠানের কথা বলতেই মনে পড়ে আর একটি অসামান্য অনুষ্ঠানের কথা, রম্যগীতি। একসময় রম্যগীতির সঙ্গে বাংলার শ্রোতাদের ছিল অন্তরের নিবিড় যোগ৷‌ এই অনুষ্ঠান শুরুর একটা ইতিহাস আছে। পঞ্চাশের দশকের সূচনায় কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতারমন্ত্রী হয়ে এলেন বি. ভি. কেশকর। কেশকার মশায়ের মাথা থেকে বেরিয়েছিল যে, ‘ফিল্মি গানা’র আগ্রাসন আটকাতে আকাশবাণীর নিজস্ব খরচে নানান ভারতীয় ভাষায় আধুনিক গানও তৈরি করা দরকার। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রায় প্রতিটি আকাশবাণী কেন্দ্রে সরকারী খরচে আধুনিক গান তৈরির বিভাগ খোলেন। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে তার নাম দেওয়া হল ‘রম্যগীতি।’ কলকাতার রম্যগীতি বিভাগে প্রথম প্রযোজকের দায়িত্ব নিলেন সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। ক্রমশ পঞ্চাশের দশকে আকাশবাণী কলকাতার রম্যগীতি বিভাগটি হয়ে উঠতে লাগল অসামান্য সুরসমৃদ্ধ বেশ কিছু আধুনিক বাংলা গানের জন্মভূমি। আকাশবাণীতে কত যে বরণীয় গীতিকার, সুরকারের সৃষ্টি অসাধারণ সব শিল্পীর কন্ঠে মানুষের মন ভরিয়েছে, তার শেষ নেই৷‌
রম্যগীতি সৃজনে আশ্চর্য মমতা ছিল ধ্রুপদী কণ্ঠসঙ্গীতের এক নিজস্ব ঘরানার প্রবর্তক, সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের। তিনি বলতেন, আকর্ষণীয় বাংলা গানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রাগসঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত করাই তাঁর উদ্দেশ্য। রম্যগীতির সঙ্গে কিন্তু রাগপ্রধান গানের তফাৎ আছে। রাগপ্রধান গানে রাগের ভূমিকাই প্রধান, তার প্রকাশের জন্য বাণীর ব্যবহার। আর রম্যগীতিতে গানের ভিতর দিয়ে রাগের প্রবেশ। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ নিজে অপূর্ব কিছু রম্যগীতি গেয়েছিলেন। তাঁর গুণী ছাত্র প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি অসাধারণ গান- ‘নিশীথ শয়নে জাগে আঁখি উদাসী।’কথা ও সুরের মায়াজালে সঙ্গীতাচার্যের সৃষ্টি আরও দুটি অসামান্য গান- ‘কূল ছেড়ে এসে মাঝদরিয়ায় পিছনের পানে চাই’ গেয়েছিলেন বাণী কোনার আর ‘আমি সুরে সুরে ওগো তোমায় ছুঁয়ে যাই’-এর সুরে মুগ্ধ করেছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সুরসৃজনে গোপাল দাশগুপ্তের রচনা ‘বন্ধু হে পরবাসী’ প্রাণ পেয়েছিল মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গায়কীতে। পরবর্তীকালে অজয় চক্রবর্তীর কণ্ঠেও অসাধারণ কিছু গান শোনা গেছে। তাঁর অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরাও অনেকে গাইতেন। সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ছিলেন এক বিরলতম প্রতিভা। একে ভার্সেটাইল জিনিয়াস, তার ওপর উচ্চশিক্ষিত৷ মিউজিশিয়ানদের ক্ষেত্রে সে যুগে এরকম কম্বিনেশন পাওয়া দুর্লভ৷ মূলত তবলা আর কন্ঠসঙ্গীতের গুরু হয়েও সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ আর একটি অনবদ্য কাজ করেছিলেন। ‘গন্ধবিচার’ (সিংহাসনে বসল রাজা বাজল কাঁসর ঘন্টা), ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’(ছুটছে মোটর ঘটর ঘটর), আর ‘নেড়া বেলতলায় যায় ক’বার’(রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা)– সুকুমার রায়ের এই তিনটি অমর সৃষ্টিতে সুর সংযোজনা করেছিলেন। নিজে কন্ঠও দিয়েছিলেন। তিনটি গানই পাঁচের দশকে রম্যগীতির আসরে শোনান হয়েছিল। ওই ধরণের গানের প্রযোজনার আঙ্গিক যে কেমন হতে পারে, তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ। কিন্তু পরবর্তীকালে এই গানগুলি সকলের সামনে আর আসেনি। এমন অতুলনীয় তিনটি গানের সুর-তাল-ছন্দ ও গায়কী নিয়ে আর কোন চর্চাও হয়নি।
রম্যগীতির অনুষ্ঠানে কৃষ্ণা দাশগুপ্তর গাওয়া ‘কে ভুলালে বারেবারে’ তাঁর কন্ঠের সুরে আর যথাযোগ্য বাজনার সঙ্গতে অপূর্ব। পঞ্চাশের দশকে বাঁশের বাঁশির এক অসামান্য প্রতিভা পান্নালাল ঘোষ। তাঁকে ‘বাঁশির ঈশ্বর’ বলা হত। পান্নালাল ঘোষ জাতীয় বাদ্যবৃন্দের কম্পোজার ও পরিচালকের পদ নিয়েছিলেন; পরে আকাশবাণী দিল্লির প্রযোজকও হয়েছিলেন। রম্যগীতিতে তাঁর অবদানও অপরিমেয়। ‘কে ভুলালে বারেবারে’ গানটিতে সুর দিয়েছিলেন পান্নালাল ঘোষের ভাই নিখিল ঘোষ। নিখিল ঘোষের সুরে আরও কিছু চমকপ্রদ আধুনিক বাংলা রম্যগীতি সৃষ্টি হয়েছিল। তার মধ্যে ‘গুনগুনগুন অলি গায়’, ‘ছন্দে ছন্দে’, ‘নদী বয়ে যায় রে’ গানগুলির সুর ছিল ব্যতিক্রমী। নিজে ধ্রুপদী ঘরানার মানুষ হয়েও আধুনিক গানের সুর করতে গিয়ে রাগানুগত্যের বদলে প্রয়োগ করেছিলেন আধুনিক সংগীতের ইডিয়ম। সুপ্রভা সরকার, সুপ্রীতি ঘোষ, উৎপলা সেন, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গায়ত্রী বসু, বাণী কোনার, নির্মলা মিশ্র, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল প্রমুখ- রম্যগীতির আসরে সকলেই ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
ভারত-চীন যুদ্ধের সময় রচিত হয়েছিল‌ বেশ কিছু দেশাত্মবোধক রম্যগীতি। এমনকি বাংলা ভাষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দিতেও বহু রম্যগীতি রচনা করা হয়৷‌ রম্যগীতির সিগনেচার টিউনে ব্যবহৃত হত সানাই, বাঁশি, ঢোল- এইরকম সব নানা বাদ্যযন্ত্র৷‌সেসময় সাধারণ শ্রোতারা প্রিয় আধুনিক গানগুলি মনে রাখতেন গায়ক-গায়িকাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে। আকাশবাণী কলকাতার অনুরোধের আসরে জানানো হত শুধু কণ্ঠশিল্পীর নাম। গানটি কে লিখেছেন আর কে সুর করেছেন, তা ঘোষণা করা হত আকাশবাণীর রম্যগীতি আর আধুনিক গানের ‘লাইভ’ অনুষ্ঠানে।
আকাশবাণীর রম্যগীতির ঐতিহ্য ও ইতিহাস ৬০ বছরের৷‌ পরবর্তীকালে বিনোদনের কত না উপকরণ! বিশেষ করে বৈদ্যুতিন মাধ্যমের অদম্য আকর্ষণ! ফলে মানুষের মন থেকে ক্রমশ রম্যগীতির সেই আবেশ যেন হারিয়ে যেতে লাগল৷‌ একসময় বন্ধ হয়ে গেল রম্যগীতি। আজও রেডিওতে পুরনো সেইসব গান মাঝে মাঝে শোনা যায়৷‌ ছোটবেলায় শোনা প্রিয় গানগুলির স্মৃতি কখনও বুড়ো হয় না। রেডিওর সোনালি দিনের সেইসব রম্যগীতি শ্রোতারা যেসব কণ্ঠে শুনেছিলেন সেদিন, তাঁদের স্মৃতিতে সেই কণ্ঠগুলি আজও অমলিন। সেই কন্ঠগুলির বয়স বোধহয় বাড়েনি আজও। কিন্তু রম্যগীতির গুরুত্ব ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আজকের শ্রোতারা হয়তো তেমন কিছুই জানেন না৷‌ এমন সমৃদ্ধ ও অতুলনীয় এক সঙ্গীতধারা এখনকার প্রজন্মের কাছে অধরাই থেকে গেল।

রেডিওর হারিয়ে যাওয়া অনুষ্ঠান বলতে মনে পড়ছে ‘বিদ্যার্থীদের জন্য অনুষ্ঠান’-এর কথাও। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সিলেবাসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হত দুপুরবেলা। নির্দিষ্ট বিষয়ের একজন মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে থাকতেন সেই স্কুলের পড়াশোনায় সেরা তিন-চারজন ছাত্র। আলাপচারিতায় বেশ প্রাঞ্জল করে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু ক্রমশ বাড়তে থাকা কম্পিটিশন আর কোচিং সেন্টারের সংখ্যা ও রমরমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না রেডিওর এই অনুষ্ঠানটিও। হারিয়ে গেল সময়ের স্রোতে।

কারোর কি মনে পড়ে ‘কৃষিকথার আসর’ আর ‘মজদুরমন্ডলীর আসর’-এর কথা? কাজের শেষে মাঠ থেকে ফেরা চাষীভাইরা সমবেত হতেন মোড়লের বাড়ির দাওয়ায় কিংবা গ্রামের চন্ডীমন্ডপে। সেখানে কৃষিকথার আসরে মোড়লের সঙ্গে আলোচনায় সমাধান হত তাঁদের নানা সমস্যার। কথায় আর আবহে সত্যি যেন ফুটে উঠত অল্প আলো-জ্বলা সন্ধ্যের চন্ডীমন্ডপ। কেমন এক অদ্ভুত মায়াবি পরিবেশ সৃষ্টি হত যেন। মজদুরভাইদের অসম্ভব সহায়ক অনুষ্ঠান ছিল ‘মজদুরমন্ডলীর আসর।’ গ্রামের সেইসব মায়াবি চন্ডীমন্ডপ আজও রয়ে গেছে, আছেন চাষী আর মজদুর ভাইরাও। কিন্তু রেডিও থেকে চিরকালের মত হারিয়ে গেছে কৃষিকথার আসর আর মজদুরমন্ডলীর আসর।

রেডিও শ্রোতাদের শ্রবণসুখের একটা স্বর্ণযুগ এল ’৭০-এর দশকে বিবিধ ভারতী প্রচার তরঙ্গের মাধ্যমে। শুরু হল বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের অনুষ্ঠান। বাইরের প্রোডিউসাররা বিজ্ঞাপন দাতাদের স্পনসর্ড প্রোগ্রাম পৌঁছে দিতে লাগলেন রেডিওতে। একেবারে অন্য মাত্রা পেল শ্রবণ বিনোদন। আর কী নেই সেই বিনোদনের পশরায়! গান, নাটক, ধারাবাহিক, অন্ত্যাক্ষরী, ক্যুইজ, হাজারো প্রতিযোগিতা। জিতলেই হাতে গরম পুরস্কার। রমরম করে এই বিজ্ঞাপনী ধামাকা জুড়ে ছিল ’৭০, ’৮০ আর ’৯০ দশকেরও অনেকটা সময়।
স্মৃতির সরণী বেয়ে পিছু ফিরে চাইলে মনে পড়ে বেশ কয়েকটি এমন অনুষ্ঠান, যা ছিল সেই সময়ের শ্রোতাদের নিত্য শ্রবণসঙ্গী। বোরোলীনের সংসার, বাটা-র গল্পের আসর, হাতুড়ি মার্কা ফিনাইল এক্স-এর শনিবারের বারবেলা, কেয়োকার্পিন নাটকের দিন, শালিমারের নাটকের আসর, সিফোম ক্যুইজ কনটেস্ট, সিফোমের রূপকথার আসর, হরলিক্সের সুচিত্রার সংসার, ওয়েসিস কিছু কথা কিছু গান, পি-থ্রী রহস্য সিরিজ, অমর কাহিনী আরব্য রজনী...কী নয়!
নাটকের বৈচিত্রের তো কোন সীমা পরিসীমা ছিল না বিবিধ ভারতীতে। দেশি বিদেশী কত অজস্র কাহিনীর যে নাট্যরূপ প্রচারিত হয়েছে! একদিনের পূর্ণাঙ্গ নাটক বা গল্প; আবার বছরের পর বছর ধরে চলা ধারাবাহিক নাটক। এক দিকে যেমন ‘পথের দাবী’ বা ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ চলছে প্রবল উচ্ছ্বাসে, অন্যদিকে শ্রোতারা শিহরিত হয়েছেন গড ফাদার, ডঃ জেকিল অ্যান্ড মিঃ হাইড, কিংবা ড্রাকুলা শুনতে শুনতে। জেমস হেডলি চেজ, হ্যারল্ড রবিন্স, ব্রাম স্টোকার- জগৎ বিখ্যাত থ্রিলার লেখকরা অনুবাদের মাধ্যমে নাট্যরূপে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বেতার যন্ত্রে। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় কয়েকটি নাম তখন বার বার ফিরে ফিরে আসত। কল্যাণসুন্দর, উদয় বসু, অরুণাভ গাঙ্গুলী ও অপর্ণা গাঙ্গুলী, স্বরাজ বসু...।
তবে সব্বাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিল দুটি নাম- জলদমন্দ্র কন্ঠ নিয়ে কাজী সব্যসাচী এবং অবশ্যই শ্রাবন্তী মজুমদার। একটু হাস্কি ভারী গলা, তার সঙ্গে এক চিমটে ন্যাকামি আর মাঝে মধ্যে কথায় একটু ইন্টিমেট সেক্সি পরশ তাঁর কন্ঠকে আরো মোহময়ী করে তুলেছিল। ঐ পর্বে শ্রাবন্তী মজুমদার রেডিওর অবিসংবাদিত বিজ্ঞাপনরাণী। শুধু উপস্থাপনাই নয়; অজস্র সুপরহিট অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং, এডিটিং, আবহসঙ্গীত সব দায়িত্ব একা হাতে সামলাতেন শ্রাবন্তী। তাঁর মেন্টর কর্ণেল বোসের (সি.বি.)-র কথাও উল্লেখ করতেই হয়। শুনেছি, ‘লিভিং সাউন্ড’ স্টুডিওতে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল গাইতে এসেছিলেন শ্রাবন্তী। কর্ণেল বোসই, শুধু গান গাওয়াই নয়; আরও কিছু প্রতিভার উন্মেষের সম্ভাবনা দেখেছিলেন তাঁর মধ্যে। নিজে দায়িত্ব নিয়ে খুঁটিনাটি শিখিয়েছিলেন শ্রাবন্তী মজুমদারকে। তারপরেরটা তো ইতিহাস।
লিভিং সাউন্ডের মতই অরূপ গুহঠাকুরতার ‘অ্যাডমেকার্স’-ও রেডিওর বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের নাটক প্রযোজনা করত। এমনকি ফটিকচাঁদ চলচ্চিত্র নির্মাণেরও আগে সেই অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায়। মূলত রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনীতেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। মৌলালির মোড়ে গোবিন্দবাবুর স্টুডিওতে বসে এমন অজস্র নাটক রেকর্ডিং আর এডিটিং করেছেন নগেন দত্ত। এইসব নাটকের নাট্যরূপ যাঁরা করতেন নিয়মিত, তাঁদের মুনশিয়ানার কোনও তুলনা নেই। এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য মিহির সেন। মূলত সাহিত্যিক, তবু এই বিজ্ঞাপনী দাপটে কত হাজার গল্প উপন্যাসের যে সার্থক নাট্যরূপ দিয়েছেন মিহির সেন, তার ইয়ত্তা নেই। মনে হয় সে সবই গেছে কালের স্রোতে হারিয়ে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে বাংলা সাহিত্যে নাট্যরূপায়িত সম্ভার হিসেবে তা চিরকালের সম্পদ হতে পারত। অভিনেতা-পরিচালক শ্যামল সেনও বেশ কিছু নাট্যরূপ দিয়েছেন। আর একজন ছিলেন, শুধু নাট্যরূপ দিতে নয়, নাটক রচনাতেও সিদ্ধহস্ত। তিনি স্বরাজ বসু। বিশিষ্ট অভিনেতা গঙ্গাপদ বসুর পুত্র। শুনেছি, তাঁর লেখার পাতায় যে সব পাংচুয়েশন থাকত, সেগুলো ঠিক মত অনুসরণ করলেই অভিনেতারা অভিনয়ের সমস্ত ইঙ্গিত পেয়ে যেতেন। এ এক বিরলতম লেখার স্টাইল। কন্ঠও ছিল তাঁর অসাধারণ। দুরূহ সব চরিত্রে অভিনয় করে মুগ্ধ করতেন রেডিওর শ্রোতাদের।
অবশ্য কে-ই বা অভিনয় করেননি সেসময়ে বিবিধ ভারতীর এইসব নাটকে! বিকাশ রায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, ভানু চট্টোপাধ্যায়, মনু মুখোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তু মুখোপাধ্যায়, ধীমান চক্রবর্তী, শ্যামল সেন, কৌশিক সেন, সৌমিত্র বসু, দেবরাজ রায়, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, গৌতম চক্রবর্তী, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়; তারপর শাঁওলী মিত্র, মমতা চট্টোপাধ্যায়, কাজল চৌধুরী, ঊর্মিমালা বসু, সুমিতা বসু, নমিতা চক্রবর্তী, মুক্তি মুখোপাধ্যায়, রণিতা দাশ, আভেরী দত্ত...ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছি...মনে পড়ছে আবার মিলিয়েও যাচ্ছে এমন কত নাম। এঁদের অনেকেই তখনই রীতিমত সুবিখ্যাত। আর অনেকে পরবর্তীকালে অভিনয়ে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন। আলাদা করে গৌতম চক্রবর্তী প্রসঙ্গে দু’কথা না বললেই নয়। কি আকাশবাণীর নাটক, কি বিবিধ ভারতী, দু’জায়গাতেই গৌতমের ভূমিকা অসামান্য। অনেকের মতে উনি প্রায় ‘রেডিওর উত্তমকুমার।’ ছিপছিপে রোগা পাতলা চেহারা, কিন্তু জলদমন্দ্র কন্ঠ। চেহারা আর কন্ঠের অদ্ভুত এই বৈষম্যই বোধহয় চলচ্চিত্রে বা টিভি সিরিয়ালে গৌতমের সাফল্যের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে রেডিওতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। গৌতমের অকালমৃত্যুতে সত্যি বঞ্চিত হয়েছিলেন রেডিও শ্রোতারা। যত দূর মনে পড়ে, টোনাল কোয়ালিটিতে কোথায় যেন তাঁর একটা সূক্ষ্ম মিল ছিল সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সেটাও শ্রাবন্তী মজুমদারের আবিষ্কার। পি-থ্রী রহস্য সিরিজে ‘ডঃ জেকিল অ্যান্ড মিঃ হাইড’ নাটকে ডঃ জেকিল সতীনাথ মুখোপাধ্যায় আর মিঃ হাইড গৌতম চক্রবর্তী- রেডিও নাটকে বেশ একটা সেনসেশন তৈরি করেছিল। মুগ্ধ করেছিল শ্রোতাদের। এই নাটকেই একটা বিশিষ্ট চরিত্রে অভিনয় করতেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্প শুনেছি, প্রায় সবসময়েই দুধসাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে লিভিং সাউন্ডে আসতেন তিনি। তখন তো আর সব স্টুডিও ফ্লোরে এত এ.সি.-র চল ছিল না। বিশেষ করে গরমকালে প্রত্যেককেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও রীতিমত গা ঘামিয়ে অভিনয় করতে হত। শোনা যায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রসিকতা করে বলতেন, ‘বাড়ি থেকে বেরোবার সময় বলে এলুম, যাই একটু ঘেমে আসি।’ তারপরই তাঁর সেই উদাত্ত হাসি, যা অব্যর্থভাবে মনে পড়িয়ে দিত শের আফগান কিংবা রেডিওর নাটক, নেফা সুন্দরী নেফা।

ফেলে আসা সেইসব মায়াবি রোববারের দুপুর বারোটায় সব বাড়ি থেকেই ভেসে আসত রেডিওর গমগমে আওয়াজ। হাওয়ায় ভাসত বড় আলু আর গোটা পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করা কচি পাঁঠার ঝোলের সুঘ্রাণ। আর শ্রাবন্তী মজুমদারের মোহময়ী কন্ঠে শোনা যেত বিজ্ঞাপনী জিঙ্গল:
‘শুষ্কতার, রুক্ষতার অবসান যদি চান
বারোমাস সারা অঙ্গে মেখে নিন
সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রীম বোরোলীন।
ত্বক যদি কেটে যায়, ফেটে যায়, খসখসে যদি হয়,
রোদ্দুরে ঝলসায়, সারা অঙ্গে মেখে নিন
সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রীম বোরোলীন।’

রোববারেই হত ওয়েসিস ‘মনের মত গান, মনে রাখার কথা।’ শ্রোতাদের নানান প্রশ্নের চটজলদি উত্তর দিতেন শ্রাবন্তী মজুমদার। তার মাঝে মাঝে বাজত বিখ্যাত সব গান। অনেকেই অবাক হয়ে ভাবতেন, কি অসম্ভব স্মার্ট উত্তর! এক্কেবারে ঠোঁটের ডগায় রেডি! আসলে, শ্রোতাদের চিঠির এক পিঠে ছোট্ট ছোট্ট করে দুর্দান্ত স্মার্ট উত্তরগুলো লিখে দিতেন মিহির সেন। ওয়েসিস জিঙ্গলটাও ছিল বেশ মন-কাড়া, শ্রাবন্তী মজুমদারেরই গাওয়া:
‘মাথার ঘন চুল যখন
মরুভূমি হয়ে যায়
ওয়েসিস নিয়ে আসে মরুদ্যান
মেঘের ছায়ায় ছায়ায়।’


আরও একটা ভারি মজার জিঙ্গল ছিল জ্যাবোর্যা ন্ডির:
‘রাবণরাজার টাক ছিলো
পরচুলাতে ঢাকছিলো
জ্যাবোর্যাান্ডি মেখে মাথায়
চুল এলিয়ে হাসছিলো।’

রোববারে দুপুর দুটো নাগাদ হতো ‘অমরকাহিনী আরব্যরজনী,’ ধারাবাহিক। তাতে অবশ্য এত মাখো মাখো আবেগমথিত কন্ঠে ‘আমার জান’, ‘আমার কলিজা’, ‘পেয়ারা’, ‘পেয়ারি’, ‘দিলকা টুকরা’- এইসব বলা হত যে ছোটদের সেসব শুনতে দেওয়া হত না মোটেই। তখন স্টেশন পাল্টে একেবারে সোজা কলকাতা ক।

আর একটা অনুষ্ঠানের কথা না বললেই নয়। হয়তো একবার যাঁরা শুনেছেন, আর ভোলেননি! একেবারে প্রথমে বলা হত- “শুরুহচ্ছে, হাতুড়ি মার্কা ফিনাইল এক্স নিবেদিত, বিশেষবেতারঅনুষ্ঠান, ‘শনিবারের (খানিকক্ষণ ইকো) বারবেলাআআআ...’(আবার ইকো)।”আর তারপরেইসেই মোক্ষম ক্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ চ...। দরজার আওয়াজ। ওই দুপুর রোদেই কেমন যেন একটা গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়ে যেত মুহূর্তে!
এইরকমই কথায় গানে গল্পে নাটকে- নানা রঙে ভরা ছিল রেডিওর সেইসব দিন। সোনা ঝরা শোনার দিন।

না, দৃশ্যমান নয়, সবটাই শ্রাব্য। শুধু কন্ঠ দিয়ে আর আশ্চর্য স্বরক্ষেপণে অচেনা, অদেখা কিছু মানুষ গল্পের এক একটা চরিত্র হয়ে উঠে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-আবেগ, হাসি-কান্নার রোলার কোস্টারে চড়াতেন শ্রোতাদের। ছোটবেলায় প্রথমে শিশুমহল, তারপর গল্পদাদুর আসর এবং তারও পরে বিবিধ ভারতী ছিল আমার ‘গল্প বলা বন্ধু।’ গল্প শেষ হওয়ার পরও কাটতে চাইত না মুগ্ধতার ঘোর। কল্পনার অবাধ তেপান্তরের মাঠে ইচ্ছে মত ছুটিয়ে দিতাম পক্ষীরাজ। কত মন খারাপের দুপুর-বিকেলে মন ভালো করা কমলা রঙা রোদ্দুর এনে দিত এইসব গল্প আর গান। কালক্রমে সিন্দুক-প্রমাণ ভাল্ভ রেডিওর জায়গা নিল আধুনিক প্রযুক্তির ট্রানজিস্টার। ছোট হতে হতে কিছু কিছু এমন মডেল তৈরি হল, যা প্রায় হাল আমলের সেলফোনের সাইজ- অনায়াসে পকেটে ঢুকিয়ে নেওয়া যায়। হাতে হাতে, কানে কানে রেডিওর জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা এনে দিল ব্যাটারিচালিত ট্রানজিস্টার। এর পাশাপাশি নব্বই দশকের মাঝামাঝি তথ্য-প্রযুক্তি আর টেলিভিশনের দৌলতে বদলে গেল বিনোদনের ধরণ। বিজ্ঞাপনের ধরণও। উন্মুক্ত আকাশ হারিয়ে কল্পনার পক্ষীরাজ আটকে পড়ল টেলিভিশনের বাক্সে। শেষে বন্ধই হয়ে গেল বিবিধ ভারতীর বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের বাংলা অনুষ্ঠান। হারিয়ে গেল গল্পের সেইসব সোনার খনি। শিশুমহল আর গল্পদাদুর আসরের স্বর্ণযুগও গত হয়েছে। অনুষ্ঠানদুটো আজও হয়, কিন্তু শোনে কই শিশু-কিশোররা!

জীবন থেকে যা চলে যায়, চিরদিনের জন্যেই কি যায়! কিছু কিছু হয়তো ফিরে আসে, কিছু যায় হারিয়ে চিরতরে। বিবিধ ভারতীর ধারাবাহিক অনুষ্ঠানগুলোর শেষে প্রতি সপ্তাহে আবার ফিরে আসার কথা বলা হত নিয়ম করে। মনে পড়ে কাজী সব্যসাচীর কন্ঠ: “এরপরের অংশটুকু শোনার জন্য নিশ্চয়ই ছটফট করছেন? আগামী সপ্তাহে ঠিক এই দিনে এই সময়ে রেডিও খুলুন।” তারপর প্রতীক্ষা গোটা সপ্তাহের। কিন্তু এক সময়ে সপ্তাহ পেরিয়ে, মাস পেরিয়ে বছর গেল, প্রতীক্ষার অবসান আর হল না! হারিয়েই গেল সেইসব কমলা রোদ মাখা দিন, মন ভালো করাদিন। স্বপ্নকন্ঠ কাজী সব্যসাচী আর নেই। ইংল্যান্ডের অনতিদূরে আইলস অফ মান-এ রেডিও থেকে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে শ্রাবন্তী মজুমদার। আজও ত্বক রুক্ষ থাকে, শুষ্ক হয়, রোদ্দুরে ঝলসায়। আজও বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হয়ে আছে বোরোলীন। নেই বিবিধ ভারতীর সেই মন মাতানো জিঙ্গল “বারোমাস সারা অঙ্গে মেখে নিন……।” লক্ষ লক্ষ শ্রোতারা আজও আচ্ছন্ন হয়ে আছেন নস্ট্যালজিয়ায়।সোনা ঝরা শোনার দিন হারিয়ে গিয়ে রামধনুর রঙ মাখা কিছু ছবি আর নস্ট্যালজিয়াটুকুই শুধু রয়ে গেল মনের কোণে, স্মৃতির রঙিন পাতায় পাতায়।