ক্যামিলিয়ান ও জাদুকর

সূর্যস্নাত বসু



চুড়িহাটির দোকানগুলোর শাটার একটার পর একটা নেমে যাবার পর রাজু এক মুহূর্তও ভাবে নি । পাশেই এক খুপরি গলি । গলির বাঁদিকটায় চৌকোণ টিনের দুটো কৌটো বেওয়ারিশভাবে পড়ে আছে । হাফ লিটার তেলের টিন হবে হয়ত । ফাঁকা । রাজু এদিক ওদিক তাকিয়ে নিল দুবার । তারপর ডান হাতের দুটো আঙুল আলতো করে প্রথমে কপালে তারপর বুকে ঠেকিয়ে একটু চুমু খেয়ে নিল । ওপরের দিকে (খুব সম্ভবত ভগবানের উদ্দেশ্যে) তাকিয়ে কি যেন একটা বিড়বিড় করে বলল । তারপর ছেঁড়া ধূসর কোট-পকেট ফাঁক করে টুক করে পুরে ফেলল কৌটো দুটো ।

‘একটায় হাল্কা গোলাপি আর একটায় লাল রঙ ঢালব । আয়নার পেছন দিকটায় প্রচুর ইঁদুর হয়েছে । রঙের কৌটোগুলো ও ব্যাটারাই কেটেছে ।’

তবে ওসব তো প্লাস্টিক ছিল, ইঁদুর তো আর টিন কাটতে পারে না--- এই ভেবে খানিক নিশ্চিন্ত হল রাজু । আজ রোববার । দোকানপাট যে হারে বন্ধ হচ্ছে, তা দেখে রাজুর কপালে টান পড়ল । সাত রকমের ফেব্রিক, বারোটা লিপস্টিক, পাউডার, পরচুল আর পাঁচটা বিভিন্ন রঙের সুতোর বাণ্ডিল কিনতে হবে । কুন্তলদার দোকান চৌমাথায় । হরতালের দিনও কেউ ওকে কখনওই দোকান বন্ধ রাখতে দেখে নি । সব রকমের প্রলেতারিয়েতদের তাই কুন্তলদাই ভরসা । রাজুরও তাই ।

‘গতরাতে হাফ লোড হয়ে প্রায় মারাই গেছিলাম । একে শীতের সময় । ছেঁড়া কাঁথা, আর যে কয়াটা জামা আছে প্রায় সবই গায়ে জড়িয়ে নাক ডাকছি । এমন সময় কোথাকার কোন শুয়ারের বাচ্চা শালা সিঁদ কেটে চুরি করলি ? আর করলি তো করলি তাও কার ঘরে ? আমার ? রাজু বহুরূপীর ?’ দুহাত দিয়ে কোমর ধরে রাজু চেঁচাল । সঞ্জয়, রাজুর পাড়াতুতো বন্ধু ও এক সময়কার গাঁজা-পার্টনার সবটা শুনে বলে উঠল, ‘বাআআআআআল’ । সেও রাজুর সাথে বাজারে এসেছে । রাজুর বাড়ির গলির ঠিক মুখে সঞ্জয়ের দোকান । লটারি টিকিটের । এক ক্ষয়ে যাওয়া জঙ পড়া লোহার টেবিলের ওপর তার লটারি-আঁতাত । বিক্রিবাট্টা খুব সামান্যই । রাজু প্রতিবার হাটে যাওয়ার আগে সঞ্জয়ের দোকানে সাইকেল রাখে । এবং যেহেতু সঞ্জয়ের দোকান মেইন রোডের ধারে, কাজে, রাজুও খুব ইসিলি সঞ্জয়ের দোকানের পাশ থেকেই বাস-ফাস ধরে কখনও ফালাকাটা, কখনও ধূপগুড়ি, কখনও বা ময়নাগুড়ির হাটে চলে যেতে পারে ।

এদিকে পূর্ব সীমান্তে আজ সেনাবাহিনীর টহলও চলেছে জোর কদমে । রাস্তাঘাট আজ ফাঁকা । ল্যাম্পপোস্টের তারে দু-একটা ফিঙে ছাড়া কেউ কোত্থাও নেই । খুখুলুং বস্তি ও তার সংসগ্ন এলাকা হয়ে কাল রাতেই ফেরার হয়েছে বিজন রায় ওরফে রবার্ট ও তার শাগরেদরা । পুলিশের অনুমান আঙড়াভাষা পার করে ধূপগুড়ি ছাড়িয়ে সে এখন চ্যাংড়াবান্ধার দিকে । ওপারেই বাংলাদেশ । সেখানে তার সহচরেরা তার জন্য নিশ্চয়ই অপেক্ষা করে আছেন ।

গন্তব্য সেই পূব দিকে হওয়ার জন্যই রাজু হঠাৎ বলে উঠল, ‘হ্যাঁ রে , আর্মি ফার্মি কেন ?’

‘ওই যে কে এল ও নেতা বিজন না কি, কাল পালিয়েছে না আমাদের আঙড়াভাষা দিয়ে ? তাই...’

‘তা সে তো কাল ফুটেছে, এখন কি আর আছে এখানে ? এরাও পারে মাইরী !’

‘না না শুনলাম, ও গতরাতে আঙড়াভাষার কয়েজনের ঘর থেকে কিছু চুরি-ডাকাতিও নাকি করেছে । দেখ আবার তোর ঘরে তোর সাজবার সামানগুলোও ওই হাতিয়েছে নাকি...’

রাজু হঠাৎ থেমে গেল । তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল--- ‘ ধুর ! ও শালা আমার জিনিস নিয়ে কী খই ভাজবে ? কি যে বলিস তুই না... ?

সামনেই কুন্তলদার দোকান । এক্কেবারে বড় রাস্তার ধারে । কিন্তু এ কী ! আজ কুন্তলদার দোকানও দেখছি বন্ধ । শরীর ঠরীর খারাপ হল না কি ? দূর থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছে, কয়েকজন মাঝবয়স্ক উর্দিধারী পুলিশ দোকানের সামনে এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন । খানিক কাছে আসতেই রাজু ব্যাপারটা পুরো বুঝতে পারল । সীজ হয়েছে দোকান । দোকানের সিঁড়ির ওপর বসে খইনী ডলছিলেন কনস্টেবল মানিক’দা । রাজুর দিকে ডান হাতটা আলতোভাবে উঠিয়ে বলে উঠলেন, ‘কী র‍্যা বেজন্মা, শালা এদিকে কী তোর ? পেছনে লাঠি ঠোঁকাব ?’

‘কী হয়েছে মেজদা এই-এই-এইখানে ?’

‘তা দিয়ে তোর কী শুয়ার ? যা ভাগ শাআআল্লা নওটোঙ্গী ।’

সঞ্জয় তড়িঘড়ি এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে রাজুকে সেখান থেকে নিয়ে পালাল ।



আজ বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়েছে । রাজুর হাত কোটের পকেটে । এদিকে সঞ্জয় নিজের হাতদুটোকে বগলদাবা করেছে । এই বেলা দশটার দিকেও কী ভীষণ কুয়াশা । দশ মিটার দূরের জিনিসকেও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না । মাঝেমধ্যে দূর থেকে একটা-দুটো লরির হেডলাইট চোখে পড়ছে । কুয়াশা কোনমতে ভেদ করে সেই অতি সামান্য ধূসর-সোনালী আলো পৌঁছে যাচ্ছে চোখে । অমনি সতর্ক হয়ে রাস্তার বাঁ দিকে সরে যাওয়া---এইসব চলছে সঞ্জয় রাজুর মধ্যে । কিন্তু কেউই তেমন কথা বলছে না । রাজু এমনি তে খুব রোগা, কিন্তু গায়ে বেশ জোর আছে । পাশাপাশি আছে অদ্ভূত শারীরিক সক্ষমতা । শেষ যে কবে ওর সর্দি লেগেছিল, তা বলা মুশকিল । মাথা বাদ দিয়ে সারা শরীরে বিন্দুমাত্র লোম নেই । ফলে বহুরূপীর সাজে মাঝেমধ্যেই ওকে নকল দাড়ির শরণাপন্ন হতে হয় । লম্বায় প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি । ফলে একমাত্র চার্লি চ্যাপলিন সাজা ছাড়া রাজুকে তেমন কোন অসুবিধের সম্মূখীন কখনওই হতে হয় নি । রাজু নিজেকে জাত শিল্পী বলে । ওর বাপ-দাদুরাও এই পেশায় নিযুক্ত ছিল । সেলফ-অ্যাপোয়েনটেড আর কী । শিব-কালী-কৃষ্ণ-দৈত্য-হ ুমান-ঘোড়াসমেত ঘোড়চালক আরও কত কী-ই না সাজা হয়ে গিয়েছে রাজুর এই ক’বছরে ।

‘মোটামুটি হাজার লাগে বুঝলি একমাসে । এক মাস মানে তো আট দিন । সপ্তাহে তো দুইটা হাটবার । আর প্রতি হাটে হল গিয়ে তোর এই ধর তাও তিন থেকে চারশো । এইভাবে মাস গেলে হাজার তিন হয়ে যায় । জানিসই তো । কিন্তু এই টাকায় কী আর চলে আজকাল ? বাড়িতে বুড়িটাও তো আছে । একে শালা কামাই নেই, তার ওপর গুষ্টির চুরি । পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে মাইরী মাঝেসাঝে ।’

‘হুম... কিন্তু তুই হীরাচান্দের মুদি দোকানে যখন ছিলিস, এক্সট্রা ইনকাম তো ছিলই বল ? ছাড়লি কেন ? এখনও তো পারিস, জোয়ান আদমি । এই তো সেদিন নরেন’দা ওর ইস্টেশনারী দোকানে এক ছেলেকে রাখবে বলে খোঁজ করছিল । চাইলে বল, আমি কিছু ইনতেজাম করি ?’ সঞ্জয় বলে ওঠে ।

‘না না, আমার তো ভাবনা ঠাবনা আছে না কী ? তোর মত তো সারাদিন ভাঙা টেবিল নিয়ে পড়ে থাকি না, ভাবতে লাগে ... বুঝলি কি বলছি ? এটা তো একটা শিল্প । ভাবনা ছাড়া শিল্প হয় ? সেই ভাবার টাইমটা তো দরকার, না ? আমার এই আর্ট খুব কঠিন । খুব খুব । একটা আলাদা আন্দাজ থাকতে লাগে । সবাই পারে না । তাই দেখ না এখন এসব আর দেখাই যায় না । এই পুরো ধূপগুড়ি-ময়নাগুড়িতে আমি একা । মনে আছে, মনে আছে , সেই চার বছর আগে কোন এক মেগাজিন আমার কাছে এসেছিল ইনটারভু না কি বলে সেটা নিতে... ?’

সঞ্জয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং তারপর কিছুটা আশ্বস্ত হয় এটা দেখে যে কথা বলতে বলতে তারা খানিক আগেই তাদের বস্তিতে ঢুকে পড়েছে ।



বস্তির পাশ দিয়ে কী একটা নদী বয়ে গেছে । বছরের বেশীরভাগ সময়েই সেখানে জল থাকে না । পাড়ের দিকে কিছুটা জল আছে বৈ কী, তবে তা নিতান্তই সামান্য । ওই পারে শ্মশান । আর শ্মশানের ঠিক পরেই জঞ্জাল ফেলার বিরাট গর্ত । বস্তির মুখেই একটা কল । সারাক্ষণই পরিষেবা দিয়ে চলেছে । অজস্র সরু গলির মধ্যে মাঝে মাঝেই বস্তির অনেক ঘরবাড়ির বারান্দা, উঠোন, কুয়োর পাড় ইত্যাদি ।

‘কী রে রাজু, কই চললি ?’ বস্তির এক বৃদ্ধ রিটায়ার্ড প্রাইমারী স্কুল মাস্টার রাজুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন ।

‘আরে আর বলো না, কাল তো বড়দিন । বীরপাড়ার ওই ইয়েটা আছে না ? আরে বল না কী বলে ওটাকে...’ , সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে রাজু বলে উঠল ।

‘চা...চা...চার্চ ?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ ঐ , তা ওখানে আমায় আবার বড়দিনের ঐ মোটা বুড়োটা সাজতে হবে । পুরো দেড় পাচ্ছি, হে হে...’

‘তা সাজতে হবে তো এখন কোত্থেকে এলি ? একে গণ্ডগোল বাইরে, শুনিস নি নাকি ?’

‘কেন কী হয়েছে ? হ্যাঁ আদবকায়দা , যা দেখলাম বাইরে, ঠিক ভাল ঠেকল না । কিন্তু আমি না গিয়েই বা কোথায় যাই বল, কাল রাতে আমার আবার ওই বুড়াটার ড্রেসটাই চুরি হয়েছে । তাই তো রমেনদার কাছ থেকে সক্কাল সক্কাল ওদের নাটকের কিছু জামা প্যাণ্ট চাইতে গেছিলাম । আমি আগের বার দেখেছিলাম ওদের ঐ রকম একটা পোশাক আছে । কিন্তু কাল রাতেই নাকি রমেনদাকে পুলিশ ধরেছে...’

‘শুধু রমেন না রে, আরও অনেককে । তোদের দোস্ত কুন্তলও তো ফেসে গেছে...’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ কী হয়েছে বলতো কুন্তল’দার ? ওর দোকানটাও তো দেখলাম সীজ হয়েছে ।’ নাকটাকে খানিকটা উপরের দিকে তুলে ভ্রু যথাসম্ভব কুঁচকে সঞ্জয় বলে ওঠে ।

‘ওদের কি একটা ভাষা আছে না ? ভালো করে বললে ওটা এই যে আমরা বাংলা কথা বলি, তারই উপভাষা । সেই উপভাষা বা ভাষা যাই বলি না কেন, তা আর শোনা যায় না । তবে শোনা যায় না---এই কথাটাও ভুল । শোনা যায় তবে পুরোপুরি খাঁটি না । কিছুটা বাংলা, কিছুটা ওদের ভাষা এবং কিছুটা রংপুরী বাংলা মিক্সড করে ওরা এখন কথা বলে । ফলে ভাষাটা পুরোপুরি হারিয়েই যাচ্ছে বলতে পারিস । ওদের ছেলেমেয়েরা এখন কনভেণ্টে পড়ে । বাড়ির বাবা-মায়েরা ওদের নিজেদের ভাষাটাকে আর তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে রেখে দিতে চায় না হয়ত । কারণ তাদের ধারণা , এই ভাষায় কথা বললে তাদের আর কেউ স্মার্ট বলবে না...’

ক্লাস টুয়েলভ অব্দি পড়া রাজু খানিক্ষণ ভাবল । তারপর হঠাৎই বলে উঠল, ‘ঠিক...ঠিক... এই যেমন ধরো আমিও আমার এই পেশাটাকে খুব ভালবাসি । তাই আর চাকরী-বাকরীর চেষ্টাই করি নি । অথচ আমি চাইনা আমার ছেলে যদি হয়, সে এই পেশায় আসুক ।’

‘কেন রে ?’ মাস্টার তাঁর আধ-ভাঙা চশমাটাকে স্যাণ্ডো গেঞ্জিতে ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞেস করলেন ।

‘অ্যাঅ্যা...... কেন ? আমি চাইনা । চাইনা তাই । যাকগে, হ্যাঁ বলো তারপর...?’

‘তারপর আর কি ? প্রায় দুই যুগ ধরে ওরা আন্দোলন করছে । খুন-খারাপি না । এমনি অহিংস বুঝিস ? মানে ওই মিছিল ফিছিল করে, দাবী ঠাবি রেখে আর কী ।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি বুঝেছি । তা সেটা কী অপরাধ যে পুলিশ ধরবে ?’ ---বেশ কনফিডেণ্ট হয়ে সঞ্জয় বলে উঠল ।

‘না না অপরাধ হতে যাবে কেন রে ? আসলে পুলিশের সন্দেহ তাদের সাথে জঙ্গী রবার্টের যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে ।’

‘সে আবার কে ?’ অদ্ভূত এক অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে রাজু তাকায় ।

‘রবার্ট ও তার অনুযোগীরা ভাষা ও রাজ্যের দাবী নিয়ে অনেকদিন ধরেই অনুনয় বিনয় করে চলেছিল । কিন্তু সবশেষে যখন দেখল যে এসব করে কিস্যু হচ্ছে না । হাতিয়ার তুলে নিল । অনেকে কবিতাকে হাতিয়ার করে । অনেকে প্রবন্ধ-গল্প-গদ্যকে । অনেকে গান-নাটক-সিনেমাকেও । কিন্তু প্রবল মুক্তিকামীরা হাতিয়ারকেই হাতিয়ার করে ফেলে । সমাজ এদেরকেই জঙ্গি বলে । কেনো রে ব্যাটা পেপার পড়িস না নাকি ?’

‘পেপার ? ধুৎ তোমার ওই পেপার-কবিতা-গল্পের কাগজ-পিচবোর্ড এসব দিয়ে তো আমি মুকুট বানাই ।’

হো হো করে হেসে ওঠেন মাস্টারমশাই । ছোটোবেলায় রাজু ক্লাস ফোর অব্দি ওনারই স্কুলে পড়েছেন । রাজুর বাবা ছিলেন রাজুরই মত বহুরূপী । ইনফ্যাক্ট এটা ওদের খানদানি ব্যবসা । লাঠি-স্যাটা নিয়ে রাজুর বাবা ছেলেকে পড়াতে বসাতেন । কিন্তু ছেলের মন পড়ে থাকত আয়নায় আর আয়নার পাশেই রাখা বড় টিনের ট্রাঙ্কে । এই দুটোই ছিল ওদের আসবাব । আর কী-ই বা লাগে এক বহুরূপীর ? শিল্পীর যেমন তুলি, রং আর একটা ক্যানভাস হলেই যথেষ্ট, কবির যেমন কলম আর খাতা নিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে ফেলা সম্ভব, রাজুরও তাই মনে হত যে একটা মেক আপ বক্স আর একটা আয়না নিয়েই বহু বছর জেগে থাকা যাবে । কখন হাট বসবে , কখন ওর বাবা ট্রাঙ্ক খুলে সাজগোজের জিনিসপত্র বার করবেন । আর তারপর ছেলেকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়বেন হাটে হাটে---এই ছিল রাজুর অপেক্ষা । ছোট্ট রাজুর হাতে একটা থলি থাকত । সেই থলি নিয়ে সে হাটে হাটে বাবার পেছন পেছুন ঘুরে বেড়াত আর দোকানে দোকানে গিয়ে কিছু টাকা পয়সার অনুরোধ জানাত । আর তৎক্ষণাত ওর বাবা পাশাপাশি ওইসব দোকান-সংলগ্ন এলাকার সামনে নানান রকমের অভিনয় করত । কখনও খরগোস সেজে, তো কখনও রাম, কৃষ্ণ, কালী । লক্ষ্মীপুজোর দিন স্বয়ং মা লক্ষ্মী সেজেও বেড়িয়েছেন । আর বরাবর ছোট্ট রাজুই ছিলেন তাঁর দোসর । এবং পরবর্তীকালে খুব ভালোভাবেই রাজু এই পরম্পরাকে বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে ।


রাজুর বাড়ি বস্তির একেবারে শেষের দিকে । সাধারণত ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বস্তিজাতীয় এলাকার ঘরবাড়ি একে অপরের খুবই ঘনসন্নিবিষ্ট হয় । রাজুদের পাড়াও তাই । কিন্তু রাজুর বাড়ি প্রথাগত সেই ঘনসন্নিবিষ্টতা কাটিয়ে খানিকটা নীরিবিলি ভাবেই অবস্থান করেছে । এখান থেকে ময়লা ফেলার জায়গাটা খুবই কাছে । এবং তার ওপারেই রূপাখালি নামের এক জঙ্গল । নদীর বাঁধ ধরে ধরেই এগোতে হয় সাবধানে । ইলেকট্রিসিটি নেই । তবে মোবাইলের নেটওয়ার্ক ঠিকঠাকই পাওয়া যায় । রাজুর বাড়িতে একটাই ঘর । উঠোন আছে । রাজুর মা প্রতিদিন কোত্থেকে যেন গোবর আর ঘুঁটে খুঁজে নিয়ে আসেন । গোবর দিয়ে উঠোন ল্যাপা হয় । আর ঘুঁটে দিয়ে রান্না । ঘরে কেবল একটা আয়না আর দুটো চৌকিজাতীয় কিছু । বাঁদিকেরটায় রাজু শোয় । আর ডানে ওর মা । মায়ের চৌকির নীচে রাজুর সাজবার সামান । মানে একটা পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক । ড্রেসিং টেবিলের নীচের দিকে আছে ড্রেসিং টেবিল-সংলগ্ন একটা বাক্স । আর তার নীচে একটা বড় ড্রয়ার । বাক্সের মধ্যে বিভিন্ন রঙের পরচুল, ক্লিপ, গার্ডারের বাক্স, মুখে মাখার অনেক অনেক রঙের কৌটো, সুই-সুতোর বাক্স ইত্যাদি । ঘরটা পাক্কা দশ ফুট বাই আট ফুট । তাই খাওয়া-দাওয়া ঘর থেকে বেরিয়ে ডানদিকে যে ছোট্ট একটা রান্নাঘর আছে, সেখানেই চলে । প্রাতঃ-সান্ধ্য যা ক্রিয়াই বলি না কেন, সবই চলে ওই নদীর পাশে । বড় বাঁধ আছে । তাই অন্যের দৃষ্টিতে বাঁধ সাধে না ।

‘কী রে ? কিছু পাইলি ?’ কাঁপা কাঁপা স্বরে রাজুর মা বলে ওঠে ।

‘না ।’

‘তবে ?’

‘তবে আর কী ? আর মাথা গরম করিও না ।’

‘আ...আ...মি আ...আ...বার কি করলাম ? ভালো কথা কই, কিন্তু... তাও কথা শুনতে হয়... মরে যাই... ও মিনুর মা...’ বলে ঝুঁকে যাওয়া শরীরকে কোনক্রমে তুলে রাজুর মা পাশের বাড়ি চলে গেল ।

আজ আকাশটা কেমন যেন একটা করে এসেছে । বৃষ্টি কী হবে ? গত বছরও রাজু দেখেছিল বীরপাড়ার মিশনারি স্কুলের বাচ্চারা ছাতা হাতে ক্রিসমাস পালন করছে । এই এলাকায় ওই একটাই চার্চ । আশেপাশের ষাট কিলোমিটারের মধ্যে এটিই একমাত্র । ক্রিসমাস উপলক্ষে এক বিরাট মেলারও আয়োজন হয় । আসাম, উত্তরবঙ্গ এমন কী কলকাতা থেকেও প্রচুর দোকানপাট বসে । আসেপাশের কুড়ি বাইশটা গ্রাম থেকে অনেক মানুষ আসেন । ২৫ তারিখ তো ভিড়ের ঠেলায় হাঁটাই যায় না প্রায় । রাজু বছরের এই সময়টুকুতেই ভালো-মন্দ কিছু কামিয়ে নেয় । কিন্তু এবার ঘোর বিপদ হয়েছে । শেষে কিনা স্যান্টাক্লসের ওই পোষাকটাই চুরি হয়ে গেল ! ওই পোষাকই তো ছিল সামনের দুটো মাসের জন্য রাজুর রুজিরোজগারের দোসর । রাজু একবার মাথা চুলকোয় । তারপর ভাবে একবার চার্চে গিয়েই খোলাখুলি ব্যাপারটা বলি । ওরা যদি কিছু একটার ইনতেজাম করে দিতে পারে...



সময় নেই আর । এই ব্যবসাটা যেহেতু হারিয়ে যাচ্ছে, তাই মানুষেরও কোনো রকমের হেলদোল নেই । কিংবা মানুষের হেলদোল নেই বলেই বুঝি ব্যবসাটা হারিয়ে যেতে বসেছে । অর্থাৎ ‘হারিয়ে যাওয়া’ এবং ‘হেলদোল না থাকা’ --- এরা একে অপরের পরিপূরক, তা রাজু খুব ভালো মতই জানে । তবে রাজুর এটাকে ব্যবসা বলতে ঢের আপত্তি । কিভাবে সম্পূর্ণ নিজের ক্ষমতায় ও একটার পর একটা সাজ নিজের ওপর ফুটয়ে তুলে অভিনয় করে, তা সবারই জানা । রাজু একে শিল্প বলে । পাশাপাশি এটাকে পেশার থেকে নেশায় উত্তরণ ঘটানোর কারিগর সে নিজেই । এটা ওদের জাত ব্যবসা বা জাত শিল্প যাই বলি না কেন, একটা ব্যাপারে ভেবে ঠাঁই পাওয়া যায় না যে কেন সে নিজের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এটাকে রেখে দিতে চায় না ! ‘প্রয়োজনে কেউ যদি আগ্রহ প্রকাশ করে এই শিল্পকে শেখার , তাকে রাজু প্রাণভরে শিখিয়ে দিতে চায় । কিন্তু নিজের প্রজন্মকে ? কখনই না’--- এই মত রাজুর । আজ আবার হাট বসেছে । কাল ভেবে রেখেছিল যে আজ ধূপগুড়ির হাটে সে সর্পকন্যা সাজবে । কিন্তু গতরাতের চুরিটাই সব ভেস্তে দিল । এক হাট থেকে কম করে হলেও তিন-চারশ’ টাকা তো উঠতোই । কিন্তু এখন এসব ভেবে আর কী বা হবে ? রাজু নেতাজী পাড়া ক্রস করে বিকেল চারটা নাগাদ বীরপাড়ার বাসে উঠে পড়ে এবং বীরপাড়া পৌঁছোতে পৌঁছতে তা প্রায় সাড়ে পাঁচটা বেজে যায় । ডিসেম্বরের পাঁচটা মানে বেশ অন্ধকারই । কিন্তু চারদিকের ঝাঁ চকচকে রকমারী আলো, উৎসবমুখরতায় সে অন্ধকার সাফ হয়ে গেছে । আজ থেকে যদিও মেলা শুরু হয় নি , তবুও মেলার মেইন এনট্রান্সের সামনে প্রচুর ভিড় । কিন্তু এ কী ! এ তো পুলিশ ! রাস্তার দুধারেও অনেককটা খাকী ঊর্দিধারীদের মোতায়ন করা হয়েছে । ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই রাজুর সামনে দাঁড়ানো দুই রিক্সাওলার কথোপকথন রাজুর কানে ধরে যায় । কথাগুলোকে সংক্ষিপ্ত করলে যা দাঁড়ায়, তা হল এই--- গোপন সূত্রের খবর বিজন রায় ওরফে রবার্ট না কী এই মেলাসংলগ্ন এলাকাতেই আত্মগোপন করে রয়েছে । তাই এলাকাটায় একপ্রকার চিরুনী তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ । বীরপাড়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে রূপাখালি ফরেস্ট হয়েই না কী সে এই এলাকায় ঢুকেছে । রাজু শরীরে অদ্ভূত একপ্রকার রোমাঞ্চ অনুভব করল । তারপর সটাং রাস্তা পেরিয়ে শিমুলতলা প্রাথমিক স্কুলের মাঠের দিকে হাঁটা শুরু করল । খুব জোর হিসু পেয়েছিল ! স্কুল ও স্কুলের মাঠের মাঝখানে এক সরু গলি । সেখানেই কাজটা সেরে ফেলা যাবে এই ভেবে যেই না রাজু গলির কিছুটা ভেতরে ঢুকেছে, দেখছে স্কুলের ইটের উঁচু পাঁচিল ঘেষে অন্ধকারে কোন এক ছায়াময় মূর্তী দাঁড়িয়ে রয়েছে । উচ্চতায় পাঁচ-দশ হবে । আর একটু সামনে যেতেই রাজুর সবকিছু জলের মত স্পষ্ট হয়ে গেল---রাজুরই কেনা অথবা বানানো সাদা চুল, সাদা দাড়ি গোঁফ, লাল জ্যাকেট সাদা হাত মোজা পরে রবার্ট দাঁড়িয়ে রয়েছে । রাজুর ঘর থেকে গত রাতে রবার্টই এ মাল হাতিয়েছে --- এ ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ নেই । শুধু প্রসাধন সামগ্রী নয়, হয়ত স্যান্টাক্লজ সেজে চার্চ অথারিটির কাছ থেকে রাজুর প্রাপ্য টাকাটাও সে হাতিয়েছে । এ টাকা দিয়ে রাজুর অনায়াসেই দুমাস কেটে যেত । রাজু খিমচে ওঠে, রবার্টের কাছে কী হাতিয়ের আছে তার পরোয়া না করেই সে এগিয়ে যায় । কিন্তু কী অদ্ভূত ! স্যান্টাক্লজের বেশে রবার্টকে আরও ভালো মত আরেকটিবার দেখার পর রাজু থমকে দাঁড়ায় । মনে হয় কে যেন ওর পা’দুটোকে আটকে রেখেছে । ভেতর থেকে এক দরিদ্র শক্ত নুড়ি যেন বলে ওঠে, ‘বাহ রবার্ট ! খুব ভালো মানিয়েছে তোকে ! চালিয়ে যা । আমার এই লুপ্তপ্রায় শিল্পে একদিনের জন্য হলেও তোকে স্বাগত । ’

‘কে ওখানে ?’ রাস্তার ওপার থেকে এক পুলিশ চেঁচিয়ে ওঠেন ।
‘আজ্ঞে আমি হুজুর । মুতছিলাম ।’ গাম্ভীর্য এবং নমনীয়তার মাঝামাঝি যে রূপ, সেই রূপ নিয়ে রাজু গলি থেকে বেরিয়ে আসে ।

‘ওখানে কী অন্য কাউকে দেখলি ? এই তোমার মত হাইট, রং ফর্সা, রাজবংশী ?’

‘কো...কোই না তো ’ বলে রাজু মেলার দিকে হাঁটা দেয় । পেছনে ফিরে দু’বার গলিটাকে লক্ষ্য করে । তখন সেখানে আর কেউই ছিল না । থাকলেও অন্ধকারে হয়ত ঢাকা পড়েছিল । অদ্ভূত একপ্রকার গর্বমিশ্রিত আশা নিয়ে রাজু বাসে উঠে বাড়ি ফিরে আসে । বাসের ভেতরটায় রাজুর সাথে খান-চল্লিশেক গিরিগিটিও ছিল ।