হারিয়ে যাওয়া চব্বিশ ফ্রেম

নির্ণয় বসাক


আমরা যারা সিনেমা গিলি পরিচালক ,পা্রফর্মার নির্বিশেষে , audio-visual কে দিবারাত্র ফালাফালা করি দৃশ্য ও মনন সুখের কারণে, তাদের কাছে বাড়িটাই একটা ফিল্ম আর্কাইভ হলে ভাল হত। চারটি জন্ম নিয়ে cinematheque franchise –র প্রতিটি কোণ অবধি সাফ করে , ফ্রেম বাই ফ্রেম মগজে জুড়ে নিতে পারলে আমাদের আশ মেটে। এহেন ফিল্মখোড়দের (দেখুন, আমি নিজে কিন্তু ফিল্ম খুব কমই দেখেছি) কাছে ‘আসিয়াও আসিল না’ বা ‘হারাইয়া গেল’ বিষয়গুলি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।ফিল্ম হারিয়ে যায়। কালচক্রে ,সংরক্ষণের অভাবে পুরনো পুঁথি যেমন হারিয়ে যায় ,ফিল্মও হারিয়ে যায়। পুরনো পৃথিবীর কিছু সাদা কালো আলো, কিছু গুনগুন , কিছু ফিসফাস , কিছু চিন্তা , কিছু কষ্ট, কিছু আনন্দ নিইয়ে ফিল্ম হারিয়ে যায়। সাথে সাথে হারিয়ে যান কিছু পরিচালক, আলোকচিত্রী আর কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী।
ঋত্বিক ঘটক এর সিনেমাগুলি নাকি একবার হারাতে বসেছিল। একে পুরনো নেগেটিভ তায় অব্যবস্থা । আরেকটু হলে বারোটা বেজে যাচ্ছিল এমন অসামান্য সৃষ্টিগুলির।পড়ে টনক নড়ে আর্কাইভের।ঋত্বিক বেঁচে যান, বাঁচেননি অন্য বহু পরিচালক। বহু ভারতীয় সিনেমা আজ হারিয়ে গেছে কালের গভীরে। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায় তামিল ভাষার প্রথম সাউন্ড ফিল্মটিকে। নাম ছিল ‘কালিদাস’। Lumiere ভাইদের দেখাদেখি হীরালাল সেন বেশ কয়েকটি ছবি করেন যার অধিকাংশই আজ ‘lost’।শুধু সেনই নন, FTTI এর সুরেশ ছাব্রিয়া র মতে সাইলেন্ট যুগের ১২৫০ টি ছবির মধ্যে মাত্র ২৫ টিকে আজ সংরক্ষণ করা গেছে। কিছু ফিল্ম হারাতে বসেছে। মৃণাল সেনের ক্যালকাটা ট্রিলজি কান উৎসবে দেখানো যায়নি নেগেটিভে এর দুরবস্থার জন্য। এমন কত সৃষ্টি যে আমাদের চখের আড়ালে হাপিস হয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই।
এ গেল দেশের কথা। বিদেশের কথা বলতে গেলে প্রথম আসে সিনেমার জন্মভূমি ফ্রান্স। George Melies, ‘A Trip to the Moon ’ এর পরিচালক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের সৈনিকরা তাঁর ফিল্মের নেগেটিভ পুঁড়িয়ে দেয় রূপো আর সেলুলয়েড এর লোভে । নিজেও তিনি রাগের মাথায় বহু নেগেটিভ পুড়িয়ে ফেলেন। সেগুলিও আজ আর নেই। পার পাননি D.W. Griffiths, Fritz Lang কিংবা স্বনামধন্য John Ford ও। এদেরও কিছু সিনেমা খরচের খাতায়। Emil Jennings অস্কার পেয়েছিলেন The Way of All Flesh ফিল্মটির জন্য। এটিকেও বাঁচানো যায়নি। Martin Scorsese র Film Foundation এর মতে ১৯২৯ সালের আগের নব্বই শতাংশ ফিল্ম নষ্ট হয়ে গেছে। এর পেছনে একটা বড়ো কারণ হল স্টুডিওগুলির ব্যবসায়িক বুদ্ধি। সাইলেন্ট ফিল্ম বেশি লোক দেখে না । অতএব এগুলিকে বিদায় করো। যথারীতি ফিল্মের ভুষ্টিনাশ। ১৯৫২ সালের আগে ফিল্মগুলির নেগেটিভে নাইট্রেট ব্যবহার করা হত। অনেক ক্ষেত্রে আগুন লেগে এগুলি পুড়ে যায়। এছাড়া রূপোর বিষয় তো আছেই । সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় এটিই যে Charlie Chaplin এর অধিকাংশ ফিল্ম অক্ষত রয়ে গেছে। তা না হলে পৃথিবীর শিল্পের ইতিহাসে একটা কালো ফুটো কিছুতেই ভরাট হতো না। পরবর্তীকালেও কিছু ফিল্ম হারিয়ে যায় । তবে তার সংখ্যা খুবই কম।কারণ ততদিনে ফিল্ম সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে, শিল্পমাধ্যম হিসেবে ফিল্মের গুরুত্ব বেড়েছে, সংরক্ষণের গুরুত্ব বেড়েছে।
এবার আসা যাক কিছু হারিয়ে যাওয়া ফিল্ম ব্যক্তিত্ত্বের কথায়। ১৯৩০ এর চন্দ্রমোহন কিংবা সান্তা আপ্টে একসময় ফিল্মে দাপটে অভিনয় করেছেন। Stanley Kubrick এর The Shining এর সেই বারট্র্যান্ডার এর ভুমিকায় Joe Turkel ।Keith David, Judith Anderson এমনকি Bruce Dern কেই বা কজন মনে রেখেছে। এরকম হাজার হাজার নাম আছে । সব উল্লেখ করতে গেলে প্রবন্ধের বদলে পঞ্জিকা কিংবা ক্যাটালগ হয়ে যাবে। আমাদের ‘গঙ্গা’খ্যাত রাজেন তরফদার আজ আলোচনার বাইরে। ঋত্বিক ঘটকের ভাগ্যেও তা ঘটত। একসময় তাঁর ফিল্মগুলির বেলায় সিনেমা হলগুলি মাছি তাড়িয়েছে। আজ ভাগ্যক্রমে বাঙ্গালির তাকে মনে পড়েছে তাই রক্ষে। নইলে তিনি কবে হারিয়ে যাওয়া ইতিয়হাস হয়ে যেতেন। বাবার মুখে শুনেছি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যখন আদূর গোপালকৃষ্ণণের সিনেমা যখন আসত, শুরুতে হল ভর্তি। কারণ দক্ষিণী সিনেমায় যে যৌন সুড়সুড়ি থাকে তার লোভে সব ভিড় জমাত হলে। ঘন্টা আধেক সিনেমা এগোলেই হল গড়ের মাঠ। এহেন পরিচালক হারিয়ে যাবেন সন্দেহ কী?
এবারে আসা যাক কিছু রিলিজ না হওয়া ফিল্মের কথায়। এগুলির চেয়ে মর্মান্তিক বুঝি আর কিছু নেই। একজন ফিল্ম পরিচালক তাঁর জীবনের বেশ কিছু সময় , বেশ কিছু পুঁজি, কর্মক্ষমতা নষ্ট করে একটা ফিল্ম বানালেন। সেটি মুক্তি পেলনা অনিবার্য কারণে। কোন এক শিল্পীর সৃষ্টি মানুষের জন্য। কিন্তু এমন কিছু সৃষ্টি যা মানুষ দেখতেই পেলনা , সমাদর পাক না পাক সেটি ব্যর্থ। Terry Gilliam এর The Man Who Killed Don Quixote , কিংবা David Russell এর Nailed এই তালিকায় পরে। দ্বিতীয় ফিল্মটি্র তো প্রায় সবই খতম । শুধু একটি দৃশ্যের শুটিং বাকি ছিল। তার আগেই লোকজন বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে বাড়ি। একি রকম ভাগ্য Godard এর One A.M. ফিল্মটির। Eisenstein এর Que Viva Mexico আর Orson Welles এর The Other Side of the Wind ও শুটিংএর পর রিলিজ করেনি। একটা ফিল্মের ক্ষেত্রে আর গল্প থেকে শুরু করে আর্ট ডিজাইনিং, ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিক মায় পোস্ট প্রোডাকশান পর্যন্ত সমান গুরুত্বপূর্ণ । একটা কিছু গণ্ডগোল হওয়া মানে সোজা ভাগাড়ে। সেই সঙ্গে বাতিল কিছু মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর গুচ্ছের পয়সা। আজকের Quentin Tarantinoর ফিল্মের ভাগ্যেও এমনটা ঘটে।
এমন কিছু সিনেমা যেগুলি হওয়ার কথা ছিল। ব্যাবস্থাপনাও রেডি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে শুটিং ক্যানসেল। এর অনেকগুলিই হতে পারত পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফিল্ম। তা না হয়ে স্রেফ কতগুলি ডিক্লেয়ার্ড প্রোজেক্ট হিসেবে রয়ে গেল। হয়ত কাজও কিছু হয়েছিল। তবে সেটা তার বেশি আর এগোয়নি। এরকমই কয়েকটি প্রোজেক্ট হল Stanley Kubrick এর Napoleon, Alfred Hitchcock এর Kaleidoscope, Alejandro Jodorowsky র Dune । Kubrick নিজে বলেছেন Napoleon হতে পারত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সিনেমাগুলির মধ্যে একটা । David Lynch, David Fincher মায় Salvador Dali ও এই লিস্টিতে আছেন। তবে এগুলির মধ্যে সবচেয়ে অসাধারণ হওয়ার কথা ছিল Andrei Tarkovsky র The Idiot র। Dostoyevsky র উপন্যাস Tarkovsky র ফ্রেমে। যেটা দাঁড়াত তার মত গভীর সিনেমা আর হত কিনা সন্দেহ। কিন্তু আমরা বঞ্চিতই রইলাম। Tarkovsky নিজেই রণে ভঙ্গ দিলেন।
আমার সবচেয়ে কষ্ট লাগে একটি মানুষের কথা ভাবে। তিনি ঋত্বিক ঘটক। যিনি জীবদ্দশায় থেকেঈগেলেন অজানা অচেনা এক ভবঘুরে মাতাল। যার হাতে আগুন ছিল। প্রমিথিউসের চুরি করা আগুন। তিনি জ্বালিয়েওছিলেন, আমরা চিনতে পারিনি। তাপ অনুভব করতে পারিনি। একদিন তিনি দুম করে মরে গেলেন। ঋত্বিক ঘটকরা দুম করেই চলে যান। আমাদের চোখের আড়ালও। পরে হয়ত আমরা হাহুতাস করি, কিন্তু তা অনেক পরে। ঋত্বিকেরও কিছু হারিয়ে যাওয়া সিনেমা আছে। হ্যাঁ, ডকুমেন্টারি রামকিঙ্কর, রামকিঙ্কর বেইজ এর উপর। এক জিনিয়াস এর প্রসঙ্গে আরেক জিনিয়াস। এমন একটা জিনিস তাও অসম্পূর্ণ। এটা বাদ দিয়েও ঋত্বিকের আরও কয়েকটি সিনেমা আছে যা অসম্পূর্ণ। সবচেয়ে দুঃকের বিষয় এই যে ঋত্বিকের এমন বহু screenplay যেগুলি কাজেই লাগানো হয়নি। তা যদি হত তাহলে হয়ত আজকে ভারতীয় সিনেমার মুখটা পাল্টেও যেতে পারত। হারিয়ে যাওয়া ঋত্বিক ঘটক আছেন তার এক ডকুমেন্টারি ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’ এ। এটি তাঁর গুরুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ। এটিকেও কেও মনে রাখেনি। ইউরোপে ফিল্ম বিদ্রোহী যেমন ছিলেন Godard, ভারতে তেমনই ঋত্বিক ঘটক। তিনি না সমর্থন করতেন তৎকালীন কংগ্রেস্কে, না সমর্থবন করতেন compromising communism। যথারীথি রাজনৈতিক দল্গুলির বিরাগভাজন ত হারিয়ে যাওয়া।
আজকে কলকাতার কোন রাস্তায় চলতে চলতে আচমকা যদি একটু দাঁড়াই বুঝতে পারি শহরটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে সবকিছু। । হারিয়ে যাচ্ছে সব। গত দশ বছর আগেও যা দেখেছি তা আর নেই। এখন এই বদলানোটা ভাল না খারাপ সে বিষয়ে আমি যাচ্ছি না। খালি বলছি একটা নস্টালজিয়ার(এটা কিন্তু Tarkovsky র সিনেমা নয়) কথা। হারিয়ে যাওয়া সিনেমাগুলি এমনই কিছু নস্টালজিয়া হয়ে রয়ে গেছে। এগুলির একটাও আমি দেখিনি । ভাল কি খারাপ জানি না । তবু মনে হয় এগুলো থেকে কিছু অন্তত পেতাম । যাই হোক পুরোন দিনের পৃথিবীটাকে তো দেখতে পেতাম ।কিছু মানুষজন, তাদের জীবনযাত্রা , লড়াই, চিন্তা ভাবনার অল্প কিছু পরিচয় তো পেতাম। সেটা কেবলই হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী হয়ে থাকত না।