স্মৃতিপটে - বিবিধ ভারতী

দেবপ্রিয়া চট্টোপাধ্যায়


আমাদের মত যাদের জন্ম সত্তরের দশকের শেষে বা আশির দশকের প্রথমে তাদের অনেকেরই অবসরযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রেদিওতে বিবিধ ভারতীর নানা অনুষ্ঠান।সম্ভবত আমরাই প্রথম প্রজন্ম যাদের মায়েরা চাকরী করতে বেরতেন।আর আমাদের স্কুল,ছবি আঁকা,চাচা চৌধুরী,চাঁদমামা,অরণ্য দেব - ম্যানড্রেকের গল্পের ফাঁকে সপ্তাহ শেষের অবসরের প্রতীক্ষার আবহে মিলে যেত বিবিধ ভারতীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের শীর্ষ-সঙ্গীত।
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা।প্রায় সারাদিন একা একচিলতে ভাড়াবাড়ির ঘরের কোণে বেড়ে ওঠা বেশ কঠিন একটা কাজ ছিল,বিশেষ করে যেখানে খেলার কোন দোসর ছিলনা,ছিলনা কোন আজকের বহুল - ব্যবহৃত কিশোর - মনের বেড়ে ওঠার কোন আমোদ - আহ্লাদের সামগ্রী,গণ বিনোদনের চিত্তাকর্ষক সব মাধ্যম যেগুলো ছাড়া আজকের যুগের ছেলে মেয়েরা পড়াশুনার সময়টুকু বাদ দিয়ে থাকার কথা কল্পনাই করতে পারে না।
ভুল লিখলাম নিশ্চিত করেই।সেই সময়েও ছিল।আজকের যুগের নিরিখে যৎকিঞ্চিত সেই কয়েকটা অবলম্বনই আমাদের বড় হওয়ার,বেড়ে ওঠার বড় আদরের সাথী ছিল।আজকে কালের স্রোতে ভেসে যাওয়া সেই সব গল্পের বই,কাঠ বা প্লাস্টিকের খেলনা এখন তার প্রাপ্য কদর হারিয়ে যখন নিঃশব্দ অবলুপ্তির পথে,তখন সত্যিই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে,মনে হয় ওদের সঙ্গে আমাদের শৈশবও যেন কিভাবে কখন হারিয়ে গেল,টের পেলাম না।
আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল আমার বড় প্রিয় বূশ ব্যরণের ট্রান্সশিষ্টর রেডিও,যা কত যে অনাবিল আনন্দ দিয়েছে হয়তো লিখে বা ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে আগে সেই সময়টাকে একটু প্রেক্ষাপটে আনার চেষ্টা করি যাতে একটু হলেও আজকের সঙ্গে পার্থক্যটা বোঝা যায়।
তখন কলকাতায় টেলিভিশন এসেছে,কিন্তু আসেনি TRP,আসেনি অবিরত বিজ্ঞাপনের কোলাহল।রেডিওর শব্দতরঙ্গের জাদুতে আপামর আবালবৃদ্ধবণিতা আবিষ্ট,শুধু বিনোদন নয় তথ্য - সমৃদ্ধ নানা অনুষ্ঠান আমাদের সকাল - বিকেলকে অর্থবহ করে তুলত।এবং সবার আগে যে সেন্টার (Channel জাতিয় আরও নির্ধারক শব্দ আমরা জেনেছি অনেক পরে)আমাদের হাতকে চালিত করতো তা অবশ্য বিবিধ ভারতী।
একটা ধারণা হয়তো এখনো প্রচলিত আছে যে অন্যান্য সেন্টার (ক, খ, যুববানী ইত্যাদি)যদি for the class হয়,তাহলে বিবিধ ভারতী অবশ্যই for the mass.এটা নিতান্তই অসম্পূর্ণ ও কিছুটা উন্নাসিক মনোবৃত্তির থেকে বলা।
কেন বললাম?বলছি।তার আগে বিবিধ ভারতীর যে যে অনুষ্ঠান আমাকে টেনে রাখতো সেগুলো বলি।প্রথমেই মনে আসে রবিবার দুপুরের বোর্ণভিটা কুইজ কনটেস্ট-আমিন সায়ানির মায়াময় অথচ জলদগম্ভীর,পেশাদার অথচ আন্তরিক কণ্ঠস্বরকে কবে থেকে যে আপন করে নিয়েছিলাম যদিও এখন তা স্পষ্ট মনে পড়েনা,তবে এটা ভাবলে এখনও বিস্মিত হই যে কোন সেই কৈশোরকাল থেকেই কত কঠিন প্রশ্নেরও সাবলীল উত্তর শুনতে অভ্যস্ত ছিলাম সমবয়স্ক ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে।এটাও বোধকরি ব্যবহারিক শিক্ষার যে নিজস্ব একটা মান অবচেতনেই নির্ধারিত হচ্ছিল,তার পিছনে বোর্ণভিটা কুইজ কনটেস্ট জাতীয় অনুষ্ঠানের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা ছিল।এরকম বিনোদন তথা শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান আজ হয়ত নানা গণমাধ্যমে অপ্রতুল নয় কিন্তু সেই বেড়ে ওঠার মাহেন্দ্রক্ষণে তার তাৎপর্য ছিল অপরিসীম।তাই দায়িত্ব নিয়েই বলা যায় যে বিবিধ ভারতী মনোরঞ্জনের সাথে সাথে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের প্রতি যত্নবান পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তবে অনস্বীকার্য যে মূলত বিবিধ ভারতীর আমাদের মনোরঞ্জনের দিকেই বেশী মনোযোগ ছিল স্বাভাবিক ভাবেই,যার উৎস রয়েছে তার চিন্তনে,তার মননে।১৯৫৭ সালে গান্ধী জয়ন্তীর সেই প্রথম জন্মলগ্নের দিনটি থেকে আজ তার দীর্ঘ ৫৭ বছরের পথ চলার মূল মন্ত্রই ছিল যে আবালবৃদ্ধবণিতার জন্য সর্বজনগ্রাহ্য সারাদিনব্যাপী আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের পশরা নিয়ে হাজির হওয়া।
কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো?নানা ধরণের মুড,নানা ধরণের স্বাদ সবই পাওয়া যেত ষাট থেকে আশির দশকের বিবিধ ভারতীতে,যে সময়টা ভারতীয় সংস্কৃতি জগতেরও golden time ও বলা যেতে পারে।এর’ই মধ্যে কিছু বিশেষ মনে রাখার মতো অনুষ্ঠান ছিল রোজ সকালের ‘ভুলে বিসরে গীত’,দুপুরে ‘আপ কি ফরমাইশ’,সন্ধ্যেয় ফৌজিভাইদের জন্য ‘জয়মালা’ বা বেশ একটু রাতের দিকে ‘ছায়ালোক’।এখানে একটু শব্দশ্লেষের সুযোগ নিয়েই বলছি ভারতীয় বেতার জগৎ’ও তখন নিতান্তই নাবালক ছিল এত সমৃদ্ধি সত্ত্বেও।কেন বলছি?আরে রাত এগারটার আর তারও অস্তিত্ব থাকত না যে, স্কুলপড়ুয়াদের মতন বেতার’ও মনে হয় নিশ্চিন্ত বিশ্রামের জগতে বিচরণ করত।
তবুও সকাল ছটা থেকে রাত এগারোটা(মধ্যে আরও দুবারের বিরতি হত)-এই সময়টুকুই পর্যাপ্ত বিনোদনের পসরা সাজানো থাকত আমাদের জন্য।কয়েকটা আগেই বলেছি, এবার বলি মুখ্য আকর্ষণগুলো - অবশ্যই সেগুলো খাঁটি বাংলায় হত শনি ও রবিবারে।এক এক করে বললে প্রথমেই শনিবার রাতের p3 রহস্য-রোমাঞ্চ নাটক(আচ্ছা রহস্যের সঙ্গে রোমাঞ্চের যে প্রায় অবশ্যম্ভাবী মেলবন্ধন এইসব নাটক শোনার আগে কেউ কি খেয়াল করেছেন?এই বান্দা তো অন্তত করেনি)তারপর বোর্ণভিটা কুইজ কনটেস্টর আগে পরে সুচিত্রার সংসার ও বাংলা নাটক।একটু দুপুরে আবার শুরু হতো আরব্য -রজনীর স্বপ্নময় উপস্থাপনা।রণ গুডুইনের আরাবিয়ান নাইট’স এর সুর অবলম্বন করে গল্পের অপরূপ জাল বিস্তার।এই সব নাটকের মাধ্যমেই না আমরা গৌতম চক্রবর্তী, সৌমিত্র বসু, মনু মুখোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের অভিনয় শৈলীর সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম ও বলা বাহুল্য সেই মুগ্ধতার রেশটুকু রয়ে গেছে আজও।পরে এদের বহুবার চাক্ষুষ কিন্তু সেই ছোটবেলায় শোনা অভিনয়ের অনুরণন যেন আরো অনেক জীবন্ত ছিল বলে মনে হয়।এদের স্থান তাই আমার কাছে বহু প্রথিতযশা শিল্পীর থেকে অনেকটা ওপরে।মনে হয় খেলার ধারাবিবরণী বাদ দিলে এদের প্রভাব আমার ওপর ছিল সর্বাত্মক , সর্বগ্রাসী ।
হয়তো কিছুটা ব্যক্তিগত পছন্দের নিরিখেই শ্রাবন্তী মজুমদারের ওয়েসীস “মনের মতো গান,মনে রাখা কথা” - এই অতীব জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের কথা সব শেষে বলছি, কিন্তু শুধুই মোহময় কণ্ঠের আবেশে এবং কথার কুহকে যে একটা বড় অংশের শ্রোতাকে প্রায় নেশার মতন রেডিয়োভিমূখী করা যায় এর থেকে বোধহয় আর কোন প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়না।মনে রাখা কথা অনায়াসেই হারিয়ে দিত মনের মতো গানকে।শুধু শ্রাবন্তীর গলায় নিজের নামটুকু শোনার জন্যই যে কতো কিশোর থেকে মধ্যবয়স্ক,সম্ভ্রান্ত থেকে উদ্ভ্রান্ত, সোচ্চারে বা সন্তর্পণে মনের ভাব জানিয়ে চিঠি পাঠাতো তার দ্বিতীয় বিকল্প আর দেখিনি।জানিনা আজ এই ধরণের অনুষ্ঠান কোনো স্টেশনেই হয় কিনা,তবে হলেও সেই সময়ের শ্রাবন্তীর আকর্ষণের মত যে কোনভাবেই হবেনা সে বিষয়ে নিশ্চিত।মনে পড়লে আজ’ও একইভাবে অবাক হয়ে যাই।
তাই Class ও mass দুধরণের শ্রোতার জন্যই বিবিধ ভারতী তার বিনোদন ভাণ্ডার উজার করে এসেছে এই ৫৭ বছর।বললে কি খুব অত্যুক্তি হবে যে ভারতে টেলিভিশন, আরো সুষ্ঠুভাবে cable টেলিভিশন পূর্ববর্তী যুগে বিবিধ ভারতী একটা pan Indian সাংস্কৃতিক ঐক্যসূত্র স্থাপনে একটা বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল(যে ভূমিকাটা হয়তো আজ বলিউডের ফিল্ম বা ক্রিকেট খেলার কুক্ষীগত)।আর্থ - সামাজিক বৈষম্য ভুলে আপামর জনগণের মন এই নির্দিষ্ট তরঙ্গে বাঁধা পড়েছিল এক অপূর্ব বিনোদনবন্ধনে।আজকের ইন্টারনেট,ইউ - টিউব,আই - প্যাড,আই - পড বা ট্যাব’এর যুগে কালের নিয়মেই বিবিধ ভারতীকে ডিজিট্যাল হতে হয়েছে অস্তিত্বরক্ষার স্বার্থে,কিন্তু মনে হয়না আর সেই হারানো সুর ফিরে আসবে বিবিধ ভারতীর হাত ধরে, শ্রোতা ও মাধ্যমের পথ আজ অবশ্যম্ভাবী ও অনুদ্ধরণীয় ভাবেই দুটি বিপরীত দিকে বেঁকে গেছে।আমরা যারা মধ্যবয়স্ক, তাদের সময়ের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে কষ্ট হলেও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিবিধ ভারতী শুধুই একটি নাম।Old order has surely changed yielding place to new.