এল পি বিকেল

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়


এলপি। লং প্লেয়িং রেকর্ড। ইপি। এক্সটেন্ডেড প্লেয়িং। এস পি। সিংগ্ল প্লেয়িং। রেকর্ডের এই স্তূপ পেরিয়ে আমার পক্ষে যেওন ঘুরে দাঁড়ানোই একটু বিপদজনক হয়ে ওঠে। একটা রাস্তা চোখের সামনে। শনিবারের বিকেল। বাবা বাড়ি ফিরেছে তাড়াতাড়ি। শ্রাবণ। আচমকা পশলা। একটা দেবব্রত নামক বিশ্বাস গভীর হচ্ছে। আমার তখন ৯ বা ১০ বছর। আমি স্পষ্ট শুনছি এরে ভিখারি সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে। প্রথম লাইনের পরে গায়ক একটু কেশে নিচ্ছেন। বাড়ির সামনে নির্মিয়মান পার্ক। সেখানে ১৯৮৭ মানে একটু করে চাকরি না পাওয়ার অভিমান জমা বম্বুদা। এরপর শ্রাবণ কখন আমাকে ছাড়িয়ে ঝাঁকড়া হয়ে উঠবে তা বুঝতে পারছিলাম না। শুধু আমাদের ফিলিপ্স রেকর্ড প্লেয়ারটায় দেখতাম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাবা ভালোই কাজ জানত এইসব যন্ত্রের নিজেই সারিয়ে নিত। কিন্তু একটু করে রোজই জোর বাড়াচ্ছিল টেপ রেকর্ডার বিশেষত শব্দ রেকর্ড করার ক্ষেত্রে। আগে একটা ফ্ল্যাট ক্যাসেট রেকর্ডার, পারস, তারপর এলো বুশ, তার লাল রেকর্ডিং বোতামএর দিকে নির্ণিমেশ কয়েকটা রং জনিত টান। কিন্তু গান? কখনও বারান্দার বসেছি, সামনে সেই পার্কের খেলা, শরীরে জ্বর, শিশু আমাকে টেনে নিচ্ছে চৈত্র। পিছনে একটা বেগুনী মলাটের লং প্লে ঘর থেকে, শান্তিদেব ঘোষ, নিশিদিন মোর পরানে। (সেই একই রেকর্ডিং এখন ডিজিটাল http://www.saavn.com/s/song/bengali/Shantideb-Ghosh---Rangiy e-Diye-Jao-Go-Ebar/Nishidin-Mor-Parane/JAQAABhyTX0) বাবা এসে গেছে শনিবার। তাহলে কি লং প্লে মানে শনি বার? বম্বুদার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলি অন্য বারে। সামনের পার্কে সে আমায় নিয়ে মজে যায়। তার তীব্র রোগা চেহারাটার সামনে নিজেকে বেশ থপথপে মনে হত। আমাকে সে নিয়ে যাচ্ছিল এক অন্য জগতে। মহম্মদ আজিজ। কত নিষিদ্ধ দুপুরে সে আমাকে তার বাড়ির সন্তোষ মনো ক্যাসেট প্লেয়ারে শুনিয়েছে বম্বের আজিজ বাংলার মুন্না পৃথিবী হারিয়ে গেল মরু সাহারায়। একটা স্পষ্ট রোগা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি সরু গোঁফের ২০/২২ বুকের বোতাম খুলে এগিয়ে আসছে গানটা গলায় ধরে। সেই আমাকে ধরে নিয়ে গেল বিবিধভারতীর দুপুরে। লং প্লেয়িং নয়, আধঘন্টা এক ঘন্টার খেলা।

একটা কি এমন কোনও ঘর থাকবে না যেখানে গেলে এখনও দুম করে বিবিধভারতী ঘুরিয়ে শুনে ফেলা যাবে হাতুড়ি মার্কা ফিনাইল এক্স এর শনিবারের বারবেলা বা শ্রাবন্তী মজুমদারের ওয়েসিস মনের মত গান মনে রাখার কথা। এখন এই ছত্রিশ এ আয়নার সামনে সে বিজ্ঞাপনের গানই তো মনে পড়ে।

আচমকা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বিকেল, সামনে জল জমেছে, স্পষ্ট গন্ধের খিচুড়ি বাবা অফিস যায় নি। সে ফিলিপ্স প্লেয়ারে শুধুই অবসর। বাবা দীর্ঘ অধ্যাবসায়ে তার স্প্রিং ইত্যাদি পরিষ্কার করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। বর্ষামঙ্গল। রেকর্ডের কাভারটা মনে পড়ছে না। কিন্তু তাসের দেশ এর ছবিটা স্পষ্ট এখনও। রানিবিবির কথা এলেই আমার সামনের বাড়ির পিসিমা। অনুঢ়া। ৪০ এর কাছে তখন। গোটা বাড়ি শাসন করছেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা মা ও শিক্ষিকার আর্থিক অধিকারে। লং প্লেয়িং রেকর্ড মানে কী জীবনের ওপর দীর্ঘ সময়ের কর্তৃত্ত্ব? রেকর্ড ও তার কালো ঘণত্বে তার গানের ট্র্যাকগুলোর ফ্যাকাশে দাগ সে কি আমাদেরই বিভাজন? অথচ আমরা কিছুতেই ট্র্যাক পালটে ফেলতে পারি না। একই শব্দপুঞ্জ তাদের সঙ্গীত হারিয়ে বেজে চলে। চলো নিয়ম মতে। হৃদয় শতদল শুধুই টলমল! গোপন কথা গোপনতর শুধু মুখ চেপে রাস্তা পেরোয় অফিস টাইমে।

বাবার কলকাতা মানে ট্রামের কলকাতায় এক্সটেন্ডেড প্লে (মানে ১৯৫৮) থেকে লং প্লে (১৯৫৯) এর যাত্রা সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। বাবার কলকাতা মানে তো ৭০। এগারো বছর কি বড় দীর্ঘ সময় ছিল তখন সেই অ্যানালগ দুনিয়ায়? আমাদের ডিজিটাল দুনিয়ায় তো ১১ বছর কোনও সময় না হলেও যা থাকে সে তো এক দীর্ঘতর প্লে, এক অশেষ গানের সুড়ঙ্গ। একবার আমার সমস্ত গান মিডিয়া প্লেয়ারে চাপিয়ে দেখেছিলাম ১ বছর ৮ দিন চলতে পারে সে। এক অশেষ পচনের মধ্যে দিয়ে আমরা সঙ্গীতের সুড়ঙ্গে থেকে যেতে পারি। এরপর আসবে ক্লাউড। আমি সারাজীবন গান শুনে সে মেঘ শেষ করতে পারব না। লং প্লে তো মাত্র ৪৪ মিনিট!

ভাবি বাবা এই সেদিনও ৯০ দশকের শেষে, লেনিন সরণিতে ঝুঁকে পড়ে রেকর্ড খুঁজছেন। অনেক সময় একই রেকর্ড দুবার এনেছেন। কারণ একটা খারাপ হলে আর পাওয়া যাবে না। যদিও ততদিনে প্রায় সমস্ত ৭৮ আরপিএম গ্রামাফোন রেকর্ড ক্যাসেট হয়ে গেছে। কিন্তু তাতে তো রেকর্ড প্লেয়ারের আওয়াজ বেরোয় না! এমনি ৯৮ সালে দেখলাম বাবা আবার ৭৮ আর পিএম সংগ্রহ করতে ফিরেছে। এক আশ্চর্য মহিলা কণ্ঠে এক পিঠে ছুটির বাঁশি বাজল, আরেক পিঠে আমি জ্বালব না বাতায়নে। (নমিতা সেন, http://gaana.com/song/chhutir-banshi-bajlo-namita) ততদিনে ক্যাসেটে সঙ্গীতময় সব ক্যাসেট এসে গেছে। কিন্তু সতী দেবী জয়যাত্রায় যাও গো আমার সামনে এক বিকেল, লং প্লে নয়, একবার বাজা গ্রামাফোন রেকর্ড দু পিঠে দুটো গান। আর তার পরেই এক স্তব্ধতা। একটা প্রায় ভেঙে পড়া বারান্দায় অ্যালুমিনিয়াম বিকেলে ঠাকুমা গাইছেন মন নিয়ে প্রিয় যেও না ফিরে। ৭৮ আর পিএম এই শুনেছি শান্তা আপ্তে। এই একই গান।

এল পি মানে হয় তো ছুটির দুপুরও। আমি আলাদা থাকতে শিখে গেছি আমার দোতলায়, আমার গানও তখন আলাদা। কিন্তু সলিল চৌধুরীর সঙ্গে একটা সখ্য থেকে যায়। বাবা যা শোনে সবই তখন অরুচি। কিন্তু ওই একটা এল পি, হিটস অফ সলিল চৌধুরী, কাভারে একটা ফুলের পাপড়ি গুচ্ছে নানা মুখের সলিল চৌধুরী। রবিবার সেদিন। উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রার মে। দুপুরের রোদে নিঃঝুম শান্তি। বাজছে। দরজায় ঘণ্টা বাজায় একটু একটু টাল খেয়েছে। বাবা নীচে ডেকে নিল। দেখলাম এক রংজ্বলা সাধারণ শার্ট প্যান্টের লোক বসে আছে। বয়স বোঝার সামর্থ্য আমার নেই। বাবা বললেন আলাপ করালেন অরুণ কাকু। বাবার ক্লাসমেট। আমাকে অনেক ছোটবেলায় দেখেছিলেন এখন দেখতে চাইছিলেন। মনে আছে সেদিন মা বাড়িতে ছিলেন না। খানিকক্ষণ বাদে দেখলাম ভদ্রলোক উঠে গেলেন। আমি ছাদ থেকে দেখলাম নীচে বাবা তাঁর হাতে কিছু টাকা দিলেন। পরে জেনেছিলাম ভদ্রলোক লোকাল ট্রেনে মাজন বিক্রি করেন। থাকেন ক্যানিং এর দিকে পিয়ালিতে। সালটা ১৯৯২। এখন তিনি কোথায়? দুপুরের নিঃঝুম শান্তি সে গানে আর কখনও আসবে না।

এল পি কি তাহলে একটা স্পেস? একটা জায়গা টুকরো অনুভূতি লতিয়ে ওঠার? যেখানে আমার এই অশেষ গানের টানেল ক্রমশ দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছে? বাবা বেঁচে থাকলে কি এই সুড়ঙ্গে যেতেন কি?

এল পি একটা বিকেল। যেখানে গ্রুভান্তরে যাবার পর পরতে একটা মিহি আবরণ লেগে থাকে, বিকেল ক্রমশ মোমের হয়ে ওঠে।