মিনির কাবুলিওয়ালা আর কুয়োরপাড়

অর্পিতা বাগচী


পরীক্ষা শেষ। বাড়ি ঢুকতেই মা তাড়া লাগিয়েছে, এ কদিন এই একই তাড়া কেমন অসহ্য ছিল। আজ বেশ লাগছে । আজ সব দিকের সবখানে ছুটি । মা বেশি কিছু বলার আগেই মিনি চান সেরে ভাতের আসনে । যত সময়ে এগিয়ে আসছে মার ব্যাস্ততা তত বাড়বে তার ওপর আবার বাবা যাচ্ছেন না । আজ ভাত একটু বেশিই গরম। অন্য দিন হলে মিনি অনেক কথা বলত। কিন্তু আজ না, আজ কিছুতেই না।
সারা বচ্ছর মিনি অপেক্ষাতে থাকে এই দিনের । আগে মা ভয় দেখাতো। আজকাল মিনি নিজেকেই নিজে ভয় দেখায় । রোজ রাত্তিরে শোওয়ার আগে আর ঘুম থেকে উঠে বলে, “ তুমি যদি ঠিক করে লক্ষ্মী হয়ে না থাকো, লেখাপড়া না করো, তুমি শিমুলতলা যাবে কি করে?” বাবা সকালে সাবধান করে দিয়েছেন, “ ওখানে খুব ঠাণ্ডা। মার কথা শুনবে”
শিমুলতলার জন্য মিনি সব পারে । মনে মনে বলেছিল, “ সব শুনবো। সব সব সব কথা”।
বাবার অফিসে অনেক কাজ, বাবা এবার আর যাচ্ছেন না । মিনি অনেক বার ভেবে দেখেছে,
কিন্তু হয়েনি কোনও বারই, একটুও মন কেমন করছে না বাবার জন্য ।
সারাদিন ট্রেনে, ওখানে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে। হাওড়া স্টেশনে মা, দাদাভাই আর মিনি যখন এসে দাঁড়ালো তার আগেই মাসি, দিদা, মেজমামা, ছোটমামা বড় বড় বেডিং এর ওপর বসে । দিদা কে গিয়ে প্রণাম করতেই দিদা হাত ধরে কোলে বসিয়ে, “কটা খাবে বলো ?”
মা যাতে শুনতে না পায় তাই দিদার গলা জড়িয়ে কানে কানে, “ কি দিদা কড়াইশুটির কচুরি আলুর দম আর লাল লাল টোম্যাটোর…” ততক্ষণে মা চোখে চোখাচোখি, “মিনি বড় হয়ে গেছো দিদার কোলে ওই ভাবে বসে ! দিদার কষ্ট হচ্ছেতো”
দাদাভাই আর ছোটমামা ব্যাট আর বলে । অন্য কোন জায়গা হলে মিনির ও ডাক পড়তো, স্টেশন
তাই বল ছোটমামার হাত থেকে দাদাভাই এর ব্যাটে আর সেখান থেকে আবার ঠিক বোলার এর হাতে । দাদাভাই হাত খুলে খেলছে না। বল ও এদিন ওদিক যাচ্ছে না , মিনির ও ডাক পড়ছে না।
ট্রেন আসছে । মাসি শক্ত করে হাত ধরেছে । মা দিদা কে । দাদাভাই ব্যাট আর বল কে । মেজো মামা, ছোটমামা তৈরি ট্রেন থামার আগে দরজা ধরে উঠে পড়তে হবে, তারপর ছোটো মামা একদিকের বেঞ্চিতে, মেজোমামা অন্য দিকে শুয়ে জায়গা ধরে রাখবে।
সব ঠিক ঠাক তোলার অনেক পরে ট্রেন ছাড়ল । শিমুলতলা । দিদা প্রনাম করছে মা, মাসি আর মিনি ও। মনে মনে বলছে, ঠাকুর, ট্রেন যেন কোথাও না থামে, সোজা শিমুলতলা...
শিমুলতলা স্টেশনে ট্রেন ঢুকল পশ্চিমের ঠাণ্ডা ও ছুঁয়ে দিলো । এমনিতে খুব বড় স্টেশন না।স্টেশন মাস্টার কে বলা ছিল আগেই। বেডিং আর বাকী সবাই সাবধানে নামার পর ট্রেন চলল আরও পশ্চিমে।
হাসিহাসি মুখ , গায়ে সাদা হাফ হাতা পাঞ্জাবি , শাল। হাঁটুর একটু নীচ অব্দি ধুতি, মাথার গামছাটা কান অব্দি ঢাকা । নন্দীয়া। মাঝ বয়সি, সাদা সাদা চুল, গায়ের রঙ তামাটে ।
“আরে, মিনি দিদি এসেছে”
-তুমি তোমার গরুর গাড়ি এনেছো?
-না । মিনি দিদির জন্য ঘোড়ার গাড়ি এনেছি
- তুমি ঘোড়া কিনেছ !
- না গো আমার গোরুগুলো ঘোড়া হয়ে গেছে । তুমি চড়ে দেখবে কি জোরে ছুটবে ।
মিনি, দিদা, মা, মাসি আর বেডিং নন্দীয়ার গরুর গাড়িতে । গাড়ি চলছে লাল মাটির রাস্তা দিয়ে, সন্ধ্যের মধ্যে দিয়ে আনন্দ ধামে।
-মিনিদিদি তুমি চালাবে? আমার ঘোড়ার গাড়ি।
প্রশ্ন শোনা মাত্র উত্তর দেবার প্রয়োজন নেই ভেবে যেই না সবাইকে ডিঙ্গিয়ে সামনে আসতে আসতে যাবে, “ মিনি বড় হয়ে গেছ , যাবে না বস”
আনন্দ ধামের লোহার গেটের চাবি খুলে হাট করে দেওয়া হল লোহার গেট । মিনি এক দৌড়ে
কুয়োপাড়ে। আকাশের চাঁদ তখন ও কুয়োর জলে আসেনি । মিনি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল আজ চাঁদ উঠেছে তো ? আছে । তবে আসবে কুয়োর জলেও নাইতে আসবে চাঁদ , মিনি জানে ।
কি নরম এই কুয়োর পাড়, চকচকে বাঁধান, পাশের কুল গাছটার পাতা পড়ে থাকে শুধু । ঠিক কুয়োর গা ঘেঁষে কলঘর তার দেওয়ালের গায়ে মাঝবরাবর কিছুটা ফাঁক। মা, মাসি যখন স্নান করতে কলঘরে ঢোকে, নন্দীয়া কুয়ো থেকে জল তুলে ওই গর্তে ঢালে আর সেই জল দেওয়ালের
ওই পারে ছোট্ট চৌবাচ্চা তে গিয়ে পড়ে ।
রাত্তির যত বাড়ছে শীত ও বাড়ছে। ঘরে ঘরে হ্যারিকেন । মা অনেক বার বলছে , “খেয়ে নিয়ে
দিদার পাশে শুয়ে পড় না। পারছিস না তো, কাল সকালে যাবি আবার কুয়ো পাড়ে”। কি করে
যেন মা জেনে গেছে । কিন্তু পুরোটা জানেনি। চাঁদ আসবে আর একটু পরেই কুয়োর জলে নাইতে।
আর সেই চাঁদ ধোয়া জল কাল সকালে নন্দীয়া মিনির মাথায় ঢালবে । পরীক্ষার দিন গুলোতে
পড়তে বসলেই ওই জলে মিনি কত কত দিন ভিজেছে। কাল রাত্তিরে শেষ অব্দি আর পারেনি কখন যেন ঘুম এসে ডেকে নিয়েছে ।
আজ খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো। বাবার দেওয়া লাল কোট পড়ে মিনি তৈরি । নন্দীয়ার সাথে সাইকেল চেপে একটার পর একটা ধান ক্ষেত, কপি ক্ষেত, টম্যাটো আর সর্ষে ক্ষেত পেরিয়ে দুধ আনতে যাবে। কত সংসারের গল্প শুনবে মিনি তখন। গরু কত দুধ দিচ্ছে, নন্দীয়ার ছোটো মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে, বড় নাতি এবার কলেজে পড়তে যাবে মিনির সাথে এতো কথা কেউ বলে না। কিন্তু কাল রাত্তিরে যে চাঁদ দেখা হয়নি! যদি নন্দীয়া জিজেস করে, কি বলবে? এবার ক্লাস নাইনে উঠবে মিনি, আর মা তো বলেছে বড় হয় গেছে। ও ঠিক কিছু একটা বলে দেবে।
কেন জানে না ইচ্ছে হয় না নন্দীয়াকে কিছু একটা বলে দিতে, মন চায় না । মা কে ও বলে মাঝে মাঝে আজকাল কিন্তু নন্দীয়াকে না।
“মা আমি দুধ আনতে গেলাম”, বলে বেড়োতেই যাবে আর অমনি মার গলা, “ না। যাবে না”
কেন জিজ্ঞেস করার আগেই দু চোখ টলটল। আবার মার গলা, “দাঁড়াও আসছি”। মা এসে নন্দীয়া কে কি কি আনতে হবে বলে আরও কি যেন বলে চলে যাবার সময়ে, “ সাবধানে যাবে আর ফিরে এসে আমার সাথে দেখা করবে।” সেবার আর নন্দীয়া সাইকেলে চড়ায়েনি। এ ক্ষেত ও ক্ষেত পেড়িয়ে অনেক গল্প শুনতে শুনতে সেদিন হেঁটে হেঁটে দুধ নিয়ে ফিরেছিল মিনি।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে কুয়োর পাড়ে রোদ এসে পড়ে। দাদাভাই, ছোটমামা, মেজমামা সেই রোদে বসে তেল মাখচ্ছে আর নন্দীয়া মাথার গামছা গায়ে বেঁধে একটু তেল দিয়ে গা গরম করেছে । এরপর যা হবে মিনি তাও জানে। একের পর এক বালতি নামবে, জল উঠবে আর স্নান যাত্রা শুরু। তবে এ যাত্রার শেষ অন্য । নিজের মাথায় নিজেই জল ঢেলে যাত্রা পালা সাঙ্গ করবে নন্দীয়া। কুয়োরপাড় জল থৈ থৈ। কুল গাছের পাতা আটকে রাখবে জল আরও বেশ কিছুক্ষন। জল সরবে একটু একটু করে তারপর পড়ে আসা রোদে কুয়োর পাড় শুকিয়ে আরও চকচকে হবে তার আরও পরে চাঁদ আসবে।
প্রথম রাত্তির বলেই বোধ হয় শীত একটু না বেশ বেশীবেশীই লাগছে মিনির। হ্যারিকেন এর আলো ঘিরে বসেছে দিদা, মিনি আর নন্দীয়া। সকালে মিনি কে যে কথা বলেছে এখন দিদা কে বলছে। মিনি দুবার করে শুনছে। কাল সকালে আরও অন্য গল্প শুনবে। মাঝে মাঝে মিনির ইচ্ছে প্রবল হয় এখানেই থেকে যেতে। কথায় কথায় রাত্তির বাড়ছে, ঠাণ্ডা ও। নন্দীয়া এবার
তার ঘরে যাবে । নন্দীয়া উঠে দাঁড়াতেই মিনি ও এক লাফে উঠে পড়ল, হাত ধরে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কুয়োর পাড়ে। একটু ঝুঁকে আরও জোরে চেপে ধরল নন্দীয়ার হাত। “ কাল মিনি দিদি
চাঁদ ধোয়া জলে চান করবে, আমি জল তুলে মিনি দিদির মাথায়ে ঢালবো” নন্দীয়ার সাইকেল বেল বাজাতে বাজাতে চলে গেল। মিনি কত রাত্তির অব্দি জেগেছে মনে নেই।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দাদাভাই এসে বলে দিলো আজ তাড়াতাড়ি চান করে সামনের
মাঠে আসবি, সামনের পাইন ভিলার ছেলেদের সাথে ম্যাচ আছে। মিনি ও তো তাড়াতাড়ি চান করতেই চায় । রান্নাঘরের সামনে বসে আখের গুড় আর গরম রুটি খেতে খেতে দেখল আজ নন্দীয়া দুধ নিয়েই এসেছে। আজ সবাইকার দেরী, কাল চাঁদ দেখেছে যারা, সবাইকার। তাড়াও আছে। আজ ম্যাচ। এক এক করে চান করছে সবাই। মিনি জানে চাঁদ ধোয়া জল কারো মাথায় ঢালবে না নন্দীয়া। সবার শেষ মিনি আসবে আর নন্দীয়া ঠিক চাঁদের জল ঢালবে মিনির মাথায়। মিনির গায়ে গামছা , চুল খোল, চোখ বন্ধ। বালতি নামছে চাঁদের জল আনতে ...
“ মিনি কি করছো ! ভেতরে যাও । কলঘরে স্নান করো। যাও”
“মা”। আর কিছু বলার আগে মা মিনির হাত ধরে কলঘরে। চোখের জ্বালা তখনো জুড়োইনি, তবু বল ধরতে রোদে দাঁড়াতে হল। মিনি কে দেখলে দাদাভাই যেন আরও জোরে জোরে মারে।
পাঁচিল টপকে বল পড়ল কুয়োর জলে। পাইন ভিলা হারছেই, তাই দাদাভাইর তর আর সইছে
না। মিনি কুয়োর পাড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে , দাদাভাই ঝপাং ঝপাং বালতি ফেলছে কুয়োর জলে, বল উঠছে না, আরও জোরে জোরে বালতি ফেলছে, মিনি চিৎকার করে, “ কি করছিস তুই ! আস্তে করলে তো পারিস”। বল উঠেছে। বালতি ভর্তি জলে বল ভাসছে। বল নিয়ে দাদাভাই ছুটতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো, বালতি জল মিনির মাথায়ে ঢেলে এবার দৌড়। কুয়োর পাড় ধুয়ে যাচ্ছে , পাইন ভিলা হেরে যাচ্ছে, আর মিনি? মিনি ও স্নান সারছে চাঁদ ধোয়া জলে ...