অন্তিম সাক্ষাৎকার

শুভ্র ভট্টাচার্য



তারা ছিল তিনজন। তারা ছিল একসাথে। তারা ছিল বন্ধু পরস্পরের। আর তাদের ছিল থিয়েটার। ঘুমে জাগরণে স্বপ্নে দুঃস্বপ্নে থিয়েটারের নেশায় বুঁদ তিনটে মানুষ – অজিত, খেয়া ও প্রসাদ। এই কোলকাতা শহরের পটভূমিতে তাদের তিনজনের বন্ধুত্বের গল্প এবং অবশ্যই তাদের থিয়েটার বা নাটকের গল্প। যে গল্পগুলো আজ মৃত কিংবা তাদের পরিচিত কোনো কোনো মানুষের ধুলোমাখা স্মৃতির বাক্সে হলদে হয়ে যাওয়া অনেক পুরোনো চিঠির মত...

শ্যামপুকুর স্ট্রীটের যে ভাড়া করা ঘরে তারা দলবল নিয়ে রিহার্সাল দিত, নোনাধরা দেওয়াল ও সিলিং থেকে ঘনঘন খসে পড়তো চুন সুরকির পলেস্তারা। সর্বক্ষণ ছাদের ফাটল দিয়ে জল চুঁইয়ে পড়তো। এছাড়া ছিল পাড়া প্রতিবেশী, বিষেশত কিছু প্রবাদী মানুষের নৈমিত্তিক বাক্যবান।
- রিহার্সালের নাম করে রোজ রোজ এই হল্লাবাজী আর সহ্য হয়না মশাই।
- তা যা বলেছেন দাদা। তাছাড়া ঐ যাত্রা না থ্যাটারের নাম করে শালার ব্যাটাছেলে মেয়েছেলেতে যা গলাগলি ঢলাঢলির বহর!
- শুনিচি এদের সঙ্গে নাকি ও পাড়ার ঐ ইয়েরা, মানে বেশ্যা মাগীরাও মাঝেসাঝে এস্টেজে উঠে – অ্যারে ছ্যা ছ্যা।
- থ্যাটারের নাম করে এরা তো দেখছি একেবারে রাসলীলা চালু করে দিল!
- তাই তো। বলি এটা কি বেন্দাবন পেয়েছো? হাজার হোক ভদ্দরলোকের পাড়া বলে কতা। বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার করি। আর এখানেই কিনা –
তো এইসব ছোটোখাটো সমস্যা ওরা তিনজন এবং ওদের দলের সাঙ্গোপাঙ্গরা গায়েই মাখত না। তারা শুধু থিয়েটারেই মশগুল। সংলাপ, আলো, মিউজিক, সেট এবং অভিনয়গত নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে তাদের দিব্যি কাটছিল দিনরাত।

থিয়েটারের দলগড়ার প্রথমদিকে তারা অন্যের লেখা কিছু ছাপা নাটক মঞ্চস্থ করেছিল বটে। কিন্তু তাতে ওদের মন ভরছিল না। যাকে বলে থিয়েটারের খিদেটা ঠিক মিটছিল না। তাই তারা ঠিক করল নিজেদের নাটকের স্ক্রিপ্ট নিজেরাই লিখবে। সুতরাং রবিঠাকুর থেকে শেক্সপীয়র, শরদিন্দু-চেকভ-গোর্কি-ম ানিক বাঁড়ুজ্যে, শিশির ভাদুড়ি-গিরীশ ঘোষ থেকে বার্নাড শ-ব্রেখট- দারিও ফো... ঘেঁটে-ছেঁটে-ছেনে-বেছে শুরু হোল নিজেদের পহন্দসই স্ক্রিপ্ট লেখা। মূলতঃ প্রসাদ ও অজিতের লেখনীতে ভর দিয়েই শুরু হোল সেই থিয়েটার দলটির স্বপ্নের দৌড়। যে দলের নাম – না, থাক। নামটা আপাতত উহ্যই থাক।
‘পরিচালকের খোঁজে পাঁচজন’, ‘পাঁচ পয়সার পালাগান’, ‘রং বেরঙের দিনগুলি’, ‘আফগানী শার্দূল’, ‘চামরার গোলক’ – এরকম অসংখ্য নতুন স্বাদের নতুন ভাবনার নাটক এবং তাদের অসাধারণ অভিনয় সমৃদ্ধ প্রযোজনা। ঘেরা মঞ্চে, মাঠে-ময়দানে যেখানেই এই দলের নাটক, সেখানেই দর্শকের ঢল। হুড়োহুড়ি-উল্লাস-অভিনন দন! অভিনেতা তথা নাট্যকার হিসেবে অজিত ও প্রসাদের জয়জয়কার। পাশাপাশি বাংলা রঙ্গমঞ্চের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে খেয়াকে মেনে নিল নাট্যমোদী দর্শক। প্রকৃত অর্থেই সেই নাট্যদলের তখন বড় সু-সময়। পাশাপাশি বাংলা থিয়েটারেও যেন এক নতুন দিশা, নতুন ভাষাও পরিচয় খুঁজে পেল।


এটা তো গেল একটা দিক। অন্যদিকে ঐ তিন বন্ধুর জীবন এক অন্য খাতে বইতে শুরু করেছিল। তাদের প্রগাঢ় বন্ধুত্বের বাইরে কিংবা অবচেতনের অন্তরমহলে আলতো ঘনিয়ে উঠতে লাগল চিরাচরিত সেই ত্রিকোণমিতি।
প্রসাদ ভালোবাসতো খেয়েকে। খেয়া অজিতকে আর অজিত...? সচরাচর এসব ক্ষেত্রে যা যা হয়ে থাকে, অর্থাৎ মান-অভিমান, ঝগড়াঝাঁটি, ঈর্ষাজনিত বন্ধু বিচ্ছেদ – সেসব কিছুই কিন্তু ওই তিনজনের মধ্যে ঘটল না। অন্তুতঃ চোখে পড়ল না কারো। তবু কোথায় যেন একটা অস্থির দ্বন্দের চোরাস্রোত ওদের তিনজনের ভেতরে ভেতরে... একটু যেন বেসুরে বাজতে লাগল এতদিনের নিবিড় বন্ধুত্বের সুরে বাঁধা তানপুরা। আর মাঝেমাঝেই তার আঁচ এসে লাগছিল তাদের থিয়েটারে। তাদের তিনজনের মাঝখানে থিয়েটারই তো ছিল একমাত্র সেতু। অথচ সেই সেতুর আপাত মজবুত কাঠামোয় ঘূণ ধরতে শুরু করেছিল একটু একটু করে।

তবু এতকিছুর পরেও তখনো তারা তিনজন একসাথেই। তখনো তাদের থিয়েটার অনলস এবং অভূতপূর্ব। যাকে বলে Talk of the town। এরই মাঝে একদিন শেষ বিকেলে তারা তিনজন আউট্রাম ঘাটে। অনেক অনেক দিন পর থিয়েটার থেকে ছুটি নিয়ে গঙ্গায় নৌবিহারে। হয়ত পরস্পরের মুখোমুখি বসে নিজেদের একটু গুছিয়ে নেবার জন্যই।
নৌকা তখন মাঝগঙ্গায়, তাদের ত্রিমুখী গল্প, গান, কবিতায় ভরে উঠেছে। কত জমে থাকা কথার অফুরান আড্ডা। আর কিছু অবশ্যম্ভাবী নিরবতাও। একটা মস্ত জাহাজ একটু দূর দিয়ে চলে গেল ভোঁ বাজিয়ে। আর তখনই নৌকা দুলে উঠল জোরে। ভরা জোয়ারের গঙ্গায় বেয়ামাল তার তিনজনই একই নৌকার যাত্রী। মাঝি যেন কিছুতেই সামাল দিতে পারছে না। নৌকা বুঝি ডোবে ডোবে! আতঙ্কে চীৎকার করে উঠল খেয়া। হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল বন্ধু প্রসাদের হাত। কিন্তু কিভাবে যেন প্রসাদের হাত ফস্কে খেয়া... হতবাক প্রসাদ অজিতের দিকে তাকালো। অজিতও স্থির চেয়ে আছে তারই দিকে, অদ্ভুত দৃষ্টিতে। কয়েক পলক মাত্র। প্রথমে মাঝি, তারপর প্রসাদও ঝাঁপিয়ে পড়ল উত্তাল নদীতে। আর অজিত? সে যে সাঁতার জানতো না।

জল তোলপাড় করেও পাওয়া গেল না খেয়াকে। শেষ অবধি খবর পেয়ে জল-পুলিশের লঞ্চ এল। প্রশিক্ষিত ডুবুরীরা এল। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। ঘণ্টা চারেক পরে জলে ভিজে ফুলে ওঠা খেয়ার লাশটা ভেসে উঠেছিল বাবুঘাটের জেটির কাছে।


ঘটনার তদন্ত শুরু হোল। কারণ একে তো নামী অভিনেত্রী, তায় অপঘাতে আকস্মিক মৃত্যু। তাছাড়া দু-দুজন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে একজন অবিবাহিত যুবতী – হুঁ হুঁ বাবা, ডাল মে কুছ তো কালা জরুর হ্যায়। সুতরাং কোর্টে কেস উঠল। অনেকেরই ধারণা, প্রসাদ সেদিন ইচ্ছে করেই খেয়াকে ধাক্কা মেরে... অজিতও কি তাই বিশ্বাস করেছিল? না হলে সেদিন ঐ বিশেষ মুহূর্তে সে প্রসাদের দিকে ওভাবে তাকিয়ে... চাপান উতোর চলতেই থাকল। এমনকি খবরের কাগজে, থিয়েটারের অন্যান্য দলগুলোতে এবং উৎসুক মানুষের মুখে মুখে ডালপালা মেলতে লাগল তাদের তিনজনের সেই গোপন ভালোবাসার ত্রিকোণমিতি।
কেসের কোনো নিস্পত্তি হোল না। উপযুক্ত প্রমানের অভাবে মামলা খারিজ হয়ে গেল। আর তারপর থেকেই অজিত ক্রমশঃ পালটে যেতে লাগল। ভালো করে খায় না, ঘুমোয় না। কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। থিয়েটারের রিহার্সালে অনিয়মিত। এলেও বেমানান নিরব প্রায়। নিজের প্রানের চেয়েও প্রিয় থিয়েটার থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছিল অজিত। সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ঘরের কোণে একলা বসে থাকে। সারাক্ষণ বিড়বিড় করে কি যেন বলে। একা একা ঘুরে বেড়ায় শহর কোলকাতার অলিগলি। গোত্রহীন বেশ্যাদের শরীর আর লাগামছাড়া মদের নেশায় আকন্ঠ ডুবিয়ে দেয় নিজেকে। অচেনা মানুষের ভিড়ে খেয়াকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত বিধ্বস্ত অসুস্থ মানুষটা বড় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। অবশেষে একদিন ভোরবেলায় নিজের ঘরের সিলিং থেকে ঝুলন্ত অজিতের নিথর দেহটা... সুইসাইড নোটে লেখা ছিল – ‘আই হ্যাভ নাথিং টু লুজ, সো আই কুইট দা গেম।’

অজিত চলে গেল, খেয়া তো অনেক আগেই চলে গেছে। শুধু একা প্রসাদ আজও বেঁচে আছে, তিন বন্ধুর স্বপ্নের থিয়েটারের ফেরিওয়ালা হয়ে। আজ দেশ বিদেশ জোড়া সুনাম এই নাট্যদলের।ঈটাই তো চেয়েছিল একদিন তারা তিনজন মিলে, অথচ...
থিয়েটার থেকে যা যা পাবার, প্রায় সবই তো পাওয়া হয়ে গিয়েছে। তবু বুড়ো প্রসাদের বুকের ভেতরে আজো কখনো কখনো খেয়ার অভিনয়ের টুকরো - টুকরো কতগুলো ছবি আর সেদিন অজিতের চোখের সেই দৃষ্টিটা... বারবার নিজের অবচেতনে রক্তাক্ত হতে হতে প্রসাদ প্রাণপণে তার সবটুকু সত্ত্বা দিয়ে আঁকড়ে ধরতে চায় শুধু থিয়েটারকেই।

সেট রেডি হয়ে গেছে। মঞ্চের আলো জ্বলে উঠেছে। মিউজিকের তালে তালে পর্দা উঠছে। এখনই শুরু হবে নাটক। অজিত এবং খেয়া অভিনীত – ‘অন্তিম সাক্ষাৎকার!’ উইংসের পাশে একটা চেয়ারে একা বসে প্রসাদ তখন একটু একটু করে ডাউন মেমোরি লেন ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিরিশ বছর আগে...