অ্যান্টেনা

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়


অনেকক্ষণ ধরেই খুট - খাট টুং - টাং ঝনঝন আওয়াজে রোববার সকালের আলসেমির ঘুমটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছিল অনিন্দ্যর। চোখ খুলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ক’দিন যা খাটাখাটনি আর অনিয়ম গেছে। বাড়ি ভর্তি লোক ছিল। শোওয়ার জায়গাটুকুও পায় নি ঠিক মত। সবে গতকালই বাড়ি খালি হয়েছে। কাল থেকেই আবার অফিস। কিন্তু শরীর আরও খানিকটা বিশ্রাম চাইছে। তাই বালিশ আঁকড়ে শুয়েই ছিল অনিন্দ্য। কিন্তু এবার বেশ জোরে ঝনঝন আওয়াজ। ব্যাপার কি দেখতে এবার উঠতেই হল। বাবার ঘরে মেঝেতে বসে গলদঘর্ম হয়ে পুরনো টিভির অ্যান্টেনাটা ঝাড়পোঁছ করছে পৃথা। রডগুলো প্রায় সবই খুলে এসেছে। একটা একটা করে মুছে একপাশে গোছ করে রাখছে। ধুলোমাখা ট্রাঙ্ক দুটোও বের করেছে খাটের তলা থেকে।
- সকাল থেকেই এসব নিয়ে পড়লে?
- অন্যদিন সময় কোথায় পাই বল? আজ তোমারও একটু হেল্প পাবো।
- কি করতে চাইছ?
- বলেছিলাম না, বাবার ঘরটা খালি করে রনির জন্য স্টাডি বানিয়ে দেব!
সবে তো দুদিন হল কাজ মিটেছে বাবার। এর মধ্যেই...! নাহ, অযথা সেন্টিমেন্টাল হওয়ার মানে হয় না। রনির আই সি এস ই পরীক্ষার আর ছমাসও নেই। ছেলেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা আলাদা পড়ার জায়গার ব্যবস্থা করে দিতে চাওয়া মা হিসাবে কিছু অন্যায় তো নয়ই বরং স্বাভাবিক। তবু না ভেবে পারেনা অনিন্দ্য। দিন পনেরো আগেও তো বাবা এই ঘর জুড়ে ছিলেন!
- চৌকিটা শঙ্করকে দিয়ে দেব, বলে রেখেছি। বদলে আর কিছু টাকা দিয়ে ও একটা পড়ার চেয়ার-টেবিল আর ছোট একটা বইএর ক্যাবিনেট বানিয়ে দেবে। আজই ক্যাটালগ নিয়ে আসবে বলেছে। ...এই পুরনো ট্রাঙ্ক দুটো নিয়ে যে কি করি! আপাতত বারান্দায় রেখে দিচ্ছি। একটু খোঁজ কোর তো, কেউ যদি নিতে চায়। ...বাবার বইপত্র, জামাকাপড়, জুতো...আর যা যা ছিল সব লফটে তুলে দিয়েছি। রনি বলছিল, বাবার ছড়িটা, নস্যির কৌটো আর চশমাটা রেখে দিতে...তুমিও দেখো যদি কিছু রাখতে চাও। বাকিগুলো কাউকে দিয়ে দিলেই হয়...
এবার তাহলে বাবার সত্যি সত্যিই বিদায়। এ’কটা দিন বাবার ঘরে ঢুকলে মনে হত না, মানুষটা আর নেই। যেন কোথাও বেরিয়েছে একটু, যেমন বেরোতো, যেন এখনই ফিরবে। এ ঘরটা যেমন ছিল তেমনই থেকে গেলে বেশ হত, কিন্তু তা কি আর সম্ভব? এতটা বিলাসিতা কি করে করবে অনিন্দ্য এই আড়াই কামরার ফ্ল্যাটে? পৃথাকে তাই দোষ দিতে পারে না। তাছাড়া, একটা মানুষ মানে শুধুই কি তার শরীরী অস্ত্বিত্ব? ওই যে ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে উলটোদিকের দেওয়ালে, ওই যে জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকছে সকালের হিম হিম অঘ্রানের বাতাস, ওর মধ্যে কোথাও কি বাবা নেই?
- মুশকিল হয়েছে এই ভাঙ্গা অ্যান্টেনাটা নিয়ে। এটাকে নিয়ে যে কি করি! পুরনো ভাঙা লোহা-টোহা কেনার লোক আসে মাঝে মাঝে, ওদের বলে দেখি...
পুরনো টিভিটা বিদেয় হয়েছে কবেই। রয়ে গেছে অ্যান্টেনাটা। বাবা ফেলতে দেন নি। সেই পাইকপাড়ার এজমালি বাড়িতে ছাতের এক কোণে একটা বাঁশের খুটির ওপর বাঁধা থাকতো ওটা। তাদের পুরনো চটা-ওঠা বাড়িতে একটু বেমানানই ছিল। এর আগে পাড়ায় আর মাত্র দুটো বাড়ির ছাদে দেখা যেত অ্যান্টেনা। এক ধরণী ডাক্তার আর এক সনাতন উকিলের বাড়ি। তাদের গ্যারাজে গাড়ি ছিল, বাড়িতে ছিল শখের কুকুর। অনিন্দ্যদের এসব কিছুই ছিল না, তবু কিভাবে যেন তার সাদামাটা বাবা হঠাৎ করে বড় কাঠের বাক্সের মত দেখতে একটা টিভি এনে হাজির করেছিলেন। সঙ্গে ওই অ্যান্টেনাটা। অনিন্দ্যর তখন ক্লাস সিক্স। রাতারাতি ওই অ্যান্টেনাটা তাদের বাড়িটাকে পাড়ার অন্য বাড়িগুলো থেকে আলাদা করে দিল।
পরে তো পাড়ার আরও অনেক বাড়িতেই এল এমন অ্যান্টেনা। শেষে তাদের বাড়িটাই আর রইলো না। শরিকি বিবাদে জেরবার হয়ে বাবা তাঁর নিজের অংশ বিক্রি করে চলে এলেন শ্যামবাজারের এক ভাড়া বাড়িতে। অনিন্দ্য তখন পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করতে করতে চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে। ততদিনে ঘরে ঘরে কেবল্ টিভি। তাদেরও পুরনো টিভিটা বদলে ছোটো টিভি এসেছে। অ্যান্টেনার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তবু বাবা সেটাকে নিয়ে এসেছিলেন অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে, যদি কখনও কাজে লাগে!
তারপর অনিন্দ্যর চাকরি হল, পৃথা এল, রনি...। মা চলে গেলেন। দমদমের এই আড়াই কামরার ফ্ল্যাট কেনা হল। এবারও বাড়ি বদলের সময় বাবা অ্যান্টেনাটা আনতে চাইলেন। ততদিনে ওটা টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। অনিন্দ্য বেশ বিরক্ত হয়েছিল বাবার এই খামখেয়ালিপনায়,
- কি হবে আর ওটা দিয়ে? কোনও কাজে তো লাগবে না!
খানিক ইতস্তত করে বাবা বলেছিলেন,
- থাক, আছে একটা জিনিস! কত মানুষও তো এমনিই থেকে যায়, কোনও কাজে লাগে না, ধর না আমারই মত...
- কি যে বল!
আর কিছু বলতে পারে নি অনিন্দ্য। কেন কে জানে এই ভাঙা অ্যান্টেনাটার ওপর অদ্ভুত একটা মোহ ছিল বাবার। নিজেই জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন কতবার, পারেন নি। মেকানিকের খোঁজও করেছিলেন, পাওয়া যায় নি ধারেকাছে।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এসব বাতিক বাড়ছিল বাবার। কিছু ফেলতে চাইতেন না। বিশেষতঃ পুরনো জিনিস। বলতেন, যাকে রাখ, সেই রাখে...। কে জানে, হয়তো হারিয়েও ফেলছিলেন অনেক কিছু। নতুন করে পাওয়ার ও আর কিছু ছিল না। তাই এই পুরনো জিনিস আঁকড়ে ধরার বাতিক। ছোট ফ্ল্যাটে এসব বাতিকে বিরক্ত হত পৃথা। বাবা বুঝতে পারতেন, তাই সবকিছু জড় করতেন নিজের একরত্তি ঘরের ছোট চৌকিটার নীচে, আজ যেখানটা ঝেঁটিয়ে পরিস্কার করছে পৃথা।
একবার ঘূর্ণিঝড় আয়লার কারণে যখন সারা শহর বিপর্যস্ত, কেবল্ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, টিভিতে ছবি আসছে না দিনের পর দিন, কবে ঠিক হবে কেউ বুঝতে পারছে না, বাবা প্রবল উৎসাহে সেই ভাঙা অ্যান্টেনা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। কোনোমতে জোড়া লাগিয়ে সেটাকে টাঙানোও হয়েছিল বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরে। কিন্তু তাতে লাভ কিছু হয় নি। বাবা আশাহত হয়েছিলেন খুব। ফের সেটাকে খাটের নীচে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বলেছিলেন,
- আমারই মত অপদার্থ রে!
হয়ত শেষ বয়সে বাবা ওই ভাঙা অ্যান্টেনাটার মধ্যে নিজেকেই দেখতে পেতেন। আজ মনে হয় অনিন্দ্যর, কম বয়সেও ওরকমই ছিলেন বাবা, একটা বিশেষ দিকে স্থির, একরোখা, কোনও ঝোড়ো হাওয়া কখনও বেসামাল করেনি যাঁকে, তাই তাঁর জীবনের ছবিটাও ছিল উজ্বল, নিস্কম্প।
তবে, তাদের অ্যান্টেনাটা কিন্তু হাওয়ার দাপটে স্থির থাকতে পারতো না। বেশ মনে আছে অনিন্দ্যর, একটু জোরে হাওয়া বইতে শুরু করলেই ছবি চলে যেত। স্ক্রিনে তখন সাদা কালো ঢেউ। এরকম হলেই ছুট্টে ছাদে চলে যেত অনিন্দ্য। ঘুরে যাওয়া অ্যান্টেনাটাকে রড ধরে ঘুরিয়ে একটা বিশেষ দিকে কোণাকুণি রাখতে হত। বাবা নীচে থেকে চিৎকার করতেন,
- ডাইনে, আর একটু ডাইনে, ইসস্...এবার একটু বাঁয়ে...
সেইমত রড ঘুরিয়ে যেত অনিন্দ্য। মনে আছে, ঘুড়ি ওড়ানোর দিনে কত রকমারি ঘুড়ি এসে আটকাতো অ্যান্টেনাটায়, সুতো জড়িয়ে গিয়ে খোলা হাওয়ায় পতপত করে উড়ত। সারা কার্ত্তিক মাস জুড়ে আকাশ প্রদীপ জ্বালত তারা ওই অ্যান্টেনাটার মাথার ওপর। স্বাধীনতা দিবসের ফ্ল্যাগ ওড়াত। আর বহুদিন পর্যন্ত কাউকে তাদের বাড়ির ডিরেকশন দিতে গেলে বলত, ‘তিনমাথার মোড় থেকে ডানদিকে চারটে বাড়ি ছেড়ে অ্যান্টেনা দেওয়া বাড়িটা...’। আজ মনে হয়, তারও কৈশোরের খানিকটা জড়িয়ে আছে ওই অ্যান্টেনার সঙ্গে, ঘুড়ির সুতোর মত। পৃথা তখন কোথায়? সে এসবের কি জানে?
খানিক ইতস্তত করে পৃথাকে বলল,
- ইয়ে, ওই অ্যান্টেনাটা রেখে দিলে হয় না?...লফটের এক কোণে পড়ে থাকবে!
কেন যে বলল, তা নিজের কাছেই খুব স্পষ্ট নয়।
পৃথা খুব অবাক হল শুনে।
- তুমিও কি বাবার মত পাগল হলে নাকি?
- না, ভাবছিলাম, ......পুরনো দিনের একটা স্মৃতি তো!
- পুরনো দিনের অনেক জিনিস রাখা আছে। পুরনো বাসনপত্র, লক্ষ্মীর পট, তোমার ছোটবেলার খেলনা, সার্টিফিকেট, মেডেল, সব আছে। এই ভাঙা অ্যান্টেনাটা রাখতে চেও না প্লিজ! বাবা থাকতে কিছু বলি নি। বুড়ো মানুষ, মনে কষ্ট পেতেন। কিন্তু তুমি আবার একই বায়না শুরু কোর না তো!
বেশ তাই হোক। সত্যিই, অযথা সেন্টিমেন্টাল হওয়ার কোনও মানে হয় না। তাই আপাততঃ এক চিলতে বারান্দার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে রইলো ট্রাঙ্ক দুটো আর তার ওপরে গোছ করে বেঁধে রাখা ভাঙা অ্যান্টেনার টুকরোগুলো।
সেদিন মাঝরাতে ঝনঝন শব্দে ঘুম ভেঙে গেল দুজনেরই। বারান্দার দিক থেকে এসেছে শব্দটা। বারান্দায় বেরিয়ে আলো জ্বেলে দেখে, মেঝের ওপর ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে অ্যান্টেনাটা।
- কি হল? আমি তো গোছ করে ওই ট্রাঙ্কের ওপর রেখেছিলাম, এভাবে ছড়িয়ে পড়লো কি করে?
অনিন্দ্য বলল,
- হতে পারে, বুঝতে পেরেছে এ বাড়িতে অদ্যই ওর শেষ রজনী। তাই হয়তো যেতে চাইছে না, প্রতিবাদ করছে।
- কি যে বল! বড় বড় ধেড়ে ইঁদুর ওঠে বারান্দায় পাইপ বেয়ে...তাদেরই কীর্তি নিশ্চয়ই।
- ইঁদুর? এত ভারী একটা জিনিস ঠেলে ফেলে দেওয়া কোনও ইঁদুরের কাজ বলে মনে হয় তোমার?
- না তো কি চোর এসেছে তোমার ভাঙা অ্যান্টেনা আর ট্রাঙ্ক চুরি করতে? ইঁদুর কি আর ঠেলে ফেলেছে? একটু ধাক্কা লেগে ডিসব্যালেন্স হয়ে হয়তো...
আবার সব গোছগাছ করে ট্রাঙ্কের ওপর তুলে রেখে ঘুমোতে গেল ওরা।
খানিক পরে আবার একই রকম আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। নিশ্চিত বারান্দা থেকেই এসেছে শব্দটা। অনিন্দ্য বলল,
- এত ইঁদুরের উৎপাত টের পেয়েছ কখনও?
পৃথা কেমন থম মেরে গেছে। কিছু বলল না। খানিক পরে বারান্দায় গিয়ে দেখে, আবার সেই একই দৃশ্য...
- থাক, আর গুছিয়ে লাভ নেই এত রাতে। চল কাল সকালে দেখা যাবে।
তারপর আর ঘুম আসছিল না অনিন্দ্যর। চোখে মুখে ঘাড়ে জল দিল। ভিজে তোয়ালেটা বারান্দায় মেলে দিয়ে এল। ভিজে তোয়ালে থেকে বিশ্রী গন্ধ ছাড়ে। মেলতে গিয়ে টের পেল উত্তুরে হাওয়া ছেড়েছে বেশ। হিম হিম হাওয়ায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার ঘরে এল। কাল থেকে অফিস। এবার একটু না ঘুমোলেই নয়। পৃথাও এপাশ ওপাশ করছিল। অনিন্দ্যকে দেখে বলল,
- একটা কথা ভাবছিলাম...তুমি তো আত্মা-টাত্মায় বিশ্বাস কর না!
- … তুমি তাহলে ভাবছ ওটা ইঁদুর নয়, বাবার প্রেতাত্মা?
- বাবার ওটা খুব প্রিয় ছিল তো! শুনেছি মায়ার বাঁধন কাটাতে না পারলে আত্মার মুক্তি হয় না! কালই দূর করবো ওটাকে, তারপর একটা শান্তি-স্বস্ত্যয়ন আর একবার গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান...
আর কিছু বলল না অনিন্দ্য। ঘুমোতে চেষ্টা করল। ঘুমিয়ে পড়লও একসময়।
আবার আচমকা ভেঙে গেল ঘুমটা। দেখল তার হাতটা খামচে ধরে তাকে ঝাঁকিয়ে তুলেছে পৃথা।
- শুনছো! ওই শোন! শুনতে পাচ্ছ?
- কি? কি শুনবো?
- একটু কান পেতে শোন!
হ্যাঁ, এবার শুনতে পাচ্ছে অনিন্দ্য। ঠক... ঠক... ঠক... চাপা একটা আওয়াজ!
দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা সময় দেখাচ্ছে ভোর পাঁচটা।
- ঠিক এই সময় মর্নিং ওয়াকে বেরতেন না বাবা? ওটা কি?...কি ওটা?...বাবার লাঠির আওয়াজ?
- কি বলছ কি? পাগল হলে নাকি তুমি?
ভোরে উঠে হাঁটতে বেরোনো বাবার অনেকদিনের অভ্যেস। ইদানীং লাঠিটা নিয়েই বেরতেন। জেগে থাকলে বা হাল্কা ঘুমের ঘোরে থাকলেও কানে আসতো ঠক... ঠক... আওয়াজটা। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে মিলিয়ে যেত। ঘড়ি মিলিয়ে নেওয়া যেত, ভোর পাঁচটা।
- এসব কি শুরু হল বল তো?
গলা কাঁপছে পৃথার। অনিন্দ্যর হাতটা শক্ত করে ধরে আছে তখনও।
- বাজে বোকো না! ছাড় আমাকে। দেখতে দাও।
- না না! কোথায় যাবে তুমি? কিচ্ছু দেখার দরকার নেই। আর একটু বেলা হোক। রোদ্দুর উঠুক!
ঠক... ঠক... ঠক...। জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে ঘরের বাইরে এল অনিন্দ্য। আওয়াজটা আসছে ওই বারান্দার দিক থেকেই। অবিকল মেঝেতে বাবার লাঠি ঠোকার আওয়াজ। বারান্দায় যাবার বন্ধ দরজাটার সামনে এল অনিন্দ্য। কিসের আওয়াজ? কি হচ্ছে ওখানে? ...বাবা? ...বাবা কি?.. দরজাটা খুললেই কি বাবাকে দেখতে পাবে অনিন্দ্য? ...কি দেখবে? হৃৎপিণ্ডটা মাথা কুটছে বুকের অস্থিপঞ্জরে, তার আওয়াজ নিজের কানে শুনতে পাচ্ছে অনিন্দ্য।
মরিয়া হয়ে দরজাটা টান মেরে খুলে ফেলল অনিন্দ্য। ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপট লাগলো চোখেমুখে। প্রথমেই চোখে পড়ল তোয়ালেটা, ঝুলছে, দুলছে হাওয়ায়। আর কি আশ্চর্য! ভাঙা অ্যান্টেনার একটা টুকরো কি করে জানি আটকে গেছে তোয়ালের সুতোর সঙ্গে। হাওয়ার দাপটে মাঝে মাঝে বেশ জোরে দুলে উঠছে তোয়ালেটা আর সেই আটকে থাকা লোহার দণ্ড ধাক্কা মারছে পাশের দেওয়ালে, আওয়াজ হচ্ছে ঠক... ঠক... ঠক...। নাহ বাবা নয়, বাবার কোনও চিহ্ন মাত্র নেই কোথাও। নেহাতই আধভেজা তোয়ালে আর অ্যান্টেনার ভাঙা টুকরো জড়িয়ে ভোরের হাওয়ার এক অর্বাচীন রসিকতা। একটু কি আশাহত হল অনিন্দ্য? সে কি সত্যিই ভেবেছিল বাবাকে দেখতে পাবে? আর একবার যদি...!
পৃথাকে ডেকে দেখাল। পৃথা তখনও ঠিক স্বাভাবিক হতে পারে নি।
- যাই বল, আমার কিন্তু ভাল লাগছে না! আওয়াজটা অবিকল বাবার লাঠি ঠোকার আওয়াজের মত! আর ঠিক পাঁচটাতেই ওই আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে গেল! এসব কি কাকতালীয়?
- তা না তো কি? এভাবেই তো কুসংস্কারের জন্ম হয়।
আর ঘুমনোর কোনও প্রশ্ন নেই। পৃথা লেগে পড়ল তার গেরস্থালীর কাজে। চা খেয়ে বারান্দায় এল অনিন্দ্য। ভাঙা অ্যান্টেনাটা তখনও ছত্রখান হয়ে পড়েই আছে। এক এক করে টুকরোগুলো জড় করে কাঠামোটা জুড়তে চেষ্টা করল। ঠিকমত হল না। কয়েকটা টুকরো হারিয়ে গেছে কোথায়! যেটুকু করা গেল সেভাবেই রেখে দিল অনিন্দ্য। যেরকম ভয় পেয়েছে পৃথা, তাতে এ বাড়িতে আজই যে ওর শেষদিন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। অদ্ভুত মানুষের মন! একটা আদ্যিকালের অকেজো ভাঙা অ্যান্টেনা! তার জন্যেও এত মায়া! দেখতে দেখতে, কি আশ্চর্য, ঠিক যেন বাবাকে দেখল অনিন্দ্য। হাঁটু আর কোমরের কাছ থেকে ভেঙে মাঝে মাঝে একটা ‘দ’ এর আকৃতি নিত বাবার ঢ্যাঙা শরীরটা। ঠিক তেমনি, তেমনি করে পড়ে আছে অ্যান্টেনাটা এখন।
- কি দেখছ ওটার দিকে অমন করে? ডেকে সাড়া পাচ্ছি না?
পৃথার গলা শুনে তাকিয়ে দেখল, সে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছে তাকে!
- দেখো দেখো, অবিকল এই ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়ে কাগজ পড়তেন না বাবা?
পৃথা মুখে কিছু বলল না কিন্তু কেমন অদ্ভুত চোখে দেখতে থাকল অনিন্দ্যকে।
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে অনিন্দ্য দেখল, ট্রাঙ্ক দুটো বিদেয় হয়েছে কিন্তু অ্যান্টেনাটা তখনও রয়েছে বারান্দার একপাশে।
- কি, আজ আসেনি তোমার লোহা-ভাঙা-ওয়ালা?
- নাহ, ভাবলাম, তোমার যখন ইচ্ছে নয়... বাবার এত প্রিয় একটা জিনিস! তোমারও ছোটবেলার স্মৃতি! কতইবা আর জায়গা নেবে...থাক...
- আরে না না, তা তো বলিনি.....তা ছাড়া কি সব আত্মা-টাত্মা বলছিলে...ভয় করবেনা তোমার?
- ভয় পাবো কেন? আত্মা বলে যদি কিছু থাকে, সেও তো বাবা-ই। ...ধরে নাও আমারও ইচ্ছে নেই...
- সেকি! অনিচ্ছে তো তোমারই ছিল!
- ইচ্ছে কি বদলায় না মানুষের?
আর কিছু না বলে রান্নাঘরে গেল পৃথা। কিছু বুঝলনা অনিন্দ্য। পৃথার মনের তরঙ্গ ধরতে চেষ্টা করলো নিজের অ্যান্টেনায়। ধরা পড়লো না। প্রতিটি মানুষেরি নিজস্ব অ্যান্টেনা থাকে। সেখানে ধরা পড়ে হাজার তরঙ্গ, তার কিছু পড়তে পারা যায়, কিছু যায় না। খুব প্রিয় মানুষ, চেনা মানুষ, কাছের মানুষ হলেও যায় না সবসময়। আর তাই তো জীবনের ছবিটা নিস্কম্প থাকে না কখনও।
ভাঙা অ্যান্টেনাটা আপাততঃ রয়ে গেল বিগত জীবনের কিছু সঙ্কেত বুকে নিয়ে।