ঝরা ফুলদলে

শ্রাবণী দাশগুপ্ত


ভালো লাগে ধরিত্রীর - রেন কম ঝমাঝম? না রেল কম ঝমাঝম? কতবার আর চড়া হয়েছে? অদ্বিতীয় হাওড়া ব্রিজ, স্টেশন প্লাটফর্ম, ‘কুলি কুলি’, বাক্স-প্যাঁটরা, ছুটি ছুটি গন্ধ। প্যাসেঞ্জার গাড়িখানা বেশ সরসরিয়ে পাশ কাটাচ্ছে খেত-খামার, ঝোপঝাড়, ডোবা-পুকুর। সন্ধ্যেরঙ শাড়ী। দূরে ওপারে, উনুনের তলানি আঙরার মতো ফুটকি আলোর ছিটেয় বসবাস চেনা যায়। ট্রেনের চিনে বাদাম চা। কোয়ার্টারে পৌঁছে যা হোক ভাতে-ভাত, আর পড়শিরা আছে, ওটুকু তারা করেও থাকে। ধরিত্রীর মুখ ঠেসে আছে জানালায়। মানস বলেছিল সরে বসতে। শান্ত মানুষ, জোর করে না। এক বিঘতও সরে নি, যেন জানালায় জন্মগত নিঃসপত্ন অধিকার। ধুলোয় মুখ কিচকিচ, কালো। ইঞ্জিনের বয়লার থেকে আসা দমকা বাতাসে গরম হলকা, উড়ে কয়লার কুচি চোখে। নিজের শাড়ির আঁচলে মুখের ভাপ দিয়ে চোখে ঠেসেছে কয়েকবার। আড়াআড়ি লম্বালম্বি দুভাবে কাটা কলজেতে জমা রক্তের বাষ্প থেকে টুপটাপ ফোঁটা নিঃশব্দে। নীরবে দেখছে মানস। তবু ভাবছে, এই থাকুক। একমাসের ওপরে কলকাতায় কাটিয়ে ফিরছে, বছর ঘুরতে-আসা সংসারে – বরের চাকরির জায়গায়। শ্বশুরবাড়ি বাপের বাড়ি দুবাড়ির কেউ এখন আসতে দিতে চায় নি। ধরিত্রীর বেয়াড়া জিদ।


‘মানস আর্জেন্টলি কাম উইথ ধরা’ – বাবা পাঠিয়েছিল টেলিগ্রামটা। দুদিন লেগেছিল আসতে। টরে টক্কা টক্কা টরে ধরিত্রীর মাথার মধ্যে। সোনাদাদা একবার এসেছিল তাদের এখানে। ভরদুপুরে ছোট্ট বাগানে গরমে ফাটাফুটি মাটি। হঠাত গেটের শব্দ। নীল ছাপাছাপা পর্দা সরিয়ে ধরিত্রী উঁকি মেরেছিল। এমনিতে পিওন রামরতন অনেক দুপুরে চিঠি ফেলে যায় লেটারবক্সে। শাশুড়ি মায়ের পোস্টকার্ডের শেষে, “ইতি আশীর্বাদিকা তোমাদের মা।“ বান্ধবীরাও কালেভদ্রে এক-আধটা লেখে। তার মা লম্বা লম্বা ইনল্যান্ডে ঠিকানার জায়গায় বাংলায় লেখে – স্নেহের ধরিত্রী অধিকারী, প্রযত্নে শ্রীমান মানস অধিকারী। উপদেশ-টুপদেশ, বাড়ির খবর, রন্ধনপ্রণালী, মন খারাপের কথাবার্তা নিয়ে ওই দুপুরগুলো সে তাদের কালীঘাটের এলোঝেলো ছড়ানো বাড়িটায়। দেড়-কামরার ছোটো একতলায় ধরিত্রী-মানসের বাবুইবাসায় সেদিন টুকটুক কড়া নাড়া। সবে মাসদুইয়ের পুরনো সংসার। মেয়েটা খেয়েদেয়ে কেয়ো কার্পিন গন্ধচুল ছড়িয়ে মাটিতে বালিশ ফেলেছে, সাথে বই। বড্ড বই-বাতিকে মেয়ে। ওমা, রোদ্দুর মাথায় করে কে? কে যাস রে ভাটিগান গাইয়া... ওই গানটা কোথাও-!

“কি রে, ঢুকতে দিবি না?”
ইস্‌ কী হয়েছে চেহারা দেখো... শুকনো তক্তা। চুল কাটে নি কতদিন? বিয়ের রাতে হঠাত এসে হাজির হয়েছিল ধূমকেতু। তারপরে এ্যাদ্দিন ধরে না খোঁজ, না খবর! দরজা খুলে বোকা হয়ে গেছে ধরিত্রি।
“তোদের দেখতে এলাম! কপোত কপোতী যথা উচ্চবৃক্ষচূড়ে বাঁধি নীড়... কপোত কি অফিসে? অবশ্য তাই থাকার কথা।”
কথা বন্ধ হয়ে গেছে। ড্যামের বন্ধ স্লুইস-গেটে হঠাত জলের ধাক্কা! ঘামের গন্ধটা অবিকল, ময়লা পাজামার নীচে বিচ্ছিরি চটিটাও। ধুলো পায়ে বড় নখ। তার আজন্মের সোনাদাদা, আপন জ্যাঠার ছোটো ছেলে। পিঠোপিঠি, মেরেকেটে পনেরো মাসের বড়। অতিথি হয়ে তাদের কুটিরে। কি লজ্জাটাই করছে হঠাত!


“দাঁড়া আসছি একটু।”
ধরিত্রী দৌড়েছে রান্নাঘরে। শাড়ি চুল বেঠিক, শুয়েছিল বলে। আর ঝুড়ি দেখে, আলু বেগুন পটল আছে। ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা খুলে দেখে। একমুঠো জল-ঢালা ভাতে পেট ভরবে নাকি? খয়রা মাছের ঝাল তুলে রেখেছে ওবেলার জন্যে। আগুণ নিবু নিবু উনুনে! শিক দিয়ে খুঁচিয়ে কয়লা ঢালে, ঢেকে দেয়।
“খুব খিদে পেয়েছে রে ধৈ।”
সোনাদাদা দরজায় কখন এসে দাঁড়িয়েছে? এতটুকু রান্নাঘরটা। ততক্ষণে সামলে উঠেছে সেও,
“এই তো উনুনের আঁচ তুলে দিলাম। একটু বোস।”
“আরে বেশি চাই নে, ঘরে যা আছে দে না।”
“দূর, ওইটুকুন ভাতে-”
“এখন তো দে, পরে অন্য কিছু বানাস। আমি হচ্ছি শ্রীকৃষ্ণ... কণামাত্র তন্ডুলে মিটবে হালুম-হুলুম খিদে।”
ধরিত্রী হেসে ফেলে। কালীঘাটের বাড়িটার আনাচ-কানাচে এমনই সোনাদাদা ছোটোবেলা থেকে – “ও মা, হালুম-হুলুম খিদে... ও কাকিমনি হালুম-হুলুম খিদে...।”
লোডশেডিং হয়েছে আবার, কী বিরক্তি! হাতপাখাটা নাড়তেই থাকে। একটু পরে টাইমের জল আসবে। কাজের মাসী আসবে।
“আঃ অসামান্য মাছের ঝাল... বর দিই – অচিরেই পুত্রলাভ হউক।” ধরিত্রী লাল। মাথায় টকাং করে গাঁট্টা পড়ল, “তবে খিদেটা পুরো মিটল না বুঝেছিস? আসলে কতদিন থেকে যে ভালো করে...!”
তার মুখ ছেয়ে কুয়াশা, “সোনাদাদা, তুই বাড়ি থেকে আসছিস না, না?”
মাথা দোলায় ডানদিক থেকে বাঁদিক... তার চোখে তাকিয়ে অদ্ভুত মুখে হাসে, “ছাড়্‌ তো। বেশ গিন্নী হয়েছিস্‌ দেখছি মা’দের মতো। স্নিগ্ধ, পরিচ্ছন্ন। গুড গুড।” তার গাল টিপে দেয়। তারপর দুহাত লম্বা করে জড়িয়ে ধরে তার গলাটা। এতেই চোখ ছলছল। জ্যাঠা-পিসি-কাকাদের সে একমাত্র রাজকন্যে। সকলের ছোট। দাদামনি, ছোট্‌দাদা, ভালোদাদা, রাঙাদাদা- সুশান্ত, প্রশান্ত, দেবজ্যোতি, শুভজ্যোতি এমন সব নাম। সোনাদাদার ধ্রুবজ্যোতি। ঠাকুর্দা রেখেছিল, সবার চেয়ে উজ্জ্বল।
“ও কি কাঁদবি নাকি? তাহলে কেটে পড়ছি।”
হাত ধরে টেনে খাটের ওপরে বসিয়ে দিল ধরিত্রী। দশ আঙুলে ঘাপসা চুল ধরে টানল, “বড়ো-মাকে এত কষ্ট দিস যে তুই!”
“মা’র আরেকটা ছেলে আছে তো! না কি? আঃ কী আরাম, আর একটু টেনে দে না চুলগুলো। আমার উপহার-দেওয়া গোর্কির বইটা তোর শেষ হলো?”


সন্ধ্যের পর মানস ফিরলে, দুজনকে লুচি, আলুর দম, বেগুনভাজা, বেড়ে দেয়। ছোটো ছোটো নারকেল নাড়ু। ছোট্ট বারান্দায় বসে গল্প... মানস কথা কম বলে। ধরিত্রী গান গায় – দূরে কোথায়। দক্ষিণীতে শিখত। “সোনাদাদা... তোর, তোদের কাছে রবীন্দ্রনাথ আবার...” বলতে গিয়ে ঝট করে গিলে ফেলে। বলা বারণ, ঝগড়া তর্ক বারণ, মনে পড়ল। চিঠি দেওয়া, মা’দের কাছে খবর জানতে চাওয়া, সব নিষিদ্ধ।
“চক্ষে আমার তৃষ্ণা, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে...” কী যে সুরে গায় সোনাদাদাটা, একটু চাপা গলা। চোখ বুজে যায় আপনা থেকে। রেশ ভেসে থাকে। ধরিত্রী অবাক হয়ে বলে, “তুই কবে থেকে আবার রবীন্দ্রসঙ্গীত...?”
সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে – গুণগুণ বুকের ভেতরে। রাতে আধখানা বসার ঘরের চৌকিটাতে শুয়েছিল সোনাদাদা। কত রাত অবধি তার বইগুলো দেখেছিল। অনেক রাতে তাদের দরজায় সতর্ক টোকা। বুক থেকে ঘুমন্ত মানসের হাত নামিয়ে দরজা খুলে বেরোয়, চোখ রগড়ায়। ভেজা ভেজা হাওয়ায় গায়ে কাঁটা। এক পশলা বৃষ্টি হলো কখন? সন্তর্পনে বলে,
“চলি ধৈ, ভালো থাকিস। শুকতারার মতো স্থির, সুন্দর, পবিত্র।”
“কোথায় যাবি? কী অন্ধকার - আজ অমাবস্যা... মাঝরাতে তুই এখন...! দাঁড়া ওকে একটু...”
“তোর ‘ও’ ঘুমোক। নির্বিবাদী ভালো মানুষ। ঝামেলায় ফেলিস না।”
“আবার কবে আসবি?”


মা’র চিঠিটার শেষ পৃষ্ঠার চৌকোণায় বাবা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। ভালো উতরেছে গ্র্যাজুয়েশন, অনার্সও কাটে নি। পুনশ্চ দিয়ে লেখা, ‘তোমার ঠাকুমার শরীর খানিক বিকল। ওষুধ খাচ্ছেন। চিন্তা করিও না।’ ধরিত্রী টেলিগ্রামটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। সেই চিঠির কথাও মনে পড়ে। ঠাকুর্দা বিয়ের আগের বছরে গেলেন, এবারে আম্মাও তাহলে...। তার সুখবর জেনে গেল না শেষ অবধি। তিনমাস আগে চার দিনের জন্য কলকাতায় গিয়েছিল। ফিরে এসে অল্পদিন হলো কেমন বমি ভাব, শরীর আনচান। নিজেও বোঝে না ঠিক, মানসকে জানায় নি। কলোনী কোয়ার্টার্সের বাইরে গুপ্ত ডাক্তারের চেম্বারে টেলিফোন আছে। কিন্তু দুপুরে বন্ধ। তাছাড়া, কলেজস্ট্রিটে বাবার বইয়ের দোকানের ফোন অর্ধেক সময়ে ‘আউট অফ অর্ডার’। এমনিতেও দূরের কথা স্পষ্ট শোনা যায় না টেলিফোনে। সারাটি দুপুর চোখ মুছে মুছে লাল। ভাত ঢাকা পড়ে রইল, মাছ-তরকারি। কাক এসে বসেছে বাগানের গেটে, বিচ্ছিরি ডাকছিল। রীতি অনুযায়ী ওবাড়ির কিছুতে এখন তার কিছু করনীয় নেই, গোত্রান্তরিতা কন্যা।


মানসের ছুটির ব্যবস্থা করতে দু তিন দিন।
সন্ধ্যের মুখে পৌঁছে বাগানের গেট খুলে ছুট্‌, পেছন পেছন মানস। ঠাকুমার ঘরের চৌকাঠে লেগে হুমড়ি খেয়ে সপাটে পড়ল ধরিত্রী। বিছানায় উঠে বসেছিলেন বৃদ্ধা। শব্দ শুনে দৌড়ে এল বাবা মা, বৌদি। পেটে ক্র্যাম্প – অসহনীয় যন্ত্রণা। অঝোর রক্তে ভোরের আগে ঝরে গেল কুঁড়িটুকু।
ওভাবে টেলিগ্রাম না পাঠালেই হতো – খুব কষ্ট পাচ্ছিল তার বাবা। অনুশোচনার মতো। কতবার ঘুরে ঘুরে দেখে যায়। বিছানার পাশে বসে, মাথায় কপালে হাত বোলায়।
“তুমি কিছু জানতে না যে বাবা। থাক, আম্মা তো ভালো আছে বাবা!”
“হ্যাঁ, তা আছে।”
“তা’লে তখন কি বাড়াবাড়ি ছিল?”
“ওই রকমই।”
“বড়োমা’র কি হয়েছে? একবার এলো না আমার কাছে? জ্যাঠামনিকেও দেখতে পাই না।”
সে-ই দুর্বল পায়ে একদিন বড়োমা’র কাছে, গিয়ে আঁতকে উঠেছিল। কী বিকট শ্রীহীন ভাঙাচোরা প্রতিমার মুখ! বড়ো বড়ো চোখ অস্বাভাবিক স্থির, ভাব নেই, বক্তব্য নেই। ঠোঁট নড়ছিল একটু, “উফ উফ গুলি রক্ত, গুলি রক্ত...”। চোখে জলের প্রশ্নচিহ্ণ নিয়ে বৌদির দিকে তাকিয়েছিল।
ধ্রুবজ্যোতি আর দু জন সহচর নকশাল শেষ অবধি ধরা পড়েছিল। পুলিশের হেফাজতে থেকে জানিয়েছিল ইচ্ছেটুকু, ধৈ-কে একবার দেখবে।


কত দিন পরে সকাল ন’টার ভোঁ কানে আসে ধরিত্রীর। ভোরবেলা কাঁচা কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ নাকে আসে, উনুনে আঁচ পড়েছে। বিরাট এলুমিনিয়মের কেটলিতে থেকে কাপে কাপে ঢালা হয় চা। খবরের কাগজ নিয়ে কাড়াকাড়ি। সে শুয়ে থাকে, কেউ বিরক্ত করে না। কেন মনে হয়, এগুলো সাজানো, অর্থহীন? জোর করে স্বাভাবিক হয়েছে সবাই? দশটা সাড়ে দশটায় উনুন থেকে নামা ফুটন্ত ডাল-ঝোল কাঁসার বাটিতে চড়ে ছেলেদের পাতের পাশে পাশে। সকলে বের হবে। সেও গেছে, ইস্কুলে, কলেজে। কিছুদিন আগে খাবার টেবিল কেনা হয়েছে। দাদাদের প্যান্ট পরে অসুবিধে বলে ঠাকুমা অনুমতি দিয়েছেন, ‘বৃহত কাষ্ঠে দোষ নেই’। বাবা-জ্যাঠা ধুতি পাঞ্জাবী পরেন, পিঁড়েতে অসুবিধে নেই। পুজোতে সেও তাই দিয়েছে। বাড়ির পিঁড়েগুলো রান্নাঘরের কোণে টাল দিয়ে রাখা। সারাটা দিন শুধু মাথার ভেতরে গুলোয়। কী ওষুধ দিয়েছে ডাক্তার, ঘুম পায় খালি। সন্ধ্যে হলে মা শাঁখে ফুঁ দেয়, শোনে শুয়ে শুয়ে। তাড়াতাড়ি ফিরে আসে বাবা-দাদারা। বাড়ির জানালা দরজার ফাঁক ফোঁকর বন্ধ করা হয় কাগজ আর ন্যাকড়া দিয়ে। ব্ল্যাক-আউট। ধরিত্রী অনেক বেলায় সকালের যুগান্তরে চোখ বোলায়। ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধ – ইন্দিরা গান্ধী – ভুট্টো – ইয়াহিয়া খান – বঙ্গবন্ধু মুজিবর, এই-ই রোজ। খবরের কাগজ ভাঁজ করে সরিয়ে রাখে। পড়ার ঘরটা তার আর সোনাদাদার। তর্ক, তুমুল লড়াই কত। কোণার সরু তক্তপোশে ঘুমোত সোনাদাদা। বইয়ের মস্ত আলমারির চাবি তার কাছে থাকত। কলকাতা থেকে যাবার আগে জ্যাঠামনির জিম্মায় রেখেছিল, “সাবধানে রেখো। আমি এলেই আবার নেবো।” জ্যাঠামনি তাকে দিতে এল চাবিখানা, ফিরিয়ে দিল, “থাক্‌ রাখো। পড়বো না। ইচ্ছে করে না।” রেডিওতে অত প্রিয় অনুরোধের আসর, ছায়াছবির গান, শুক্কুরবারের বাংলা নাটক – ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, ‘নব’ বন্ধ করল। কেমন বোদা বোদা বিস্বাদ। বৌদি এসে বসল, “তুমি তো সত্যজিতের বই ভালোবাস। অরণ্যের দিনরাত্রি বলে নতুন একটা এসছে। সৌমিত্র আছে, শর্মিলা ঠাকুর... চলো না তোমায় আমায় ম্যাটিনি? আর নিশিপদ্ম বলে একটা বই... উত্তমের, যাবে?” পাশ ফিয়ে শুয়ে রইল ধরিত্রী, উত্তর দিল না। ছোট্‌দাদা একদিন বললো, “চল ধরা, শম্ভু মিত্রের নাটক... ট্যাক্সি চড়াবো...।” সে একটু হাসলো, “তুই, তোরা যা রে, অতসীদিকে নিয়ে!” ছোট্‌দাদা অস্বস্তিতে, “চুপ চুপ।“ বাড়ি থেকে বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হয়ে আছে। তবু খুব লুকিয়ে চোরাগোপ্তা দেখাশোনা, খবরটুকু ভাইবোনেরা জেনেছে।




“শোনো না, ও ঠাম্মু কি ভাবছিলে গো? এই দ্যাখো এটা, পড়তেই পারছি না, লিখব কি করে?”
ছোটো ছোটো ঠেলা মারছে শুকতারা। একমাত্র নাতনী, দিল্লীবাসী। ন বছরের মেয়েটা অদ্ভুত বুঝদার, ধীর স্থির। বড়ো ছুটিতে তাদের কাছে এসে থাকে, বাংলা শেখে। ধরিত্রী তাকিয়ে দেখে বইটা। তার লাল-হওয়া আদর্শলিপি দিয়েছে শুকতারাকে, নিজের শিশুবেলাটুকু ভরে।
“ও এটা? এটা তো লী... এই যে ঋ, ৯, এ ঐ...।”
“লী? মানে এল-আই? সো সুইট! ঠিক আছে। একটা শব্দ বলো তো – যেমন ঋ-তে ঋষি। জানো তো, আমার একটা ক্লাসমেটের নাম।”
শুভ্রা বইটার দিকে চেয়ে থাকে, ভাবে। কিছুতেই মনে আসছে না একটা শব্দও।
“নাঃ ভেবে পাচ্ছি না। ওটা ছেড়ে দে যাঃ ... ধরে নে হারিয়ে গেছে বর্ণমালা থেকে।”
“হারিয়েই গেল? ওহ গড!”
শুকতারার হাসতেই থাকে। জানে তার ঠাম্মু একটু অদ্ভুত। কেমনভাবে যেন চেয়ে থাকে তার দিকে, আদর করে। তার নামটাও রেখেছে, তার বাবার নামও। ধরিত্রী নাতনীর কপাল দেখে, মসৃণ একটু উঁচু ঢাল। সাধারণত মেয়েদের এমনটা হয় না। অনেকটা প্রদোষের মতো... আর কারও সঙ্গে মিল।
“আমার নাম শুকতারা মানে ভেনাস না ঠাম্মু?”
“হ্যাঁ শুক্রগ্রহ। খুব জ্বলজ্বলে, আবার স্নিগ্ধ।”


“এই ফোটোতে আজ রজনীগন্ধার মালা কেন ঠাম্মু?”
“এই দাদুর জন্মদিন যে সোনা-।”
“এটা দাদু? এ বাবা! ইয়াং দাদু! কোথায়?”
শুকতারা মজা পায়। চশমার ভেতরে ধোয়ামোছা পরিষ্কার চোখ ধরিত্রীর। টেবিলে পাশাপাশি দুটো ফোটো। একটাতে ঠাকুর্দার দুহাতে পুতুলের মতো সে আর সোনাদাদা – অস্পষ্ট হয়ে গেছে। রবীন্দ্র সরোবরে যেত দাদুর সঙ্গে মর্নিং ওয়াকে। ভোরবেলাতে হোস পাইপ দিয়ে ধোয়ানো হতো রাস্তাঘাট। দেখতে ভারী মজা লাগত! পাশেরটা সোনাদাদার – গ্রুপ ফোটো থেকে পরে এনলার্জ করা হয়েছিল। তার বিয়ের আগের বছরে সকলে মিলে তোলা। দৃঢ় টানটান উন্নত কপাল, মিলটা খুঁজে পেয়ে হাল্কা লাগল। বলে,
“হারিয়ে গেছে... এই যেমন কত কিছুই-।”
“ঐ যে লেটারটার মতো? এল-আই?”
“হুঁ... ঠিক।”
তার কোল না ছুঁয়ে চলে যাওয়া আকারহীন শিশুর বছর দুই পরে যে এসেছিল গর্ভে, সে-ই প্রদোষ। তার মেয়ে শুকতারা।


ইলেক্ট্রিক প্রদীপ থেকে আলো পড়েছে সোনাদাদার কপালে। ধরিত্রী চোখ বুজে দেখে, বিশাল ডানাওয়ালা ধপধপে সাদা সারস উড়ে চলছে, অন্তহীন অন্ধকার আকাশ বেয়ে। ডানাদুখানা কোন্‌ তারার ঔজ্জ্বল্য মুছে নিয়ে মাখিয়ে দিয়ে গেছে। কানে বাজল কোন্‌ কালে এক শুক্কুরবারের নাটকে শোনা অজিতেশের গভীর কণ্ঠস্বর “তোমার জন্যে রেখে গেলাম আমার আলোকিত যৌবন।”