রঙিন অবকাশ অথবা ফুলের গল্প

অনিন্দ্য



রাতুলের ফিরতি পথ তখন বাড়ি নামক গন্তব্যে লেখা। বড় রাস্তা ছেড়ে ঈষৎ নিরিবিলি। ঠোঁটে অগ্নিভ সাদা দাগ রোজকার মতই পুড়ে যায়। ব্যাকপ্যাকটাও একসময় কাঁধ বদলে বদলে ভবঘুরে। রাস্তা আর গলির দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রাতুল আরও একটু সময় সেঁকে নেয়, আরও একটা সাদা দাগ জ্বলে ওঠে। রোজকার মতই।

গলির মুখের একটা দৃশ্য রাতুলের প্রত্যাশিত। কর্পোরেশনের একটা মরচে ধরা পাইপে, বিনু পাগলার ঠিকানা। তেলচিটে পোঁটলা, ধার করা ছেঁড়া শার্ট, কুড়িয়ে নেওয়া প্যান্ট এবং আরও কি কি যেন। রাতুল মাঝে মাঝে দেখত বিনু বৃষ্টিভেজা পাইপের ওপর পেতে রেখেছে তার সম্বল। কে যেন সারারাত সেগুলোর ওপর হলুদ ফুল ছড়িয়ে দিত। বিনু ঝুঁকে পড়ে ভোর খুঁজতে চাইত। আর রোদ্দুর উঠলে পাইপের ওপর উঠে ‘রামধুনু, রামধুনু’ চেঁচাত। এক শীতে ও রাতুলের থেকে রাম খেয়ে সারারাত নেচেছিল। মরচে ধরা পাইপের ওপর বসে সে নাচ রাতুলের ক্লান্তি এবং ইগোগুলোকে গোগ্রাসে হজম করে নিয়ে ছিল।

প্রসঙ্গত, সেই বিশেষ দিনেই রাতুল তার প্রথম চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ফিরে এসেছিল।

বিনু যেন রোজই রাতুলের অপেক্ষায় থাকে। দিনের আধখানা সাদা দাগ। আগুনে ভয় পায় বলে রোজই সে রাতুলের আধখাওয়া সিগারেটটা চায়। আজ বিনু অপ্রত্যাশিত বেহদিস।

রাতুল অভ্যাস ভেঙে তৃতীয়বার আগুন ধরায়।


বিনুর না থাকাটা রাতুলের ক্রাইসিসে পরিণত হয়েছে। একটা রবিবারের সকাল ও মর্গে কাটিয়ে আসে। পাগলের নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে ওর শেষ ইমেল। সেন্ডিং... মেল পেন্ডিং... সেন্ডিং ফেইল্ড...।

সেই রাতটা পাইপের পাশেই কাটায় রাতুল। আধখাওয়া রাম সেদিন বোতলবন্দি থেকে যায়। সিগারেটগুলো অন্য ঠোঁট না ছোঁয়ার ধোঁয়ায় পুড়তে পুড়তেই আর একটা সূর্য এসে পড়ে। রাতুল বাড়ি না অফিসমুখি - একটা দ্বিধায় পাইপের খোদলে শুয়ে থাকা কুকুরের বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে...।


বেখাপ্পা নির্জন রাতগুলোকে এখন ভয় পায় রাতুল। ও জানে বিনু নেই। পাইপটা কর্পোরেশনের লোকে তুলে নিয়ে গেছে। জায়গাটায় এখন ঝোপের ঝাড়। কুকুরগুলো অজানা অন্যত্রে। শুধু বিনুর ছেঁড়া তোষকটা ফুটপাথ দখল করেছে।

রাতুলের ফিরতি পথে এখনও বাড়ি নামক গন্তব্য লেখা থাকে। বড় মোড় ছেড়ে নিরালায়। মুখে অগ্নিভ সাদা দাগটা রোজকার মতই পুড়ে যায়। ব্যাকপ্যাকটা আজও কাঁধ বদলে ভবঘুরে।

ফুটপাথ জুড়ে বিনুর ছেঁড়া তোষক। ঝোপের পাশে রাধার চূড়ায় হলুদ আগুন। রাতে তারা লুটিয়ে পড়ে অদৃশ্য বিনুর গায়ে। তোষকটা রাতে ফুলের, আর ফুল সকালের ভ্যাটে – আর এই হয়ে চলা চক্রটা শুধু রাতুলের। রাস্তা আর গলির দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রাতুল আজও একটু সময় সেঁকে নেয়, আরও একটা সাদা দাগ জ্বলে ওঠে। রোজকার মতই। আধখাওয়া সিগারেটটা তোষকের পাশের ফাটলটায় গুঁজে দিয়ে রাতুল তার নতুন রং হওয়া রঙিন বাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।