শুভদীপ

প্রলয় মুখোপাধ্যায়


আঁশফলের বাগানে শুভদীপ এসে দাঁড়ায়।তার বালক থেকে ঝরে যায় মধুরিমার গ্রীটিংস।ডালিমের ফুল বেঁধে প্রাইমারী স্কুল ইউনিভার্সিটির পথ ধরে। সহজপাঠ ছেড়ে চলে যায় লিচুচোর। তাহারই বাগানে আজ বিশ্রাম নেয় শুভদীপ।আয়নায় দেখে সোয়েটার বোনার উল ফুরিয়ে গেছে। কুলফির টুকরো গলে গেছে মধুরিমার মোরে।

শুভদীপ আমাদের সেইসব হেমন্তকাল।একসাথে অনেক জন্মদিন যার।একটা বালক হারালে অন্য কিশোরের নাম শুভদীপ।কিশোরটি হারালে ইয়ং জেনরেশনের নাম শুভদীপ। একসাথে পাঁচটা পেন্সিল কিনে ফেলা অভ্যাসের মত। পুরনো মোমবাতি গলে যায় শুভদীপের।নতুন বাতি জ্বেলে বান্ধবী চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।শুভদীপ বৈশাখির হাত ধরে বলে আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাবি না কথা দে।

বরং শুভদীপ প্রস্তুত থাকুক সব হারিয়ে ফেলার জন্য। কে চায় মাঠের বাইরে বল কুড়িয়ে কেটে যাক তার কুসুমবেলা। মনে মনে শুভদীপ ভাবে সেও বড় হবে। পিংপং টুর্নামেন্ট খেলবে মাঘ মাসে। তাই বৈশাখীর মত মেয়ে নেমে আসে হঠাৎ। গোটা শীতকাল ওলটপালট করে দেয়। টিউশন যাওয়ার পথে হাসি ছুঁড়ে কপাল ফাটিয়ে দেয় । আর আমরা বৈশাখীর দিকে এগিয়ে যাই মায়ের আঙ্গুল হারিয়ে। শুভদীপ যত বৈশাখীর কোলে ঘন হয়। মায়ের আঙ্গুল ধরে মেলার জিলিপি হারিয়ে যায়।অজান্তে চুমু খাওয়ার বয়স এসে পড়ে।খোলা মাঠ ছেড়ে চিলেকোঠার খোঁজ বাড়ে তখন। ব্যাগ থেকে সাদাকালো ফটো বের করে বৈশাখীকে দেখাই। দেখাই মায়ের আঙ্গুল ধরে মেলায় মিশে যাওয়ার দৃশ্য।এসব ফটো হারিয়ে প্রেমিকার আঙ্গুল ধরে ফুচকার দোকানে এগিয়ে যাই।বলি ছেলেবেলা বেশ ভালো ছিলো।অথচ সবাই জানি পাঁচটা মোমবাতি একসাথে কিনি।একটা ফুরিয়ে গেলে নতুনটা জ্বলবে।

যারা শুভদীপকে হারাবে ভেবে ভয় পায়।দক্ষিণের জানলা খুলে স্কুলের দিকে চেয়ে থাকে।তার মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে বাবাকেই জড়িয়ে ধরে।এইসব আদর হল আমাদের শুভদীপ। যে ক্যারাম ফুটবল হারিয়ে খেলনার দোকানে দাঁড়িয়ে থাকে।মুখে বয়সের মাঝি ভেঙে পড়ার আগে ওর কোল জুড়ে আসে আর এক শুভদীপ।সে বোঝে প্রতিটা হারানো এক একটা ফসলের অঙ্কুর পুঁতে দেয়। শুভদীপ বাবার বয়স ছেড়ে দাদুর বয়সে ঢুকে পড়ে।বুকে নাতনির থুতনি রেখে গল্প শোনায় মধুরিমার। পুরনো মেলা ভেঙে নতুন মেলার জন্ম হয়। তারপর শ্মশানে চলে যায় শুভদীপ।মৃতদেহের পাশে বসে অজস্র শুভদীপ কাঁদে। কেউ বোঝেনা শুভদীপের মত দেখতে যে লোকটা সে আসলে বয়সের সোয়েটার।