বৈরাগী

অর্পিতা বাগচী

“বাসন নিবা গো বাসন...”
অন্যমনস্ক কাটল তার ডাকে।
আজ সারাদিন তেমন কোন কাজ নেই । আনমনা হয়েই হাঁটছি । সামনে কখন যে সে হাঁটতে শুরু করেছে বুঝিনি । তার ঝুরি ভর্তি চকচকে বাসন । মন যেই সায় দিলো , চোখ ও আটকালো তার ঝুড়িতে রাখা এক গোলাপি রঙে ।
বৃষ্টি বড় হচ্ছে । ওর জামা গুলো ছোট । পাশের বাড়ির মুন্নির মা বাসন কিনত,দেখাতো ।রোজ রোজ দেখতে দেখতে দিলাম একদিন সব টেনে বার করে। জামা, কাপড়, বেড কভার সব।নতুন থালা বাসনে ঘর ভরে উঠল। আহা কি গোছানী,সংসারী হয়েছি আমি । যা দিলাম তা পড়ে থাকতো এক কোনে। আর যা এলো, তা ঝলমলিয়ে দিলো ঘর।
কিন্তু তুমি কোথা থেকে ! অফিস নেই?
এতবার আসা যাওয়া করছি দেখলাম না তো। জানতাম ই তুমি আসবে। নাহলে কি আজ আর বৈরাগী হওয়ার ইচ্ছে হয়!
-“ও বৌদি, কি গো কি করছ? এতো ভাল ভাল জামা কাপড় গুলো দিয়ে দিবা ! আর দিয়ো না।”
আমাকে সরিয়ে এগিয়ে গেল।দরাদরি মারামারি আমার আর ভাল লাগে না। শান্ত পায়ে ভিতরে চলে আসি। ঘর থেকেই শুনতে পাই,একটা চাদর নিয়ে টানাটানি চলছে। চলুক আমি একটু তোমার কাছে থাকি।
“ হাত কাটলে কি করে?”
ও কিছু না, তুমি একটু আহা করবে তাই
আর তোমার ওই আহা টুকু যেন আমার রক্ত থামতেই দেয় না।
-“বউদি,নাও”
বলে চাদর টা ফেরত দিয়ে গেল। আমি হলে পারতামই না। কি ভালএকটা গোলপী রঙ দিয়ে গেল।
জানো সেদিন ঠিক এমনি রঙ এর মাধবীলতা ফুটে ছিল। আরও কত কত রকমের গাছ। আম্লকি, কামিনি, কাঞ্ছন, জবা, সিউলি, লঙ্কা, লেবু আরও কত কত কি। আমাদের বাড়ির ছাদেও অনেক গাছ। ঠোঁট চেপে মনযোগী হওয়াটা আমার ছোট্ট বেলার অভ্যাস।একটা জুঁই ফুলের গাছ ছিল।আমি গিয়ে তার নীচে দাঁড়াতাম আর একটা হাত দিয়ে গাছ কে ঝাঁকাতাম। টুপটাপ জুঁই পড়তো আমি মনযোগী হতাম আর ঠোঁট চেপে ধরত দাঁত।
-“ ও বউদি, আজ তোমার বাড়িতে থাকতে দিবা?”
-“থাকো”
-“ জানতো, আমি বাড়ি ছেড়ে দিয়েছি।”
-“হু”
-“আর একটা কাজ ধরিয়ে দিবা?”
তুমি হাসছো কেন? ও বেচারি কোথায় যাবে বলোত? আজও ভালবেসে কত মানুষ ঘর ছাড়ে। জানি, কি বলবে। বলবে তো অন্নপূর্ণার সংসার । এই সংসার জিনিস টা আমাকে বড্ড টানে।ছোট্টবেলা থেকে আজও। কি থাকে বলো দিনের শেষ এ! ওই হাতের পাঁচ বলতে তো তুমি।আমার ভরা বসন্তের শীতকাল। কাল রাত্তিরে একটা ঝড় বৃষ্টি হল। একটা একটা করে ভিজছিল গাছগুলো। ডালপালা গুলো মেলে ধরছিল আকাশে। বৃষ্টি শেষে চুল আঁচড়ে আবার যে যার জায়গাতে।
-“বৌদি তোমার বৃষ্টির কলে একটু চান করতে দিবা? দু দিন হল চান করিনি।”।
আমার দিকে তাকাবে না, আমি না করতে পারব না।
-“হু, যাও।”
সেই স্কুলে থেকে ফেরার দিনগুলো , ক্লাস চলছে আর বৃষ্টি ও পড়ছে জানলা দিয়ে।ছুটির ঘণ্টা পড়তেই একছুট । না, দিতাম না। আমি না ক্লাস মনিটর। গোল গোল চশমার ভিতর থেকে দেখতাম,কেউ যেন কাউকে না ঠেলে ইচ্ছে একটা প্রবল ইচ্ছে দুহাত দিয়ে সবকিছু কে সরিয়েএক ছুট দিই, ঝপাং ঝপাং জলে । কোন বৃষ্টিতে ছাতা খুঁজতাম না। ভেজা ঝাপসা কাঁচে দুষ্টুমি আড়াল করতে সুবিধে হত । বাড়ি এসে গরম গরম খিচুড়ি । সন্ধ্যে অব্দি নাগাড়ে বৃষ্টি ।তার সাথী হত লোডশেডিং । বৃষ্টি রাত্তিরে হ্যারিকেনের আলোতে পড়তে বসা।চোখ বই এর
পাতা ছেড়ে কাকে যেন খুঁজতো । আমার সব গোছানো হারিয়ে যেত অন্ধকারে ।আজও তেমনি যায়। আগছালো হই । এলোমেলো হই। মনে মনে। আজও বৃষ্টি পড়ে । আজও দৃষ্টি ঝাপসা হয়। জানালা দিয়ে বৃষ্টি পড়ে । জলের স্পর্শ এসে লাগে চোখে লাগে মুখে । আমি ভিজতে থাকি মনে মনে।সেদিন যেমন ভিজতাম ...