অথবা একটা ভুলে যাওয়া গদ্য লেখার স্বপ্ন

নীলাব্জ চক্রবর্তী


না। সেই যে ছেলেটা হলুদ জামা পরে আমাদের সাথে প্রতি রবিবার ক্রিকেট খেলতো আর বল পুকুরে পড়ে গেলে বলতো ম্যালা দূর আর সপ্তাহের অন্যান্য দিন ধূপকাঠি বিক্রি করতো ট্রেনে ট্রেনে ওকে নিয়ে কিছু লেখা হোলো না এবারও। ওর আসল নাম বিমল না বলে সবাই হলদিপুর বলতো মনে থেকে যাবে। ধূপকাঠি বিক্রি করতে করতেই মারা যায় ও। মাথা বার করে সিগন্যাল দেখতে গেছিলো। পোস্ট খুব দূরে ছিলোনা। সেইরকম আরও দুই অকালমৃত খেলার সাথী ছিলো আমাদের দিল্লীরোডের ক্রিকেটসকাল আর ক্রিকেটবিকেলের। বিলু আর অনুপম। বিলু কিছুটা ছোটই ছিল আমাদের। যখন মারা যায় তখন হার্ডলি কুড়ি। মদ আর ঘুমের ওষুধের নেশার ওষুধের ওভারডোজ। বাড়িতে কেউ ছিলো না সেরাতে। পরদিন সকালে দরজা ভেঙে বিলুর ছিপছিপে শরীর। আর বাল্যবন্ধু অনুপম মুখার্জী। দিল্লীরোড তখনো বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়নি। টানা মাইল দুয়েক একটা জায়গা রেললাইনের পাশে। মালভূমি মালভূমি টাইপ। নীচে পরপর পুকুর। নাকি রেলের পুকুর। তাও অবশ্য বোজাতে বাকি রাখেনি পার্টি। তা সেই দিল্লীরোডে ছিলো আমাদের ক্রিকেটসভ্যতা। কখনও বৃষ্টি এলে দূর থেকে দ্যাখা যেত আর আমরা ব্যাট উইকেট তুলে দৌড়। খেলাধূলার ব্যাপারে সবথেকে উৎসাহী ছিলো অনুপম। কেউ নেই তো স্রেফ আমরা দুজন। সেই অনুপম... না। এদের নিয়ে কিছু লেখা হোলোনা হবেনা আমার সত্যিই।



ফ্রেমের ভেতর
ফিরে আসছে আরও একটা ফ্রেম
অন্য লোকদের ঝিরঝির পাতানো
আর
বৃষ্টি খুলে ফ্যালা মেয়েরা
গ্রামাফোন পেরিয়ে
চিলেকোঠার ভেতর দিয়ে
লিখে রাখছে
যাবতীয় আঙুলচিহ্ন ও বোতামহীনতায়
জল ঝরে যাওয়া প্রিয় শাটার...


স্বপ্নের চেয়ে অত্যাশ্চর্য কোনও চলচ্চিত্র কখনও দেখিনি আসলে। ওখানে শ্যামল সিংহের সাথে বুনুয়েলের দ্যাখা হয়ে যায়। আমার মনেই থাকেনা যে আমি ওঁদের দুজনের কারোরই গলার স্বর শুনিনি কখনো। আসলে লুপ্ত বলে কিছু হয়না। বরং একটা মেগা ইরেজারের কথা ভাবি। তোমাদের স্মৃতি নাই গো স্মৃতি? এসো ভাবি একটা পারাপারহীন মস্ত পুকুরের কথা আর তাতে ভেসে ওঠা অসংখ্য মৃত ফাঁকা কাঁচের বয়ামের কথা। কথা জমিয়ে রাখার বয়াম আলো জমিয়ে রাখার বয়াম। সম্ভাব্যতা আর প্রতিসম্ভাব্যতাগুলো কিছুতেই যখন কনভার্জ করছেনা। হ্যালোওওও... আমি অনেকক্ষণ আগে একটা এক্সট্রালার্জ শনিবার অর্ডার করেছি... ওপরে কুচো কুচো সমাজ ফেনা ফেনা বিপ্লব ভাসবে ভালো করে বলে দিয়েছিলাম... এখনও আমার টেবিল ফাঁকা... ইয়ার্কি হচ্ছে এটা? এই ফ্লোরের ম্যানেজার কোথায় ম্যানেজার... কোনও কোমরে মৃদু ঘুরে যাওয়া একটা অচেনা চেন্নাইয়ান ধুন। অথচ স্থানাঙ্ক জ্যামিতির ছাত্ররা কবে থেকেই তো জানে যে নাভি মানেই ফোকাস। ভাবি আমরা সবাই কখনো একটা অধিবৃত্তের ছবি এঁকেছিলাম বাথরুমের মেঝেতে জুহি চাওলার বসে থাকার ভঙ্গি এঁকেছিলাম, ওহো! তবে স্তন মানে কৌণিক ভরবেগ বা অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম এরকম কিছু কখনো বইতে লেখা ছিলোনা। কে না জানে, সবকিছু বইতে লেখা থাকেনা! তারপরেও কেউ কেউ বলে উঠছে, আরেকটু বেঁকে যাও প্রিয় শীতকাল হে! অ্যাজ ইফ ওই রাস্তার দীর্ঘ আকার আর ওভারকোটের পকেট জুড়ে হাওয়াবাতাসবরফবারুদ খেলবে আর ক্রমে জমা হবে একটা একটা গদ্যকবিতার লাইন। তবুও পাতা ঝরে ঝরে একটা গুডলেন্থ স্পট। বুকসমান সব ডেলিভারী হোম ডেলিভারীর গাঢ় রুটম্যাপ। অর্থাৎ আমি এগোব না পিছোব বুঝতে পারিনা এখানে। ফ্রন্টফুট না ব্যাকফুট। বড়োজোর ফ্রি ফল বিষয়ক একটা গদ্য। বড়োজোর একটা জোর করে বুজিয়ে ফ্যালা পুকুর যেভাবে কারো কারো শ্বাসপ্রশ্বাসের ভেতর এখনো। ওম স্নায়ু। আর বারান্দার সবটা জুড়ে যা বেড়ে উঠেছিলো তার নাম ইনবক্স। তারপর প্রোজেকশন আর ডার্করুম এফেক্ট নিয়ে যাবতীয় সিনট্যাক্স নিয়ে অটোমেটিক রাইটিং নিয়ে ঘষামাজাপালিশএডিট নিয়ে নিরন্তর-চালু-একটা-প্রস েস নিয়ে নালেখা আয়নাগুলো নিয়ে মাথার ভেতর লম্বা লম্বা দু’-চারমাইল শীতকাল আর কোথাও তুষারপাতের কোনও নামোনিশান নেই। আমি নমিনেশান ভাবছি আর ছিটকে উঠছে একটা দুটো ফোটা শব্দ যাদের ডিকোড করলে শুধু শুধুই দুপুরের পিনকোড দুপুরের প্রফুল্লনগর। প্রায় একইভাবে যতবার শ্যামল সিংহ যুবতী শব্দটি লিখেছেন আমি একটা দুপুর দেখতে পাই। ছমছমে। ভরদুপুর। এক এরকমই ভরদুপুরে বুনুয়েলের দীর্ঘ উটপাখীর সাথে দ্যাখা হয়ে যায় যুবতীর।





... “যুবতী দেখছে
লাল রুমাল খুলে দিচ্ছে পৃথিবী
যুবতী দেখছে
হলুদ রুমাল পড়ে আছে
যুবতীর
পায়ের কাছে” --- (রেজারেকশন / শ্যামল সিংহ)



রোল রিভার্সালের পর আস্তে আস্তে জল বাড়তে থাকে আর ফুটে ওঠে বেসমেন্টের নিজস্ব ধাতুরূপ। দেওয়ালে একটা মস্ত পাতলা টিভি আর তাতে কি একটা অচেনা সিনেমা কিন্তু আমি জানি ওটা বুনুয়েলের। উৎপলদা বলেছিলেন বেসমেন্ট আমার একদম বোনড্রাই চাই একদম বোনড্রাই। অল্প আলোয় দুলতে থাকা ওই সোনালি দেওয়াল পুরো অ্যাতো ডিপ জলের প্রেসার ধরে আমায় ডিজাইন করতে হবে এখন! ক্র্যাক উইডথ চেক করতে হবে! ওই এক্সেল শিট আমার তৈরী নেই স্যার ভাবতে ভাবতে একটা ওপেন এন্ডেড বৃত্ত কীভাবে অধিবৃত্ত হয়ে যায়। আর ততোদিনে সবাই জেনে যায় ক্রমে কারোর কারোর আলোর বৃত্ত ভালোই লাগেনি কখনো... হায় প্রতিষ্ঠান হায় প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা! কীভাবে জাস্টিফাই করবে তোমার জন্য মিডিয়া তোমার জন্য সমকাল। তুমি কখনো সমকালকে ফলো করলে না আর সমকালও তোমার সঙ্গে, ফলতঃ, কখনো সমাজ সমাজ খেলতে এলোনা...





দূতাবাসের পাতায় পাতায় একটিই প্রত্যন্ত তারিখ... তার ভ্রান্তি ও নিরাময়ের আদলে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে নীলের ভেতর নীল... অলৌকিক মনে হচ্ছে পেরিয়ে যাওয়া ঘ্রাণ শব্দটায় যে যে অক্ষরগুলো ক্রমে বর্ণান্ধ হয়ে যাওয়ার কথা...


সেই যেবার অলোককাকু পড়ে গ্যালো ওদের তিনতলার ছাদ থেকে আর রাতে হাসপাতালের র্যা ম্পে দাঁড়িয়ে সেই ফ্রি ফল বিষয়ক গদ্য আর আলো নিভে যায় আর পূর্বপুরুষের নামে ও সেজকত্তা দলা দলা ইণ্ডিয়া উড়ছে গো... দলা দলা মাদ্রা দলা দলা মাইঝপাড়া মিনাজদি সিরুয়াইল। তখনো জানিনা আর কয়েকদিনের মধ্যে শহরের কুখ্যাততম অগ্নিকাণ্ড সমস্ত বিশেষণ পুড়িয়ে ফুরিয়ে যে ৯২ জনের হাসপাতালবাস আরোগ্য নিরাময় শুশ্রূষার সব সমীকরণের অন্য মানে করে দেবে চিরদিনের জন্য তাঁদের মধ্যে একজন হবে অলোককাকু। আর অতো জীবন্ত লাশকাটা ঘর শহর কখনো দ্যাখেনি... দ্যাখেনি পরপর অতোগুলো শববাহী গাড়ি একটার পর একটা বের করতে হবে বলে বিশাল হাতুড়ি দিয়ে সরকারি হাসপাতালে মর্গের পাশের মস্ত পাঁচিল ভেঙে ফ্যালার দৃশ্য... কালো বাষ্পে মোড়া শরীরগুলোতে বিকেল গড়াচ্ছে... কিছু পরে উঠোনে উঠোনে ভেঙে পড়ছে পাড়ার লোক...


শুধু শুধুই একটা বাসরাস্তা
বেসমেন্টের থেকেও নীচে আরও
কেমিস্ট্রি বইয়ের পাতা
কাগজের ঠান্ডা গাড়িগুলো জানলায়
ভোরবেলা ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে
ওখানে তোমার নামে কোনও চিঠি নেই
একটাও ধূসর খাম নেই
ফুটপাথে নরম কবিতাগুলো উল্টো হয়ে শুয়ে
আজ কোথাও হাইফেন বসবে না
রূপটানের রেখা মুখ ফিরিয়ে
ছুটে যাওয়া স্ট্রেচার
কর্তব্যরত শব্দটার গায়ে এতো ভারী বেল্ট
এতো এতো উর্দির গন্ধ
প্লিজ, কাট ইট শর্ট, ক্যান উই
আমরা বাড়ি ফিরে সিরিয়ালে সন্ধ্যা মেশাবো
কফিমগে আর একটু আন্তরিক চিনি
বাষ্প ও কার্বনের জন্য যে জানলাগুলো খোলাই পড়ে
যে কাঁচগুলো ভেঙে ফেলা হোলো
তাদের ময়নাতদন্তে পাঠাও চাদর তুলে তুলে...








কোথাও একটা আমরি হাসপাতালে মধ্যরাতে আগুন লেগে ভাঙা কোমর নিয়ে ঘুমচোখে সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে যেতে নাপারা অলোককাকু একটা নিষিদ্ধ বাজি কারখানায় আগুন লাগা পোড়াবাড়ির ফোটোগ্রাফ একটা বুজিয়ে ফ্যালা পুকুরের স্মৃতি আর স্মৃতির শহর বলতে একটাই তো জলপাইগুড়ি একটা ভুলে যাওয়া স্বপ্নের ম্লান ছায়ার ভেতর মিশে যায় আর খুব ঘুম পায় আমাদের। ফিরে ফিরে আসেন শ্যামল সিংহ আর বুনুয়েল। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের সামনের রাস্তাটা দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে বাঁধে উঠে পড়েন ওঁরা। দূরে মিলিয়ে যান আর কথাবার্তা চলতে থাকে ওঁদের। যেন আমি শুনতে বুঝতে পারছি সব। শ্যামল সিংহের লাল অক্ষর, আলোচনা, জ্বলন্ত, টুপি, নবান্ন, সিম্ফনি, রান্নাঘর আর পোড়োবাড়ি – এই আটটি কবিতা নিয়ে বুনুয়েল একটি চলচ্চিত্র তৈরী করতে চাইছেন আর সেই বিষয়ে ওঁদের আলোচনা চলতে থাকে... কমল হাসন, ফার্নান্দো রে, ক্যারোল বোকে আর অ্যাঞ্জেলা মোলিনা অভিনয় করবেন... ছবির নাম পোয়েটিক জাস্টিস হবে কিনা এখনো ঠিক হয়নি...