নিরুপমের উদ্দেশে যাত্রা: হন্টন অথবা Haunt-On

অর্ক চট্টোপাধ্যায়


"Year on year, the number of journeys taken on foot declines – indeed, on current projections walking will have died out altogether as a means of transport by the middle of this century." ---উইল সেল্ফ



সেদিন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিলো না; ছিলো বলতে হাঁটা আর হাঁটার ইচ্ছা। হাঁটতে শুরু করলে অনেক কিছু ঝকঝকে হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে নিজের শরীরটার সাথে নতুন করে বন্ধুত্ব পাতানো যায়। অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে মন মগজ সবই সচল হয়ে উঠছে মনে হয়। হাঁটতে আমার বরাবরই ভালো লাগে। আমি সেই বিরল ব্যতিক্রমী মফস্বলী যে ছোট শহরে থেকেও সাইকেল শেখা রপ্ত করে উঠতে পারিনি। চারচাকা থেকে দুচাকা হতে না হতেই দুদিকে সাপোর্ট হিসেবে ঠেকনো চাকা আমদানি হয়েছে আর আমার ব্যর্থ সাইকেলশিক্ষক দাদুকে সেই সাইকেলের পেছনে ক্রমাগত দৌড়তে হয়েছে। ব্যালেন্সের অভাব নাকি পড়ে যাবার ভয়? দৌড় বন্ধ হলেই আমার সাইকেল চালোনোও বন্ধ। সেসব অনেক পুরনো দিনের কথা। অন্তত পনেরো বছর আগে। তারপর থেকে সাইকেল নয়,সব জায়গায় হাঁটাই সঙ্গ দিয়েছে। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি কিনা জানি না, তবে হাঁটতে শেখার মধ্যে এক স্বয়ম্ভরতা খুঁজে পেয়েছি আস্তে আস্তে, তাই বহিরাগত কোনো সাইকেল নয়, অন্তর্গত শরীর দিয়ে হাঁটাই স্বস্তি দিয়েছে, যেন হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যাওয়া যায় না! আমার দাদু আর আমার বন্ধুরা আমায় অনেক ডাবল ক্যারী করেছে। আমার বাল্যবন্ধু অর্ণব যার কথা ভাবলে মনে হয় সে বোধ হয় জন্ম থেকেই আমার বন্ধু, সে তার থেকে অনেক ভারী এই আমিটাকে তার সাইকেলে করে এখান ওখান নিয়ে গেছে। ইস্কুলের আরেক বন্ধু দেবরাজও তাই। আবার অনেকসময় আমি আমার বন্ধুদের হাঁটতে বাধ্য করেছি। আমি সাইকেল চালাতে জানি না বলে তারাও নানা জায়গায় হেঁটে আমায় সঙ্গ দিয়েছে। সেদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে এইসব পুরোনো হাঁটার স্মৃতি ফিরে আসছিলো। একলা হাঁটা শুধু নয়, অনেকে মিলে হাঁটাও বটে। অনেক দিন ধরে একটু একটু করে হাঁটা, একলা একলা অনেক।

এখন গবেষণাসূত্রে সিডনীতে। এখানে হাঁটতে বেরোলে সবথেকে বেশি মিস করি চেনা কারুর সাথে দেখা হয়ে যাওয়াটা। উত্তরপাড়া ছোট শহর হওয়ার কারণে হাঁটতে বেরোলে কারুর না কারুর সাথে দেখা হতো। দেড় বছরের প্রবাসে চেনা মুখ দেখার অভ্যেস এখনো কাটেনি। হয়তো কাটাতে চাইনি বলেই কাটেনি। অস্ট্রেলিয়ার যা জন-ঘনত্ব তাতে শহরের বাইরে যেখানে আমি থাকি, সেখানে হাঁটতে বেরোলে মানুষ দেখতে পাওয়াই বড় পাওনা। আর চেনা মানুষ পাওয়া তো নিদেনপক্ষে অসম্ভব। সেকি আমি উত্তরপাড়ায় বেরোলেও সবসময় হত? শেষ দশবছরে কলেজ জীবন থেকে শুরু করে কলকাতায় যে বিস্তর হাঁটাহাঁটি করেছি তাতেও কি সবসময় চেনা লোকের সাথে দেখা হতো? না, কিন্তু দেখা না হলেও দেখা হবার সম্ভাবনাটা অন্তত জিইয়ে রাখা যেতো। এখানে হাঁটতে বেরোলে দেখা হওয়ার থেকেও বেশি ওই দেখা হওয়ার সম্ভাবনাটাকে মিস করি। এই হাঁটাগুলো এভাবে নিরুদ্দেশযাত্রা হয়ে ওঠে। এখানে শুধু যে কারুর উদ্দেশে যাত্রা হচ্ছে না তাই নয়, এখানে আমি নিজেও নিরুদ্দেশ। সেদিন বিকেলে উইনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আমার অফিস ছেড়ে যখন হাঁটতে বেরোলাম, সন্ধ্যে তখন ৬টা। অক্টোবর মাস। শীতশেষে বসন্ত ছুঁয়ে এখন গ্রীষ্ম আসছে। দিনগুলো বাড়তে শুরু করেছে, আলো শেষ হতে চায় না। এখনই সাড়ে সাতটা অব্দি আলো থাকছে, ডিসেম্বরে গিয়ে ৯টা ছোঁবে। পিঠে পড়ন্ত রোদ নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম। এই আপাত নিরুদ্দেশযাত্রায় গন্তব্য না থাকলেও হাঁটার ইচ্ছা ছাড়া আরেকটা ব্যপার ছিলো: রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা 'দ্য রোড নট টেকন'। আমি যে ছোট্ট ট্রেন স্টেশন থেকে মিনিট কুড়ি পা চালিয়ে ক্যাম্পাসে আমার বাসায় ফিরি তার নাম 'পনেনিয়া'। রাস্তাটা আমার বেশ পছন্দ। পিচের রাস্তা ধরে খান চারেক কাটাকুটির পর একটা মাঠ পেরিয়ে কাঠের সাঁকো ধরে এগিয়ে গেলে দুদিকে গাছ ঝুঁকে আসে রাস্তার দিকে। গাছেদের মাঝখান দিয়ে সোজাসুজি হেঁটে যেতে যেতে গাছের সারি শেষ হবার ইঙ্গিৎ দ্যায়। ততক্ষণে বাসাও আসন্ন। তা মাঠ পেরিয়ে সাঁকোটায় ওঠার সময় রোজই মনের ভেতর কে প্রশ্ন করে, আচ্ছা বাঁদিকের ওই রাস্তাটা কোথায় যায়? কিন্তু ফেরার সময় এতো রাত হয়ে যায় যে আর যাওয়া হয়ে ওঠে না। ছোটবেলায় পড়েছিলাম ফ্রস্টের কবিতাটা:

Two roads diverged in a wood, and I--
I took the one less traveled by,
And that has made all the difference.

আমি এখনো অব্দি ডানদিক বা বাঁদিক কোনো রাস্তাতেই বিশেষ কাউকে যেতে দেখিনি। তাই কোনটা "less traveled by" আর কোনটা "more" তা বলা কঠিন। তাও ওই রাস্তাটা ফেরার সময় দ্য রোড নট টেকন হয়ে অনেকদিন হন্ট করেছে। আমিও তাই তক্কে তক্কে ছিলাম যে যেদিন সুযোগ পাবো আলো থাকতে থাকতে ঐদিকে হাঁটতে বেরোব। আই উইল টেক দ্য রোড নট টেকন! এখানেই নিরুদ্দেশের ভেতর একটু আধটু উদ্দেশ উঁকি ঝুঁকি মারছিলো। তবে এদেশে যেমন সবাই গুগল ম্যাপ দেখে বেরয়, আমি ইচ্ছে করেই তা দেখিনি। সঙ্গে যে ফোনটা রয়েছে, যুগের হিসেবে তাও আমার মতোই আনস্মার্ট। ম্যাপ বলতে যা কিছু তা চোখের প্রসারে ক্রমশ প্রকাশ্য। তবে বেরোনোর সময় বুঝিনি যে রাস্তাটা এত বড়সড় হয়ে এগিয়েই চলবে। ভেবেছিলাম হয়ত খানিকটা গিয়ে রাস্তাটা মাঠ আর সারিবদ্ধ গাছের কাছে মাথা নত করবে কিন্তু না, দিব্বি এপাশ ওপাশ এপিঠ ওপিঠ করতে করতে এগিয়ে চললো। খেলার মাঠ, স্থানীয় ক্লাবে উইকএন্ড উল্লাশ পাশ কাটিয়ে আমিও হাঁটতে লাগলাম নিরুদ্দেশের পথে। রাস্তাটা যেন জানান দিতে চাইছিলো যে তাকে আন্ডারএস্টিমেট করা মোটেও ভালো কথা নয়। প্রায় আধঘন্টা হাঁটার পর একটা বিরাট মাঠ পেরিয়ে কিছুটা চড়াই বরাবর উঠে সামনে বড় রাস্তা দেখতে পেলাম। রাস্তার ওপাশে জর্জেস রিভার বয়ে চলেছে আপনমনে, সেও তো আরেকধরণের নিরুদ্দেশ হন্টন। জলের পায়ে পায়ে গলনের সীমান্তে গিয়ে আরোকিছুটা সঞ্চালনসুখ রোজগারের চেষ্টা। এই জায়গাটার নাম কেলসো বীচ। বোর্ডে লেখা রয়েছে। একটা লুক আউট পয়েন্ট আর খানকতক জলদেখার বেঞ্চ। নদী বিস্তার পেয়ে পেখম মেলবে মেলবে করছে আর দূরে হাল্কা পাহাড় আর জঙ্গুলে ভাব ঘিরে রেখেছে জলকে। আমি বাঁদিক বরাবর আরেকটু হেঁটে কয়েকটা ঘাটের মত পাথুরে জায়গা পেলাম যেখানে ডাঙা জলের কাছে নিরুদ্দেশ হয়ে গ্যাছে।

জল যেখানে কথা বলতে শুরু করছে তার আগে, শেষ পাথরটার ওপর দাঁড়িয়ে ডাঙার প্রান্তবর্তী মানবচিহ্ন হয়ে বেশ ভাবতে ইচ্ছে করলো গল্পমাত্রেই তো নিরুদ্দেশের জন্য ঘোষণা। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে আমার সমান্তরাল পাথুরে ঘাটটায় বসে দুটি ছেলে বিয়ার খেতে খেতে মাছ ধরছে। জলের ভেতর যেখানে চোখ যায় না, সেখানে বছরের পর বছর ধরে ছুঁড়ে দেওয়া পরিত্যক্ত এমন কত জিনিসই না রয়েছে, আবার রয়েছে নতুন পুরনো নানা রকম প্রাণ, মানুষ ছাড়া অন্য অন্যন্য টুকিটাকি সব প্রাণ। লিখতে বসলে আমিও তো অমনকরেই মাছ ধরি, মাছ ধরতে গিয়ে মাছ না পেলেও ছিপের টানে কত কত নিরুদ্দেশ আধডোবা চিঠিচাপাটি বেরিয়ে আসে। সেইসব লিখনচিহ্ন ধীরে ধীরে সুঠাম হয়ে স্ক্রিন কিম্বা পাতায় এসে বসে যায় আর গল্প হয়ে ওঠে। জলের মধ্যে থেকে এমন অনেককিছু একটু ঠোঁট ফাঁক করে বেরিয়ে থাকে। স্পর্শের জন্য কাতর সেই সব নিরুদ্দিষ্ট ঠোঁটের ওপর দিয়ে জল চলে যায়, তাদের ছাপিয়ে যায়, ছাপিয়ে দ্যায়। চোখের জলতল ভেদ করে দেখলে সেখানেও আধ-ভেজা কয়েকটা ঠোঁট দেখা যায়। চোখের সাদার মধ্যিখানে কালো গোলক যেখানে দিন-রাত আর আলো-অন্ধকারের যক্ষ হয়ে ওৎ পেতে থাকে, সেই সাদা কালোর সীমানা বরাবর আঙ্গুল দিয়ে আলতো চাপ দিলে অনেক নিরুদ্দিষ্ট পালক বেরিয়ে আসে। কান্নার ভেক ধরে সেইসব নিরুদ্দেশ আলোর ল্যাজ ছড়িয়ে দ্যায় চোখের বাইরের আকাশে। এইরকম নিরুদ্দিষ্ট চোখের নিবেশের কথাই হয়ত বলেছিলেন পল চেলান:

Aching depth of the eyeball:
the lid
does not stand in its way, the lash
does not count what goes in.

The tear, half,
the sharper lens, movable,
brings the images home to you.

চারিদিকে জলের মধ্যে এইরকম কত কিছুই না ডোবা-ভাসার মাঝামাঝি প্রক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে। এই সব গুমশুদাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে, তাদের গল্প বলাই তো আমার কাজ। জলের ধার ঘেষে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত মনে হতে লাগলো গল্প মানেই নিরুদ্দেশের উদ্দেশযাত্রা আবার উদ্দেশের নিরুদ্দেশযাত্রাও বটে। গল্প শুধু হারানোর ফিরে পাওয়া নয়, হয়ত পাওয়াকে হারনোও--যে হারানোর উদাহরণ কিম্বা উদ্ধৃতি কোনটাই আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

কেলসো বীচ থেকে ফিরতি পথে সূর্য যখন মুখ ফিরিয়েছে আর দিগন্তরেখা অনেক নিরুদ্দেশকে চোখের ভেতর চেপে ঢুকিয়ে দিতে চাইছে আর তারা বারবার দৃষ্টির সীমান্তে মাথা তুলে তাকাচ্ছে, তখন সাঁকোর কাছে ফিরে এসে দেখলাম আমার পায়ের শব্দে মজা জলের মধ্যে আধ-ভাসা ট্রলির ওপর থেকে একটা বক উড়ে গ্যালো। ট্রলিটা বহুদিন ধরেই জলে পড়ে রয়েছে। জোৎস্নায় বাড়ি ফেরার সময় ট্রলির এখনো তেমন মরচে না পড়া স্টীলটুকু সাদা পাশবালিশের মত হাতছানি দ্যায় অন্ধকারে। তাও এর আগে ওকে নিয়ে বিশেষ ভাবনা হয়নি। কিন্তু আজ বকটা উড়ে যাওয়ায় ওর একাকিত্বতাই শুধু চোখে পড়লো তাই নয়, ওর সম্ভাব্য ইতিহাসও বেশ আগ্রহব্যঞ্জক মনে হলো। শপিং মলে শক্তপোক্ত কিম্বা পেলবমধুর হাতের পরশ পাওয়া এই ধাতু ঠিক কিভাবে সাঁকোর নীচের নিথর জলে নিরুদ্দেশ হলো তা নিয়ে একটা গল্প লিখতে বসলে তা কি শুধু নিরুদ্দেশ হবার গল্প থাকে নাকি নিরুদ্দেশকে উদ্দেশ্য বানিয়ে তাকে আবার উদ্দেশের পথে নিয়ে আসে?

নিরুদ্দেশের উদ্দেশ আর উদ্দেশের নিরুদ্দেশের মাঝে ফারাক গড়ে দ্যায় যে নিরু, সেই নিরুপম একাকীর মতো নিভন আলোয় ফিরতে ফিরতে আমিও বললাম: মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি । বাইরের পৃথিবীটা ভেতরেরটার থেকে কতোটা বিদঘুটে রকমের আলাদা তা বোঝানোর জন্যে হয়তো ঠিক তখনই আমার কানে ভেসে এলো, সাঁকোর ওপারের বাড়ি থেকে সপ্তাহশেষের সঙ্গীত: "ক্রেজি কিয়া রে" ।