‘আমার ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে …’

দ্যুতি মুখোপাধ্যায়


স্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠেছি, ছাড়ার অপেক্ষায় বসে। টলতে টলতে উঠল একটা লোক। ময়লা শার্ট, এলোমেলো লুঙ্গি। দরজার এক কোণে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে। স্টার্ট নিয়ে সবে গতি বাড়িয়েছে বাস আর … ‘আরে ধিরে ধিরে হাঁকো ভাইয়া! কেয়া কর রহে হো? মহাকাল পিছে দওড় রহা হ্যায়!’ আমি চমকে উঠলাম। বাসের দরজায় লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে এতক্ষণে, ভীত, সন্ত্রস্ত মুখে সে কাকুতি-মিনতি করে চলেছে, গাড়ি যেন জোরে না চালানো হয়। যত জোরে ছুটবে তুমি, মহাকাল তত দ্রুত পৌঁছবে তোমার দুয়ারে। বাসভর্তি লোক আমোদ পেয়ে হেসে ওঠে। কন্ডাক্টর মদের গন্ধ পেয়ে চটে যায়। আমি হতভম্ব হয়ে যাই। কানে বাজে, ‘মহাকাল পিছে দওড় রহা হ্যায়’।
১.
এখন রাত সাড়ে বারোটা। আমার চারপাশে ঝকঝক করছে সাদা। কাচ, কাঠ, ফলস সিলিং ঘেরা খোপ খোপ। চোখ থেকে সমস্ত প্রাণ শুষে নিচ্ছে তীব্র আলো। মাথা একটু তুললে দেখতে পাই, ব্যস্ততা শেষ হয়নি এখনও। ‘আরাবুল’, ‘জাকোভিচ’, ‘কালো টাকা’, ‘হুদহুদ’, ‘খাগড়াগড়’ – ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দ ছুটোছুটি করে। কান না পাতলেও কানে এসে লাগে খটখটখটাখটখটাখট কি - বোর্ডের ঝড়।
এই আমার সময়। এই, এইটুকুই।
অনন্ত কাজ আর অশান্ত অবসরের মধ্যে এই, এইটুকু ফাঁক। হাতের কাজ শেষ। মাঝরাতে বাড়ি ফেরানোর গাড়ি এখনও এসে পৌঁছয়নি। চোখ এখনও কিছুটা সজাগ। মস্তিষ্ক পুরোপুরি ঢলে পড়েনি ঘুমে। লিখতে বসেছি এখন। কেউ একটা নাম ধরে ডাকল কি? আমি উত্তর দিই না। একটা আদিরসাত্মক ঠাট্টা ভেসে এল ও দিক থেকে। এই সব ঠাট্টায় হাসাটা দপ্তরি দস্তুর। না হলে লোকে নাক উঁচু ভাবে। এই, এইটুকু সময় আমি আর হেসে উঠি না নিয়মমতো।
আর একটু পরেই বেরিয়ে পড়ব চিরশীতল এই ঘরটা থেকে। গরম হাওয়া একটু একটু করে অভ্যস্ত হবে আমার হিম হয়ে যাওয়া শরীরে। গাড়ির কাচ নামিয়ে দিলেই ভীষণ আরাম লাগবে আর আমি ঘুমিয়ে পড়ব। গাড়ি গিয়ে থামবে বাড়ির দরজায়, ঘুমন্ত আমি নিয়ম মেনে নামব, দরজা খুলব, খাবার গরম করব, শুয়ে পড়ব তড়িঘড়ি। ঘুম ভাংলে আর কিছু মনে থাকবে না।
২.
জেগে ওঠা আর ঘুমিয়ে পড়ার মাঝখানে আমার সময়। প্রকৃতির আপন খেয়ালে যে সময় হয় তেমন নয়। মানে, এই যে ধরুন, একটা অনন্ত সময়ধারার মধ্যে আপনি-আমি ঘুরিফিরি, যার শুরু-শেষ নেই বলেই গতি-অগতির বালাইও নেই। বা এই যে দেখুন, খাটে হেলান দিয়ে এই তো দিব্যি বসে আছি, বারান্দার দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে নারকেল গাছের পাতাগুলো শতায়ু বুড়োর মত মাথা নাড়াচ্ছে ধীরে ধীরে। এই যে আমার মনে হচ্ছে দুনিয়াটাও বোধহয় চরকিপাক থামিয়ে একটু ঘাম মুছে নিচ্ছে এমন শান্ত একটা সকালে। এই সময়টা কিন্তু আমার নয়।
আমার ঘরে একটা বড় আয়না আছে, তার সামনে দাঁড়ালে মাথার উপরে দেওয়াল ঘড়িটা দেখা যায়। ছেনি হাতুড়ি দিয়ে নিপুণভাবে ভাগ করে সেখানে সময় সাজানো। টিক টিক করে কাঁটা ঘুরছে। কাঁটার তাড়া খেয়ে ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাওয়ার মধ্যেকার সময়টুকু ফুরিয়ে যাচ্ছে। আয়নার বাইরে আরও একবার আড়মোড়া ভেঙ্গে পাশ ফিরে শোয় পৃথিবী। আয়নার ভিতরে ঘড়ির কাঁটা দৌড়য়। আয়নার ভিতরে একটা মুখ দেখা যায় সামনে দাঁড়ালে। ওটাই আমি। ওইখানে আমার সময়। আমারই অস্তিত্ব ছেনি হাতুড়ি দিয়ে সমান ভাগে ভাগ করে উপরে ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দেওয়া। টিক টিক শব্দে একটু একটু করে প্রতি মুহূর্তে বাতিল হয়ে যাচ্ছে তার একটু একটু অংশ।
আয়নার ঠিক বাইরেটায় অনেক কিছু ভীড় করে থাকে। স্মৃতি, স্বপ্ন, চেনা মুখ, প্রিয় কাজ, ততোধিক প্রিয় অকাজ। রঙ, তুলি, তানপুরা, কালি, কলমে, মাটি ধুলো, কাদায় জড়ানো-মড়ানো এক পৃথিবী। বেঢপ, বেখাপ্পা, সময়-সুযোগ না মানা অসহ্য ইচ্ছের দল। যত ট্যারাব্যাঁকা, যা কিছু ভুল, বাজে, হাস্যকর সে সমস্ত কিছু ভালোবাসার, যত্ন করার অঢেল, অফুরান অবসর।
তাকাইনা আমি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টিক টিক করা ঘড়িটাকে দেখতে দেখতে মুখ থেকে যত্ন করে তুলে ফেলি যাবতীয় স্মৃতি আর স্বপ্নের দাগ। তারপর ঢুকে পড়ি আয়নার ভিতর।
৩.
অনেক দিন মাকে দেখিনি। মা আমার পাশের ঘরে থাকে। আমি কর্মসূত্রে নিশাচর। তাই সকালে মা যখন অফিস যায় তখন আমি মাঝ ঘুমে। আর আমি যখন ফিরি, মায়ের তখন আর চোখ খোলার সাম্যর্থ নেই। রবিবার সকাল বাদে আমাদের যোগাযোগের মূল মাধ্যম তাই মুঠোফোন। মায়ের ফোন আসলে পাশে একটা ছবি আসে। বছর তিনেক আগে তোলা। হাসিমুখ। কয়েকটা চুলে পাক। কাঁধের অল্প নিচে এসে থেমে গেছে ফ্রেম। মায়ের চুল বোধহয় এখন অনেক বেশি সাদা। হাসিমুখটাও আরও ক্লান্ত। তবে এই মুখটার মুখোমুখি আজকাল কমই বসা হয়। পুরোনো মুখটাই এখন আমার মা।
মোবাইল স্ক্রিনের ছবি ধরে রাখে আমার প্রিয় মানুষগুলোকে। তাদের কারও বাঁ হাতটা কাটা, কারও কোমর থেকে, কারও মুখটা ঝাপসা এসেছে কিছুটা, কেউ আবার এমন ভেংচি কেটেছে যে চেনাই দায়। প্রিয় মানুষদের দেখতে ইচ্ছে হলে আমি ফোন করি। এই তো বেশ, ভাবি। আয়নার ভিতর থেকে না বেরিয়েই এই তো তুরন্ত পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে প্রিয় একটা কণ্ঠস্বরের কাছে। আঙুল নাড়লেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে প্রিয় একটা মানুষ। হোক না তার বাঁ হাতটা কাটা, কোমর থেকে নেই, মুখটা যেন ঝাপসা নয়তো এমনই ভেংচি কাটা যে চেনাই দায় …
এই এক তৃতীয়াংশ, দুই পঞ্চমাংশ মানুষগুলোকে নিয়েই আমি খুশি আছি। এই ভগ্নাংশ জীবনেই আমি খুশি থাকি। ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাওয়ার মাঝের সময় খুঁটে খাইদাই, হাসি, কথা বলি, ভাবি আবার কখন ঘুমোতে যাব। বেশি ভাবার সাহস করি না। বেশি ভাবার, বেশি চাওয়ার অধিকার আমার থেকে কবেই কেড়েছে আমারই আয়না। পরবর্তী দৌড়ের জন্য বাকি সময়টুকুর হিসেব কষতে কষতে ঘড়ির দিকে তাকাই। মনেও পড়ে না, কতদিন অপেক্ষা করিনি কারও জন্য।
৪.
সত্যি, কতদিন অপেক্ষা করিনি কারও জন্য।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ঘড়ির ডাক শুনে গতি বাড়িয়েছি, পাশ থেকে ক্রমে পিছনে চলে গেছে পাশের মানুষ। মানুষদের দরদাম করে স্থির করেছি, নিক্তিতে মাপা ভাগ ভাগ সময় কাকে কতটুকু দেব। হাতে প্ল্যান রেডি। চার্ট ধরে রোল নম্বর মিলিয়ে আমি কন্যা থেকে সখী থেকে প্রেমিকা থেকে শিষ্যা হয়ে ঠাঁই বদল করতে থাকি। এক ঠাঁই থেকে আরেক ঠাঁইয়ে ঠেলে দিতে থাকে মাথার ভিতরে ঘড়ির ডাক। রিয়ার ভিউ মিররে দেখতে পাই আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছে মুখ – মায়ের, বন্ধুর, প্রেমিকের, শিক্ষিকার। আমি অপেক্ষা করি না। বেশি অপরাধী লাগলে ফোন বের করি। লিখি, ‘বিজয়ার প্রণাম নেবেন’। লিখি, ‘তোর কথা মনে পড়ছে খুব’।
তা, মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই সব দিনের কথা যখন ভাবতাম গান গেয়েই দুনিয়াটা বদলে দেওয়া যায়। যখন জানতাম, এই সাড়ে তিন হাত দেহের খাঁচাতেই আছে অফুরান শক্তির ভাণ্ডার। হাতে তখন ধরা দিত অনেকগুলো হাত। কাঁধে এসে লাগত আরও কত কাঁধ। কত বীজ রোপণ করেছি। মাটি খুঁড়ে আলগা করে, জল সার দিয়ে, কঞ্চির বেড়া লাগিয়ে গরু-ছাগল তাড়িয়ে কত না যত্নে লালন করেছি কত স্বপ্ন। আপন খেয়ালে তাদের গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত দিয়েছে মাথার উপর অনন্ত সময়। হাতে মুখে কাদামাটি মাখা এলোথেলো আমি তখন আয়না দেখতে জানতাম না। মুখ দেখতে জানতাম।
৫.
একা থাকা আসলে একটা অভ্যাস মাত্র। আয়না দেখার অভ্যাস। সাধকরা নিজেদের দিকে তাকাতে পারেন সত্যদৃষ্টিতে। আমি সাধক হতে পারিনি। নিজের খোঁজে আয়নার দিকে তাকিয়েছি। সেই শুরু আমার নার্সিসাস জন্মের।
নার্সিসাসের ধাঁধাটা জানেন? সেই যে সেই অপরূপ যুবা, সারা শহর যার প্রেমে উথাল-পাথাল কিন্তু তার আর কাউকেই মনে ধরে না। এ হেন নার্সিসাস একদিন বনে ঘুরতে ঘুরতে শ্রান্ত হয়ে এক ঝরনার ধারে গিয়ে বসল, আর ব্যাস! চক্ষে আর পলক পড়ে না। ঝরনার জলে কে ঐ অনিন্দ্যকান্তি? এই তো তার মনের মত মানুষ। অতঃপর আয়নার জলে নিজেকে ধরতে গিয়ে বেচারা নার্সিসাসের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। আত্মরতির নাম তাই আমরা দিয়েছি নার্সিসাস কমপ্লেক্স।
ব্যাপারটা কিন্তু ঠিক এতোটাও সরল নয়। নার্সিসাস তো জানত না যে নিজেরই ছায়াকে দেখছে, নিজেই সে নিজেকে টানছে অতল মৃত্যুফাঁদে। আমি, আমরা নার্সিসাসের মত বোকা নই। আয়নার মানুষটা যে আমারই ছায়া তা আমরা জানি। সত্যিই কি জানি? এক ভুল কি আমরাও করি না? আমার মানুষজন্মের উপর দেবতার অভিশাপ এটা। নিজের চোখে নিজেকে দেখতে না পাওয়া। আমার সহায় শুধু আয়না। কিন্তু আয়নার আমি দ্যুতিময় শুধু। আয়নার বাইরে অনেক ধুলো-ময়লা কাদা লেগে এই শরীরে। তা আমি দেখতে পাই না। আয়না দেখতে দেখতে ভুলে যাই, প্রতিবিম্বের ভিতরমহল নেই, নেই সেই সাড়ে তিন হাতের শক্তিভাণ্ডার যা দিয়ে দুনিয়ে বদলে দেওয়া যায়।
প্রতিবিম্বের আছে শুধু ইচ্ছে। ফুটপাথের কামিজ চলবে না, চাই ব্র্যান্ডেড। ট্যাক্সি হাঁকিয়ে সাঁ সাঁ করে সে পৌঁছবে গন্তব্যে। লম্বা সিগারেট ছাড়া মুখে রুচবে না, গোয়া যেতে হবেই হবে ছুটিছাটায়। শাড়ি থেকে গাড়ি থেকে বাড়ি – এ তালিকার শেষে নেই। আর তখনই, ঠিক তখনই মাথার ভিতরে বেজে ওঠে টিক টিক টিক। আমি চমকে উঠে সাততাড়াতাড়ি হাতলটা চেপে ধরে উঠে পড়ি ছুটে চলা সময়ের বাসে। ইচ্ছের দাম মেটাতে সময় কিনি, সময়ের দাম মেটাতে ইচ্ছে। জানলা দিয়ে সারি সারি পিছনে সরে যেতে থাকে আমারই রোপণ করা গাছ, যাদের আর মহীরুহ হওয়া হবে না কখনও।
৬.
মহাকালের ভয়ে কাতর সেই প্রাজ্ঞ মাতালকে সে দিন বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছিল কন্ডাক্টর। হয়তো সে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে, কালের করাল গ্রাস এড়িয়েছে ভেবে। আমার কানে কিন্তু এখনও বাজে, ‘ধিরে ভাইয়া, মহাকাল পিছে দওড় রহা হ্যায়’! স্থির হয়ে বসে চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, তিনগুণ গতিতে সিনেমা চলার মত করে আমার দুপাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে বর্তমান। সময়কে শাসন করব বলে ঝুঁটি চেপে ধরতে যাই, মুঠো খুললে দেখি পড়ে আছে ছাই আর বালি।
এ বার স্থির করেছি, মাতালটাকেই অনুসরণ করব এক দিন। আয়নার দিকে পিছন ফিরে বাস থেকে নেমে যাব। দেখাই যাক না, মহাকালের সঙ্গে সন্ধি করা যায় কি না!