আসছে

অংশুমান


দুটো গরু উলটোদিকে মুখ করে আছে, ওদের একটা পাতনায় খেতে কী করে দেবে? বলো তো...

এই ধন্দ নিয়ে কিছু তারাবাতি, কিছু ফুলঝুড়ি ফুরিয়ে আসছে। নিঃশব্দ একটা রাতকে ফুঁড়ে জ্বলে উঠছিলো আলোর পিচকারি। কিছু বাচ্চার খিদের রাক্ষস উঠছিলো জেগে। দেওয়াল থেকে খসে যাচ্ছিলো অনিহার মাটি। পাতায় জমছিলো আরো কিছু বারুদ মাখা ধূলো; আহা! নতুন ঠিকানা, নতুন ধ্বংস। কিছু পুরুষকে জাপটে ধরছিলো মদ, কিছু নারীকে জাপটে ধরছিলো পুরুষ; ধরবেই তো, এই পুঙ্খানুপুঙ্খ অতিনিয়ম। খুঁজছে খড়, খই কিছু অসহায়। পশুদের ডাক যাচ্ছিলো আকাশ ভেদ করে স্বর্গের পাড়ে। যাচ্ছিলো তো যাচ্ছিলোই, নিস্তারবিহীন, আপাত অনন্তকালের খোঁজে; ত্রাহি, ত্রাহি। আসবে সকাল... আসবে ভবিষ্যত...

ধুকধুকে পেটে মলিদে এসে পড়তেই কী উজ্জ্বলতায় ফেটে পড়ছে চারদিক। জাবর কাটবে সুখের। আসবে ঘরে ধান। আবিষ্কার হবে ধানের গাড়ি, ধানের গোলা। মজে উঠবে উৎসব। মানুষে মানুষে হবে ঢলাঢলি। শিশুর স্বাভাবিক নগ্নতা উঠবে সেজে। লজ্জা নামের কিছু উপকরণ নেমে আসবে কৃষ্ণের ময়ূরপঙ্খ বেয়ে। আসবে নতুন চটি, নতুন নাইলন। আসবে কথা না বলার দিন... আসবে ভবিষ্যত...

সব সংস্কারের আড়ালে চাদর মুড়ি দিয়েছে বিজ্ঞান। সব বিজ্ঞানের নিশ্বাসে ভেসে থাকছে টোটকা। পুরোনো টায়ার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সভ্যতা, মানব-এঞ্জিন। আত্মীয় স্বজন না এলে কী হত? চড়ে বেড়াচ্ছে সমালোচনা, হামাগুড়ি দিচ্ছে অসুখ, গোপনে। একটা গ্রাম থেকে রূপবদল হচ্ছে আরেকটা গ্রামে। অথচ, কী দায়িত্ব! পাঁকে ঢুকে যাচ্ছে পা, জঙলায় বিঁধে যাচ্ছে নৌকা, জালিতে মাছ পড়ছে সারারাত। মাছেরা, না হলে আর যেত কোথায়? নাম পেত কি? পাললিক যকৃতে চাঁদ আনতো কে? রাত্রে নিজের ছায়া নিজে মাখছে গাছ। নিজেকেই চাদর বলছে প্রতিটি বাড়ির চাল। গোঁড়ায় এক প্রস্তরকে আশ্রয় দেওয়া বটগাছ ঈশ্বর অহংকারে শক্ত করছে নিজের বাহু। তবু দলে দলে বয়স চলেছে পীরে পায়ের দিকে ঝুঁকে। প্রতিটি পরবর্তী মানুষ করছে অস্বীকার। বলছে, এই বিতরণ চলবে না। চলবে না এইসব সুস্থ মেঘের বৃষ্টি। চাইছে অ্যাসিড। আসবে একাকীত্বের দিন... আমিও চলেছি... ছাড়ছি খোলস...

তবু সেই ধাঁধা পিছন ছাড়ছে না। গরুদ্বয় দাঁড়িয়ে আছে অসহায়। কীসের শত্রুতা? ভাঙো না সব। খেতে দিই একটা পাত্রে। কত রঙ আসছে, কত ভয়। আগামী হয়ে উঠছে নারীকেন্দ্রিক অথবা নারীর কোনো অঙ্গকেন্দ্রিক। আমি ছুটে পালাবো। যাবো ভাঁজইয়ের কাছে, কলমীলতার কাছে, চিনামাটির কাছে, মৌচাকের কাছে, ডোবার কাছে, পদ্মফুলের কাছে। ছুঁয়ে থাকবো আঁশফল, বনবিড়াল আর কালোদিঘী। মাটির মূর্তি গড়ে উঠছে চাহিদায়, শিল্পেরও এমন বেকায়দা, এমন বেকায়দা! অথচ প্রতিটি রান্নায় থাকছে মাঠের গন্ধ, শকুনের সম্ভাবনা, থাকছে নুন-হলুদের একাকী নিবিড় বন্ধুত্ব। তার বেশি তো কিছু নেই। বড়জোর ভাদুর আশা... খুব গান খুব নাচ অথবা কিছু চালের মায়া। দিতে জানতে হয়। দেওয়ার অহংকার ভাসিয়ে দিতে হয় প্রতি শরৎকাল। কাশফুল শুধু ল্যান্ডস্কেপ মায়ায় ভর্তি করছে পরাবাস্তব পটভূমি। আসছে রাসায়নিক বিকেল... আমিও তৈরি হচ্ছি খুব... নিয়েছি জলরোধি ব্যাগ, কোট, জুতো...

গরু দুটোকে মনে হয় আর খেতে দেওয়া হবেনা। বাজপাখি বাসা গড়েছে বেদেনির হাতে। সাপও তেমনি মনসা হয়ে উঠেছে মিথে মিথে। কোন নদী ভাসিয়ে নেবে সন্তান? কোন নদী ফিরিয়ে দেবে সোহাগ? কোন সাঁকো জুড়ে দেবে কাদামাখা হৃদয়? টেরিকটে জামা ভেসে যায় কার? তারপর প্লাস্টিক আর প্লাস্টিক। ছোটো ছোটো আলো। ভেসে আসছে বিজ্ঞাপণের ধারণা। না কাটা গমগাছ মচকে যাবে। পারবেনা জাগাল, তুমি হারিয়ে যাচ্ছো মাঠে মাঠে। আর মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে অবধারিত সময়ের কোটরে। আলেয়ার আশেপাশে গড়ে উঠছে ঠিকানা। সব উড়ে যাবে। আসবে ভবিষ্যত... আমি তৈরি...

গরু দুটোকে খড় দেওয়া হলো না। পারলাম না বাবা।

ওরে পাগল! গরুদুটো মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকলেই তো উল্টোদিকে মুখ করে থাকে। এবার তো একটা পাতনায় খেতে দিতে পারবি।

খড় নেই... সময় তড়িঘড়ি করে ঢুকে পড়ছে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণে...