হারিয়ে যাওয়া অন্ধকার

অস্তনির্জন


এই হাওয়ায় এসে আমার শিরদাঁড়া একটু উঁচু হয়ে যায়। শীত এসেছে। তার কিছু ফলস পাড়, সালমা জরি, কুশঘুশ আমি চামড়ায় টের পাই। চুপ থেকে আরও চুপ এই দিল্লীর রাস্তায় যেতে ভালো লাগে আমার। সিগারেট খেতে। এত আলো মলমলের পাশে একা পড়ে থাকা হঠাৎ গলিগুলোকে দেখতে। কি জানি মনে হয় গলিগুলো রাস্তার বিশ্রামঘর। একা শান্ত চুপ। একটু চিপে দেওয়া আঁন্ধার মেশানো। ধবক করে মনে হয় কিছু হারিয়ে এসেছি।
মনে হয়।
মনে হয়।
চোখ বুজে ফিরে যাই।
আমারও তো কোনো ছোটবেলা ছিল। বাবা মা বাড়ি ছিল। রূপনারায়ন নদী। মাঝে মাঝে ওই ভাবে চলে যেতাম নদীর ধারে। সন্ধ্যে নামত যখন। যে বাঁকটা দক্ষিনমুখো অবিচুয়ারি। দেখতাম অনেক উঁচুতে কোনও এক টাওয়ার, এক আলো লাল এক জমে আছে। অন্ধকার যত ঘন হত। সে আরও জমে জমে যেত। কি যে অদ্ভুত ভাবে একটা কালারকে আমি অন্ধকার হতে দেখতাম, ধীর প্রান্ত নিঃসঙ্গ। সব আছে অথচ কি যেন হারিয়ে আছে।
কিছুটা নিঃশ্বাস বুকের অর্ধেকটাতে এসে থেমে থাকে। এই অপূর্ব শহরের অপরূপ আলোভাসানের স্নানে আমি ডি-কোড হই। একা হই।
আকা মানে কি অন্ধকার
?
সে হাসে।
আমি মিনিয়েচার ঠেলে সরে যাই। আরো কিছু ভেতরের দিকে। ছোট পাতাবাহার গ্রীল। দেখি একা মানে কি অন্ধকার? আমি আবার জিজ্ঞ্যেস করি।
সে আবার হাসে।
বলে – মাকে মনে পড়ে? মায়ের ভেতর
?
জরায়ুর মধ্যে ভেসে আছো তুমি ভেসেল। আবছা ঐ ছোপ ছোপ-জন্ম। অন্ধকার থেকে তোমার জন্ম। এই সার।
আমি মাথা নাড়ি। সিগারেট ধরাই।
সে বিন্দুর লাল দিকে তাকিয়ে বলে – আলো। আর আমার চোখে ভেসে ওঠে অন্ধকার কেটে ভোর হচ্ছে। ধানজমির আলে আমি অবাক হয়ে দেখছি ধানীইঁদুরের খুঁড়ে রাখা গরতের কাছে মাটি কত নরম কত সেদ্ধ, কতটা আলো ফেলে দিয়ে মলমল হয়ে থাকা।
চমকে উঠে সিগারেট ফেলে দিই। পা দিয়ে ঘষে দি। ঘষে ঘষে দিই।
প্রে ম্যাটার
?
বই মাথায়। ঐ স্মৃতিতে। আলো পড়ছে না। টর্চ ফিরে যাচ্ছে। ধূসর ধূসর। তুলো চাষের জমি। তোমার বহনের চিন্তার প্রায় অংশ অন্ধকার। যা কিছু সৃজন – তাই অন্ধকার।
আমি হাসি।
সে হাসে।
আমি বলি তবে হারিয়ে ফেলা নেই...?
নেই
?
যা ফেলে এলে, এসেছো, আসবে। সব রয়ে গেছে। রয়ে যাবে। তাই অন্ধকার। তার গ্রহন বর্জন চাওয়া পাওয়া হারানো
ব্রহ্ম
?
ঐ যে আলো নিভে গেলে তুমি তো প্লুরাল। আলো জ্বলে আছে ,আছ? সুইচে আছ – নিভে যাক। তোমরা তো তুমি। এক – পরিব্যপ্ত। অন্ধের মত স্থির। অন্ধের থাকাকে তুমি বলবে – হারিয়ে যাওয়া?
যে নক্ষত্রের সবে জন্ম হয়েছে, যার আলো আসতে আসতে আরও কয়েক হাজার বছর লেগে যাবে পৃথিবীতে। তার এগিয়ে আসাটাকে বলবে – হারিয়ে যাওয়া?

তুমি এক্সপেক্ট করো...হাত পাতো।

আমি বলি জানো...
আর আমি আবার ছোট্টবেলায় ফিরে যাই। মনে পড়ে...কালিপুজোর পরের দিন মা সন্ধ্যেবেলায় কলাগাছের পেটোয় চালগুঁড়ি দিয়ে তিনটে ঠাকুর বানাত। সাদা নারায়ন, হলুদ গুলে লাগান, হলুদ-লক্ষ্মী আর নিমপাতা বেটে লাগানো সবুজ কুবের।
আর একটা পেটোয় বানান হত গোবর দিয়ে অলক্ষ্মী।
আমরা ধামা বাজিয়ে, প্যাকাটি জ্বালিয়ে সেই অলক্ষ্মীকে বিদায় করে আসতাম।
মাগো কাউকে বলিনি...কোনোদিন। ছোট্ট দীপ জ্বেলে যখন এই হালকা শীতের অন্ধকারে ঘরের বাইরে কোনো মৃদু ঝোপের নীচে সেই অলক্ষ্মীকে নামিয়ে রেখে আসার যে কি কষ্ট। সারারাত ঘুমাতে পারতাম না। শুধু মনে হত – একা শুয়ে আছে – তার মাথায় ছাদ নেই। সে একা আছে বাইরে আমার। তাকে তো কেউ ডাকবে না – দুঃখী মেয়ে যে সারারাত শিশিরের নিচে খোলা আকাশের নিচে শিতের নীচে শুয়ে থেকে যাবে।
খুব ভোরে উঠে ছুটে যেতাম। দীপ নিভে গেছে। গোবরের ওপর মিশমিশে জল। ভিজে ভিজে। চুপচাপ চিৎ শুয়ে আছে অলক্ষ্মী। আর অদ্ভুত এক মাখামাখি আঁধার পাতা থেকে গুল্ম থেকে মাটি থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো ঝুঁকে আছে তার মুখের ওপর।
আমি তার হাত চেপে ধরি। সব রয়ে যায়? বলো সব রয়ে গেছে? ঐ আঁধার। ঐ রেনাম। আমি কি হারিয়ে ফেলি নি?ঐ অলক্ষ্মী শুয়ে আছে। মরে যাওয়া প্রদীপের নিচে। মাটি থেকে পাতা থেকে গুল্ম থেকে সেই গোল ছমছমে উপুড় হয়ে আসা আশমানি আঁধার গুঁড়ো গুঁড়ো ঝুঁকে আছে তার শিশিরভেজা মুখের ওপর।
ভোর হওয়ার আগের বাতাস বইছে।